প্রিয় মুরালি,

সহস্রতম উইকেটটি নিয়ে আপনি যখন মাঠে উৎসবের মধ্যমণি, আমাদের ড্রেসিংরুমে সবাই তখন টেলিভিশন রিপ্লেতে আম্পায়ার আসাদ রউফের তুলে দেওয়া তর্জনীর দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে। আমি ওখানে ছিলাম না। এরপরই আমাকে নামতে হবে, প্যাড-ট্যাড পরতে পরতে আমি তখন ভাবছিলাম, কোথায় আপনি আর কোথায় আমি! 

পরিসংখ্যানের কচকচানি আমার একদমই ভালো লাগে না; সত্যি বলছি, আমার কত উইকেট, সেটি পর্যন্ত মনে থাকে না। আমাদের দলে আশরাফুলের এসব মুখস্থ, লাঞ্চের সময় ও-ই জানাল, টেস্ট আর ওয়ানডে মিলিয়ে আমার মোট উইকেট ১৫৩টি। এরপর হেসে বলল, দ্বিতীয় ইনিংসে তো সংখ্যাটা আরও বাড়বে।

দ্বিতীয় ইনিংস! কথাটা খট করে কানে লাগল। টেস্ট ক্রিকেটে যে দ্বিতীয় ইনিংস বলেও একটা ব্যাপার আছে, এটা মাঝে-মধ্যে আমার মনেই থাকে না! এই চট্টগ্রামের আগে যে ২২টি টেস্ট খেলেছি, তার অর্ধেক টেস্টেই তো দ্বিতীয় ইনিংস বলে কিছু পাইনি। বাকি ১১ বারই বা সেভাবে পেলাম কোথায়! দু-তিনবারের কথা বাদ দিলে আমরা এত কম রানের পুঁজি নিয়ে নেমেছি যে, উইকেট-টুইকেট নেওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে নিশ্চিত পরাজয়টাকে বিলম্বিত করার কথাই ভাবতে হয়েছে।

অস্বীকার করব না, কখনো কখনো আপনাকে ঈর্ষাও করেছি। আমরা ছোট দল, আমাদের বিপক্ষে তো করবেনই। টেলিভিশনে দেখেছি, বড় বড় দলের বিপক্ষেও ব্যাটসম্যানের চারপাশে ফিল্ডারের জাল ছড়িয়ে আপনি চতুর্থ ইনিংসে বল করছেন। আর আমি সিলি পয়েন্টের সঙ্গে একটা শর্ট লেগ চাইতে গেলেও অধিনায়ক গম্ভীর মুখে স্কোরবোর্ডটা দেখিয়ে দেন। অধিনায়কের কী দোষ, ওই বেচারাকেও তো রান বাঁচানোর চিন্তাতেই হিমশিম খেতে হয়। এখানেই কী হলো দেখুন না! প্রথম ইনিংসে দু দলই প্রায় সমান-সমান, ভাবলাম এবার বোধ হয় চতুর্থ ইনিংসে জয়ের জন্য বোলিং করার সুযোগ পাচ্ছি। কিসের কী, আমার দলের ব্যাটসম্যানরা আমার কথা একটুও ভাবল না। আপনাকে দুটি ছক্কা মেরেছি বলে নিশ্চয়ই মনঃক্ষুন্ন হয়েছেন। আপনাকে বলেই দিই, ছক্কা দুটি আমি নাফিসদের (নাফিস ইকবাল ও শাহরিয়ার নাফীস) ওপর রাগ করেই মেরেছি।

আশা করি, আপনি এটিকে ঔদ্ধত্য মনে করবেন না। আপনি আর শেন ওয়ার্ন আমাদের স্পিনারকুলের শিরোমণি। স্পিন বোলিংকে আপনারা যে জায়গায় নিয়ে গেছেন, তাতে স্পিনার হিসেবে আমারও গর্ব হয়। কাউকে যা বলিনি, এমন কিছু দুঃখ জানাতেই আপনাকে এই চিঠি লিখছি। যে লড়াই করে আজ আপনি সহস্রতম উইকেটের চূড়ায় বসেছেন, সেটি আমাকেও প্রেরণা যোগায়। তবে সবিনয়ে জানাই, লড়াই কিন্তু আমাকেও কম করতে হয়নি। যত দূর জানি, আপনি ক্যান্ডির এক বিস্কুট ফ্যাক্টরির মালিকের ছেলে। অভাব কাকে বলে, সেটি আপনার গল্প-উপন্যাস পড়েই জানতে হয়েছে। আপনার ক্রিকেট খেলা মনের আনন্দে।

আর আমার কথা শুনবেন! দারিদ্র্যের কথা বলে বেড়ানোটা আমার মানসিকতায় বাধে। তারপরও আপনাকে খুব আপন মনে হচ্ছে বলেই বলি, ক্রিকেট আমার কাছে শুধু খেলা নয়, এটা আমার কাছে রুটি-রুজিও। সেদিনই এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, এই বয়সেও আপনি এত ফিট আছেন কীভাবে? আমি শুধু বলেছি, আমার ফিট না থেকে উপায় নেই। ক্রিকেট তো আমার কাছে খেলা নয়, এটা আমার জীবিকা। ওই সাংবাদিকের মুখ দেখে মনে হলো, কথাটাকে উনি রসিকতা মনে করছেন। অথচ এটিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।

বোলিং অ্যাকশন নিয়ে আপনাকে যে পরিমাণ হেনস্তা হতে হয়েছে বা এখনো হতে হচ্ছে, তার তুলনায় কিছুই নয়; তবে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টেই আমার অ্যাকশন নিয়েও কিন্তু আপত্তি উঠেছিল। বিসিবি থেকে খবরটা যখন পেলাম, আমার মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। আর যদি খেলতে না পারি, তাহলে আমার পরিবারের কী হবে! ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেটে পরিশ্রম করে অ্যাকশন ঠিক করেছি, অথচ তারপর কী হলো, জানেন? নির্বাচকেরা আমাকে ওয়ানডে স্পেশালিস্ট বানিয়ে দিলেন! আমার বলে নাকি টার্ন নেই, বোলিংয়ে টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করার মতো বৈচিত্র্য নেই। আপনার বলে যে টার্ন, বোলিংয়ে যে বৈচিত্র্য—তা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু আপনিই বলুন, ব্যাটের কানা নিতে বলকে কতটুকু টার্ন করাতে হয়? ঠিক জায়গায় বল ফেলাটাই কি আসল নয়, টেন্ডুলকার-লারাদেরও কি তখন ফরোয়ার্ড ডিফেন্সিভ না খেলে উপায় থাকে?

সেই শৈশব থেকেই জীবনের রূঢ় বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় বলেই কি না, আমার মধ্যে আবেগটা একটু কম। কিন্তু আপনাকে লিখতে বসে কেন যেন একটু আবেগপ্রবণ হয়ে যাচ্ছি। যেসব কথা কোনোদিন কাউকে বলিনি, তা-ও বলে ফেলতে ইচ্ছে করছে। একটা আনন্দের ঘটনাও বলেই ফেলি। বছরখানেক আগে নিউজিল্যান্ড এসেছিল এখানে। ড্যানিয়েল ভেট্টোরির সঙ্গে তো আপনার ভালোই খাতির। একদিন ও আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলল—অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে ঘাসের উইকেটে আমার আর্মার খুব কাজ করে। কিন্তু উপমহাদেশে বল যখন খুব তাড়াতাড়ি পুরোনো হয়ে যায়, তখন আর আমি ওটা করতে পারি না। তুমি তো এখানেও দারুণ আর্মার করছ, আমাকে একটু শিখিয়ে দেবে!

সেদিনও একটু আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলাম। যাকে সবাই এই সময়ের সেরা বাঁহাতি স্পিনার বলে মানে, সেই ভেট্টোরি আমার কাছে টিপস চাইছে! আমি ওকে কিছুই বলিনি, ও হয়তো ভেবেছে আমি ওকে শেখাতে চাই না। আসলে কী জানেন, ক্রিকেটীয় অনেক কিছুই আমি বুঝিয়ে বলতে পারি না। আমি তো বই-টই পড়ে ক্রিকেটার হইনি। এর আগে কাউকে বলিনি, এই চট্টগ্রামেই টেস্ট সিরিজ শেষে যখন ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার নেওয়ার জন্য ভেট্টোরির ডাক পড়ল, মনে মনে বলেছিলাম—বন্ধু, যাও, এই পুরস্কার তোমারই প্রাপ্য। তবে মনে রেখো, চার ইনিংসে বল করে তুমি নিয়েছ ২০ উইকেট, আর দুই ইনিংসে বল করে আমি ৯। আরেকটা কথা মনে রাখলেও ভালো হয়, তোমাদের ব্যাটসম্যানদের আমাদের মতো অমন উদার হাতে উইকেট বিলানোর অভ্যাস নেই।

ছোট্ট একটা চিঠি লিখব বলে বসে অনেক কথাই লিখে ফেললাম। কিছু মনে করবেন না যেন। সহস্রতম উইকেটের জন্য আপনাকে অভিনন্দন জানাই। দোয়া করবেন, ক্যারিয়ার শেষ করার আগে যেন স্কোরবোর্ডে কিছু রান নিয়ে চতুর্থ ইনিংসে বোলিং করার সুযোগ পাই।

ইতি
মোহাম্মদ রফিক