নাজমুল হোসেন শান্ত সেঞ্চুরি করায় সবচেয়ে খুশি হয়েছেন কে?

সবচেয়ে খুশি তো অবশ্যই শান্ত নিজে। যদিও দিনশেষে ১২৬ রানে অপরাজিত ব্যাটসম্যানের চোখেমুখে খুশির চেয়েও যা বেশি ফুটে উঠেছে, তার নাম স্বস্তি। টিভি ইন্টারভিউয়ে তা বলেছেনও। এর আগে শুরুতেই যে কথাটা বলেছেন, তা আরও ইন্টারেস্টিং। ‘কেমন লাগছে’ জাতীয় প্রশ্নে উত্তর দিলেন,‘মাচ বেটার নাও।‘

‘ভেরি হ্যাপি’ বলার বদলে ‘মাচ বেটার’ কেন বললেন, তা বুঝতে আমার একটুও সমস্যা হচ্ছে না। বেচারার ওপর দিয়ে গত কিছুদিন এমনই ঝড় বয়ে গেছে যে, প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি তাঁর মনে যত না খুশির ঢেউ তুলেছে, তার চেয়ে বেশি এই ‘আগের চেয়ে ভালো’-র স্বস্তি। যাক বাবা, অন্তত কয়েকটা দিন একটু শান্তিতে খেলা যাবে।

শুরুতেই উইকেট পড়ে যাওয়ায় বলতে গেলে প্রায় সারা দিনই ব্যাটিং করেছেন। টেস্ট ম্যাচে এমন দীর্ঘ সময় উইকেটে কাটালে শুধু রানই আসে না, একজন ব্যাটসম্যানের অমূল্য কিছু শিক্ষাযোগও ঘটে। যে শিক্ষা ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেটে ব্যাটিং করেও পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস কমপিটিশনের যে হাল, তাতে দুদিন ব্যাটিং করেও না। নাজমুল হোসেন শান্ত তাই এক ইনিংসেই অনেক কিছু শিখেছেন।

শান্তর ব্যাটিং দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আমাদেরও বোধ হয় এ থেকে কিছু শেখার আছে। টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে আমরা ধৈর্য আশা করি; কিন্তু আমাদের নিজেদের কথাবার্তায়, আচার-আচরণেও কি সেই ধৈর্যের প্রকাশ থাকা উচিত নয়? আমাদের মধ্যে কি সেই চর্চা আছে?

‘আমাদের’ ‘আমাদের’ বলছি মানে আমি নিজেও নিজেকে প্রশ্নটা করছি। কাজেই ভুলেও এমন মনে করবেন না যে, নিজে সাধু সেজে আপনাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছি। তবে এটা তো আশা করছিই যে, আমার মতো আপনিও নিজেকে প্রশ্নটা করবেন। কথাটা বারবার বলছি, এটাকে খুব জরুরি মনে করছি বলেই। কেন তা মনে করছি, একটু বুঝিয়ে বলি।

অপরাজিত ১২৬ রানের ইনিংসে ১৪টি চারের একটি। ছবি: শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট

জানা কথাটাই প্রথমে আবার বলে নিই। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বড় কঠিন ঠাঁই। নেমেই জয় করে ফেলার ঘটনা এখানে অহরহ ঘটে না। কোনো ফুল যেমন খুব তাড়াতাড়ি ফোটে, কোনো ফুল দেরিতে; কোনো কোনো ফুল ফুটেই ঝরে যায়, আবার কোনো ফুল একবার ফোটার পর অনেকদিন বৃন্তে ঝুলতে থাকে–ক্রিকেটারদের মধ্যেও এমন রকমভেদ থাকে।

মোহাম্মদ আশরাফুল যেমন মাত্র ১৭ বছর বয়সে টেস্ট অভিষেকেই সেঞ্চুরি করে ফেলেছিলেন, আবার প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পেতে শান্তর অনেক দিন লাগল। ‘অনেক দিন’ কথাটায় ভুল নেই। টেস্ট ক্রিকেটে এটা শান্তর চতুর্থ বছর। কিন্তু ম্যাচ সংখ্যার দিকে তাকালেই এই ‘অনেক দিন’ কথাটা অন্য অর্থ নিয়ে দেখা দেবে। পাল্লেকেলেতে তো মাত্রই সপ্তম টেস্ট খেলছেন শান্ত।

সময়ের হিসাবে অনেক দিন হয়ে যাওয়াটা তো নিছকই দুর্ঘটনাক্রমে। ২০১৭ সালের নিউজিল্যান্ড ট্যুরে সে সময়ের কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জল-হাওয়া, নিউজিল্যান্ডের ভিন্ন কন্ডিশন এসবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে মূল দলের সঙ্গে বড় এক লটবহর নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৭ বছরের শান্ত ছিলেন সেই ‘ট্যুরিস্ট’দের দলে। ক্রাইস্টচার্চে শেষ টেস্ট আসতে আসতে বাংলাদেশ দল এমনই চোট-আঘাতে জর্জরিত যে, ১১ জন নামানোই কঠিন। বাধ্য হয়ে তাই শান্তকে নামিয়ে দেওয়া হয়।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ক্রাইস্টচার্চে ঘটনাচক্রে শান্তর সেই টেস্ট অভিষেক। ছবি: গেটি ইমেজেস

