ঘরের এক কোণে সবুজ একজোড়া প্যাড। পাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে দুটি ব্যাট। গুছিয়ে রাখা কিট ব্যাগ, কফিন। পাশেই ড্রেসিং টেবিলের ওপর একজোড়া গ্লাভস। একটা অটোগ্রাফ-খচিত মিনিয়েচার ব্যাট। বড় বড় তিনটি ট্রফি। আলনার নিচে চার-পাঁচ জোড়া সাধারণ জুতা। পলিথিন দিয়ে জড়ানো, যাতে ধুলোবালি না পড়ে।

উল্টো দিকে ওয়ার্ডরোবের ওপরে দুটি হেলমেট। ছোট-বড় কয়েকটা ট্রফি। সংবর্ধনায় পাওয়া বিশাল একটা প্লেট। ডাবল খাটে বিছানাটা পরিপাটি। চাদরটাতে একটাও ভাঁজ নেই। মনে হচ্ছে, ঘরের বাসিন্দা কোনো কাজে বাইরে গেছেন। যেকোনো মুহূর্তে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকবেন।

আসলে কোনো দিনই আর ঢুকবেন না। বাইরেই গেছেন, তবে কাছাকাছি কোথাও নয়, এই পৃথিবীরই বাইরে। এটা মানজারুল ইসলাম রানার ঘর।

মুজগুন্নীর কাজিবাড়ি বললেই সবাই চেনে। ছিমছাম দোতলা বাড়ি। কলাপসিবল গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলে হাতের বাঁয়ে সিঁড়ি পড়ে, দোতলা হয়ে যা চলে গেছে ছাদে। সিঁড়িতে ওঠার মুখে হাতের ডানে বড় একটা ট্রফি ক্যাবিনেট। সেই

কৈশোর থেকে জেতা সব পুরস্কার ওখানে। রহস্যজনকভাবে রানার সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জনের স্বীকৃতিটাই যেখান থেকে চুরি হয়ে গেছে। ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে পরপর দুটি ওয়ানডেতে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন। ম্যান অব দ্য সিরিজও। চোর আর কিচ্ছু ছোঁয়নি। ওই তিনটা ট্রফি আর বিজয়ের স্মারক একটা স্টাম্পই শুধু ‘নাই’ হয়ে গেছে!

প্রথম আলোতে ছাপা হওয়া এই প্রতিবেদন থেকে নেওয়া হয়েছে এই ছবিটা

আজ খুলনার যে শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম টেস্ট ভেন্যু হিসেবে নাম লেখানোর অপেক্ষায়, সেই স্টেডিয়ামের খুব কাছেই ওই বাড়ি। এত কাছে যে, ছাদে উঠলে খেলা দেখা যায়। বাড়িটা নিজেই করেছিলেন রানা। তখন কি আর জানতেন, খুব বেশি দিন এতে থাকা হবে না। তাঁর স্মৃতি নিয়ে একদিন তা শহীদ মিনারের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে!

গত পরশু রাতে সেই বাড়ির গেট খুলে দিয়ে রানার বৃদ্ধা মা অস্ফুটে আর্তনাদ করে ওঠেন, ‘স্টেডিয়ামে এত আনন্দ হবে। সেসব শব্দ আমার বুকে শেল হয়ে বিঁধবে। ওর বাবা তো পালিয়ে বেঁচেছে। আমি কোথায় পালাব?’

রানার বড় দুই ভাই বাইরে থাকেন। বাড়িটা একা পাহারা দেন তাঁর মা। বয়স ৫০, তবে আরও বেশি দেখায়। চেহারা-ছবিতে কোনো বিশেষত্ব নেই। কিন্তু চোখ দুটিতে যেন বাসা বেঁধেছে এই জগতের সব বিষণ্নতা। ‘এই বাড়িতে আপনি একা থাকেন?’ ‘হ্যাঁ, একা একা কষ্ট পাহারা দিই’—বলে জামিলা খাতুন ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন।

চোখ মুছতে মুছতে দোতলায় রানার ঘরের তালা খোলেন। ভেতরে ঢুকে একেকটা জিনিসে চোখ পড়ে আর উদ্গত অশ্রু সামলাতে গায়ে জড়ানো ওড়নায় আশ্রয় খোঁজেন। ঘরটা এখনো রানারই আছে। এই ঘরে কেউ থাকে না। ঝাড়মোছ করতেই শুধু খোলা হয় তালাটা। সাজানো-গোছানো ঘরটা এমন জীবন্ত যে, কিছুক্ষণ থাকলেই কেমন যেন একটা অস্বস্তি হয়।

