উৎপল শুভ্র: ইংল্যান্ড সফরে ওরকম সাফল্যের পর তাে উচ্ছ্বাসের স্রোতেই ভেসে গেছ তুমি। এখন বেশ কিছুদিন পর যখন পেছন ফিরে তাকাও, একটু স্বপ্ন-স্বপ্ন মনে হয় না?

সৌরভ গাঙ্গুলী: না, ঠিক স্বপ্ন বলব না। তবে যতবারই ইংল্যান্ড সফরের কথা ভাবি, নতুন করে শিহরিত হই। সবচেয়ে বেশি আনন্দ লাগে এটা ভেবে যে, আমি ভারতের হয়ে পারফর্ম করতে পেরেছি এবং এখনাে করছি। কারণ যে নির্বাচকরা প্রায় চার বছর পর আমাকে দলে নিয়েছিলেন, আমি তাদের সেই আস্থার প্রতিদান দিতে পেরেছি। প্রমাণ করতে পেরেছি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পারফর্ম করার ক্ষমতা আমার আছে। এ কারণেই আমি খুব খুশি।

শুভ্র: '৯২-য়ের অষ্ট্রেলিয়া সফর থেকে '৯৬-য়ের ইংল্যান্ড-মাঝের সময়টা কেমন কেটেছে?

সৌরভ: আমাকে কঠিন লড়াই করতে হয়েছে। তবে আমি বলব, একদিক থেকে তা ভালােই হয়েছে। আমার খেলার খুঁটিনাটিগুলাে নিয়ে ভাবতে পেরেছি। এ সময়টায় মানসিক ও শারীরিকভাবেও আগের চেয়ে অনেক শক্ত হয়েছি। '৯৪ সালে ইংল্যান্ডে মাইনর কাউন্টিতে খেলাটাও খুব কাজে এসেছে। ল্যাঙ্কাশায়ার লিগে বন্ডসবেরির পক্ষে আমি খুব ভালাে খেলেছিলাম। ১৭-১৮টি ম্যাচ খেলে হাজারের ওপর রান করেছিলাম, উইকেটও পাই অনেক। ওই সময়ই আমার আলাপ হয় মাইক স্টুয়ার্টের সঙ্গে। পেশায় মনােবিদ এই ভদ্রলােক ইংল্যান্ডের ক্রিকেটার অ্যালেক স্টুয়ার্টের ব্যক্তিগত মনােবিদ হিসেবে কাজ করেন। তাঁর উপদেশ আমাকে মানসিক স্থৈর্য এনে দিতে দারুণ সাহায্য করেছে। সবকিছু মিলিয়ে, আবার ভারতীয় দলে ফিরে আসার সময় আমি ছিলাম পুরােপুরি প্রস্তুত।

শুভ্র: তাহলে কি মনে করাে, প্রথমে একটু বেশি তাড়াতাড়িই সুযােগ পেয়ে গিয়েছিলে তুমি? ১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়া ট্যুরের সময় ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটের জন্য তুমি রেডি ছিলে না?

সৌরভ: তা আবার পুরাে ঠিক বলব না। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটের সঙ্গে সেভাবে পরিচয় তাে ছিলই না। এর আগে শুধু দেশে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিনটি ওয়ানডে ম্যাচের ইন্ডিয়া টিমে ছিলাম। কিন্তু ঘটনা হলাে, অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে আমি ধারাবাহিকভাবে পারফর্ম করে যাচ্ছিলাম। বড় ক্রিকেটাররা তখন আমার সম্পর্কে লিখছেন, সে খুবই ভালাে। সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার উপযুক্ত। শচীন টেন্ডুলকার ১৬ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঢুকে পড়েছে। এবং সে সাফল্যও পেয়েছে। তাহলে ১৮ বছর বয়সী একজন ভালাে হলে কেন তাকে সুযােগ দেওয়া হবে না? তবে দলে সুযােগ পেলেও খেলার সুযােগ কিন্তু আমি সেভাবে পাইনি। একটা মাত্র ওয়ানডে খেলেছি। এক ম্যাচের পারফরম্যান্সেই কি সিদ্ধান্ত দিয়ে দেওয়া যায়?

