সাদা রঙের ১০ নম্বর জার্সিটা এখনো ঝুলছে। রোম থেকে কয়েক কিলোমিটার আগে হাইওয়ের পাশে ডিভাইন লাভ নামের চার্চটিতে। ফ্রেমে বাঁধানো জার্সিটি ঘাম-থুতুতে মাখামাখি। পাশেই ছোট্ট একটা নোট=‘আমি ক্ষমা চাই। মোস্ট হোলি ভার্জিন অব ডিভাইন লাভ, আমাকে কখনো পরিত্যাগ কোরো না। ফ্রান্সেসকো।’

আগামীকাল রাতেই জার্সিটি নামিয়ে ফেলা হতে পারে। যদি ইতালি বিশ্বকাপ জেতে! যদি ফ্রান্সেসকো টট্টি বিশ্বকাপ জেতেন! দুই বছর পর টট্টি তখন শান্তিতে ঘুমোবেন। ২০০৪ সালের ১৪ জুলাইয়ের পর থেকে যে ঘুমের মধ্যেও তাঁকে তাড়া করছে ওই দুঃস্বপ্ন।

২০০৪ সালের ১৪ জুলাই ওই জার্সিটি পরেছিলেন টট্টি। পর্তুগালে ইউরো ২০০৪-এ ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচে। ম্যাচ শেষে ডেনমার্কের এক টিভি কোম্পানি ম্যাচের ছবি এডিট করতে গিয়ে আবিষ্কার করে ঘটনাটি। ডেনমার্কের ক্রিস্টিয়ান পোলসেনের গায়ে থুতু দিচ্ছেন টট্টি। একবার নয়, তিন-তিনবার। সেই ভিডিও দেখেই টট্টিকে তিন ম্যাচের জন্য সাসপেন্ড করা হয়। এরপর টট্টির জীবনে যা নেমে আসে, সেটিই আসল শাস্তি। ডেনমার্কের এক পত্রিকা তাঁর নাম দিয়ে দেয়,‘দ্য স্পিটিং ক্যামেল’। থুতু ফেলা উট। উটের মতোই যাঁর যখন-তখন থুতু ফেলার অভ্যাস।

 পুরো ইতালি লজ্জায় ডুবে যায়। তিনি টট্টি বলেই। কারণটা লেখে এক ইতালিয়ান পত্রিকা, ‘টট্টি তো শুধুই একজন খেলোয়াড় নয়। টট্টি হলো ইতালি।’ শুধুই একজন ফুটবলার নন, টট্টি ইতালিয়ান পুরুষের প্রতীক। তাঁর চেহারা, সুগঠিত শরীর—সব মিলিয়ে টট্টির পরিচয়‘দ্য লাস্ট অব দ্য গ্ল্যাডিয়েটরস’।

ইউরো ২০০৪-এর আগে ২০০২ বিশ্বকাপ। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে পেনাল্টি বক্সে ডাইভ দেওয়ার অপরাধে লাল কার্ড দেখেছিলেন টট্টি। এ কেমন গ্ল্যাডিয়েটর! গ্ল্যাডিয়েটরের তো এমন কাজ সাজে না। থুতু দেওয়ার ওই ঘটনার পর টট্টি প্রথমে বলেন,‘ভিডিওতে যাঁকে দেখা যাচ্ছে, সে টট্টি নয়। অন্য কেউ।’পরে অনুতপ্ত হয়ে এক যাজকের কাছে গিয়ে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তাঁকে কথা দেন, তিনি পরিশুদ্ধ হবেন। বিশ্বকাপ জিতে।

ওই ঘটনার পর থেকে বলতে গেলে ইন্টারভিউই দেননি। এড়িয়ে চলেছেন টেলিভিশন ক্যামেরা। মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছেন‘পরিশুদ্ধ হওয়া’নিশ্চিত করতে। অসাধারণ খেলেছেন সিরি‘এ’-তে, বলতে গেলে রোমাকে একাই টেনে তুলেছেন পয়েন্ট টেবিলের তলানি থেকে। জিতিয়েছেন টানা ১০ ম্যাচ। এরপরই পুরো ইতালিকে উৎকণ্ঠায় ডুবিয়ে দিয়ে পায়ে চোট পেয়ে বসেন। ফেব্রুয়ারিতে অ্যাঙ্কেল ভেঙে ফেলার পর ডাক্তাররা বলে দেন, সেরে উঠতে ১০০ দিন লাগবে। বিশ্বকাপ তখন ১১৩ দিন দূরে। দেশজুড়ে হাহাকার। ইতালিকে কে জেতাবে বিশ্বকাপ!

