খড়ের আগুনটা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন এক দর্শক। শুভ্র.আলাপে টেস্ট-সংক্রান্ত আলোচনা ততক্ষণে মোড় নিয়েছে 'বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সমস্যা ও সমাধান' গোছের সেমিনারে। উৎপল শুভ্র তো এমনও বললেন, এই শো হয়তো অনেকে দেখছেন, এই আলোচনা হয়তো অনেকে শুনছেন, কিন্তু তাতে কোনো কাজ হবে বলে মনে হয়। এতসব ভারিক্কি আলাপের মধ্যেই একজন স্মরণ করিয়ে দিলেন খালেদ মাসুদ পাইলটকে, 'ইন্ডিয়ার সঙ্গে খেলার সময় আপনি মজার স্লেজিং করতেন সৌরভ গাঙ্গুলীকে। কী কথা হতো, এটা যদি বলতেন?'

এতেই সিরিয়াস বিষয় থেকে মজার দিকে মোড় ঘুরে গেল আলোচনার। ক্রিকেটটা উপভোগের মন্ত্রে খেলতেন বলে স্লেজিং নিয়ে অজস্র অভিজ্ঞতা আছে পাইলটের; কথা দিয়ে কাউকে আহত করাটা উদ্দেশ্য ছিল না, তবে মজা নিতেও ছাড়তেন না। উইকেটকিপারদের এমনিতেই সরব থাকতে হয়। পাইলট মাঝেমধ্যেই সেটিকে অন্য মাত্রা দিতেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণটা অবশ্য রহস্যই রয়ে গেল। উৎপল শুভ্র ইংল্যান্ড 'এ' দলের এক ব্যাটসম্যানের সঙ্গে পাইলটের একটা স্লেজিংয়ের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিতেই হাসিতে ভেঙে পড়লেন দুজনই। যদিও তা অনুষ্ঠানে বলার অনুপযুক্ত বলে জনমনে একটা কৌতূহলই রেখে দিলেন তাঁরা।

তবে ইনজামাম-উল-হককে করা স্লেজিং কিংবা মুরালিকে 'চাকিং' নিয়ে কেমন খোঁচা দিয়েছিলেন পাইলট, সেই গল্পগুলো জানা গেল ঠিকই।

'ইনজি ভাই, লোকে তোমাকে আলু কেন বলে?'

শুভ্রই মনে করিয়ে দিলেন, দর্শকরা কেমন 'আলু' 'আলু' বলে খেপিয়ে তুলতেন ইনজামামকে। একবার সাহারা কাপের ম্যাচে কান ঝালাপালা করা চিৎকারে ব্যাট নিয়ে গ্যালারিতে গিয়ে দর্শককে মারতেও উদ্যত হয়েছিলেন তিনি। পাইলটও ইনজামামকে স্লেজিং করেছিলেন ওই আলু নিয়েই। সেটিরই মজার বর্ণনা দিলেন তিনি, 'একবার ইনজামাম-উল-হক ব্যাটিংয়ে নামছে। তো নামার সময় খুব দোয়া পড়ছে, বুকে ফুঁ-টু দিচ্ছে; আমাদের আকরাম (খান) ভাইয়ের মতোই নামার সময় ও খুব টেনশনে থাকত। তো নামার পরে আমি পেছন থেকে ডাকলাম, "ইনজি ভাই, ইনজি ভাই"।

আমি বুঝতে পেরেছি, ও কী করবে ভেবে কনফিউজড হয়ে গেছে; মানে বোলারের দিকে তাকাবে, আম্পায়ারের সাথে কথা বলবে নাকি আমার সাথে কথা বলবে। একটা বল খেলার পরে একটু রিল্যাক্সড হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ও বলল, "বোলো, বোলো।"

আমি বললাম,  "ইনজি ভাই, আপকো ইয়ে সব আলু আলু কিউ বোলতা হ্যায়?"

ইনজামাম রেগে গিয়ে বললেন,  "ছোটা ভাই ছোটা ভাইসে তরফ রহো, নেহি তো মার দুঙ্গা!"

