শেষ বাঁশি বাজার পর নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর শুয়ে পড়লেন মাঠে। আকাশের দিকে তাকিয়ে কী ভাবছিলেন লিওনেল মেসি? স্বপ্নের বিশ্বকাপটা তাহলে স্বপ্নই থেকে গেল!

একটু দূরে জার্মানরা মেতেছে বাঁধভাঙা উল্লাসে। তৃতীয় বিশ্বকাপ জেতার ২৪ বছর পর আবার ফুটবলে জার্মান-রাজ। ইতালির মতো জার্মানিরও এখন চারটি বিশ্বকাপ। সামনে শুধু ব্রাজিল। 

ফাইনালের আগেই এই বিশ্বকাপে ১৭০ গোল। ১৯৯৮ বিশ্বকাপের রেকর্ড ছুঁতে মাত্র একটি গোলই লাগত। সেই গোলের জন্য দুদল হন্যে হয়ে ফিরল ১১৩ মিনিট। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফাইনালেরই কি তাহলে পুনরাভিনয় হচ্ছে? নির্ধারিত ১২০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর বিশ্বকাপ ফাইনালে সেবারই প্রথম টাইব্রেকার। ১৯৯৪ ফাইনাল হতে হতে মারাকানা হয়ে গেল সকার সিটি। গত বিশ্বকাপ ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের চার মিনিট বাকি থাকতে গোল করে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা জিতিয়ে দিয়েছিলেন স্পেনকে।

এই ফাইনালের ‘ইনিয়েস্তা’ মারিও গোটশে। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হওয়ার একটু আগে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোলের মালিক মিরোস্লাভ ক্লোসাকে তুলে যাঁকে নামিয়েছেন জোয়াকিম লো। ‘সুপার সাব’-এ পরিণত সেই গোটশেই হয়ে দুর্দান্ত এক গোল করে ভেঙে দিলেন মেসির স্বপ্ন। ফিলিপ লামের হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি তুলে দেওয়ার আগেই লিওনেল মেসি ফিরে এসেছেন গোল্ডেন বল হাতে নিয়ে। ট্রফিটা এমন অনিচ্ছায় নিলেন যে বোঝাই গেল বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারের কোনো মূল্যই নেই তাঁর কাছে। 

বিশ্বকাপের ২০টি ফাইনালের মধ্যে সর্বোচ্চ তিনটিতে এই দুই দল। ১৯৯০ সালে ফাইনালে দু দলের সর্বশেষ দেখায় আর্জেন্টিনা যে জার্সি পরেছিল, কালও সেই নীল জার্সি। রোমের ফাইনালে বিতর্কিত পেনাল্টিতে হারার পর কেঁদেছিলেন ম্যারাডোনা। এখানে মেসি কাঁদলেন না। কিন্তু তাঁর চোখমুখ দেখে পরিষ্কারই বোঝা যাচ্ছিল উদ্গত অশ্রুকে কোনোমতে বাঁধ দিয়ে রেখেছেন।

বিশ্বকাপ যোগ্য দলের হাতেই উঠেছে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই বিশ্বকাপের সন্দেহাতীত সেরা দল জার্মানি। ফাইনালেও তাদের খেলা ছিল অনেক বেশি গোছানো। কিন্তু দারুণ পাসিং ফুটবল খেলে গোলে শট নেওয়ার সময়ই কেমন যেন সব গুলিয়ে ফেলছিল জার্মানরা। গোল লক্ষ্য করে শট দু দলেরই সমান (১০)। কিন্তু জার্মানি যেখানে বল পোস্টে রাখতে পেরেছে সাতবার, আর্জেন্টিনা মাত্র দুবার। কিন্তু সেসব শট এমনই দুর্বল ছিল যে, গোলটির আগে রোমেরোকে সেভাবে পরীক্ষাই দিতে হয়নি।

গোলের পরিষ্কার সুযোগ আর্জেন্টিনাই বোধ হয় বেশি পেয়েছিল। মেসি সুযোগ পেয়েছেন। অতিরিক্ত সময়ে প্যালাসিও। সবচেয়ে সুবর্ণ সুযোগটি পেয়ে গিয়েছিলেন হিগুয়েইন। ক্রুস কী ভেবে হেড করে বল পেছনে দিয়েছিলেন। পেছন থেকে ছুটে গিয়ে সেটি ধরে ফেলেন, সামনে শুধু নয়্যার। অথচ হিগুয়েইন শটটা পোস্টেই রাখতে পারলেন না। বাকি জীবন এই মিস তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াতে বাধ্য।

মারাকানায় মাঠে খেলছিল জার্মানি-আর্জেন্টিনা। গ্যালারিতে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল। আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা পেলে-ম্যারাডোনার ওই গান গাইছিল, সেমিফাইনালে সাত গোল খাওয়া নিয়েও খোঁচাখুঁচি। ব্রাজিলিয়ানরা ‘এক হাজার গোল’ ‘এক হাজার গোল’। জার্মান আর ব্রাজিলিয়ান মিলে যাওয়ায় গ্যালারিতে আর্জেন্টাইনরাই সংখ্যালঘিষ্ঠ। জার্মানি গোল করার পর তাই রীতিমতো গর্জন উঠল মারাকানায়।

সেটি আবার তুঙ্গ ছুঁল খেলার শেষ মিনিটে। ২৫ গজ দূরে ফ্রি কিক পেয়েছে আর্জেন্টিনা। খেলাটাকে টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়ার শেষ সুযোগ। মেসি জিব দিয়ে ঠোঁট চাটলেন। ডান হাতে মুখটা মুছলেন। জীবনে কত ফ্রি কিক নিয়েছেন, কত গোল করেছেন, অথচ এই একটা ফ্রি কিকের ওপর দাঁড়িয়ে তাঁর সারা জীবনের স্বপ্ন। মেসির সেই ফ্রি কিক উড়ে গেল বারের অনেক ওপর দিয়ে।

সেটির সঙ্গে বিশ্বকাপ হাতে নেওয়ার স্বপ্নটাও হয়তো উড়ে গেল চিরদিনের মতো।