স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে যে রাতে ক্রিকেট হয়েছিল!

উৎপলশুভ্রডটকম

২৪ আগস্ট ২০২১

স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে যে রাতে ক্রিকেট হয়েছিল!

স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের ফ্লাডলাইট জ্বলছে ক্রিকেটের জন্য

দিবা-রাত্রির ক্রিকেট ম্যাচ অনেক দিনই ডালভাত হয়ে গেছে। কিন্তু এক সময় এটাই ছিল বিরাট ব্যাপার। কৃত্রিম আলোতে ক্রিকেট আয়োজন করার হ্যাপাও কম ছিল না। ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম দিবা-রাত্রির ম্যাচ আয়োজন নিয়েও যেমন অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে প্রথম দিবারাত্রির ম্যাচটা হয়েছিল চেলসি ফুটবল ক্লাবের মাঠ স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে।

ক্রিকেটে তখন লেগেছে দিন বদলের হাওয়া। লাগিয়ে দিয়েছেন আসলে কেরি প্যাকার নামের এক ভদ্রলোক। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়ে নামিয়েছেন ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেট; সঙ্গে সঙ্গে ড্রপ-ইন পিচ, রঙিন পোশাক আর কৃত্রিম আলোর নিচের ক্রিকেটে ধাঁধিয়ে দিয়েছেন দর্শকের চোখ-মন!

স্বভাবতই এসিবি তুলেছিল ক্রিকেটের 'জাত গেল, জাত গেল' রব, তাদের সঙ্গী হয়েছিল ইংলিশ ক্রিকেটের কর্তারাও। তবে জনগণের মনটা বদলের হাওয়ায় যে ঘুরে গিয়েছে পুরোপুরি, প্রশাসকেরা তা অনুধাবন করেছিলেন ভালোভাবেই। বুঝে গিয়েছিলেন, সামনে এগোতে হলে প্যাকারের রাস্তাই ধরতে হবে। আর ওই চেষ্টাটা দিবা-রাত্রির ম্যাচ আয়োজন দিয়েই শুরু হতে পারে।

আলোচনা হচ্ছিল বেশ কয়েকটা কাউন্টিতেই, তবে প্রথম পদক্ষেপটা নিয়েছিল সারে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন খেলতে এসেছিল ইংল্যান্ডে, সে সময়ই 'ডেইলি মিরর'-এর পৃষ্ঠপোষকতায় সফরকারীদের সঙ্গে দিবা-রাত্রির একটি ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় তারা। তবে সিদ্ধান্ত নিলেই তো হবে না, তা বাস্তবায়ন করতে যেতেই দেখা দিতে শুরু করে রাজ্যের সমস্যা। প্রথম সমস্যাটা ভেন্যুর। ম্যাচকে রাত পর্যন্ত টেনে নিতে হলে কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা করতে হবে, কিন্তু ইংল্যান্ডে কোনো ক্রিকেট মাঠেই তখন ফ্লাডলাইট নেই। এর আগেই যেমন, ১৯৫২ সালে এক ক্রিকেটারের বেনিফিট ম্যাচ আয়োজন করা হয়েছিল আর্সেনালের ঘরের মাঠ হাইবুরিতে। ভেন্যুর সমস্যাটা সমাধান হয় ওই তরিকাতেই, সারে বেছে নেয় উত্তর লন্ডনের ফুটবল ক্লাব চেলসির ঘরের মাঠ স্ট্যামফোর্ড ব্রিজকে। ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেটের ভেন্যু নির্বাচনের সময় প্যাকারও যে মাঠকে সম্ভাব্য ভেন্যুর তালিকায় রেখেছিলেন।

তবে ফুটবল মাঠকে ক্রিকেটের উপযোগী বানানোও তো কম ঝামেলার নয়। প্রথম সমস্যা ফুটবলের মাঠে দৈর্ঘ্য আর প্রস্থের মাঝে অসামঞ্জস্য। লম্বায় বেশি বড় হওয়াটা তেমন সমস্যা না করলেও উইকেটের আড়াআড়ি একদমই ছোট হওয়াটাই ছিল মূল সমস্যা। ব্যাটের কানায় লাগা শটগুলোও অবলীলায় পেরিয়ে যাচ্ছিল সীমানা। একবার তাই এমনও ভাবা হয়েছিল, উইকেটের দুই পাশে হওয়া বাউন্ডারিগুলোতে দেওয়া হবে দুই রান করে। কিন্তু আয়োজনটা যেন কেবল দর্শক মনোরঞ্জনের খোরাক হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সে কারণে বাদ দেওয়া হয় এই ভাবনা। সারের ম্যানেজার এক মাস আগেই জানিয়ে দেন, খেলা কমপিটিটিভ করার ক্ষেত্রে কোনো আপোস করা হবে না।

পিচ নিয়েও কিছুটা ঝামেলা হচ্ছিল। ওভালের মাঠকর্মী হ্যারি ব্রিন্ডই তখন স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও সামলাতেন। তাঁকেই দেওয়া হয়েছিল ঠিকমতো ড্রপ-ইন উইকেট বসানোর গুরুভার। কিন্তু সেটা এতটাই ঝামেলাপূর্ণ মনে হচ্ছিল যে, এই পরিকল্পনা বাদ দিয়ে নিতে হয় কৃত্রিম পিচের আশ্রয়।

এত সব ঝামেলা করলেও আক্ষেপ থাকত না, যদি নিজেদের করা আয়োজনে সারে খেলতে পারত। কিন্তু সেখানেও বিধি বাম, বৃষ্টির কারণে জিলেট কাপের সেমিফাইনাল গড়ায় দ্বিতীয় দিনে, আর সেখানে ইয়র্কশায়ারের মুখোমুখি হয়েছিল সারে। তড়িঘড়ি করে সারের বিকল্প হিসেবে নামিয়ে দেওয়া হয় এসেক্সের ক্রিকেটারদের। আয়োজনে এসেক্সেরও কিছুটা ভূমিকা ছিল, স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ডে ক্রিকেটের জটিল সংখ্যাগুলো ধারণের ব্যবস্থা ছিল না বলে তাদের ভ্রাম্যমাণ স্কোরবোর্ড ধার দিয়েছিল এসেক্স কর্তৃপক্ষ।

ছবি: গেটি ইমেজেস

সব বাধা পেরিয়ে ইংল্যান্ডের মাটিতে প্রথম দিবা-রা্ত্রির ক্রিকেট ম্যাচ শুরু হয় ১৯৮০ সালের ২৪ আগস্ট স্থানীয় সময় সাড়ে পাঁচটায়। আগে ব্যাট করতে নামা ওয়েস্ট ইন্ডিজ শুরুটা করেছিল বেশ সাবধানী, এমনকি রানের খাতা খুলতে ভিভ রিচার্ডস পর্যন্ত সময় নিয়েছিলে ১৫ মিনিট! তবে এরপরই ১৮ মিনিটের ঝড়ে তিনি তুলে নিয়েছিলেন ৫৩ রান, ডেভিড অ্যাকলফিল্ডের টানা চার বলেই তো করেছিলেন ২০! কলিস কিং সেদিন দেখা দিয়েছিলেন রিচার্ডসের চেয়েও রুদ্র-সংহারী হয়ে, ৫৬ রান করার পথে ভেঙে ফেলেছিলেন এক দর্শকের ছাতাও। সঙ্গে ফাউদ বাক্কাসের ৬ ছক্কায় সাজানো ৮৭ রানের ইনিংসে এসেক্সকে ৪০ ওভারে ২৫৮ রানের লক্ষ্য দিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ।

জেতার জন্য এসেক্সকে অবশ্য সেই রান পর্যন্ত যেতে হয়নি। চতুর্থ ওভারেই নিল স্মিথ প্যাভিলিয়নে ফেরত গেলে ক্রিজে আসেন অধিনায়ক গ্রাহাম গুচ, এর আগে বল হাতেও যিনি নিয়েছিলেন তিন উইকেট। পরে ব্যাট হাতে নিয়েছিলেন দর্শকের পয়সা উসুলের দায়িত্ব। ১০ ছক্কায় করেছিলেন ১১১, যার মধ্যে রিচার্ডসের পরপর তিন বলে তিন ছক্কা আর ম্যালকম মার্শালকে স্টেডিয়ামের বাইরে পাঠানোর ঘটনাও ছিল।

অন্য উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান কেন ম্যাকইউয়িনের সঙ্গে ১৭৮ রানের জুটি গড়েছিলেন গুচ, ম্যাকইউয়িনও আক্রমণকেই ভেবেছিছিলেন মন্ত্র, যদিও তাঁকে থেমে যেতে হয় ৬৭ রানেই। কোনো বোলারের বলে অবশ্য নয়, তিনি থেমেছিলেন প্রকৃতির বাধায়। বৃষ্টির সম্ভাবনা ছিল বিকাল থেকেই, শেষমেশ সত্যি সত্যিই বৃষ্টি নেমেছিল রাত ৮:২৫ মিনিটে। ওই বৃষ্টি দশ মিনিটের মাঝে থেমে গেলেও খানিক বাদেই মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছিল আবার। মাঝের ওই বিরতিতে একটা লাভই হয়েছিল, মাত্র ৭৭ মিনিটে সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছিলেন গ্রাহাম গুচ, ম্যাচ-সেরাও তিনিই।

ডাকওয়ার্থ লুইস পদ্ধতি তখনো আলোর মুখ দেখেনি, যে কারণে ম্যাচের ফল আনা হয় রান রেটকে বিবেচনায় নিয়ে।  ২৮ ওভারে ১৯২ রান তুলে ফেলা এসেক্সই তাই জিতেছিল।

ম্যাচের রেশ অবশ্য ফলাফলেই শেষ হয়নি। স্পন্সরশিপ কিংবা টিকেট বিক্রি থেকে আয় হয়েছিল ৫০ হাজার পাউন্ডের বেশি, আয়োজক সারে কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাব পেয়েছিল ১৫ হাজার ডলারের মতো। এত অর্থের ঝনঝনানি দেখে অন্য কাউন্টিগুলোও চাইছিল এমন আয়োজন করতে, ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টল সিটি এফসির মাঠে তাই দিবারাত্রির ম্যাচ আয়োজন করা হয় বিশ্ব একাদশ আর অবশিষ্ট বিশ্ব একাদশের মাঝে। দর্শকরাও এমন ম্যাচই দেখতে চাইছিলেন নিয়মিত। প্রমাণ? ওই ম্যাচের দু'দিন পর স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে খেলতে নেমে চেলসি ম্যাড়মেড়ে ড্র করেছিল রেক্সহ্যামের বিপক্ষে। গ্যালারিতে তখন স্লোগান উঠেছে: 'উই ওয়ান্ট ক্রিকেট'!

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন