ক্রিকেট বঞ্চিত করেছে, জীবনও

উৎপল শুভ্র

১২ জুন ২০২১

ক্রিকেট বঞ্চিত করেছে, জীবনও

ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম ৭ উইকেট নেওয়ার কীর্তি যাঁর, সেই উইনস্টন ডেভিসের সার্বক্ষণিক সঙ্গী এখন হুইল চেয়ার। কেন, কীভাবে এই অবস্থা হলো সাবেক এই ক্যারিবিয়ান ফাস্ট বোলারের? উইনস্টন ডেভিসের মুখেই সেই মর্মান্তিক কাহিনি শুনেছেন উৎপল শুভ্র।

প্রথম প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০০৯। প্রথম আলো।

উইনস্টন ডেভিস নামটা আপনি শুনলেও শুনে থাকতে পারেন। খেলার পাতায় এই লেখা যখন পড়ছেন, আপনাকে ক্রীড়ানুরাগীই ধরে নেওয়া যায়। তাহলে তো অবশ্যই শুনেছেন নামটি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাবেক ফাস্ট বোলার, বিশ্বকাপ এলে যাঁর নামটি অবশ্য অবশ্যই উচ্চারিত হয়।

উইনস্টন ডেভিসের সবচেয়ে বড় কীর্তিটা যে বিশ্বকাপেই। ১৯৮৩ বিশ্বকাপে হেডিংলিতে ৫১ রানে ৭ উইকেট নিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডকে। ওয়ানডেতে প্রথম ৭ উইকেট নেওয়ার কীর্তি, সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড হিসেবে যা টিকে ছিল আট বছর। বিশ্বকাপে সেরা বোলিংয়ের রেকর্ড হয়ে ছিল আরও বেশি দিন। ২০০৩ বিশ্বকাপে গ্লেন ম্যাকগ্রা ভেঙেছেন সেই রেকর্ড। উইকেট ৭টিই, শুধু রান দিয়েছেন ৩৬ কম (বিপক্ষ নামিবিয়া)।

সেই উইনস্টন ডেভিসকে এখন দেখলে আপনার কী যে মায়া লাগবে! এমন প্রাণোচ্ছল এক ক্রিকেটার ছিলেন, ছন্দে থাকার দিনে বলে গতির ঝড় তোলায় কারও চেয়ে কম যেতেন না, অথচ এখন তিনি হুইলচেয়ারে বন্দী!

বন্দী আজ প্রায় ১১ বছর ধরে। সেটিও হৃদয়বিদারক এক দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে। সেন্ট ভিনসেন্টে তাঁর নিজের বাড়িতে গাছে উঠেছিলেন বাড়ির চালে চলে আসা একটা ডাল কাটতে। গাছ থেকে পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ডে এমন চোট পেলেন যে ঘাড় থেকে শরীরের নিচের অংশ সঙ্গে সঙ্গেই নিঃসাড় হয়ে গেল। নিজের টাকা-পয়সা তেমন ছিল না, শুভানুধ্যায়ীরা কাজে নামলেন। গ্ল্যামরগন ও নর্দাম্পটনশায়ারের হয়ে দীর্ঘদিন কাউন্টিতে খেলেছেন, ইংল্যান্ডেও তাই তাঁর জন্য চ্যারিটি ম্যাচ আয়োজিত হলো। কিন্তু আমেরিকা-ইংল্যান্ড কোথাও চিকিৎসা করেও কোনো কাজ হলো না। উইনস্টন ডেভিস এখনো হুইলচেয়ারেই।

লেখার সঙ্গে ছবিটা যদি এরই মধ্যে দেখে ফেলে থাকেন, উইনস্টন ডেভিসের বর্তমান দশাও আপনার জানা হয়ে গেছে। হাত-পাগুলো শুকিয়ে কাঠি হয়ে গেছে, মুখটাও আগের চেয়ে ছোট—তার পরও উইনস্টন ডেভিস একটা আশা নিয়েই বেঁচে থাকছেন, ‘আমার বিশ্বাস, আমি একদিন আবার হাঁটতে পারব।’অনেক বছর ধরে হুইল চেয়ারেই বন্দি উইনস্টন ডেভিস। ছবি: উৎপল শুভ্র