আমি যে সন্ধ্যায় রানার বাড়িতে গিয়েছিলাম, সেদিন দুপুরেই রানার মায়ের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন বাংলাদেশের সাবেক কোচ ডেভ হোয়াটমোর। ছবি: রতন গোমেজ

আমরা তাই নিচে ড্রয়িংরুমে নেমে আসি। সেখানে বসে রানার মা হারিয়ে যাওয়া ছোট ছেলের স্মৃতিচারণা করেন আর কাঁদেন। জাতীয় দলে প্রথম ডাক পেয়ে সবার আদরের ছোট ছেলেটা কেমন খুশি হয়েছিল, সেই কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে, ঘরের পাশের স্টেডিয়ামে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে (২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে) খেলার সুযোগ না পেয়ে কেমন ভেঙে পড়ার কথা। ‘ও ওর কষ্টের কথা কখনো আমাকে বলত না। কিন্তু সেই ম্যাচের আগের দিন মাঠ থেকে ফিরে কাঁদতে শুরু করে’—বলতে বলতে তিনিও কাঁদেন।

প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে ঘুরতে ঘুরতে ২০০৭ সালের ১৬ মার্চ তারিখটা বারবার ফিরে ফিরে আসে, যেদিন খুলনার উপকণ্ঠে ডুমুরিয়ায় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মানজারুল ইসলাম রানা ব্যাট-বল, রান-উইকেট—সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। এই পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণ উপভোগ করতে তাঁর জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ২২ বছর ৩১৬ দিন। এত কম বয়সে আর কোনো টেস্ট ক্রিকেটারের জীবনের খেলাতেই ‘স্টাম্পস’ ঘোষণা করে দেননি অদৃশ্যলোকের সেই সর্বশক্তিমান আম্পায়ার।

মানজারুল ইসলাম রানার বাংলাদেশ জার্সি হাতে রানার মা ও ডেভ হোয়াটমোর। ছবি: রতন গোমেজ

ছয়টি টেস্ট খেলেছেন, ওয়ানডে ২৫টি। ছিলেন জাতীয় দলে আবার ফেরার লড়াইয়ে। শ্রীলঙ্কা সফরের ‘এ’ দলে ডাক পেয়েছিলেন শুধু এক দিনের ম্যাচ সিরিজের জন্য। সে কথা মনে করেন আর মায়ের দুঃখ আরও বাড়ে। চার দিনের ম্যাচের জন্য নির্বাচিত দলটা রানার মৃত্যুর ঠিক আগের দিন শ্রীলঙ্কার ফ্লাইটে উঠেছে। সেই দলে সুযোগ পেলে তো রানার এমন মৃত্যু হয় না। বলেই আবার যেন স্বগতোক্তি করেন, ‘এভাবে বলা ঠিক নয়। কোরআন-হাদিসে নিষেধ আছে। বলা আছে, যার যেখানে লেখা, মৃত্যু তাকে সেখানে টেনে নেবেই।’

যে গেছে, সে তো গেছেই। বাকি জীবন দুঃখে বসতিও মেনে নিয়েছেন মা। জীবনের কাছে তাঁর এখন শুধু দুটিই চাওয়া। বাড়ির পাশের স্টেডিয়ামটার একটা গ্যালারি যেন রানার নামে করা হয়। ‘এই স্টেডিয়াম তো রানার বাপ-দাদা-চাচার জমিতেই...এখানে রানার একটা স্মৃতিচিহ্ন কেন থাকবে না!’—বলতে বলতে বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধে তাঁর মনটা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে, ‘স্টেডিয়াম কেন রাজনীতিবিদদের নামে হবে? স্টেডিয়াম হবে খেলোয়াড়দের নামে।’ শেষ দিকে আবার তাঁর কণ্ঠ ভেঙে পড়ে।

স্টেডিয়ামে রানার একটা স্মৃতিচিহ্ন চান, আর চান বাড়ির সামনের যে রাস্তাটাতে রানার মৃত্যুর পর ‘মানজারুল ইসলাম রানা সড়ক’ নামফলক উন্মোচন করেছিলেন খুলনার মেয়র, সেটির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ‘আমি যা হারিয়েছি, তা তো কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তবে এই দুটি চাওয়া পূরণ হলে তাও একটু শান্তি পাব’—বলে রানার মা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।

কান্নাভেজা সেই দৃষ্টি বুকে এসে বিঁধে।