ওই শ্রীলঙ্কান সাংবাদিকের কথাটা খুব মনে পড়ছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিয়ে গদগদ দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কখনো গলে গিয়েছ?’ তখন পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা বলতে কলম্বো আর ক্যান্ডি। গল দেখা হয়নি। শোনার পর ওই সাংবাদিক ‘আগেই জানতাম’ জাতীয় একটা হাসি দিয়ে বলেছিলেন, ‘একবার গলে যেও। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোনো দ্বীপের চেয়ে এটি কম সুন্দর নয়।’

নিজের দেশ সম্পর্কে এমন সবাই বলে। ২০০৭ বিশ্বকাপের সময় অ্যান্টিগাতে আমার হোটেল ম্যানেজার গর্ব করে যখন বলছিলেন ‘আমাদের এই দ্বীপে ৩৬৫টি সৈকত আছে’, আমি পাল্টা বলেছিলাম, ‘সংখ্যায় তোমরা এগিয়ে থাকতে পারো, কিন্তু বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কোথায় জানো?’

ওই তরুণের তা জানা ছিল না। কক্সবাজারের কথা শুনে বিস্ময়ে বলেছিলেন, ‘বলো কী! আমি তো জানতাম, বাংলাদেশে কোনো বিচই নেই।’ গল নিয়ে শ্রীলঙ্কান সাংবাদিকের উচ্ছ্বাসকেও ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’ ধরনের অনুভূতির প্রকাশ বলেই মনে হয়েছিল। গলে এসে ভুলটা বুঝতে পারলাম।

মাতারা থেকে গাড়ি ভাড়া করে গলে এসেছি। আসার পথে টানা বাঁদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাড় ব্যথা হয়ে গেল। রাস্তার বাঁয়ে যে হাতছানি দিয়ে ডাকছে সাগর। সেটির কূলজুড়ে শরীর-স্বাস্থ্যে বাংলাদেশের সুপারিগাছের মতো নারিকেলগাছের সারি। সাগরের হাতছানি এড়াতে না পেরেই কি না, কোনোটিই খাড়া ওপরে উঠে নেই। বাঁকা হয়ে উঁকি দিতে চাইছে সাগরে। কী যে সুন্দর! কী যে সুন্দর!

নিজের মুগ্ধতায় নিজেই একটু বিস্মিত হলাম। সাগর তাহলে এখনো আগের মতোই টানে! ওয়েস্ট ইন্ডিজে চারবার ক্রিকেট কাভার করতে গিয়ে ক্যারিবিয়ানের ক্রিকেট খেলুড়ে সব দ্বীপরাষ্ট্রই মোটামুটি দেখা হয়ে গেছে। এমন অনেক হোটেলে থেকেছি, যেটির আঙিনা আর সৈকত একাকার হয়ে গেছে। দিনের পর দিন প্রতিবেশী হিসেবে সাগরকে পেয়ে একটা সময় মনে হয়েছিল, সাগর দেখে যে মোহাচ্ছন্ন একটা ভাব হয়, সেটির বোধ হয় সমাপ্তি ঘটল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে ফিরে কক্সবাজারই যেমন আর আগের মতো ভালো লাগে না। কোথায় ওই ক্যারিবিয়ান সাগরের নীলাভ জলরাশি, আর কোথায় কক্সবাজারের কালচে নোংরা জল!

মাতারায়ও হোটেলের সামনেই সাগর ছিল। ছিল সোনালি বালুর সৈকতও। কিন্তু গলের সাগর আর উনাওয়াটুনার সৈকতের কাছে সেটি কিছুই নয়। গলের উপকণ্ঠে এই উনাওয়াটুনাতেই একটা হোটেলে উঠেছি। রাস্তার ওপারেই উনাওয়াটুনার বিখ্যাত সমুদ্রসৈকত। কাল দুপুরে সেই সৈকতপারের এক হোটেলে খেতে গিয়ে আর রুমে ফিরতে ইচ্ছা করছিল না। বিশ্বের সেরা ১২টি সৈকতের মধ্যে কেন উনাওয়াটুনাকেও রাখা হয়, সেটি বুঝতেও কোনো সমস্যাই হলো না।

সাগর যদি হয় এমন, তাহলে তা নিয়ে আদিখ্যেতা তো করতেই হবে। ছবি: গেটি ইমেজেস

ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে লেখা ‘ক্যারিবীয় কড়চা’য়ও পাঠকেরা সাগর নিয়ে আমার ‘আদিখ্যেতা’র পরিচয় পেয়েছেন। এবার তাই ঠিক করেই এসেছিলাম, আর যা-ই লিখি, সাগর নিয়ে ‘আহা’ ‘উহু’ একদমই নয়। কিন্তু উনাওয়াটুনা সেই প্রতিজ্ঞা রাখতে দিল না। ক্যারিবিয়ান সাগর হয়তো নীল রঙের রকমারি শেডের দিক থেকে এগিয়ে, তবে মাতারা-গল রাস্তার পাশের সাগর এগিয়ে থাকছে পাথরের কারণে। সৈকতহীন সাগরপাড়ে নানা আকারের পাথর দৃশ্যটাকে অপার্থিব বানিয়ে ফেলে।

উনাওয়াটুনা এসে এর মজার একটা ‘ইতিহাস’ও জানলাম। হয়তো কল্পগাথা। সেটি না হয় আগামীকালের জন্য তোলা থাক।

৬ মার্চ ২০১৩। গল।

আরও পড়ুন:

হাম্বানটোটার প্রেসবক্সে বৃষ্টির অবসরে

হাতির রাজ্যে উড়ন্ত ময়ূর

হাম্বানটোটায় কালুভিতারানার অতিথি

প্রেমাদাসায় বসে শেয়ালের ডাক শোনা

প্রেমাদাসায় গেলে শচীনকেই কেন আগে মনে পড়ে

সুনামি ও গল স্টেডিয়ামের পুনর্জন্ম

হনুমানের ফেলে দেওয়া টুকরো থেকে যেটির সৃষ্টি

বিশ্বের প্রথম সুড়ঙ্গ মন্দিরে বুদ্ধ শরণে

মাতারা হারিকেনের সঙ্গে মাতারায়

যত কাণ্ড মাতারায়