চিকিৎসার সুবিধার জন্য ওই দুর্ঘটনার পর থেকে ইংল্যান্ডেই থাকেন। উস্টার আর বার্মিংহামের মাঝামাঝি কী একটা জায়গায়। বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্টের সময় এসেছিলেন সেন্ট ভিনসেন্টে। খেলা দেখতে নয়, মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে। সেন্ট ভিনসেন্টে মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচটা এর সঙ্গে মিলে যাওয়ায় পাঁচ দিনের তিন দিনই তিনি মাঠে।

মাচো ফাস্ট বোলার ছিলেন। গাছ থেকে পড়ে যাওয়াটা অপমানজনক মনে হয় বলেই কি না, আসলে কী ঘটেছিল তা ব্যাখ্যা করাটা খুব জরুরি মনে হলো তাঁর। সেই ব্যাখ্যা হলো—যে ডালটা কেটেছিলেন, সেটি আরেকটা ডালে বাড়ি খেয়ে তাঁকে বাড়ি দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। এমন উঁচু কোনো গাছ ছিল না। কিন্তু উইনস্টন ডেভিসের কপাল যে খারাপ!

আমেরিকার ডাক্তার তাঁর ঘাড় আর মেরুদণ্ডের অবস্থা দেখে রীতিমতো অবাক। ‘গাছ থেকে পড়েছি, ডাক্তার এটা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। বললেন, এক শ ফুট ওপর থেকে পড়লেও তো এমন ইনজুরি হয় না’—বলার পর ডেভিস নিজেই যেন নিজেকে বললেন, ‘আমি আর মন খারাপ করি না। ঈশ্বর আছেন, তিনি কী কারণে কী করেন আমরা কি আর সব সময় তা বুঝি!’

ঈশ্বরের এত কাজ থাকতে একজন তরতাজা মানুষকে এমন পঙ্গু বানিয়ে দেওয়ায় কেন তৎপর হতে হবে, এ প্রশ্ন নিশ্চয়ই উইনস্টন ডেভিসের মনেও জাগে। সেটি নিয়ে পড়ে থাকলে যন্ত্রণা যে আরও বাড়বে। হয়তো এ কারণেই ‘ঈশ্বরের লীলা’য় সান্ত্বনা খোঁজেন।

তিরাশিতে অভিষেক, শেষ আটাশিতে—টেস্ট খেলেছেন মাত্র ১৫টি। জন্মটা যে ভুল সময়ে হয়েছিল! ওয়েস্ট ইন্ডিজে তখন নারকেল আর ফাস্ট বোলারের সংখ্যা প্রায় সমান। তাঁর সম্পর্কে যেকোনো লেখায় এই কথাটা পাবেনই পাবেন—ওই সময়ের ওয়েস্ট ইন্ডিজের বদলে অন্য যেকোনো দেশে জন্মালে উইনস্টন ডেভিস হয়তো সে দেশের মূল বোলার হয়ে যেতেন। কথাটা বললাম তাঁকে খুশি করতে। কিন্তু ডেভিসের তাতে তীব্র আপত্তি, ‘একদম বাজে কথা। ওই সময়েও আমার যোগ্যতা ছিল আরও বেশি টেস্ট খেলার।’ খেলতে না পারার কারণ মনে করেন একটাই—সেন্ট ভিনসেন্টের মতো ছোট দ্বীপগুলোর ক্রিকেটারদের প্রতি ‘চিরকালের বৈষম্য’।

ক্লাইভ লয়েডের ওপর এখনো খুব রাগ। ‘শুনবেন, ও আমার সঙ্গে কী করেছিল? একবার জোয়েল গার্নার আনফিট। নির্বাচকেরা আমাকে নেবেন বলে ঠিক করেছেন। আর লয়েডই ওদের বলল, আনফিট গার্নারও আমার কাছে ফিট উইনস্টন ডেভিসের চেয়ে ভালো।’