শুভ্র: তুমি ইংল্যান্ড ট্যুরের দলে ডাক পাওয়ার পরও তাে এ নিয়ে অনেক বিরূপ সমালােচনা হয়েছে।

সৌরভ: এ রকম হয়ই। এটা আমাকে একটুও ভাবায়নি। আমি নিজে আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। বরং আমার দলে আসা নিয়ে ওসব কথাবার্তা আমাকে আরও ইনস্পায়ার করেছিল, আমি আরও ডিটারমাইন্ড হয়ে উঠেছিলাম। আমি পরে এটা লক্ষ্য করে দেখেছি, যখনই কেউ আমার অন্যায় সমালােচনা করে, তা আমাকে বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগায়। খারাপ তাে একটু লাগেই, কিন্তু একই সঙ্গে একটা জেদ চাপে যে, সমালােচকদের বলতে বাধ্য করব, 'না, ও সত্যিই ভালাে।'

শুভ্র: শেষ পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হলাে, তাও লর্ডসে। যখন নিশ্চিত হলে, লর্ডসে অভিষেক হতে যাচ্ছে, কেমন লেগেছিল?

সৌরভ: লর্ডস টেস্টে খেলতে যাচ্ছি, এটা আমি বেশ কদিন আগে থেকেই জানতাম। ওই টেস্টের আগে ডার্বিশায়ারের বিপক্ষে আমাদের একটি ম্যাচ ছিল। সেই ম্যাচে ইন্ডিয়া অল্প রানেই আউট হয়ে যায়। বাকি ব্যাটসম্যানরা তেমন রান পায়নি, আমি ৬৪ রান করি। তখনই আমাকে জানিয়ে দেওয়া হয় আমি লর্ডসে খেলছি। তখন থেকেই নিজেকে তাতিয়ে তুলতে থাকি, সুযােগ যখন এসেছে, তাকে কাজে লাগাতে হবে। লাকিলি আমি তা করতে পেরেছি।

শুভ্র: জীবনের প্রথম টেস্ট ইনিংসেই সেঞ্চুরি। সেঞ্চুরিতে পৌঁছার পর বিশেষ কিছু কি মনে হয়েছিল?

সৌরভ: বেশি কিছু মনে হয়নি। শুধু আনন্দ, দারুণ আনন্দ, আমি কিছু করতে পেরেছি। বিশেষ কিছু মনে হয়নি। আমি ভারতের পক্ষে হান্ড্রেড করতে পেরেছি, শুধু এই দারুণ অনুভূতিতেই ভেসে যাচ্ছিলাম।

লর্ডসে সেঞ্চুরির পর সৌরভ। 'কেমন খেলেছিলেন' প্রশ্নের উত্তরটা লুকিয়ে আছে ইংল্যান্ডের উইকেটকিপার জ্যাক রাসেলের করতালিতেই। ছবি: পপারফটো

শুভ্র: এরপর ট্রেন্টব্রিজেও সেঞ্চুরি...

সৌরভ: একটা কথা বলে নিই, পুরাে ইংল্যান্ড সফরে আমি কিন্তু একটুও চাপের মধ্যে ছিলাম না। লর্ডসে সেঞ্চুরির পর ট্রেন্টব্রিজে খেলতে নামার সময়ও না। কারণ লর্ডস টেস্টের পর হ্যাম্পশায়ারের বিপক্ষে আমি আরেকটি হান্ড্রেড পাই। তাই ট্রেন্টব্রিজে খেলতে নামার আগে আমার আত্মবিশ্বাস ছিল আকাশছোঁয়া। ট্রেন্টব্রিজ ছিল তাই লর্ডসের চেয়ে অনেক সহজ। টেস্ট ক্রিকেট কখনােই সহজ নয়, তবে লর্ডসের তুলনায় ট্রেন্টব্রিজ ছিল সহজ। লর্ডসটা ছিল বড় পরীক্ষা।

শুভ্র: দুই সেঞ্চুরির মধ্যে প্রিয় কোনটি?

সৌরভ: অবশ্যই লর্ডস। আর কোনাে কিছু বিবেচনার প্রয়ােজন নেই। ওটা যে আমার ফার্স্ট টেস্ট সেঞ্চুরি।

শুভ্র: ট্রেন্টব্রিজে দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৮ রানে আউট হয়ে যাওয়াটা নিশ্চয়ই খুব হতাশার ব্যাপার ছিল। সেঞ্চুরি পেলে টেস্ট ইতিহাসে প্রথম তিন ইনিংসেই সেঞ্চুরি করা প্রথম ব্যাটসম্যান হতে তুমি।

সৌরভ: বিশ্বাস করাে, ওসব রেকর্ড-টেকর্ড মাথাতেই ছিল না আমার। প্রথম তিনটি টেস্ট ইনিংসেই সেঞ্চুরি পেলে নিশ্চয়ই ভালাে লাগত, ওরকম একটা রেকর্ড তাে খারাপ লাগার কথা নয়, তার ওপর আউট হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি সত্যিই ভালাে খেলছিলাম। তবে এ নিয়ে আমার কোনাে আক্ষেপ নেই। রেকর্ড প্রয়ােজন। নেই, আমি শুধু ভারতের পক্ষে খেলে যেতে চাই । খেলতে চাই মর্যাদার সঙ্গে। যদি আগামী আট-নয় বছর তা খেলতে পারি, তাহলেই আমি খুশি। রেকর্ড-টেকর্ড না হলেও চলবে।

শুভ্র: তাই বলে ইংল্যান্ড ট্যুরের পর  দিল্লিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যখন তৃতীয় টেস্ট খেলতে নামলে, তখনো  তােমার ওপর রেকর্ডের চাপ ছিল না বললে কিন্তু মানছি না। বিশেষ করে জীবনের প্রথম তিন টেস্টেই মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের সেঞ্চুরি ছুঁতে পারবে কি না, এ নিয়ে যখন এত কথা হচ্ছিল.... 

সৌরভ: তুমি না মানলে না-ই, কিন্তু সত্যি বলছি, আমার ওপর বাড়তি কোনাে চাপ ছিল না। তবে আমি ৬৬ রানে আউট হয়ে গিয়েছিলাম, এ জন্য একটু আফসােস হয়েছে, এত কাছে এসেও সেঞ্চুরিটা পেলাম না। আজহার ওর জীবনের প্রথম তিন টেস্টে সেঞ্চুরির রেকর্ড সম্পর্কে আমাকে বলেছে, আরেকজন ভারতীয় এটা ভাঙলে ও খুব খুশি হবে। আমি ওর পাশে দাঁড়ানোর সুযােগটা পেয়েছিলাম।

শুভ্র: আজহার সম্পর্কে তােমার উচ্ছ্বাস আগেও পড়েছি আমি। আসলে ব্যাপারটা কী বলো তাে। আজহার তাে তােমাকে ইংল্যান্ডে দলে নেওয়ার প্রতিবাদে সিলেকশন কমিটিতে তুলকালাম বাঁধিয়ে দিয়েছিল বলেই শুনেছি।

সৌরভ: সেটা অন্য ব্যাপার। হয়তাে আমার সম্পর্কে অন্য রকম ধারণা ছিল ওর। তা হতেই পারে। তবে আমি বলব, আজহার ইজ আ ফ্যান্টাস্টিক হিউম্যান বিইং। ওর মতাে মানুষ হয় না। ওর সঙ্গে কদিন মিশলেই যে কেউ তা বুঝতে পারবে। ইংল্যান্ডে দ্বিতীয় সেঞ্চুরির পর তৃতীয় টেস্টের পঞ্চম দিন আমাকে একটা ঘড়ি উপহার দিয়ে বলেছিল, আশা করি, এমন ঘড়ি তুমি আরও জিতে নেবে। ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে এটা ছিল দারুণ এক উপহার।

তখন মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের দারুণ গুণমুগ্ধ তিনি। ছবি: অলস্পোর্ট

শুভ্র: ইংল্যান্ডে তােমার ব্যাটিং দেখে রিচি বেনাে, সুনীল গাভাস্কার থেকে জিওফ বয়কট পর্যন্ত সবাই তাে তােমাকে প্রশংসার জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছিল। তােমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় কমপ্লিমেন্ট কোনটি?

সৌরভ: আমি রিচি বেনােকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমার ব্যাটিংয়ে কী সমস্য আছে তা বলতে। ওনার উত্তরে খুব লজ্জা পেয়ে গিয়েছিলাম। বেনো আমাকে বললেন, 'তোমাকে আমি কী বলব? তােমার মতাে ব্যাট করতে পারলে আমি আরও অনেক বেশি রান করতে পারতাম।' তবে সবচেয়ে স্মরণীয় কমপ্লিমেন্টটা পেয়েছিলাম আমার এখনকার ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে। শচীন টেন্ডুলকার আমাকে বলেছিল, 'মনে হচ্ছে তুমি প্রথম নয়, এক শ নম্বর টেস্ট খেলছ।' শচীন সত্যি খুব ভালাে । ওর সঙ্গে কথা বললেই বুঝতে পারবে। বাচ্চা ছেলে না!

শুভ্র: সুনীল গাভাস্কার কিছু বলেননি?

সৌরভ: উৎসাহ তাে দিয়েছেনই। তবে ইংল্যান্ড সিরিজের পর তাঁর একটা লেখাতেই সব বলে দিয়েছিলেন তিনি। লিখেছিলেন, 'পর পর দুই সেঞ্চুরির পর সময় আসবে, যখন সে ব্যর্থ হবে। রান পাবে না। ওই সময়টার সঙ্গে সৌরভকে মানিয়ে নিতে হবে।' ্এবার ইডেনে প্রথম ইনিংসের পর বলেছেন, 'তুমি মােটেই দুশ্চিন্তা কোরাে না। এটা ল অব অ্যাভারেজের ব্যাপার। রান আসবেই।'

শুভ্র: ইডেনের কথা তুলে ভালােই করলে। তােমাকে ঘিরে প্রত্যাশার বিপুল চাপেই কি ভেঙে পড়লে (ঘরের মাঠে প্রথম টেস্টে সৌরভ করেছিলেন ৬ ও ০)?

সৌরভ: মােটেই চাপ-টাপের কারণে নয়। এটা কো-ইনসিডেন্স, পার্ট অব দ্য গেম। তবে আমি এখন মনে করি, এই ব্যর্থতাটাতে ভালােই হয়েছে। একটানা সাফল্যের পর এই ব্যর্থতার প্রয়ােজন ছিল। নইলে হয়তাে আমার মধ্যে একটু আলগা ভাব এসে যেতে পারত। এখন আমি কানপুরে (দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তৃতীয় টেস্ট) ভালাে করার ব্যাপারে অনেক বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ । হ্যাঁ, হতাশা তাে আছেই। নিজের হােমটাউনে খেলা প্রথম টেস্টে ভালাে করতে পারলাম না। তবে এই হতাশা নিয়ে বসে থাকার সময় নেই। সামনে অনেক খেলা। তিন দিন পরই একটি টেস্ট। এরপর টানা ১০টি টেস্ট এবং ৩০টি ওয়ানডে। তাই একটি মাত্র টেস্টে ব্যর্থতার জন্য মন খারাপ করে বসে থাকার সময় নেই। সবাই ব্যর্থ হয়, ওয়ার্ল্ডের বড় বড় ব্যাটসম্যানও ব্যর্থ হয়েছেন। কপাল খারাপ, আমি দুবারই ভালাে বল পেয়েছি, তাও ইনিংসের শুরুতেই। যদি ২০-৩০ রান করার পর আউট হতাম, তাহলে বেশি খারাপ লাগত। করলাম তাে ৬ আর ০! আমি তাে সেট হওয়ারই সুযােগ পাইনি!

শুভ্র: ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর কলকাতায় তোমাকে নাকি বিশাল সংবর্ধনা দিয়েছিল?

সৌরভ: ফ্যান্টাস্টিক! আমি কখনাে কল্পনাও করিনি যে, কলকাতার মানুষ আমার সাফল্যে এত খুশি হবে। এয়ারপাের্টে নেমেই দেখি, মানুষ আর মানুষ! এ আমি আশাই করিনি। এয়ারপাের্ট থেকে বেহালায় আমার বাড়ি পর্যন্ত পাঁচ-ছয় কিলােমিটার রাস্তা আসতে ট্যাক্সিতে দশ মিনিটের বেশি লাগে না। অথচ সেদিন মানুষের ভিড়ে এর অনেকগুণ বেশি সময় লেগে গিয়েছিল। সেদিনের কথা আমি জীবনে ভুলব না। এত মানুষকে আমি খুশি করতে পেরেছি, এটা ভেবে খুব আনন্দ লাগছিল।

শুভ্র: ভারতে এমনিতেই তাে ক্রিকেটাররা হিরাে। তার পরও কলকাতায় তাে তােমাকে ঘিরে উন্মাদনাটা একটু বেশিই। কেমন লাগে?

সৌরভ: উন্মাদনা ভালােই লাগে। তবে এবার উন্মাদনার সঙ্গে গালাগালও খেলাম এই ম্যাচে (কলকাতা টেস্টে)। এটা আমি একদম আশা করিনি। এত রান করার পর একটা ম্যাচে খারাপ করার কারণে এ রকম পরিস্থিতিতে পড়তে হবে ভাবিনি। ব্যর্থতা তাে থাকবেই। দর্শকরা কেন বুঝতে চান না, এটা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট, এখানে সবাই ভালাে। অপােনেন্টও ভালাে, আমার চেয়ে বেশি না হলেও আমার মতােই ভালাে। আমার সঙ্গে লড়াইয়ে সে-ও তাে কখনাে কখনাে সফল হবে, আমিও তাে আউট হব। তুমি দেখাে, গত জুন থেকে নিয়মিত সাফল্য পেয়ে আসছি আমি, স্ট্যাটিসটিকস তাে তুমি জানােই । অথচ এই একটা ম্যাচে রান না পাওয়াতেই এ অবস্থা!

