শ্রীলঙ্কায় পথেঘাটে সবচেয়ে বেশি কী চোখে পড়ে, জানেন? ধ্যানরত বুদ্ধদেব। ‘পথেঘাটে’ কথাটা বোধ হয় ঠিক হলো না। বলা উচিত পথের পাশে। সেই ১৯৯৪ সালে প্রথম এসেছিলাম এই দ্বীপ দেশে। এবার এলাম সপ্তমবারের মতো। বুদ্ধের মূর্তি তাই কম দেখা হয়নি। তবে মাতারার ওয়েরাহেনা মন্দিরে যা দেখলাম, এমন কিছু আগে দেখিনি।

এই কলাম লেখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ই আরেকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল। ক্রিকেট এখানে নৈবচ নৈবচ। খেলার বাইরের শ্রীলঙ্কা, এখানকার মানুষ-সংস্কৃতি—এ সবই শুধু বিষয় হয়ে থাকবে এখানে। এর আগে ছয়বার শ্রীলঙ্কায় এলেও কলম্বো আর ক্যান্ডি ছাড়া আর কোনো শহর দেখা হয়নি। এবার কলম্বো-ক্যান্ডি ছাড়াও আরও তিনটি শহরে খেলা। লেখার বিষয় পাওয়া তাই কোনো সমস্যাই হবে না বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু ক্রিকেট খেলাটা যে বড় সময়খেকো। সেটি টেস্ট ম্যাচই হোক আর নিছক তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচ। সারা দিন ধরে খেলা, এর পর লেখা শেষ করতে করতে রাত ১০টা বেজে যায়। পর্যটকের চোখ নিয়ে আশপাশে যে একটু ঘুরে দেখব, সেই সময় কোথায়?

বৃষ্টি এল আশীর্বাদ হয়ে। কাল সকাল থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। মাঠে গিয়ে দেখি উইকেট ত্রিপলে ঢাকা পড়ে আছে। খেলা কখন শুরু হবে, ঠিক নেই। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তো নয়ই। এই সুযোগ! কিন্তু যাব কোথায়? মাতারায় দেখবটা কী?

‘পর্যটক আকর্ষণ’ হিসেবে ইন্টারনেটে যা পাচ্ছি, সেগুলোর কোনোটাই খুব বেশি টানছে না। খুব সুন্দর একটা লাইটহাউস আছে এখানে, পর্তুগিজ আর ডাচদের রাজত্বের সময়কার দুর্গ-টুর্গও। তবে এসব ক্যারিবিয়ানের প্রায় সব দ্বীপেই এত দেখেছি যে খুব বেশি আগ্রহ বোধ করছি না। তাহলে কি ওয়েহেরানা বৌদ্ধমন্দিরটাই দেখে আসব? মাতারায় কী দেখার আছে, স্থানীয় লোকজনকে প্রশ্ন করলেই উত্তরে এই ওয়েহেরানা মন্দিরটার কথা ‘কমন’ পেয়েছি। যে কারণে দ্রষ্টব্য, সেটিকে অবশ্য খুব আকর্ষক বলে মনে হয়নি। প্রত্নতত্নে খুব একটা আগ্রহ নেই বলে ‘অনেক প্রাচীন মন্দির’ কথাটা মনে খুব একটা অনুরণন তোলেনি। তারপরও ভাবলাম, আর কিছু যখন পাচ্ছি না, একবার গিয়ে দেখি। গিয়ে বুঝলাম, না গেলে বড় ভুল হতো।

 মাতারার ওয়েহেরেনা বৌদ্ধ মন্দিরে বুদ্ধের এক বিশাল মূর্তি

মাতারা শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ওই ওয়েরাহেনা। গিয়ে দেখি মন্দির প্রাঙ্গণে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। কদিন পরই শ্রীলঙ্কান প্রেসিডেন্ট মন্দির পরিদর্শনে আসবেন। মন্দির প্রাঙ্গণের এখানে-ওখানে ইট-পাথরের স্তূপ। নয়তলা মন্দির, যার তিনতলাই মাটির নিচে। এক তলা থেকে আরেক তলায় যাওয়ার সিঁড়ি আছে। তবে ঘুরতে হয় সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে। এটি নাকি বিশ্বের প্রথম সুড়ঙ্গ মন্দির। মাটির নিচের ওই অংশটা নির্মিত হয়েছে দেড় শ বছর আগে, ওপরের অংশটার বয়সও ৬০ বছর হয়ে গেছে।

