হতাশার ঢেউটা এর চেয়ে বড় হয়ে আছড়ে পড়তে পারত না বাংলাদেশ দলের ওপর। হতাশায় মুষড়ে পড়া খেলোয়াড়-কর্মকর্তা ও যথারীতি মাঠে ভিড় করা বাংলাদেশি দর্শকেরা প্রথমে দুভার্গ্যকে মেনে নিয়ে প্রার্থনায় মগ্ন হয়েছিলেন। কিন্তু যখন সেই প্রার্থনার ফল মিলেছে বলে হাসি ফুটেছে সবার মুখে, তখনই পাওয়া গেল ষড়যন্ত্রের পরিষ্কার চিহ্ন। বিশ্বকাপ স্বপ্ন পূরণের পথে অনেকটা দূরত্ব এগিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। বীজ বুনে সার-পানি ঢেলে ফলানো ফসল তুলে আনার সময়ই বাধা হয়ে দাঁড়ালেন দুই আম্পায়ার নামিবিয়ার ক্রুগার ও ডেনমার্কের লোথার। আর্জেন্টাইন ম্যাচ রেফারি নিনো তাঁদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে মেনে নিয়ে হতাশা থেকে ক্ষোভে পরিণত করেন বাংলাদেশিদের অনুভূতিকে।

এই ম্যাচ রিপোর্টের শিরোনাম হতে পারত ‘গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে সেমিফাইনালে বাংলাদেশ'। বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের হতাশাটা অনুমান করা যায় এ থেকেই। দ্বিতীয় রাউন্ডে বাংলাদেশের এখনও এক ম্যাচ বাকি। হল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচের আগেই বাংলাদেশকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা যেত দুটি কারণে। কিলাত ক্লাব মাঠ হল্যান্ড-হংকং ম্যাচটি পরিত্যক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ কাল জিততে পারলেই হতো। কারণ হল্যান্ডের বিপক্ষে হারলেও তখন বাংলাদেশের পয়েন্ট হতো ৪, হল্যান্ডের হতো ৩। আয়ারল্যান্ড শেষ ম্যাচে হংকংকে হারালে তাদেরও পয়েন্ট ৪ পয়েন্টই হতো। কিন্তু গ্রুপ চ্যাম্পিয়নশিপ নির্ধারণে প্রথম বিবেচনায় নেওয়া হতো দু্ই দলের মধ্যকার ম্যাচের ফল। বাংলাদেশ সেই বিবেচনায় পেছনে ফেলত আয়ারল্যান্ডকে।

কিন্তু এই পুরো ম্যাচ রিপোর্টই অন্যরকম লিখতে হচ্ছে, প্রথমত বৃষ্টি এবং এরপর আইরিশদের অভিনয়দক্ষতা ও তাতে মুগ্ধ হতে প্রস্তুত দুই আম্পায়ারের কারণে। সকালে টসে হারার পর ফিল্ডিং করতে নেমে বোলারদের অসাধারণ বোলিংয়ে আয়ারল্যান্ডকে মাত্র ১২৯ রানে শেষ করে দিয়েছিল বাংলাদেশ। নিশ্চিত জয়ের আনন্দ নিয়ে লাঞ্চে যায় বাংলাদেশ দল, কিন্তু তখন কল্পনাও করা যায়নি, এমন স্বপ্নের মতো শুরু দিনটির শেষটা কত কুৎসিত হতে পারে! বাংলাদেশ ইনিংসের ৬.১ ওভার হওয়ার পরই শুরু হয়েছির বৃষ্টি। আগের দিন হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচে সারাক্ষণ চোখ রাঙানোর পরও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জয় পাওয়া পর্যন্ত যা অপেক্ষা করেছিল। কাল তা আর অপেক্ষা মানেনি। প্রায় ঘণ্টাখানেক স্থায়ী হয় বাংলাদেশের জন্য দুঃস্বপ্নের এই বৃষ্টি।

আয়ারল্যান্ডের পিটার গিলেস্পিকে বোল্ড করে ম্যাচে হাসিবুল হোসেন শান্তর তৃতীয় উইকেট। ছবি: শামসুল হক টেংকু

তা থেমে যাওয়ার পর শুরু হয় মাঠকে খেলার উপযুক্ত করে তোলার প্রাণান্তকর চেষ্টা। মালয়েশিয়ার মতো দেশে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট আয়োজনের সিদ্ধান্তটা যে বিরাট একটা ভুল ছিল, তার প্রমাণ প্রতি ম্যাচেই মিলছে। কালও উইকেট ঢাকতে কাভার নিয়ে দৌড়ে গেছেন বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা। বৃষ্টি থামার পর মাঠে জায়গায় জায়গায় জমে যাওয়া জল শুকানোর জন্য স্পঞ্জ-টঞ্জ জাতীয় কিছুই ছিল না আয়োজকদের কাছে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা গায়ের তোয়ালে দিয়ে স্পঞ্জের কাজ করতে শুরু করেন। ম্যানেজার গাজী আশরাফ হোসেন লিপু পাগলের মতো পরিশ্রম করেছেন, ক্যারিবীয় গ্রেট গর্ডন গ্রিনিজ পর্যন্ত তোয়ালে নিয়ে সঙ্গী হয়েছেন তাঁর। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সহ-সভাপতি রাইসউদ্দিন আহমেদ নেমে গেছেন মাঠে, দলের সঙ্গে ফিজিও হিসাবে আসা ডাক্তার জাওয়াদও বসে থাকেননি।

আইরিশ খেলোয়াড়েরা মাঠে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিয়েছেন, আর প্রায় পুরো বাংলাদেশ দল করেছে আসলে গ্রাউন্ডসম্যানদের কাজ। আম্পায়াররা মাঠে বিভিন্ন জায়গার অবস্থা সম্পর্কে সামান্য অসন্তোষ প্রকাশ করা মাত্রই বালতি-তোয়ালে হাতে ছুটে গেছেন লিপু ও অন্য খেলোয়াড়েরা। টুর্নামেন্ট কাভার করতে আসা বাংলাদেশের দুই ফটো সাংবাদিকও মাঠে ছবি তুলতে ঢুকে উল্টো তোয়ালে-বালতি নিয়ে কাজে নেমেছেন।

এত কিছু করার পর ম্যাচ শুরু করার জন্য লিপু দুই আম্পায়ারের কাছে রীতিমতো কাকুতি-মিনতি করতে থাকেন। এরই মধ্যে আবার সামান্য ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হলেও এতে খেলা সম্ভব, এটাই বলতে থাকেন বারবার। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে আনন্দে ভাসিয়ে খেলা আবার শুরুর সিদ্ধান্ত নেন দুই আম্পায়ার। স্থানীয় সময় ৫টা ১৯ মিনিটে আবার খেলা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়, বাংলাদেশের জন্য লক্ষ্য পুনঃনির্ধারিত হয় ২০ ওভারে ৬৬ রান। বৃষ্টি নামার আগে ৬.১ ওভারে বিনা উইকেটে ২৩ রান তুলে ফেলায় বাংলাদেশকে বাকি ১৩.৫ ওভারে করতে হতো মাত্র ৪৩ রান, হতে ছিল সব কটি উইকেট।

গ্রিনিজ গম্ভীরভাবে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ম্যাচ কি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে?’ নিনো ‘ইয়েস’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের বেগে বাংলাদেশ দলের টেন্টে ফিরে সবাইকে বাসে উঠতে বললেন গ্রিনিজ।

এ থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করার সামর্থ্য আইরিশ বোলারদের ছিল না, একমাত্র বৃষ্টির পুনরাবির্ভাবই তা করতে পারত। আম্পায়াররা খেলা শুরুর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পর খেলা শুরু হতে হতে আকাশ অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়, কাজেই বাংলাদেশ দল তখন সেমিফাইনালের স্বপ্নে বিভোর! কিন্তু আয়ারল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা অন্য পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। আবার খেলা শুরুর পর দ্বিতীয় বলেই দুর্জয়ের কাভার ড্রাইভ অহেতুক স্লাইড করে ধরার পর আয়ারল্যান্ডের এক খেলোয়াড় যন্ত্রণায় কাতরানোর ভান করতে থাকেন, পরের বলে একটি লেগ বাই নেন দুর্জয়। কিন্তু সে বলটি ধরতে গিয়ে আবারও একই কাজ করেন আরেক আইরিশ খেলোয়াড়। ফিজিওথেরাপিস্টকে মাঠে ডেকে পাঠানো হয়, একই সঙ্গে আম্পায়ারের কাছে অভিযোগ করতে থাকে তারা। মাঠে উপস্থিত বাংলাদেশিদের বিস্ময়ে ডুবিয়ে দিয়ে দুই আম্পায়ার বেল তুলে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। আয়ারল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা তো এর আগেই রওনা হয়ে গেছেন।

দুই আম্পায়ারের পক্ষপাতিত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এত পরিশ্রম বৃথা যেতে বসেছে দেখে দৌড়ে আসেন ম্যানেজার লিপু। আম্পায়াররা যখন তাঁকে জানান যে, মাঠ খেলার উপযুক্ত নয়, তখন খুবই যৌক্তিক প্রশ্নটা করেন তিনি, 'যে মাঠ কয়েক মিনিট আগ পর্যন্ত আপনারা খেলার উপযুক্ত বলে রায় দিয়েছেন, তা তিন বল হতে না হতেই কীভাবে খেলার অনপযুক্ত হয়ে পড়ে?' এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই তো কীভাবে তা দেবেন আয়ারল্যান্ডকে আনন্দে ভাসিয়ে দেওয়া দুই আম্পায়ার! লিপু বারবার বললেন, ‘এটা অন্যায়। এটা ঘোরতর অন্যায়।’

কোচ গর্ডন গ্রিনিজও ছুটে এলেন একটু পরই। আর্জেন্টাইন ম্যাচ রেফারি ক্রিস্টিয়ান নিনোকে বললেন, ‘যে দুজন খেলোয়াড় ব্যথা পেয়েছে, ওরা তো দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যায়নি। ওরা ইচ্ছে করে স্লাইড করেছে। এটা অন্যায়।’ ম্যাচ রেফারি দুই আম্পায়ারকে নিয়ে ঢুকে গেলেন তাঁদের রুমে। কিছুক্ষণ পর একা বেরিয়ে এলেন তিনি। গ্রিনিজ আবার এলেন, গম্ভীরভাবে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ম্যাচ কি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে?’ নিনো ‘ইয়েস’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের বেগে বাংলাদেশ দলের টেন্টে ফিরে সবাইকে বাসে উঠতে বললেন গ্রিনিজ।

এমনিতে খুবই ঠান্ডা স্বভাবের বাংলাদেশ সহ-অধিনায়ক বুলবুল পর্যন্ত ফেটে পড়লেন প্রচণ্ড ক্ষোভে। খেলোয়াড়দের কেউ কেউ আবার হতাশার বিপুলতায় পুরো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা তখন রাগে-দুঃখে-হতাশায় প্রবল উত্তেজিত। মাঠ থেকে বেরিয়ে এসে দুর্জয় তাঁর ব্যাটটা আছড়ে ফেললেন চেয়ারের ওপর, তাঁর সঙ্গী আতহার আলী বারবার বলতে লাগলেন, ‘ইটস নট ক্রিকেট।’ আইরিশ ক্রিকেটাররা মাঠে অভিনয় করেছে বোঝাতে তাঁদের উদ্দেশ করে কণ্ঠে তীব্র ব্যঙ্গ ফুটিয়ে বললেন, 'গো টু হলিউড।'

এমনকি এমনিতে খুবই ঠান্ডা স্বভাবের বাংলাদেশ সহ-অধিনায়ক বুলবুল পর্যন্ত ফেটে পড়লেন প্রচণ্ড ক্ষোভে। খেলোয়াড়দের কেউ কেউ আবার হতাশার বিপুলতায় পুরো স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশি দর্শকেরা আম্পায়ারের এই সিদ্ধান্তে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। কিন্তু এসবে তো আর তখন কোনো লাভ নেই। হাতের মুঠোয় থাকা স্বপ্নের সেমিফাইনাল তখন আবারও অনিশ্চয়তার দোলাচলে বন্দী। ক্রুগার ও লোথার ওই অদ্ভুত সিদ্ধান্ত না নিলে বিশ্বকাপ-স্বপ্ন পূরণের জন্য কমপক্ষে দুটি ম্যাচ হাতে পেত বাংলাদেশ। সেমিফাইনালে হেরে গেলেও স্বপ্ন পূরণের জন্য তৃতীয় স্থান নির্ধারণী মাচটি তো থাকবে, এই আনন্দের ঢেউ ভাসিয়ে নিতে যেত আজ বাংলাদেশ দলকে। শুধু বাংলাদেশ দলই বা কেন, তাতে ভেসে যেত পুরো দেশই। এই উৎসবের লগ্ন শুধু দুদিন পিছিয়ে গেছে, আপাতত প্রার্থনা হোক এটাই।