উৎপল শুভ্র নির্বাচিত পাঠকের লেখা

ইতিহাসের সঙ্গে বাবরের ব্যাটও তো আছে পাকিস্তানের

ইফতেখার নিলয়

১৩ অক্টোবর ২০২১

ইতিহাসের সঙ্গে বাবরের ব্যাটও তো আছে পাকিস্তানের

বাবর আজম: যাঁর ব্যাটে পাকিস্তানের ভরসা

১৯৯২ বিশ্বকাপে ইমরান খানের `কর্নারড টাইগারস্`-এর গল্প তো কিংবদন্তিই হয়ে গেছে। এরপরও এমন গল্প আরও অনেকবারই লিখেছে পাকিস্তান। পরিস্থিতি যত প্রতিকূল, পাকিস্তান ততই ভয়ঙ্কর। এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগেও যে পরিস্থিতি, তাতে এই পুরোনো ইতিহাস মনে না পড়ে উপায় নেই। তা আবার এমন একটা গল্প লিখতে পাকিস্তান কার দিকে তাকিয়ে? অবশ্যই অধিনায়ক বাবর আজম।

বিশ্বজয়ের আগাম উদযাপনটা পাকিস্তান কি করেই ফেলবে?

ইতিহাস বলে, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই বেরিয়ে আসে পাকিস্তানের সেরাটা। ১৯৯২ বিশ্বাকপে ইমরান খানের 'কর্নারড টাইগার্স' দিয়ে শুরু, প্রায় বাদ পড়ে যাওয়া পাকিস্তান লিখেছিল বিশ্ব জয়ের রূপকথা। ২০০৯ সালে লাহোর-হামলার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য নিষিদ্ধ ভূমি হয়ে গেল পাকিস্তান। অথচ মাস তিনেকের মধ্যেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে এসেছিল ইংল্যান্ড থেকে। সেই ইংল্যান্ডেই ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফির কথা কি মনে আছে? পাকিস্তান তখনো ক্রিকেটের জন্য নিষিদ্ধ ভূমি, ওই টুর্নামেন্টে পাকিস্তানকে কেউ হিসেবেই ধরেনি। সেই পাকিস্তানই সবাইকে চমকে দিয়ে জিতে নিল শিরোপা। পাকিস্তান ক্রিকেটের এই চরিত্র যদি জানা থাকে, তো এবারও তো তেমন কিছুর পুনরাবৃত্তি হওয়ার সম্ভাবনা বেশ জোরালোই। পরিস্থিতি যে আরও একবার পাকিস্তানের প্রতিকূলেই হাওয়া দিচ্ছে!

রমিজ রাজা পিসিবি চেয়ারম্যান হওয়ার পর নানান স্বপ্ন দেখছিলেন পাক-সমর্থকরা। নানান জায়গায় ধারভাষ্য দিয়েছেন, সেই সুসম্পর্কের খাতিরে কূটনৈতিকভাবে সফল হবেন তিনি, এমন আশাই করা হচ্ছিল সবাই। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। নিরাপত্তা ব্যবস্থা যাচাই করে পাকিস্তানে গিয়েও প্রথম ম্যাচ শুরুর খানিকক্ষণ আগে নিউজিল্যান্ড সরকারের বার্তায় ফেরত আসতে হয় কিউই ক্রিকেটারদের। দিন কয়েক বাদে সফর বাতিল করে ইংল্যান্ডও, যে সিদ্ধান্তে খোদ ইংরেজরাই সমালোচনায় মুখর।পিসিবি চেয়ারম্যান হয়েই ঝড়ের মুখে রমিজ রাজা

পিসিবির সাথে কোনো আলোচনা ছাড়াই নিউজিল্যান্ড আর ইংল্যান্ডের আকস্মিক এমন সিদ্ধান্তে পিসিবি চেয়ারম্যান রমিজ রাজা চটেছেন খুব। তাৎক্ষণিক মন্তব্যে শোয়েব আখতারও বলেছিলেন, 'পাকিস্তান ক্রিকেটকে মেরে ফেলল নিউজিল্যান্ড।' এরপরই ভিডিও বার্তায় পশ্চিমা ক্রিকেট দেশগুলোকে আলাদা 'সিন্ডিকেট' উল্লেখ করে তীব্র সমালোচনা করেন রমিজ রাজা। পাকিস্তানের বেলায় অন্যান্য দলের এমন অপেশাদার আচরণের প্রতি ধিক্কারও শোনা যায় তাঁর কণ্ঠে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেরা দল হয়ে সকল অবজ্ঞার জবাব দেওয়ার প্রত্যয়ী ঘোষণাও আসে তাঁর কণ্ঠে।

রমিজ রাজা যদি তাৎক্ষণিক আবেগের বিস্ফোরণে কথাটা বলেও থাকেন, তা কিন্তু হেলায় উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয় মোটেই। 'আয়োজক' দেশ ভারত হলেও বিশ্বকাপটা এবার আরব-আমিরাতেই হবে। লাহোর হামলার পর থেকে মাঝের সময়টায় যা পাকিস্তানের হোম গ্রাউন্ড। ওই শারজা-দুবাই-আবুধাবির মাঠে খেলেই পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে উঠেছিল। পাকিস্তানের চেয়ে মরুর ওই দেশের জল-হাওয়া সম্পর্কে কে-ই বা বেশি জানে!

মাঠের বাইরের সব অবজ্ঞার জবাব দিতে বাবর আজমও তো তীর্থের কাকের মতো মুখিয়ে আছেন। সময়ের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যানের কাঁধে এখন পাকিস্তানের তিন ফরম্যাটের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব। ২০১৯ সালে টি-টোয়েন্টি দলের দায়িত্ব পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত ক্যাপ্টেনসি করেছেন ২৮ ম্যাচে, দলকে জয় এনে দিয়েছেন ১৫ ম্যাচে। বিপরীতে, ৮টি ম্যাচ হারার পাশাপাশি পরিত্যক্ত হয়েছে ৫ ম্যাচ। পরিত্যক্ত হওয়া ম্যাচগুলোতে জয়ের সম্ভাবনার পাল্লা পাকিস্তানের দিকেই ভারি ছিল।বাবর আজম-মোহাম্মদ রিজওয়ান; পাকিস্তানকে স্বপ্ন সত্যি করতে পারেন তাঁরাই। ছবি: পিসিবি

অধিনায়কত্বের ভারে তেমনভাবে নুয়ে পড়েনি তাঁর ব্যাটও। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি বাবরের ক্যারিয়ার গড় এখন ৪৬.৮৯, ক্যাপ্টেন হিসেবে যা ৪৩.৫২। ৬১ ম্যাচে ২০টি হাফ সেঞ্চুরির অর্ধেকই এসেছে অধিনায়ক হিসেবে। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে নিজের একমাত্র সেঞ্চুরিটিও পেয়েছেন এ বছরই।

আর মোহাম্মদ রিজওয়ানের সাথে ওপেনিং জুটিটাও তো জমে গেছে বেশ। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এ বছর দুজনে মিলে রান তুলেছেন ৭৩৬। সেটাও ৫৬.৬১ গড়ে। যে দশ ইনিংসে ইনিংসের উদ্বোধন করেছেন তাঁরা দুজন, এর মধ্যে মাত্র একবারই দুজনের কেউই ৩৫ রানের বাধা পেরোতে পারেননি। আর এমনিতে দুজনের টি-টোয়েন্টি ব্যাটিংয়ের ধরন নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এক সঙ্গে ব্যাট করে দুজনে রান করেছেন ওভারপ্রতি ৯.৬১ করে।

ইতিহাসের সাক্ষ্য, দলের উদ্বোধনী জুটির এমন সব সংখ্যা...নিজেদের দ্বিতীয় বাড়িতে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন তো পাকিস্তান দেখতেই পারে। মূল কারণ অবশ্যই এসব নয়। মূল কারণ, পাকিস্তান ক্রিকেটকে দেওয়া নিউজিল্যান্ড-ইংল্যান্ডের আঘাত। এসব সময়ই তো সবচেয়ে ভয়ঙ্কর পাকিস্তান।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন