এ এক অবিস্মরণীয় জয়! বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নপূরণ হয়েছিল আগেই। এবার টেস্ট অঙ্গনের বাইরে থাকা দেশগুলোর মধ্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বও প্রমাণ করলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফির ফাইনালে উঠেছিল এবারই প্রথম। সেই ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বী যে দল, তারা শুধু এবারের টুর্নামেন্টের শীর্ষ বাছাই বলেই নয়, গত বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর মতো বিশাল চমক দেখানোর কারণেও আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অলিখিত শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিল। কিন্তু এখন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে 'অলিখিত' শব্দটা ব্যবহার করারই প্রয়োজন পড়ছে না। অসাধারণ এক টিম-ওয়ার্কের মাধ্যমে কেনিয়ার সমীহ জাগানো বোলিং-ফিল্ডিংকে নিতান্তই সাধারণ মানে নামিয়ে এনে আইসিসি ট্রফি জিতেছে বাংলাদেশ।

দুই দিনে গড়ানো ফাইনালের প্রথমদিন শেষের হতাশাই জয়ের আনন্দে আলাদা মাত্রা দিয়েছে, এর সঙ্গে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনির্বচনীয় অনুভূতি তো আছেই। কেনিয়ার দাঁড় করিয়ে দেওয়া ২৪১ রানের পাহাড় টপকানোর সামর্থ্য বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের আছে, এই আশাবাদে বারবার ছায়া ফেলছিল স্লো উইকেট এবং ততোধিক স্লো আউটফিল্ড। আগের রাতের বৃষ্টির কারণে কাল সাড়ে তিনটায় শুরু হওয়া বাংলাদেশের ইনিংস যখন মাত্র ২৫ ওভারে নির্ধারিত হয়ে গেল, তখনও কাজটা খুব সহজে রূপান্তরিত হয়নি। ২৫ ওভারে ১৬৬ রান–নতুন এই টার্গেট যে কোনো অবস্থায়, যে কোনো দলের বিপক্ষেই খুব কঠিন কাজ ব্যাটসম্যানদের জন্য। বৃষ্টির কারণে আরও ভারি হয়ে যাওয়া আউটফিল্ড আর কেনিয়ার দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ের কথা মনে রাখলে এটা আরও কঠিন মনে হতে বাধ্য।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের অমর এক ছবি। আইসিসি ট্রফি তুলে ধরেছেন অধিনায়ক আকরাম খান। ছবি: শামসুল হক টেংকু

সেই কঠিন কাজটি করার দৃঢ়প্রতিজ্ঞাই প্রতিফলিত হয়েছে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটে। আগের দিন ছন্নছাড়া মনে হওয়া দলটির পরিবর্তে এদিন মাঠে দেখা গেল প্রচণ্ড আত্মপ্রত্যয়ী এক দলকে। শেষ বলে লেগ বাইয়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হওয়া ম্যাচকে এমনিতেই অবিস্মরণীয় বলতে হয়। আর যে জয়ের মাধ্যমে নতুন এক যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ, সেটিকে বর্ণনা করার ভাষা খুঁজে পাওয়াই কঠিন। ২ উইকেটের এই জয়ে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো দিক হচ্ছে, এতে প্রায় সবারই অবদান। আগের দিন অধিনায়ক আকরাম খান বলছিলেন, ‌‘কাল হিরো হয়ে যেতে পারেন যে কেউই।’ তা অবশ্য হয়নি। নির্দিষ্ট কেউ নয়, ‌‘হিরো’ বেশ কজন। শুরুতে যেমন রফিক, শেষে তেমনি পাইলট। মাঝে নান্নু, বুলবুল, আকরাম, সাইফুল সবার কথাই বলতে হবে। ২৫ ওভারে ১৬৬ রানের ইনিংসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোর মাত্র ৩৭, এ থেকেই স্পষ্ট কতটা সম্মিলিত অবদান এই অসাধারণ জয়ে।

৬.৬৪ আস্কিং রেট দুর্জয়ের সঙ্গে ওপেনিংয়ে নামায় রফিককে। দুর্জয় প্রথম বলেই বোল্ড হয়ে যাওয়ার পর নান্নু ও রফিকের ৫০ রানের দ্বিতীয় উইকেট জুটি বাংলাদেশের আশা জাগিয়ে রাখে। রফিক ১৫ বলে ২৬ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলে তাঁকে ওপেনিংয়ে পাঠানোর উদ্দেশ্য পূরণ করেন। তাঁর ইনিংসে দুটি চার ও দুটি ছয়। বাংলাদেশের ইনিংসে ছক্কার সংখ্যাই কালকের জয়ের রহস্য কিছুটা ব্যাখ্যা করে। ৭টি ছক্কা মেরেছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। একটি আদর্শ ওয়ানডে ম্যাচের যেমন সমাপ্তি প্রত্যাশা করেন দর্শক, ফাইনালটা শেষ হয়েছে সেভাবেই। শেষ ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ১১ রান। পাইলট ও শান্ত মিলে তা করে ফেলার পর কিলাত পরিণত হয় 'ঢাকা স্টেডিয়ামে'। হাজার চারেক দর্শক মেতে ওঠেন উৎসবে। ‌‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ স্লোগানের নিচে চাপা পড়ে যায় বাকি সবকিছু।

যে আনন্দের কোনো তুলনা নেই। ছবি: শামসুল হক টেংকু

বাংলাদেশ শিরোপা জেতায় নতুন এক চ্যাম্পিয়নকেও দেখল আইসিসি ট্রফির ষষ্ঠ আসর। ১৯৭৯ সালে প্রথম টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল শ্রীলঙ্কা। ১৯৮১ সালে শ্রীলঙ্কা টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর ১৯৮২, ১৯৮৬ ও ১৯৯০–তিনটি টুর্নামেন্টেই চ্যাম্পিয়ন জিম্বাবুয়ে। জিম্বাবুয়ে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত হয়ে যায়, ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের জন্য দুঃস্বপ্নের টুর্নামেন্টটিতে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায় সংযুক্ত আরব আমিরাত। শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ে যেভাবে এগিয়েছিল, সেই পথে বিশাল এক পদক্ষেপ ফেলল বাংলাদেশও। টেস্ট মর্যাদা লাভের যে চূড়ান্ত লক্ষ্য, কিলাত ক্লাব মাঠে তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হলো কাল।

বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করেই বাংলাদেশকে যেভাবে উৎসবে রঙিন করে তুলেছেন আমাদের ক্রিকেটাররা, ট্রফি না নিয়ে দেশে ফিরলে সেই উৎসব ঠিক পূর্ণতা পেত না। উৎসবকে সেই পূর্ণতা দেওয়ার কাজটিই শুধু নয়, কালকের জয়ের মাধ্যমে আরেকটি দায়িত্বও সুসম্পন্ন করল বাংলাদেশ দল। গত আইসিসি ট্রফিতে যে তিনটি দলের কাছে হেরেছিল বাংলাদেশ, একে একে সেই তিনটি দলকেই সেই পরাজয়ের গ্লানি ফিরিয়ে দেওয়া গেল।