শুভ্র: ইডেনে তােমার রান ভাগ্য নাকি কখনােই ভালাে নয়?

সৌরভ: হ্যাঁ, আসলে তা-ই। আমার জন্য ইডেন মােটেই লাকি গ্রাউন্ড নয়। বরং বােম্বের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম এদিক দিয়ে খুব লাকি। ওই মাঠে আমি সব সময় রান পেয়েছি, সব সময়ই। ওয়াংখেড়ে তাই আমার সবচেয়ে প্রিয় মাঠ।

শুভ্র: আচ্ছা, বাংলার ক্রিকেটাররা সব সময় বৈষম্যের শিকার হয় বলে যা শােনা যায়, তুমি কি তার সঙ্গে একমত?

সৌরভ: না, পুরাে একমত নই। বৈষম্যের দু-একটা ঘটনা হয়তাে হয়েছে, কিন্তু এই লেভেলে মর্যাদার সঙ্গে সারভাইভ করতে হলে তােমাকে পারফর্ম করতে হবে। আমি ভালাে করেছি, দলে সবাই তাই আমাকে যথেষ্ট সম্মানের চোখে দেখে। শচীনের সঙ্গে কথা বলাে, দেখবে, ও কী বলে। পারফরম্যান্সটাই আসল, বাংলায় ও-রকম ভালাে প্লেয়ার কোথায়? তুমি দেখাে, গত কিছুদিন ভারতীয় দলে যারা খেলেছে তাদের মধ্যে শচীন-আজহারের কথা বাদ দাও, ওরা অনেক বড় প্লেয়ার। ওরা ছাড়াও মাঞ্জরেকার, আমরে, কাম্বলি, সিধু এরা সবাই কিন্তু টপ কোয়ালিটি পারফরমার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাে বটেই, ডােমেস্টিকেও দারুণ পারফরম্যান্স এদের। এই অঞ্চলের ছেলেদের ও-রকম পারফরম্যান্স কই? উৎপল চ্যাটার্জি পারফর্ম করেছে। চান্সও পেয়েছে। এই 'বৈষম্য, বৈষম্য' বলে চিৎকার করে লাভ নেই। পারফর্ম করতে হবে। বিশেষ করে ভারতে ব্যাটসম্যানের জন্য কাজটা অনেক বেশি কঠিন। কারণ এত বেশি ভালাে ব্যাটসম্যান আছে এ দেশে! সবাই সমান ভালাে হয়তাে না, তবে অনেকেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভালাে করতে সক্ষম। এই লেভেলের ক্রিকেটে শুধু টেকনিকটাই যথেষ্ট নয়। সাফল্য পেতে প্রয়ােজন মনের জোর, টেম্পারামেন্ট। মাইন্ড এখানে এইটটি পার্সেন্ট, টুয়েন্টি পার্সেন্ট অন্য সব। এসব কিছু না থাকলে এখানে টিকে থাকা কঠিন।

শুভ্র: কিন্তু তােমার বিরুদ্ধেও তাে অবিচার করা হয়েছে বলে ক্ষোভে ফেটে পড়েছে কলকাতা। সাহারা কাপে তােমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে দল থেকে। এর আগে শ্রীলঙ্কায় ব্যাটিংয়ে সাত নম্বরে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে।

সৌরভ: এ নিয়ে আমার কোনাে অভিযােগ নেই। সব টিমই এ রকম পরিস্থিতির সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে। রােশান মহানামাও তাে এক সময় ওপেন করত, এখন ও সাত নম্বরে ব্যাট করে। আমি কিন্তু সাত নম্বরে নেমেও রান পেয়েছি। তবে আমার পছন্দ তিন নম্বর জায়গাটা। এখন তাে ওয়ানডেতে ওপেনও করেছি, টাইটান কাপে ওপেন করে রানও পেয়েছি। এর পরও ওয়ানডেতে শচীনের সঙ্গে ওপেনই করব।

শুভ্র: তােমার কি 'আইডল' ছিল কোনাে?