ওই ‘সুড়ঙ্গ মন্দির’-এ ঢোকার আগেই দৃষ্টি কেড়ে নিলেন বুদ্ধদেব। বুদ্ধের এত বড় মূর্তি আগে কখনো দেখিনি। মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এলেন মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। প্রথমে ভেবেছিলাম আমার মতোই কোনো দর্শনার্থী। ছবি-টবি তুলে দিয়ে পরিচয় দিলেন, তিনি মন্দির কমিটির সেক্রেটারি বিজেরত্নে (নামের প্রথম অংশটা মনে করতে পারছি না)। মন্দিরটা ঘুরেও দেখালেন। সঙ্গে গাইডের মতো ধারাবর্ণনাও থাকল। বিজেরত্নেই জানালেন, বুদ্ধের এই মূর্তিটার উচ্চতা ৩৯ মিটার। একসময় এটিই ছিল শ্রীলঙ্কায় সবচেয়ে বড় বুদ্ধ মূর্তি। এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম (নাকি উচ্চতম?), মাতারারই কোথায় যেন ৫০ মিটার উঁচু আরেকটা মূর্তি বসানো হয়েছে।

গৌতম বুদ্ধকে ‘বুদ্ধ’ হতে নাকি ৫৫০ বার জন্ম নিতে হয়েছে। পূর্বজন্মের সব কথাই তাঁর মনে ছিল। কখনো কৃষকের ঘরে জন্মেছেন, কখনো-বা রাজপুত্র হয়ে। তাঁর মুখ থেকে তা শুনে লিপিবদ্ধও করে রাখা হয়েছে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষত্ব বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা ভালো বুঝবেন। আমার কাছে ওয়েরাহেনা মন্দিরটিকে যেখানে আলাদা মনে হলো, সেটিই শুধু আমি বলতে পারি। পুরো মন্দিরটাই যেন চিত্রপ্রদর্শনী! মন্দিরের বাইরের দেয়ালে তো বটেই, মাটির নিচের ওই তিনতলার সব দেয়ালে শুধু ছবি আর ছবি। মানে দেয়ালচিত্র আরকি! এর মহিমাটাও জানা গেল বিজেরত্নের কাছ থেকে। গৌতম বুদ্ধকে ‘বুদ্ধ’ হতে নাকি ৫৫০ বার জন্ম নিতে হয়েছে। পূর্বজন্মের সব কথাই তাঁর মনে ছিল। কখনো কৃষকের ঘরে জন্মেছেন, কখনো-বা রাজপুত্র হয়ে। তাঁর মুখ থেকে তা শুনে লিপিবদ্ধও করে রাখা হয়েছে। দেয়ালের ওই সব ছবিতে মূর্ত হয়ে আছে গৌতম বুদ্ধের ৫৫০ জীবনের বিভিন্ন পর্ব। ছবির সংখ্যা ‘মাত্র’ ২৩ হাজার!

সুরঙ্গ মন্দিরের দুই পাশের দেয়াল জুড়ে দেখা যায় গৌতম বুদ্ধের এমন সব ছবি। সংখ্যাটা বেশি না, মাত্র ২৩ হাজার!

ছেলেবেলায় বইয়ে পড়া বলেই হয়তো সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ল ওই ছবিটা—ঘুমন্ত স্ত্রী ও পুত্রের দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন মানুষের রোগ-শোক-জরা দেখে কাতর গৌতম বুদ্ধ।

বিজেরত্নের কল্যাণে বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে একটা শর্টকোর্সও হয়ে গেল। যার অনেক কিছু আগে থেকেই ভাসা ভাসা জানতাম। নতুন জানলাম একটা তথ্য। বুদ্ধের প্রায় সব মূর্তিই নাকি পূর্ব দিকে মুখ করা থাকে। দু-একটা অন্য কোনো দিকে মুখ করে থাকলেও পশ্চিম দিকটা একদমই নিষিদ্ধ। বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের শুধু মৃত্যুর পরই পশ্চিম দিকে মুখ করে শোয়ানো হয় (বিজেরত্নের ভাষ্য, ভুল হলে ক্ষমা করবেন)। এর একটা রূপক অর্থও আছে। পূর্ব দিকে উদিত হয়ে পশ্চিমে অস্ত যাওয়া সূর্যের সঙ্গে মানবজীবনের সাযুজ্য খোঁজা।

ফেরার সময় ঘাড় উঁচু করে বুদ্ধের মূর্তিটার দিকে আবারও তাকালাম। বিড়বিড় করে বললাম, অশান্ত এই সময়ে আপনার অহিংসা-মন্ত্রটা আজ বড় জরুরি।

৪ মার্চ ২০১৩। মাতারা।