৯ জুলাই ২০০৬, বার্লিন 

আজ ফাইনালে কে জিতবে--ফ্রান্স না ইতালি? বার্লিন অলিম্পিক স্টেডিয়ামমুখী পাতাল ট্রেনে জিজ্ঞেস করলেন জার্মান সহযাত্রী। কঠিন প্রশ্ন। ফরাসি সৌরভের মতো আমি ফরাসি ফুটবলেরও ভক্ত। কিন্তু পেশাগত স্বার্থের কথা ভাবলে যে ইতালির জয় কামনা করতে হয়। প্রথম আলোর বিশ্বকাপ ক্রোড়পত্রে 'কে জিতবে বিশ্বকাপ’ বিষয়ক লিড লেখার শিরোনাম দিয়ে এসেছি: ব্রাজিল না জিতলে কে? ইতালি?

এখানেও, ব্রাজিল বিদায় নেওয়ার রাতেই সাংবাদিক বন্ধুদের বলেছি, এবার আর ইতালির চ্যাম্পিয়ন হওয়া কেউ ঠেকাতে পারবে না। আজ ইতালি জিতলে বুক ফুলিয়ে বলতে পারি, দেখলে তো, আমি আগেই বলেছিলাম! সাংবাদিকরা তো এসব মুহূর্তের জন্যই অপেক্ষা করেন। আবার মনে হচ্ছে, জিনেদিন জিদান বিশ্বকাপটা হাতে নিয়ে বিদায় নেবেন—এর চেয়ে সুন্দর আর কী হয়! ফ্রান্স না ইতালি—এই দোলাচলে দুলতে দুলতে এক সময় হাসি পেল। নিজেই নিজেকে বললাম, ওরে মূঢ়, তোর ভাবটা এমন যে, তুই কোন দলে যাস, তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বকাপ শিরোপা! এর চেয়ে নির্ভার হয়ে মন ভরে ফাইনালটা দ্যাখ। তোর তো হারানোর কিছু নেই। ফ্রান্স জিতলে প্রিয় দলের জয়; আর ইতালি জিতলে পেশাগত জয়।

নির্ভার হয়ে খেলা দেখাটা অবশ্য একটু কঠিনই হলো। এর আগে বাংলাদেশে বেশি রাতে শুরু হওয়া ম্যাচগুলো পরদিন লিখেছি বলে একেবারেই দর্শক হয়ে দেখতে পেরেছি তা। কিন্তু ফাইনাল বলে কথা। বিশ্বকাপে এসে অন্তত প্রথম আলোর একটি সংস্করণেও ফাইনালের ম্যাচ রিপোর্ট ধরাতে না পারলে সেটি বড় দুঃখের ব্যাপার হবে। অফিসের সঙ্গে কথাও হয়েছে, নগর সংস্করণে আমার ম্যাচ রিপোর্টই যাবে। ফাইনাল ম্যাচ শেষ হওয়ার পরই তাই আমার জন্য 'আসল ম্যাচ' শুরু।

আমার ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি করে জয়টা ইতালিরই হয়েছিল। ছবি: গেটি ইমেজেস

ম্যাচ শেষ হওয়ার ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে সেটি লিখে পাঠাতে হবে—মাথায় এই চিন্তা নিয়ে খেলা উপভোগ করা যায় না। ম্যাচ নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে ধরে নিয়েই টেনশন; অতিরিক্ত সময়ে গেলে কী হবে, তা ভাবারই সাহস পাচ্ছিলাম না। যেখানে বসেছি, সেখান থেকে মিডিয়া সেন্টারে যেতেই মিনিট দশেক লাগে। সেখানে গিয়ে ল্যাপটপ খুলে গুছিয়ে বসতে বসতে আরও তিন-চার মিনিট। এমন মিনিটের হিসাবে অবাক হচ্ছেন? যেকোনো ট্যুরে সাংবাদিকের জীবন বাঁধা থাকে এই মিনিটের কাঁটায়৷ মিডিয়া সেন্টারে ঢুকলে আপনি প্রায়ই অফিসের সঙ্গে টেলিফোনে কারও না কারও কারও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের এক প্রান্তের ভাষ্য শুনতে পাবেন। হয়তো রিপোর্টারের দাবি, তিনি ৯টা ২৩ মিনিটে লেখা পাঠিয়েছেন, আর অফিস থেকে বলা হচ্ছে ৯টা ২৮। মতবিরোধের কারণটা বুঝতে পারবেন তা থেকেও।