সৌরভ: সেভাবে নয়। প্রিয় খেলােয়াড় ছিল অনেকেই। কিন্তু আমি কখনাে কারও মতাে হতে চাইনি। আসলে সবার খেলাই আলাদা, কেউই কারও মতাে হতে পারে না। ভিভ রিচার্ডসকে আমার খুব ভালাে লাগত। একবার ছােটবেলায় স্কুল ফাঁকি দিয়ে ইডেনে রিচার্ডসকে দেখতে গিয়েছিলাম। দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। রাজার মতাে চলাফেরা, নেটেও কী তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ব্যাট করলেন! নিজে বাঁহাতি বলেই হয়তাে ডেভিড গাওয়ারের খেলা খুব পছন্দ ছিল, কিম হিউজকেও খুব ভালাে লাগত। এখনকার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে আমার লারা আর শচীনের ব্যাটিং দেখতে ভালাে লাগে।অ্যালান ডোনাল্ডকেই খেলাটাই তখন কঠিন মনে হতো তাঁর। ছবি: টুইটার

শুভ্র: যেসব বােলারকে খেলেছ, তাঁদের মধ্যে সেরা মনে হয়েছে কাকে?

সৌরভ: অ্যালান ডােনাল্ড। কলকাতা টেস্টের আগে ওর বিপক্ষে দুটি ওয়ানডে খেলেছি, রান পেয়েছি দুটিতেই। তার পরও বলছি, ওর বিপক্ষে খেলা কঠিন। দুর্দান্ত গতি তাে আছেই, অ্যাকুরেট খুব, ভ্যারিয়েশনও অনেক, ভালাে স্লোয়ার বল আছে। একজন কমপ্লিট বােলার।

শুভ্র: এমন একটা শুরুর পর ভবিষ্যৎ নিয়ে কী রকম স্বপ্ন দেখাে?

সৌরভ: সত্যি বলছি, সে রকম ভাবিই না। বেসিক্যালি আই অ্যাম নট আ ড্রিমার। আমি শুধু খেলতে চাই। ক্রিকেট আমার নেশা, এখন তাে তা পেশাও। যেকোনাে স্পাের্টসম্যানেরই লক্ষ্য, দেশের হয়ে খেলা। সেটাই আমি করতে চাই আরও অনেক দিন। লক্ষ্য যদি বলাে, তাহলে তা এটাই।

শুভ্র: ঢাকা তাে তােমার বেশ পরিচিত। চারবার খেলতে গেছ ওখানে।

সৌরভ: তুমি বাংলাদেশের বলে বলছি না, ঢাকায় খেলতে আমার দারুণ লাগে। বারবার (১৯৮৯ সালে এশীয় যুব ক্রিকেট, ১৯৯২ সালে পশ্চিম বাংলা দলের হয়ে এবং ১৯৯২ ও ১৯৯৪ সালে ভারতীয় 'এ' দলের হয়ে দুটি সার্ক ক্রিকেট) দারুণ এনজয় করেছি ওখানে। যদিও শেষবার ('৯৪-এর ডিসেম্বরে দ্বিতীয় সার্ক ক্রিকেট) খেলার সুযােগই পাইনি। শুধু ফাইনাল খেলেছিলাম। সেবার কিন্তু আমার সবগুলাে ম্যাচেই খেলা উচিত ছিল। না খেলার কারণটা ক্রিকেটিং ছিল না। যাক, এ নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না। সবাই তা জানে। এসব অন্য ব্যাপার, আসল কথা হলাে, ঢাকা আমার খুব ফেবারিট। বাংলাদেশের মানুষ, পরিবেশ সবকিছুই ফ্যান্টাস্টিক লাগে। তা ছাড়া ভাষার একটা আত্মীয়তা তাে আছেই। একই ভাষায় কথা বলা যায়, সেটা তাে দারুণ ব্যাপার। একবার আমার ঢাকা লিগে খেলার কথাও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যাওয়ার আগের দিন থেকে পায়ে চোট পাওয়ায় আর যাওয়া হয়নি। ঢাকায় খেলার খুব ইচ্ছে আমার। সামনে তাে সময়ই নেই, টানা খেলা। দেখি, তার মধ্যেও যদি দু-একটা ম্যাচ খেলা যায়। ওহাে, তা কীভাবে হবে? আমার তাে কোনাে দলের পক্ষে রেজিস্ট্রেশনই নেই!

আরও পড়ুন......
'ক্যাপ্টেনসিটাকে কখনো জীবন-মরণ ব্যাপার বলে ভাবিনি'