সোবার্সের চোখে তিন ডব্লিউকে দেখা

সোবার্সের চোখে তিন ডব্লিউকে দেখা

ওয়েস্ট ইন্ডিজের থ্রি ডব্লিউ`র শেষজনও চলে গেছেন এক বছরের বেশি হতে চলল। তাঁদের নিয়ে যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের আরেক গ্রেট স্যার গ্যারি সোবার্স স্মৃতিচারণা করেন, তা আগ্রহ জাগাতে বাধ্য। উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালম্যানাকের সর্বশেষ সংখ্যা থেকে স্যার গ্যারির মুখে থ্রি ডব্লিউসের গল্প শোনার আমন্ত্রণ।

সালটা ১৯৫০। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন ইংল্যান্ড সফরে, সিরিজ শেষে যে সফরটা ক্রিকেট ইতিহাসেরই এক গুরুত্বপূর্ণ পাতা হয়ে গেছে। ১৩ বছর বয়সী আমি প্রতিদিন সকাল সাতটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়তাম ব্রিজটাউনের বে স্ট্রিট বয়েজ  স্কুলের উদ্দেশে; আসলে তো স্কুলে যাওয়ার জন্যে না, ওই সাতসকালে বেরোনোর আসল কারণ ছিল খেলার ধারাবিবরণী শোনা। জানেন নিশ্চয়ই, বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বাবাকে হারিয়েছিলাম আমি। যুদ্ধের দায় অবশ্য নেই, বাবা ছিলেন সামুদ্রিক মাছ শিকারি, মাছ ধরতে গিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে সাগরেই বিলীন হয়ে যান তিনি। তখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ, একাকী মায়ের সংসার চালিয়ে রেডিও কেনার সামর্থ্য হয়নি। আমাকে তাই খেলা শোনার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে কিংবা জানালায় জানালায় ঘুরে উৎকীর্ণ কর্ণযুগল পেতে রাখতে হতো; ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না ওই মানুষগুলো আমাকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে না দিতেন।

লর্ডসের সেই বিখ্যাত জয়টার কথা মনে আছে আমার। ইংল্যান্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেটাই প্রথম জয়, প্রথম সিরিজ জয়ও সেবারই। জয়ের দুই নায়ক সনি রামাধিন আর আলফ ভ্যালেন্টাইন তো পরে অমরত্বই পেয়ে গেলেন ক্যালিপসোতে। আমার শৈশবের নায়ক ফ্র‍্যাঙ্ক ওরেল, ক্লাইড ওয়ালকট আর এভার্টন উইকসের ব্যাটিং বীরত্ব ইংরেজ ধারাভাষ্যকাররা যেভাবে বিবৃত করেছিলেন, আমার কানে তা এখনো বাজে।

মনে আছে, ধারাভাষ্যকার বলছিলেন, ওরেল এতটাই মাপা শট খেলতেন যে, পুরোটা পথ বলের পিছু ধাওয়া করতে হতো ফিল্ডারকে, আর গিয়ে বলটা সীমানার বাইরে থেকেই কুড়িয়ে আনতে হতো। ওয়ালকটের গায়ে আবার ছিল আসুরিক শক্তি। এত জোরে বল মারতেন, ফিল্ডাররা ভয়েই বলের লাইন থেকে হাত সরিয়ে নিতেন। উইকসের শক্তি ছিল চপল পা, আয়েসি ভঙিতে খেলা শটগুলো দেখতেও ছিল নান্দনিক। ফিল্ডাররা ঠায় দাঁড়িয়ে হাততালিই দিতে পারতেন কেবল। পরে জেনেছি, ওই কথাগুলো যিনি বলতেন, তিনি জন আর্লট। আমার মনে তাঁর ওই গলা চিরস্থায়ী ছাপই রেখে গেছে, কয়েক বছর পর আমি নিজেই তাঁকে আমার মুগ্ধতার কথা জানানোর সুযোগ পেয়েছিলাম।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের থ্রি ডব্লিউস। ছবি: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

আমার মতোই ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের 'থ্রি ডব্লিউস'-এর জন্মও বারবাডোজের সেন্ট মাইকেল গীর্জার যাজকপল্লীতে। তবে চার বছর বাদে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে খেলতে শুরু করার আগে তাঁদের কারও সঙ্গেই পরিচিত হতে পারিনি আমি। তাঁরা তো ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে কিংবা ল্যাঙ্কাশায়ার লিগে খেলতে বেশির ভাগ সময় দ্বীপের বাইরে বাইরেই থাকতেন। তাঁদের কারও বিপক্ষ দলেও খেলার সুযোগ হয়নি, কারণ ততদিনে ডেনিস অ্যাটকিনসন-- পরবর্তীতে যিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে আমার অধিনায়ক ছিলেন, আমাকে পুলিশ দলে টেনে নিয়ে গেছেন। তবে তাঁদের ওপর আমার ঈগলের চোখ সব সময়ই থাকত, যে কারণে তাঁরা যখন তাঁদের ক্লাবের হয়ে ওয়ান্ডারার্স গ্রাউন্ডে খেলতে নামতেন, আমি স্কোরারের কাজ করতাম; যেন তাঁদের সবাইকেই ভালো করে দেখার আর শেখার সুযোগ পাই।

১৩/১৪ বছর বয়সেই আমি বয়সে বেশ বড় ক্রিকেটারদের বিপক্ষে খেলে কিছুটা নাম করেছিলাম বারবাডোজের ক্রিকেট-মহলে। ক্যারিবিয়ানে সফররত ভারত দলের বিপক্ষে যখন আমাকে নামিয়ে দেওয়া হয়, তখন আমি ১৬। এবং এর বছর খানেক পরই বার্তা আসে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের পঞ্চম টেস্ট খেলতে আমাকে পত্রপাঠ জ্যামাইকার উদ্দেশে রওনা হতে হবে। তখনো প্রতি সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে গলিতে শৌখিন ক্রিকেট খেলার অভ্যাস থেকে বেরোতে পারিনি আমি।

ডাক পেয়ে স্বভাবতই অভিভূত হয়েছিলাম। দু/তিনদিন পর যখন স্যাবাইনা পার্কে গিয়ে পৌঁছাই আমি, দেখি, খেলোয়াড়রা অনুশীলন করছেন। ড্রেসিংরুমে গিয়ে পড়ি ওরেল, উইকস, ওয়ালকটের সামনে; সেখানে তখন কিংবদন্তি জর্জ হেডলিও বসে। এত রথী-মহারথীর মাঝে নিজেকে দেখে গায়ে চিমটি কেটেই বলতে হচ্ছিল, 'বৎস, সত্যিই তুমি এই পর্যন্ত এসেছ।'

ভ্যালেন্টাইন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে ডাক পড়েছিল আমার, যে নয় নম্বরে ব্যাট করতে নামবে। ইংল্যান্ডের প্রথম ইনিংসে চার উইকেট পেয়েছিলাম আমি, তবে লেন হাটনের ডাবল সেঞ্চুরিতে ইংল্যান্ড সহজেই জিতেছিল ম্যাচটা। সবাই আমার বেশ তারিফও করেছিল তখন। তবে ব্যাটসম্যান হিসেবে আমার সামর্থ্য তখনো কেউ অনুধাবনই করতে পারেনি। পরের বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় টেস্টে ওপেন করতে বলা হলো আমাকে, যদিও তখনকার অধিনায়ক জেফ স্টলমেয়ার অসাবধানতাবশত বলের ওপর পা ফেলে গোড়ালি মচকে ফেলেছিলেন বলে বাধ্য হয়েই। পরে আমি শুনেছি, সত্যি বলতে বিশ্বাসও করেছি, অস্ট্রেলিয়ার রে লিন্ডওয়াল আর কিথ মিলারের মুখোমুখি হতে চাইছিলেন না হলে স্টলমেয়ার ইনজুরির নাটক সাজিয়েছিলেন।

ওপেন করতে নেমে আমার মনে হচ্ছিল, আমি ঠিক উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান নই; তাই ওপেনারের মতো করে আমি খেলব না। গার্ড নিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখতে পাই, বোলার কিথ মিলার ছাড়া আর কেউ নেই। নিজেকে অভয়বাণী শোনাই এই বলে, 'পেছনে তাকিও না। চোখের সামনে লাল কিছু দেখামাত্র ব্যাট চালিয়ে দেবে।' কথামতোই কাজ করেছিলাম, তাঁর প্রথম ওভারেই ৪টা চার মেরেছিলাম আমি। তারপর ইয়ান জনসন বল করতে এসেছিলেন, তাঁর বলে সুইপ করতে গিয়ে ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে ক্যাচ দিয়ে প্যাভিলিয়নে ফিরি ৪৩ রানে।

এরপর আমাকে আর ৯ নম্বরে ব্যাট করতে হয়নি, তবে আমি জানতাম, আমাকে আরও অনেক কিছু শিখতে হবে। আমি সব সময়ই বলি, আমাকে আবিষ্কার করা থেকে শুরু করে অ্যাটকিনসনই আমার পুরো পথটা তৈরি করে দিয়েছেন, মাঝেমাঝে তো মাঠকর্মী পাঠিয়ে আমাকে ঘর থেকেও ডেকে নিয়ে যেতেন যেন আমি তাঁকে বল করতে পারি। তবে ফ্র‍্যাঙ্ক, ক্লাইড আর এভার্টনও আমাকে কম সাহায্য করেননি।

কিছু কিছু জায়গা আছে, যেখানে দলের সিনিয়র খেলোয়াড়েরা জুনিয়রদের দেখতে চায় না। তবে আমার সঙ্গে তাঁরা তিনজন মোটেই সেরকম করতেন না। ক্রিকেট ইতিহাস যত সুমহান উচ্চতাতেই তাঁরা থাকুন না কেন, সব সময়ই আমাদের জন্য তাঁদের সময় ছিল।