হা হা হা। আমি চাচ্ছিলাম ও একটু ক্ষেপে যাক। তাহলে কী হবে জানেন, ব্রেনটা খেলার মধ্যে থাকবে না, কিছু একটা উইকেট-টুইকেট পাওয়ার সম্ভাবনা হবে। এরকম চিন্তা-ভাবনা ছিল আরকি। কোনো নেগেটিভ কিছু ছিল না।'

সাহারা কাপে ব্যাট দিয়ে দর্শককে মারতে গ্যালারিতে তেড়ে যাচ্ছিলেন ইনজামাম। '৯৭ সালে টরন্টোতে। ছবি: ইএসপিএন ক্রিকইনফো

মুরালির সঙ্গে যা হয়েছিল...

মুরালিকে করা উৎপল শুভ্রর প্রশ্নটা নির্দোষই ছিল। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মুরালির হাজারতম শিকার ছিলেন পাইলট, পরের টেস্টেই টেস্ট ক্রিকেটে মুরালির ৬০০তম শিকারও তিনি। একটু আগে পাইলটের কাছ থেকেই শুভ্র জেনেছেন, অল্পের জন্য ৫৫০ নম্বর শিকার হননি তিনি। আগের বছর শ্রীলঙ্কা সফরে পাইলটকে আউট করে ৪৪৯তম উইকেট পান মুরালি, পরে তাঁর ৫০০তম শিকারে পরিণত হন মোহাম্মদ শরীফ। এই ইতিহাসগুলো জানা থাকায় একটু রসিকতার ছলেই শুভ্র মুরালিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'পাইলটের সঙ্গে তোমার কী এমন শত্রুতা?'

 অনুমিতভাবেই 'আরে না, ওটা হয়ে গেছে' জাতীয় উত্তরই দিয়েছিলেন মুরালি। কিন্তু তাঁর চোখমুখ বলছিল, পাইলটকে আউট করে এই মাইলফলক দুটি ছুঁয়েছেন বলে তাঁর মনে বাড়তি একটা তৃপ্তি কাজ করছে। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে শুভ্র জানলেন, এর আগের বছর (২০০৫ সালে) বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কা ট্যুরে মুরালির সঙ্গে পাইলটের ঝামেলার কথা। গতকাল সন্ধ্যায় শুভ্র.আলাপের অতিথি হয়ে এসে পাইলটকে তাই দিতে হলো এই প্রশ্নের উত্তরও, 'কী বলেছিলেন মুরালিকে?'

'হয়েছে কী, তখন আমাদের টিমের অবস্থা খুব খারাপ। এই ৪০ ওভারের মধ্যে মনে হয়, নয় উইকেট পড়ে গেছে। তো আমি এক সাইড থেকে ব্যাটিং করে যাচ্ছি, বল ছাড়ছি। চিন্তা ছিল, অলআউট হব না। আর যত ভালো বোলারকে খেলবেন, ততই তো শিখবেন। পরবর্তী ম্যাচে আরও ভালো করতে পারবেন। আর আমাদের দলের অবস্থাও খারাপ, আমি চিন্তা করছি, এখান থেকে টেল-এন্ডারকে নিয়ে আরও যদি দশটা রান করা যায়। তো এরই মধ্যে ও (মুরালি) এসে গালাগাল করতে শুরু করল। আমি তখন ওকে বললাম, "শোনো, তুমি কত উইকেট নিয়েছ? তোমার নাইন্টি পার্সেন্ট উইকেটই তো চাক বল করে! তুমি লিগ্যাল বল করে উইকেট নিয়েছ নাকি?"

এই যে লেগে গেল মাঠের মধ্যে, ও আম্পায়ারকে গিয়ে কমপ্লেইন করল। আমি আম্পায়ারকে বললাম, "না, ওর বিরুদ্ধে তো কমপ্লেইনই আছে। ও চাক করে।"

খুব খেপে গিয়েছিল ও। পরে অবশ্য সব ঠিকঠাক হয়ে গেছে।'

উৎপল শুভ্র পরে জানালেন, ওই ঘটনা নিয়ে 'এতদিনে মুরালির জ্বালা জুড়াল' শিরোনামে একটা কলামও লিখেছিলেন তিনি।