যুদ্ধটা যেখানে মিনিট নিয়ে, তখন পৌনে এক ঘণ্টা তো এক যুগ! ৯০ মিনিটে ১-১ থেকে ফাইনাল যখন অতিরিক্ত সময়ে গেল, আমি তখন নিজেই নিজের হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছি। এখন কী হবে? ম্যাচে নয়, আমার ম্যাচ রিপোর্ট পাঠানোর। ম্যাচে কী হবে না হবে, এটি তখন আমার কাছে একেবারেই গৌণ। অতিরিক্ত সময়ের আধঘণ্টা, তাতে নিষ্পত্তি না হলে টাইব্রেকার। পৌনে এক ঘণ্টা তো লাগবেই।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে করণীয় ঠিক করতে অফিসে এসএমএস পাঠালাম, উত্তর পাওয়া গেল: ‘আপনি রিপোর্ট পাঠান, আমরা তা ধরাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করব।'

সেই রিপোর্ট লেখাটাকে মনে হলো পৃথিবীর কঠিনতম কাজ। টাইব্রেকারে জিতেছে ইতালি। এতে যে আমার খুশি হওয়ার বড় কারণ আছে, সেটি তো আগেই বলেছি (ঝড় আর ফকিরের কেরামতি মিলিয়ে প্রবাদটা আবার মনে করিয়ে দিতে হবে!)। কিন্তু ম্যাচ রিপোর্ট লিখতে বসে আমার যে অনুভূতি হচ্ছিল, সেটিকে আনন্দ-বিষাদ ক্ষোভ-দুঃখ-হতাশা-উচ্ছ্বাস কোনো প্রচলিত শব্দেই প্রকাশ করার মতো নয়। একটু আগে নিজের চোখে যা দেখেছেন, সেটি বিশ্বাস হতে না চাইলে সেই অনুভূতিকে কী বলবেন?

স্বীকার করে নিই, পুরো বিশ্বের দর্শকরা যেভাবে দেখেছেন, মাঠে থেকেও আমি ঘটনাটা প্রথম দেখেছি সেভাবেই। টেলিভিশনের পর্দায়। বল ছিল মাঠের অন্য প্রান্তে, আমার দৃষ্টিও স্বাভাবিকভাবে বলকেই অনুসরণ করছিল। রেফারি খেলা থামানোর আগেই অবশ্য মাটিতে পড়ে থাকা মাতেরাজ্জির দিকে চোখ পড়েছে। চোখ পড়েছে আমার দুই আসন পরে বসা সাংবাদিকের চিৎকারে : 'ইটস্ এক্সট্রা অর্ডিনারি। জিদান এটা কী করল! জিসাস!'

জিদান সত্যি অমন করেছেন। এত বছর ধরে ফুটবল দেখেও যে দৃশ্য দেখিনি, তা ই দেখলাম বিশ্বকাপ ফাইনালে! সেটিও কে করলেন, জিনেদিন জিদান! বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে যাঁর বীরের মতো বিদায় নেওয়ার কথা ছিল, সেই জিদানকে জীবনের শেষ ম্যাচে দেখতে হলো লাল কার্ড! তা-ও কোনো 'ফুটবলীয়' ফাউলের জন্য নয়, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে মাথা দিয়ে গুঁতিয়ে ফেলে দেওয়ার জন্য। এত দিনে যদি অ্যান্টি ক্লাইম্যাক্স শব্দটার যথাযথ প্রয়োগ হয়!

স্বীকার করে নিই, পুরো বিশ্বের দর্শকরা যেভাবে দেখেছেন, মাঠে থেকেও আমি ঘটনাটা প্রথম দেখেছি সেভাবেই। টেলিভিশনের পর্দায়। বল ছিল মাঠের অন্য প্রান্তে, আমার দৃষ্টিও স্বাভাবিকভাবে বলকেই অনুসরণ করছিল। রেফারি খেলা থামানোর আগেই অবশ্য মাটিতে পড়ে থাকা মাতেরাজ্জির দিকে চোখ পড়েছে। চোখ পড়েছে আমার দুই আসন পরে বসা সাংবাদিকের চিৎকারে : 'ইটস্ এক্সট্রা অর্ডিনারি। জিদান এটা কী করল! জিসাস!'

'এক্সট্রা অর্ডিনারি' সেই ঢুঁস! ছবি: গেটি ইমেজেস

আমার মতো বেশির ভাগ সাংবাদিকই বল দেখছিলেন। সামনে রাখা টেলিভিশন মনিটরে রিপ্লে দেখে অবিশ্বাসের একটা সম্মিলিত ধ্বনি উঠল। মাঠে তখনো রেফারিকে ঘিরে জটলা। মাতেরাজ্জি তখনো মাটিতে পড়ে। একটু দূরে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জিদান। টিভি রিপ্লে দেখার পরই জিদানের পরিণতি আমার জানা হয়ে গেছে। দর্শকরা কিন্তু তখনো কিছুই বুঝতে পারছেন না। স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে রিপ্লে দেখানো হয়নি। নিজের চোখে আর ক'জন দেখেছেন! এ কারণেই রেফারি লাল কার্ড বের করতেই নীল হয়ে থাকা ফ্রান্সের সমর্থক-গ্যালারি থেকে বিদ্রূপের শিস উঠল। সেই বিদ্রুপ জিদানকে নয়, রেফারিকে! তাদের চোখে যে তখন রেফারি আর মাতেরাজ্জিই ভিলেন। আর রেফারি-লাইন্সম্যানের কাছে বারবার ছুটে গিয়ে লাল কার্ড বের করানোয় ভূমিকা রেখেছেন বলে গোলরক্ষক বুফন পাচ্ছেন 'সহকারী ভিলেনের' মর্যাদা। এ কারণেই জিদান মাঠ ছেড়ে যাওয়ার পর ইতালিয়ান খেলোয়াড়রা বল ধরলেই যে শিস উঠছিল, বলে মাতেরাজ্জি-বুফনের ছোঁয়া লাগতেই সেটি পৌঁছাচ্ছিল সবচেয়ে উচ্চ-গ্রামে। আমি শুধু ভাবছিলাম, এই দর্শকরা পরে যখন রিপ্লেটা দেখবেন, তখন কী মনে হবে তাদের! তাদের প্রিয় জিজু কী করেছেন, নিজেদের আচরণের কথা ভেবে হয়তো তার চেয়েও বেশি অধোবদন হবেন!

শান্ত-অন্তর্মুখী-প্রচারের আলোতে অস্বচ্ছন্দ–জিদানের চরিত্রের এটি যে শুধুই একটি দিক, এটা তাঁর ক্যারিয়ারের অনুসারীদের ভালোই জানা। তবে জিদান তো এই একজনই নন। এটি তাঁর পেশাদার ক্যারিয়ারের ১৪তম লাল কার্ড, যাঁর কয়েকটি এমন সব কাণ্ড করে, যা পরিষ্কার বুঝিয়ে দেয় জিনেদিন ইয়াজিদ জিদানের মধ্যে ডক্টর জেকিল ও মিস্টার হাইড দুজনই বসত করেন। ফাইনালের আগে জিদানকে নিয়ে লেখার মাল-মসলা জোগাড় করতে ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে দেখেছিলাম, কে যেন বলেছেন, 'জিদান যখন হাসে তখন ওকে দেবশিশুর মতো লাগে; আর যখন চোখ-মুখ কুঁচকে তাকায়, তখন লাগে সিরিয়াল কিলারের মতো।' তাই বলে 'মিস্টার হাইডে'র রূপে দেখা দিতে হবে বিশ্বকাপ ফাইনালে? জীবনের শেষ ম্যাচে? পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে দু'দলই যখন মাঠে, অনুমান করার চেষ্টা করছিলাম, ড্রেসিংরুমে একা বসে জিদান তখন কী করছেন। মুহূর্তের ভুলে সব শেষ করে দেওয়ার পর অনুতপ্ত লজ্জিত-বিষণ্ণ-হতাশ জিদান কি কাঁদছেন!

মিডিয়া সেন্টারে ফিরে ল্যাপটপ সামনে নিয়ে বসে আছি। প্রতিটি মিনিটই মহামূল্যবান। অথচ ম্যাচ রিপোর্ট শুরুই করতে পারছি না। প্রথম লাইনটা লিখছি আর মুছে ফেলছি, এক স্বেচ্ছাসেবক এসে একটি কাগজ ধরিয়ে দিলেন হাতে। সাংবাদিকদের ভোটে নির্বাচিত হবেন গোল্ডেন বল বিজয়ী–বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়, সেটিরই কুপন। ফাইনাল দেখতে ঢোকার আগেই ভোট দিয়ে গেছেন অনেকে। আমি অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। মন বলে, জিনেদিন জিদান; যুক্তি বলে, ফ্যাবিও ক্যানাভারো। ফাইনালটা দেখে তার পরই সিদ্ধান্ত নিই! জিদান যা করেছেন, তাতে কি আর তাঁকে ভোট দেওয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে?

তাহলে কি ক্যানাভারো? কুপনটা হাতে নিয়ে আবার দেখলাম। তারপর ফেলে দিলাম বাস্কেটে।

(লেখকের 'বিশ্ব যখন ফুটবলময়' বই থেকে)।