টট্টিকে হাসপাতালে দেখতে যান সিলভিও বার্লুসকোনি। সেই বার্লুসকোনি, চাইলেই যিনি যেকোনো খেলোয়াড়কে এসি মিলানে নিয়ে আসতে পারেন। শুধু টট্টিকে পারেননি। গল্প চালু আছে, এক গ্রীষ্মকালীন অবকাশে দশ মাস বয়সী টট্টির হাত থেকে কেউ বল কেড়ে নিতে পারেনি। পাঁচ বছর বয়সে জেতেন প্রথম ট্রফি। নয় বছর বয়সে গ্যালারিতে বসা টট্টি মাঠ থেকে উড়ে আসা বল হেড করে যেখান থেকে এসেছিল, ঠিক সেখানে ফেরত পাঠান।

রোমের ছেলে, রোমাতে খেলাই ছিল নিয়তি-নির্ধারিত। তবে বার্লুসকোনির চোখ পড়েছিল অনেক আগে থেকেই। অনেক লোভ দেখিয়েও কাজ হয়নি। ১৩ বছর ধরে রোমায়ই খেলে যাচ্ছেন টট্টি। একবার বার্লুসকোনি এসি মিলানের কর্তাদের বলেন,‘যেভাবে হোক, আমার নেস্তা আর টট্টিকে চাই।’নেস্তা কথা বলতে যান। টট্টি যাননি।

শুধু রোমের মায়ায়ই নয়, মায়ের জন্যও। যতবারই ট্রান্সফার মার্কেটে টট্টির নাম উড়েছে, মা ফিওরেলা বলে দিয়েছেন,‘ফ্রান্সেসকো রোম থেকে এক ইঞ্চিও নড়বে না।’বলেছেন, ‘আমি জানি না খাবার-বাতাস-জল ছাড়া আমি কতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারব! তবে এটা জানি, ফ্রান্সেসকোকে ছাড়া এক মিনিটও বাঁচব না।’

বিজ্ঞাপন জগতে বিপুল চাহিদা। প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো পত্রিকার প্রচ্ছদে তাঁর ছবি। সব সময়ই ছায়াসঙ্গী মা। বিয়ে করার পর থেকে আলাদা থাকেন। তবে পাশের ফ্ল্যাটেই মা।‘মায়ের ছেলে’, আবার ইতালির সবচেয়ে রমণীমোহন পুরুষও। ২০০৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগে লেভারকুসেনের বিপক্ষে ম্যাচে জয় উদযাপন করেছিলেন জার্সি-শর্টস খুলে। পরনে ছিল শুধু হলুদ রঙের স্কিনটাইট আন্ডারওয়্যার। শুধুই একটি ক্লাবকে নিয়ে পত্রিকা কেবল রোমারই আছে। সেই রাতের পর থেকে‘ইল রোমানিস্তা’র পাঠকসংখ্যার অর্ধেক মেয়ে!

কাল যখন ফাইনালে খেলতে নামবেন, এসব কিছুই মনে থাকবে না। ফ্রান্সেসকো টট্টির চোখে ভাসবে শুধুই একটা সাদা জার্সি। ডিভাইন লাভ-এ এখনো ঝুলছে। ওটা নামিয়ে ফেলতে হবে। পরিশুদ্ধ হতে হবে।

টট্টির জন্য এটি পাপমোচনের বিশ্বকাপ। পরিশুদ্ধ হওয়ার বিশ্বকাপ।