জোহানেসবার্গ টেস্টে অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ব্যাটিং-তাণ্ডব দেখে তাঁর সতীর্থ জাস্টিন ল্যাঙ্গারের মনে পড়েছে স্যার গ্যারি সোবার্সের কথা। সোবার্সের ব্যাটিং সেভাবে দেখেননি, তবে এই ক্যারিবীয় অলরাউন্ডারের বিধ্বংসী স্ট্রোক প্লে বোলারদের মনোবল, স্বপ্ন--সব কিছু কেমন দুমড়ে-মুচড়ে দিত, সে সম্পর্কে অনেক শুনেছেন। বাস্তবে ব্যাপারটি কেমন হতো, সেদিন নাকি তাঁকে তারই একটা ধারণা দিয়েছেন অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। হয়তো বাঁহাতি বলেই স্যার গ্যারি সোবার্সের নামটি মনে এসেছে ল্যাঙ্গারের।

টেস্ট ক্রিকেটের ১২৫ বছরের ইতিহাসে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়ার পর অনেক প্রশস্তিগাথাই রচিত হচ্ছে গিলক্রিস্টকে নিয়ে। সেই প্রশংসার জোয়ারের মধ্যেও ল্যাঙ্গারের দেওয়া কমপ্লিমেন্টটিকে একটু আলাদা করেই রাখবেন গিলক্রিস্ট। কারণ যাঁর সঙ্গে তাঁর তুলনা করা হচ্ছে, সেই ভদ্রলোক শুধু সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারই নন, ব্যাটসম্যান হিসেবেও তাঁকে রাখতে হয় সর্বকালের সেরাদের ছোট দলে। ৯৩ টেস্টে ২৬টি সেঞ্চুরিসহ ৮০৩২ রান করা সেই গ্যারি সোবার্সের সঙ্গে তুলনা! ২১২ বলে ডাবল সেঞ্চুরির চেয়ে ‘পুরস্কার'টা অনেক বড়।

বিস্ময়ের জায়গাটা আসলে অন্যত্র। কত রথী-মহারথীর ব্যাটই না আলো ছড়িয়েছে ক্রিকেটের আঙিনায়, অথচ দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ডটি কিনা এক উইকেটকিপারের! অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ব্যাটিং দেখলে অবশ্য তাঁর পরিচয়টা 'স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবেই তিনি খেলতে পারেন' এ কথা বলার প্রয়োজন পড়ছে না, কারণ টেস্টে না হলেও ওয়ানডেতে স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেছেন অনেকগুলো ম্যাচই।

জোহানেসবার্গের সেই প্রলয়ঙ্করী ইনিংসের পরে৷ ছবি: গেটি ইমেজেস

ইয়ান হিলির সময়ে জন্মে কী ভুলই না করেছি সেই সময়ে কখনো না কখনো নিশ্চয়ই এ আক্ষেপ হয়েছে গিলক্রিস্টের। তবে সেই আক্ষেপ তাকে হতোদ্যম করতে পারেনি বরং জাগিয়ে তুলেছে আরও। হিলির কারণে এই দীর্ঘ অপেক্ষার ভালো দিকও ছিল। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে যখন প্রথম টেস্ট খেলতে নামলেন, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তখন গিলক্রিস্টের হাতের তালুর মতোই চেনা। পার্থক্য শুধু একটাই--এত দিন খেলা একদিনের ক্রিকেটের পরিবর্তে এখন টেস্ট ক্রিকেট। টেস্ট অভিষেকের আগেই খেলা হয়ে গিয়েছিল ৭৬টি ওয়ানডে। ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে সর্বোচ্চ স্কোরের রেকর্ড হয়ে গিয়েছিল তাঁর, বোলারদের আতঙ্কের প্রতিশব্দ হিসেবেও তাঁর নামটি উচ্চারিত হয়।

তবে হিলিকে সরিয়ে তাঁর ওয়ানডে দলে আসা নিয়ে হইচই হয়েছিল ভালোই। কিন্তু সেই হইচই থামাতে বেশি সময় নেননি গিলক্রিস্ট। টেস্ট আর ওয়ানডেতে ভিন্ন দল গড়তে গিয়ে মার্ক টেলর ও ইয়ান হিলির ওয়ানডে ক্যারিয়ারে যতি টেনে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলীয় নির্বাচকরা। একজন ওপেনার, অন্যজন উইকেটকিপার—বাদ পড়া দুজনের অভাব যেন একাই পূরণ করে দিলেন গিলক্রিস্ট।