যখন র‍্যাডক্লিফের হয়ে সেন্ট্রাল ল্যাঙ্কাশায়ার লিগে আমি খেলার সুযোগ পাই, ফ্র‍্যাঙ্ককে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। কাছাকাছিই থাকতেন বলে তাঁর বাড়িতে গিয়ে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় আর উইকেটের ব্যাপারে তথ্য আর পরামর্শ নেওয়ার চেষ্টা করতাম আমি। এমনই একজন ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অলরাউন্ডার সেক পিপার, তখনকার দিনে ফ্লিপার দিতে সক্ষম একমাত্র বোলার। আমি যেবার প্রথমবার তাঁর মুখোমুখি হই, বেশ ভালোই ব্যাট করেছিলাম, তবে তাঁর একটা শর্ট বলে আচমকাই খেই হারিয়ে ফেলি। বলটায় পুল শট প্রায় খেলেই ফেলেছি, তখন তাঁর ফ্লিপার সম্পর্কে ফ্র‍্যাঙ্ক ওরেলের কথাটা মনে পড়ে আমার। সাত তাড়াতাড়ি ব্যাট নামিয়ে নিই আমি। কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি, বলটাও ব্যাটে লেগে মাটিতেই পড়েছিল। তির্যক কথাবার্তার জন্যে সেকের বেশ নামডাক ছিল, আমার কাছে রাগে গজরাতে গজরাতে এসে তিনি বললেন, 'ওরেলের সঙ্গে কথা বলে এসেছ, না?' অবিকল এই কথাগুলো না হলেও এরকমই কিছু একটা বলেছিলেন তিনি।

বাঁয়ে উইকস, ডানে সোবার্স, মাঝে ওয়েস হল। ভেন্যু থ্রি ডব্লিউস ওভাল। ছবি: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

কীভাবে উপার্জন বাড়াতে পারি, ফ্র‍্যাঙ্ক আমাকে সে ব্যাপারেও পরামর্শ দিয়েছিলেন। লিগে পুরো মৌসুম খেলে ৫০০ পাউন্ড পেতাম, তা দিয়েই থাকা-পরা-সুস্থ থাকার যোগাড়যন্ত্র করতে হতো আমাকে। তবে পেশাদার ক্রিকেটারদের সামনে ৫০ রান করে বাড়তি অর্থ আয়ের সুযোগ ছিল, একটা বাক্স পুরো মাঠ ঘুরে ঘুরে পেনি, শিলিং এমনকি পাউন্ডও জমা করে দিত ক্রিকেটারদের নামে। তবে আউট হয়ে গেলেই শেষ। যে কারণে ফ্র‍্যাঙ্ক আমার মধ্যে গেঁথে দিয়েছিলেন, 'শেষ পেনিটা বাক্সে না পড়া পর্যন্ত আউট হবে না।' ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটেও তাঁর অসামান্য প্রভাব ছিল, তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক মনোনীত হয়েছিলাম বলে আমি বেশ গর্বিতও বোধ করি।

পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৯৫৮ সালে যখন আমি ৩৬৫ করি, তখন ক্রিজে ক্লাইড আমাকে সঙ্গ দিচ্ছিল বলেও নিজেকে সৌভাগ্যবান মানি আমি। উইকেটে নেমেই তিনি আমাকে বলেছিলেন, 'রান করতে থাকো, তোমাকে ব্যাটিং প্রান্তে রাখার সব চেষ্টাই আমি করব।' তখন আমি এই কথাটাই শুনতে চাইছিলাম আর তিনিও তাঁর কথা রেখেছিলেন। ইনিংস শেষে নিজে অপরাজিত রয়ে গিয়েছিলেন ৮৮ রানে।

অন্যদিকে এভার্টন ছিলেন চিরকালীন বন্ধু। একসঙ্গে পুরো বিশ্বই ঘুরে বেরিয়েছি আমরা। বারবাডোজে একসাথে কত ব্রিজ আর ডমিনোস ম্যাচ যে খেলেছি! কেনসিংটন প্যাভিলিয়নের ছাদে বসে তাঁর সঙ্গে ম্যাচ দেখাটাও আমি উপভোগ করতাম। খুব খুব ভালো ছিলেন মানুষ তিনি, বেশ আমুদে চরিত্র।

এখন তাঁরা তিনজনই অন্যলোকের বাসিন্দা। ১৯৬৭ সালে লিউকেমিয়ার শিকার হয়ে ওরেল পৃথিবী ছেড়েছিলেন মাত্র ৪২ বছর বয়সে; ক্লাইড মারা গিয়েছেন ২০০৬ সালে, আর উইকস তো গত বছরই। মারা গেলেও তাঁদের কখনো ভুলে যাওয়া যাবে না। কথাটা শুধু ক্যারিবিয়ানে নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্যই সত্য। শুধু তো গ্রেট ক্রিকেটার আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের দূতই ছিলেন না, তিনজনই দুর্দান্ত মানুষ ছিলেন।

* 'উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালামনাক' থেকে ভাষান্তর: রিজওয়ান রেহমান সাদিদ

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন