কে বলল, নিউজিল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডকে হারায়নি বাংলাদেশ!

উৎপল শুভ্র

২৭ মার্চ ২০২১

কে বলল, নিউজিল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডকে হারায়নি বাংলাদেশ!

ম্যাচের সেরা ছবিটা ম্যাচ শুরুর আগেই। অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল ও ম্যানেজার আহমেদ সাজ্জাদুল আলমের হাতে আড়াই লাখ ডলারের চেক তুলে দিচ্ছেন আইসিসির প্রধান নির্বাহী ম্যালকম স্পিড। ছবি: আইসিসি

হ্যামিল্টনেই মিশে আছে বাংলাদেশের ‘প্রথম’ সবকিছু। নিউজিল্যান্ডে প্রথম টেস্ট এখানে, প্রথম টি-টোয়েন্টিও, নিউজিল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয়ও। প্রথম জয়?

হ্যামিল্টন শহরটা আমার খুব পছন্দের। ছোট্ট ছিমছাম একটা শহর। শহরের একেবারে গা ঘেঁষে বয়ে গেছে ওয়াইকাটো নদী। শহর থেকে একটু দূরেই ‘লর্ড অব দ্য রিংস’ ট্রিলজির একটা শুটিং স্পট আছে। সিনেমা দেখে থাকলে যার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পর্কে আপনার একটা ধারণা থাকার কথা। বলতে গেলে শহরের মধ্যেই হ্যামিল্টন গার্ডেনটাও অপূর্ব, চাইলে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। 

তা নিউজিল্যান্ডের প্রায় সব শহরই তো সুন্দর। দর্শনীয় কিছু না কিছু আছেও। হ্যামিল্টন একটু বাড়তি পছন্দ হওয়ার কারণ কি তাহলে এই, ২০০১ সালে নিউজিল্যান্ডে প্রথম ট্যুরে অকল্যান্ডে শুধু রাতটা কাটিয়ে এটাই ছিল আমার প্রথম ঠিকানা!

হতে পারে। 

হঠাৎ হ্যামিল্টন নিয়ে স্মৃতিকাতরতায় আক্রান্ত হওয়ার কারণটা হয়তো বুঝে ফেলেছেন। যদি না বুঝে থাকেন, তাহলে বলে দিই। রাতটা পোহালেই বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচটা যে এই হ্যামিল্টনেই। 

আমার কাছে যেমন, বাংলাদেশ দলের কাছেও হ্যামিল্টন একই রকম। এই হ্যামিল্টনেই মিশে আছে বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ড ট্যুরের ‘প্রথম’ সবকিছু। প্রথম টেস্ট ম্যাচ এখানে, প্রথম টি-টোয়েন্টিও, নিউজিল্যান্ডের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম জয়ও।

প্রথম জয়? নিউজিল্যান্ডের মাটিতে নিউজিল্যান্ডকে হারাতে না পারা নিয়ে এত কথার পর এটা কী বলছি ভেবে শুধু অবাক না, আরও তীব্র প্রতিক্রিয়াও অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। তিন ফরম্যাট মিলিয়ে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের না টানা ২৯ পরাজয়ের বিশ্ব রেকর্ড, তাহলে বাংলাদেশ আবার নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জিতল কবে?

সবুজ উইকেট পেয়ে দারুণ বোলিং করেছিলেন শাহাদাত। ছবি: গেটি ইমেজেস্

জিতেছিল ২০০৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর। রেকর্ড বইয়ে আপনি যা পাবেন না। তবে গুগল সার্চ দিলে ম্যাচটা পেয়ে যাবেন। মানে স্কোরকার্ডটা আর কি! রহস্যটাও পরিষ্কার হয়ে যাবে তখনই। বাংলাদেশ জিতেছিল ঠিকই, প্রতিপক্ষও নিউজিল্যান্ডই ছিল, অধিনায়কও স্টিভেন ফ্লেমিংই; কিন্তু দলটার নাম ‘নিউজিল্যান্ড’ ছিল না। নাম ছিল নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট একাদশ। সে সময়ের কিউই অধিনায়ক স্টিভেন ফ্লেমিংয়ের সঙ্গে রস টেলর, স্কট স্টাইরিস, টিম সাউদি, জিতান প্যাটেল, জেমি হাউ, পিটার ফুলটন, জেমস মার্শাল, ইয়ান ও’ব্রায়েন মিলিয়ে প্রায় নিউজিল্যান্ড জাতীয় দলই। কিন্তু সেই টি-টোয়েন্টি ম্যাচটা অফিসিয়াল টি-টোয়েন্টি ছিল না, তা ছিল সিডর আক্রান্ত বাংলাদেশের সাহায্যার্থে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট আয়োজিত চ্যারিটি ম্যাচ।

চ্যারিটি ম্যাচ বলে ফ্লেমিংরা মোটেই আয়েশ করে খেলেননি, পেশাদারদের রক্তে মিশে যাওয়া জিগীষা কখনোই তা খেলতে দেয় না। বাংলাদেশ জিতেছিল যোগ্যতর দল হিসাবেই। জয়ের নায়ক ছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল। পার্শ্ব নায়ক অনেকেই–শাহাদাত হোসেন (৩/১৫), আফতাব আহমেদ (১৫ বলে ২২), সাকিব আল হাসান (১৯ বলে ২২)। দুটি নাম আলাদা লিখব বলে রেখে দিয়েছি। যে তিন ব্যাটসম্যানের কথা বললাম, তিনজনই রান আউট হওয়ার পর ১৭ বলে ৩১ রান করে ম্যাচটা জিতিয়ে ছিলেন আসলে ফরহাদ রেজা। তাঁর সঙ্গে যিনি সঙ্গত করেছিলেন, তাঁর ২৬ বলে ২১ স্ট্রাইক রেটের বিচারে বাকিদের তুলনায় অনেক ম্রিয়মান। কিন্তু প্রমত্ত ফরহাদ রেজাকে নিশ্চিন্তে শট খেলতে দেওয়ার জন্য মেহরাব জুনিয়রের ওই ইনিংসটা ছিল সময়ের দাবি। 

স্টিভেন ফ্লেমিংয়ের উইকেটটি নিয়েছেন আগেই। রস টেলরকেও আউট করার পর আশরাফুলের উল্লাসে যেন যোগ হয়েছিল সেই আনন্দও। ছবি: গেটি ইমেজেস্

মোহাম্মদ আশরাফুলকে জয়ের নায়ক বলে আবার লিখছি, ফরহাদ রেজা ম্যাচ জিতিয়েছেন–কথা দুটি পরস্পরবিরোধী হয়ে গেল না? তা হলো, তবে ঘটনা তো এমনই। ফরহাদ রেজা ১৮২.৩৫ স্ট্রাইক রেটের ইনিংস খেলার পরও আশরাফুল ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন ১০ বলে ২১ রান করার আগে বোলিংয়ে স্টিভেন ফ্লেমিং আর রস টেলরের মহাগুরুত্বপূর্ণ দুটি উইকেটও নিয়েছিলেন বলে। ম্যান অব দ্য ম্যাচ-এর ‘ম্যান’টাকে ‘মেন’ করে দিলেই বোধ হয় ঠিক বিচার হতো।

অমন সবুজ উইকেট, কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস–ট্যুরের শুরুতে অমন একটা জয় বাংলাদেশের জন্য মহার্ঘ্যই ছিল। তা সেটি  চ্যারিটি ম্যাচ হলেই বা কি! তবে ওই ম্যাচের আবহটা এমন ছিল যে, জয়-পরাজয়কে বড় করে দেখতে একটু অস্বস্তিই লাগছিল। কেউই বোধ হয় তা দেখেননি। যে কারণে সেই ম্যাচের কথা অনেকের মনেও নেই।  

তবে ওই ম্যাচে জয় একটা হয়েছিল বটে। মানবতার জয়। যা নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের প্রতি মনটা এমনই কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে তুলেছিল যে, অদ্ভুত একটা কথাও মনে হয়েছিল। না, এই ম্যাচটাতে স্বাগতিকদের হারানোটা ঠিক হয়নি! এমন মনে হওয়ার কারণটা খুলে বললে আপনি আর বিস্মিত হবেন না। 

কোন সাত সমুদ্র তের নদী ওপারের নিউজিল্যান্ড, তাদের কি দায় পড়েছিল সিডর বাংলাদেশে কী করেছে না করেছে, তা নিয়ে ভাবতে। নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট শুধু ভাবেইনি, ম্যাচটা নিয়ে যা হয়েছিল, তা দেখতে দেখতে রীতিমতো আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ম্যাচ শুরুর আগেই আইসিসির প্রধান নির্বাহী ম্যালকম স্পিড বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল ও ম্যানেজার আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববির হাতে তুলে দিয়েছিলেন আড়াই লাখ ডলারের চেক। দুই দেশ ক্রিকেট নামের বিনি সুতোর মালায় গাঁথা বলেই অকল্যান্ড থেকে এই ম্যাচ দেখতে ছুটে আসা ৬৫ বছরের স্টিভ উইলিয়ামস আমার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পরই করমর্দনের জন্য বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিলেন, ‘আমি সংবাদপত্রে পড়েই শিউরে উঠেছি। তোমাদের এই দলের কোনো খেলোয়াড়ও এতে আক্রান্ত হয়নি তো?’

ওভারের বিরতিতে স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় ক্রিকেট-বাণিজ্যিকীকরণের অপরিহার্য অনুষঙ্গ বিজ্ঞাপন ভেসে ওঠেনি। ভেসে উঠেছে সিডর-দুর্গত মানুষদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের ছবি। সঙ্গে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট-এর ডাক পেয়েই ঝাঁপিয়ে পড়া ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন’-এর আবেদন— বাংলাদেশের ঘূর্ণিদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান। মাঠের চারপাশে একটা চক্কর দিতে গিয়ে দেখলাম, কমলা রঙের টি-শার্ট পরে ওয়ার্ল্ড ভিশনের কর্মীরা মাঠের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে, যে যা পারেন, দিয়ে যান। দেখলাম, দিচ্ছেনও প্রায় সবাই।

১৫ বলে ২০ রানের ইনিংস খেলে আফতাব আহমেদই শুরু করেছিলেন ঝড়টা। ছবি: গেটি ইমেজেস্

ম্যাচ শুরুর আগে প্রেসবক্সে সাংবাদিকদের হাতে হাতে একটা প্রেস রিলিজ দিয়ে গেলেন ওয়ার্ল্ড ভিশনের তরুণী প্রেস অফিসার। সেখানে সিডরের ধ্বংসযজ্ঞের বিস্তারিত: ৫০ লাখ মানুষ আক্রান্ত। সাড়ে তিন হাজারের বেশি মৃত। ১২ লাখ ঘরবাড়ি ধ্বংস। ৬ লাখ মেট্রিক টন চাল হওয়ার অপেক্ষায় থাকা দেড় লাখ একরেরও বেশি ফসল সম্পূর্ণ বিনষ্ট। ১২ লাখ ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়ার তাৎপর্যটা বোঝাতে লেখা হয়েছে—এটি নিউজিল্যান্ডের মোট বাড়ির সংখ্যার সমান!

নিউজিল্যান্ডের সাংবাদিকদের আর দোষ কী, এর সবই জানা থাকার পরও ‘সিডর’-এর ধ্বংসলীলার এই বিবরণ তো আমাকেই বিমূঢ় করে দিয়েছিল! ম্যাচটার অন্তনির্হিত সুরটা বুঝতে পেরে বাংলাদেশ দলও জয়ের পর বলতে গেলে কোনো উল্লাসই করেনি।

করলে তা বড় অশোভন দেখাত। একটা খেলায় জেতার পর জয়ী দলের উল্লাস করাটাকে অশোভন মনে হতো বলছি, এ থেকেই বুঝে নিতে পারেন মাঠের আবহটা।

তারপরও এতদিন পর এই ম্যাচটার গল্প বললাম কেন? এতদিন পর বলেই হয়তো। বিরতিহীন দৌড়ের জীবন বলেই হয়তো চৌদ্দ বছর আগের সিডরকে এখন অনেক দূর অতীত বলে মনে হয়। চারপাশে নিউজিল্যান্ডে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয় নেই-জয় নেই বলে হাহাকার শুনছি, এটাও অবশ্য একটা কারণ হতে পারে।

ঠিক আছে, আসল জয়টা মানবতারই হয়েছিল। কিন্তু একটু স্বাধীনতা নিয়ে বলেই ফেলি না কেন, জয় হয়েছিল বাংলাদেশেরও। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে 'নিউজিল্যান্ড'-এর বিপক্ষে জয়!   
 

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
Add
Ispahani Mirzapore Tea
×