টেস্ট অভিষেকের জন্য তার পরও প্রায় তিন বছর অপেক্ষা। গিলক্রিস্টের অভিষেকের সময়ও সবাই নির্দ্বিধায় তাঁর চেয়ে ভালো উইকেটকিপার বলে মানতেন হিলিকে, গিলক্রিস্ট সুযোগ পেলেন আসলে হিলির ব্যাটিং-দৈন্যের কারণেই। নির্বাচকদের কাছ থেকে শেষ কথা শোনার পর অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হিলির শেষ ১৬টি টেস্ট ইনিংসে সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ১৬। গিলক্রিস্টের তো এর চেয়ে ভালো করারই কথা। কিন্তু কতটা ভালো, তা নিয়ে সংশয় ছিলই। ওয়ানডেতে বোলারদের হাত-পা বেঁধে রাখা নানা বাধ্যবাধকতার মধ্যে রান করা মানেই তো টেস্ট ক্রিকেটে সাফল্যের গ্যারান্টি নয়। সংশয় কাটাতেও মাত্র একটি ইনিংসই লেগেছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে গিলক্রিস্টের প্রথম ইনিংসটিই ৮১ রানের। সেই ইনিংসেই বুঝিয়ে দিলেন, টেস্ট ক্রিকেটটাও তিনি তাঁর নিজস্ব নিয়মেই খেলতে চান। পাকিস্তানের বৈচিত্র্যময় বোলিং অ্যাটাকের বিপক্ষে ৮১ রান করতে ৮৮ বলের বেশি খেলতে হয়নি তাঁকে। বছর দুয়েকের সামান্য বেশি কেটেছে টেস্ট অভিষেকের পর এবং এই সময়টাতে সবাই আরও ভালোভাবে জেনে গেছে এই বাঁহাতির ব্যাটিং-অভিধানে 'আক্রমণ' ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

হোবার্টে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩৬৯ রান তাড়া করে জয় এনে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়াকে, মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই! ছবি: এএফপি

টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার যে সর্বজয়ী রূপ, তাতে বড়সড় অবদান ৭ নম্বর ব্যাটসম্যানটির। অস্ট্রেলিয়ার রেকর্ড টানা ১৬টি জয়ের প্রথমটিতেই শুধু তিনি ছিলেন না। ৫টি উইকেট ফেলে দেওয়ার পরই ফিল্ডিং সাইডের যেখানে এই টেল শুরু হলো বলে প্রত্যাশায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠাটাই নিয়ম, প্রতিপক্ষ দল অস্ট্রেলিয়া হলে ঘটনা হয় উল্টো। তখন নামেন অ্যাডাম গিলক্রিস্ট এবং বোলারদের এমনও মনে হতে থাকে, ‘পঞ্চম উইকেটটি ফেলে দিয়ে কী ভুলই না করেছি!'

গিলক্রিস্টের মাত্র দ্বিতীয় টেস্টটিই এর বড় প্রমাণ। হোবার্টে ৩৬৯ রানের টার্গেট নিয়ে খেলতে নামা অস্ট্রেলিয়ার ১২৬ রানে ৫ উইকেট নেই, বলতে গেলে জয়োৎসবই শুরু করে দিয়েছিল পাকিস্তান। অথচ টেস্ট ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ টার্গেট (এখন নেমে গিয়েছে নয় নম্বরে) চেজ করে অস্ট্রেলিয়াই জিতল। কারণটা ওই গিলক্রিস্ট, তাঁর অপরাজিত ১৪৯ রানের ইনিংস আর ল্যাঙ্গারের সঙ্গে ২৩৮ রানের পার্টনারশিপ। উদাহরণ আছে আরও। গত বছর ভারত সফরে মুম্বাইয়ে তাঁর খেলা ১২২ রানের ইনিংসটি অস্ট্রেলিয়াকে শুধু ফেরালই না, স্টিভ ওয়াহকে বলতে বাধ্য করল, টার্নিং ট্র্যাকে এর চেয়ে ভালো ইনিংস তিনি আর দেখেননি। পরের দুই টেস্টে গিলক্রিস্টের ব্যর্থতার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বিজয়রথ থেমে যাওয়ারও যোগসূত্র খুঁজে পান অনেকে। কলকাতায় 'পেয়ার' পেলেন গিলক্রিস্ট, অস্ট্রেলিয়ার হারল ষোড়শ টেস্টে এসে।

ক্রিকেটে 'জয়' ছাড়াও অন্য কোনো ব্যাপার আছে। সেই ব্যর্থতা যে নিজেকে 'মানবীয়' করার জন্য, তাঁর প্রমাণ পরের সিরিজের প্রথম টেস্টে। এজবাস্টনে অ্যাশেজ সিরিজের প্রথম টেস্টেই ১৫২ রানের যে ইনিংসটি খেললেন, তা সবাইকে পৌঁছে দিল সন্দেহাতীত একটা সিদ্ধান্তে–টেস্ট ইতিহাসে ৭ নম্বরে গিলক্রিস্টের চেয়ে ভালো কোনো ব্যাটসম্যান ব্যাট করেননি। এমন কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নয়। ২৯ টেস্টে ৫টি সেঞ্চুরি আর ১০টি হাফ সেঞ্চুরিসহ ৫৭.৩০ গড়ে ১৮৯১ রান, সেটিও আবার প্রায় ৮০ এর মতো স্ট্রাইক রেটে–উইকেটকিপিং ছেড়ে দিলেও তো গিলক্রিস্টকে দলে রাখতে হয়।

ইয়ান হিলির সঙ্গে, হিলির জায়গা নিয়েছেন বলেও দর্শকের 'দুয়ো' শুনতে হয়েছে গিলক্রিস্টকে। ছবি: গেটি ইমেজেস

তবে গিলক্রিস্টের ক্যারিয়ার শুধু এমন 'এলাম, দেখলাম, জয় করলাম'-এর গল্প নয়। আজকের এই শিখরে পৌঁছানোর পথে যত না ফুল বিছানো ছিল, তার চেয়ে বেশি ছড়িয়ে ছিল কাঁটা। রাজ্য দলে জায়গা পেতেও লড়তে হয়েছে তাঁকে। সব জায়গাতেই তাঁর পথ আগলে দাঁড়িয়ে ছিলেন কোনো না কোনো ‘হিলি'। বদল হয়েছে শুধু নামগুলো--কখনো তা ছিল ফিল এমেরি, কখনো বা তা হয়েছেন টিম জোহরার। এমেরির কারণে নিজের রাজ্য নিউ সাউথ ওয়েলস দলে উইকেটকিপার হিসেবে সুযোগই মিলছিল না, একটু-আধটু যা খেলেছেন, তা স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে।

১৯৯৪ সালের দিকে ভাগ্যান্বেষণে নিজের আজন্ম পরিচিত জায়গা ছেড়ে চলে এলেন পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায়। কিন্তু সেখানেও ছিলেন আরেকজন—টিম জোহরার। জোহরার তখন পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া দলের উইকেটকিপার, খুব সহসা তাঁর দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে—এমন ইঙ্গিতও নেই। পার্থের ক্লাব ক্রিকেটে খেলে খেলে রাজ্য নির্বাচকদের সুদৃষ্টির অপেক্ষায় তাই দিন কাটতে থাকল গিলক্রিস্টের। অবশেষে একদিন যে বদ্ধ দ্বার খুলল, তাতে কিপিংয়ের চেয়ে ব্যাটিংয়ের ভূমিকাই ছিল বেশি। কিন্তু পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে অভিষেকের শুভলগ্নটা সর্বাঙ্গ সুন্দর হতে পারল না দর্শকদের বিরূপতার কারণে। হোম-ফেবারিট জোহরার বাদ পড়ায় 'ভিলেন' গিলক্রিস্টকে বরণ করা হলো 'দুয়ো'ধ্বনি দিয়ে। তবে সেই 'দুয়ো'ধ্বনিকে জয়ধ্বনিতে রূপান্তরিত করতে বেশি সময় নেননি গিলক্রিস্ট।

টেস্ট অভিষেকের সময়ও এই ঘটনা। ব্রিসবেনে তাঁর হোমগ্রাউন্ডে শেষ টেস্টটি খেলে তারপর বিদায় নিতে চেয়েছিলেন ১১৯টি টেস্ট খেলা হিলি। নির্বাচকরা রাজি হননি, এখানেও গ্যাবায় দর্শকদের কাছে তাই গিলক্রিস্ট 'ভিলেন', সেই অনুভূতি গোপন করার চেষ্টাও করেনি তারা। তাদের জয় করতেও সময় নেননি গিলক্রিস্ট, ৮১ রানের ইনিংসটির পর সেই দর্শকরাই করতালির মালা পরিয়ে দিল তাঁর গলায়।

শুধু সেই করতালির শব্দটাই শুনলে ভুল করবেন। অ্যাডাম গিলক্রিস্টের ক্যারিয়ার শুধুই উইকেটের সামনে-পেছনে দুর্দান্ত সব কীর্তি আর করতালির গল্প নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। প্রবল বিরুদ্ধ স্রোতে সাঁতরে পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর প্রতিভার জোরে তীরে পৌঁছানোর গল্প। আর এত সাধনায় যাঁর তীরে পৌঁছানো, সেখানে তো তাঁর সৌধ গড়ারই কথা।

আরও পড়ুন: যখন টেস্ট খেলাটা তাঁর স্বপ্ন ছিল, সেই সময়ের গিলক্রিস্টের সাক্ষাৎকার