শরীরের এমন অবস্থায় যতটা উত্তেজিত হওয়া সম্ভব, তা হয়ে ১৯৮৫ সালের আরেকটা ঘটনাও বললেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল শারজা যাবে, উইনস্টন ডেভিসও যাবেন বলে সব ঠিকঠাক। ‌‘একদিন প্র্যাকটিসে লয়েড আমাকে বলল, “তোমাকে তো নেওয়া হবে না। অন্য একজন যাবে।” সেই অন্য একজন ছিল প্যাট্রিক প্যাটারসন। আমি পেশাদার ক্রিকেটার, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে থাকব না জেনে তাসমানিয়ায় খেলতে গেলাম। এটাকেও আমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হলো। আমার নাকি ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে খেলার গর্ববোধটাই নেই।’

ছোট্ট আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। তার পরও হেডিংলির ওই একটি দিনের কারণে ক্রিকেট ইতিহাসে অমর। কী মনে হয় সেই দিনটির দিকে ফিরে তাকালে? এতক্ষণ ফুটে থাকা তিক্ততা মুছে গিয়ে এবার ডেভিসের মুখে আলো, ‌‘প্রথমেই যা মনে হয়, ওই ম্যাচে আমার খেলারই কথা ছিল না। ম্যাচের দিন সকালে আমাকে লয়েডি বলল, ‘ডাভো (ডেভিসের সংক্ষিপ্ত রূপ) ম্যালকম অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তুমি খেলবে’।'

উইনস্টন ডেভিস। যখন খেলতেন ইংলিশ কাউন্টিতে। ছবি: গেটি ইমেজেস

ডেভিসের ক্যারিয়ারে দুবার এমন হয়েছে। ম্যালকম মার্শাল শেষ মুহূর্তে অসুস্থ হয়ে পড়ায় খেলার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। পেছনে তাকিয়ে এখন ডেভিস বুঝতে পারেন, যে কোলন ক্যান্সার ১৯৯৯ সালে মাত্র ৪১ বছর বয়সেই নিয়ে গেল ম্যালকম মার্শালকে, সেটি আসলে অনেক আগে থেকেই কুরে কুরে খাচ্ছিল তাঁকে। ‘এখন বুঝি, ওই ১৯৮৫ সাল থেকেই ম্যালকম ভুগছিল। তারুণ্যের জোরে সব অগ্রাহ্য করে ও খেলে গেছে।’

বিশ্বকাপের ওই ম্যাচে ডেভিসের বোলিংয়ে পরিষ্কার দুটি ভাগ। দারুণ আগ্রহ নিয়ে যেটির বিস্তারিত বললেন ডেভিস, ‘প্রথম ৫ ওভারে (ডেভিড) হুকস আর (কিম) হিউজ তো আমাকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিয়েছিল। ওই ৫ ওভারে দিয়েছিলাম ৩৫ রান। হেডিংলির রানআপের জায়গাটা একটু উঁচু ঢালের মতো, মানিয়ে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। একবার মানিয়ে নেওয়ার পর হেডিংলির ওই সিমিং উইকেটে আর কেউ আমাকে খেলতে পারেনি। ৭ উইকেট তো পেয়েছিলাম ১৬ রান দিয়ে।’
টেস্টে তাঁর সেরা বোলিং ১৯ রানে ৪ উইকেট, ক্যারিয়ারের দ্রুততম স্পেলটি করেছিলেন ব্রিজটাউনে, টেস্টে ৭৭ রানের একটা ইনিংসও আছে—হড়বড় করে কথাগুলো বলে গেলেন উইনস্টন ডেভিস।

হুইলচেয়ারে বন্দিজীবনে ওই স্মৃতিগুলোই তো এখন অবলম্বন। স্থবির হয়ে থাকা উইনস্টন ডেভিসের দিন-রাতে স্মৃতিগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে আর তাঁর চোখে ভাসে, লম্বা রানআপের শেষ প্রান্ত থেকে দৌড়ে আসছে ছিপছিপে এক কৃষ্ণবর্ণ যুবক। চোখ দুটি কি ভিজে ওঠে?

আহা, আমি একদিন অমন দৌড়াতেও পারতাম!

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
Add
Ispahani Mirzapore Tea
×