দুই ইনিংসে রান করেছিলেন ১৮ ও ১২। কিন্তু অমন সিমিং কন্ডিশনে বোল্ট-সাউদির বিপক্ষে দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৫৮ মিনিট টিকে থাকাটা স্কুল ক্রিকেটে ডাবল সেঞ্চুরি করে প্রথম নজরে আসা ব্যাটসম্যানের সম্ভাবনাটা ঠিকই বুঝিয়ে দিয়েছিল। তাই বলে দলে জায়গা পাকা করে ফেলার মতো কিছু তো আর করে ফেলেননি। পরের টেস্ট খেলতে তাই দুই বছরের অপেক্ষা। দলে আসা-যাওয়া করে এরপর আরও যে চারটি টেস্ট খেলেছেন, তাতে একটি ফিফটি (জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৭১) আছে, এর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতে কঠিন এক উইকেটে ৪৪ ও ৩৮। নামে অনেক বিখ্যাত ব্যাটসম্যানের চেয়েও যেখানে তাঁকে বেশি স্বচ্ছন্দ লেগেছিল।

কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বশেষ টেস্ট সিরিজটাতে রান করতে না পারায় (২৫, ০, ৪, ১১) শান্তকে নিয়ে এমন সমালোচনা শুরু হয়ে গেল যে, মনে হচ্ছিল, শান্ত বোধ হয় মামা-চাচার জোরে বাংলাদেশ দল খেলছেন। লেখার শুরুর দিকে যে ধৈর্যের কথা বলছিলাম, তা এ কারণেই। ব্যাটসম্যানদের জন্য যেমন তা জরুরি, দর্শক-সমর্থকদেরও। সমালোচনা করার সময় আমরা অনেক সময় এমন ভাষায় তা করি, যেন ভালো খেলতে না পারা খেলোয়াড় চুরি-ডাকাতির মতো কোনো অন্যায় করে ফেলেছেন।

শান্ত সেঞ্চুরি করায় কে সবচেয়ে বেশি খুশি প্রশ্নটা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। এই দলে নির্বাচক হাবিবুল বাশারকেও রাখা উচিত বলে মনে হচ্ছে। ‘এ’ দলের অধিনায়ক হিসাবে শান্তকে মাঠে-ড্রেসিংরুমে-মাঠের বাইরে শান্তকে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে হাবিবুলকে সব সময়ই শান্ত সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত দেখেছি। হাবিবুলকে চিনি বলে কখনোই তা স্বজনপ্রীতি বলে মনে করার ভুল করিনি।

শুরুতেই উইকেট হারিয়ে ফেলার পর তামিম ইকবালের সঙ্গে শান্তর ১৪৪ রানের জুটিটাই রঙিন করে দিতে শুরু করেছিল বাংলাদেশের দিনটাকে । ছবি: শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট

হাবিবুলের কাছ থেকে শান্ত সম্পর্কে সার্টিফিকেট পাওয়ার আগেই তাঁকে নিয়ে একই রকম উচ্চ ধারণা দেখেছি বাংলাদেশের সাবেক কোচ স্টিভ রোডসেরও। ২০১৮ এশিয়া কাপে ক্রমাগত ব্যর্থতার পরও শান্তকে খেলিয়ে যাচ্ছেন দেখে একদিন কারণটা জানতে চেয়েছিলাম। রোডস বলেছিলেন, ‘ও রান করতে পারছে না, এটা তো আপনি যেমন দেখছেন, আমিও দেখছি। তবে ওর মধ্যে ভালো করার সব উপাদানই আছে।‘

আমরা বেশির ভাগ সময় শুধু মাঠেই খেলাটা দেখি। সেখানকার পারফরম্যান্স দিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি একজন খেলোয়াড় সম্পর্কে। এটাই স্বাভাবিক। তবে দল নির্বাচনের সময় একজন খেলোয়াড়ের প্র্যাকটিসে নিবেদন, মাঠের বাইরে মন-মানসিকতা অনেক কিছুই বিবেচনায় নেওয়া হয়। নেওয়া উচিতও। হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত বিচারটা তো মাঠের পারফরম্যান্সই। তা ভালো না হলে বাকি সব অর্থহীন হয়ে গিয়ে এক সময় তো বাদ পড়তেই হবে।

তবে এর আগ পর্যন্ত কেউ বাংলাদেশ দলে এলে আমরা যেন একটু ধৈর্য ধরতে শিখি। শান্তর প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি আমাকে অন্তত এই শিক্ষাটাই আবার নতুন করে দিয়েছে। আপনারাও যদি একটু এমনভাবে ভাবতে রাজি থাকেন, তাহলে এমনিতেই দারুণ এই সেঞ্চুরিটা বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য আরও বেশি তাৎপর্যবহ হয়ে উঠবে।   

অভিনন্দন, শান্ত!