৩-০...তারপরও ভালো!

উৎপল শুভ্র

২২ নভেম্বর ২০২১

৩-০...তারপরও ভালো!

সিরিজ শেষ হওয়ায় যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন মাহমুদউল্লাহ। ছবি: শা. হ. টেংকু

তিন ম্যাচের সিরিজে ৩-০। তারপরও বাংলাদেশ ভালোই করেছে বলছি কেন? বলছি, সিরিজ পূর্ববর্তী দুই দলের অবস্থার কারণে। তা শুধু বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স নয়, বাংলাদেশ দল নিয়ে যে তুঘলকি কাণ্ড হলো, সে কারণেও। তিন ম্যাচের দুটিতেই জয়ের সম্ভাবনা জাগাতে পারাটাকেও যে কারণে মনে হচ্ছে অনেক পাওয়া।

একটা ক্রিকেট ম্যাচে কত কিছুই না হয়! সব কি মনে থাকে? বাংলাদেশ-পাকিস্তান তৃতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচটার দিকে ফিরে তাকালেও যেমন আগের ৩৯ ওভারের সবকিছু মুছে গিয়ে চোখে ভাসছে শেষ ওভারটা।

কী না হয়েছে সেই ওভারে! ডট বল, চার, ছয়, উইকেট...

চার বলের না হিসাব পাওয়া গেল, বাকি দুই বল? বাকি দুই বলেও উইকেট। তিন উইকেটের ওভারের শেষ বলটির আগে জীবন্ত তিনটি সম্ভাবনাই। পাকিস্তানের জয়, বাংলাদেশের জয় এবং টাই। মোহাম্মদ নওয়াজের বাউন্ডারি শেষ দুটিকে মুছে দিয়ে প্রথমটাকেই সত্যি বানিয়ে দিল। পাকিস্তান ৩-বাংলাদেশ ০।

এই টি-টোয়েন্টি সিরিজের আগেই যে স্কোরলাইনকে ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিলাম। ৩-০-তে তাই একটুও অবাক হইনি। অবাক যদি একটু হয়ে থাকি, সেটি কারণ বাংলাদেশের এই ভাঙাচোরা, বিভ্রান্তি ছড়ানো দলের এমন লড়াই করা। প্রথম ম্যাচে মাত্র ১২৭ রান করার পরও একটা সময় বাংলাদেশ জিতেও যেতে পারে বলে মনে হচ্ছিল। দ্বিতীয় ম্যাচটা অমন অনিশ্চয়তার দোলায় না দুললেও বাংলাদেশের ১০৮ রান টপকাতে ১৮.১ ওভার পর্যন্ত ব্যাটিং করতে হয়েছে পাকিস্তানকে। আর তৃতীয় ম্যাচের কথা তো শুরুতেই বলা হয়ে গেছে। পাকিস্তান জিতেছে বটে; তবে অন্য দিন, অন্য কোনো সময় ওই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশও জিতে যেতে পারত।

পাকিস্তানের সিরিজ জয়ের উদযাপন। ছবি: এএফপি

বিশ্বকাপে দুই দলের পুরো বিপরীত পারফরম্যান্সের সঙ্গে বিশ্বকাপ পরবর্তী বাংলাদেশের এলোমেলো অবস্থা মিলিয়ে পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশ উড়ে যাবে, এমন একটা আশঙ্কা ছিল। যা সত্যি না হওয়ায় কে না খুশি হবে! তবে এর কারণটাও অনুমান করা কঠিন নয়। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ব্যর্থতার সব দায় অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড সিরিজের যে উইকেটের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, পাকিস্তান সিরিজের উইকেট বোধ হয় অতটা খারাপ নয়। তবে ভালো হলেই কতটা ভালো? যথেচ্ছ শট খেলার তো প্রশ্নই ওঠে না, রুটিন শট খেলাও এখানে যথেষ্টই কঠিন। আসিফ আলী খেললে হয়তো আরেকটু ভালো বোঝা যেত। কিন্তু দর্শকের চাওয়াকে থোড়াই পাত্তা দিয়ে তাঁকে তিন ম্যাচেই বসিয়ে রেখেছে পাকিস্তান।

স্মৃতিটা টাটকা বলে তৃতীয় ম্যাচটা নিয়েই না হয় কথা হোক। একটা বলই খেলে তাতে চার মেরে নওয়াজের স্ট্রাইক রেট ৪০০। ২ বলে ৬ রান নিয়ে ইফতিখারের ৩০০। বাংলাদেশের ইনিংসেও তিন অঙ্কের স্ট্রাইক রেটের ইনিংস চারটি। তবে তা ধর্তব্যের মধ্যে নয়, কারণ এই চার ইনিংসে সর্বোচ্চ তো মাত্র ৫। উইকেট বোঝাতে বরং এই তথ্যটা খুব কাজে আসবে, ম্যাচের ২০-এর বেশি কোনো ইনিংসর মধ্যে স্ট্রাইক রেট ১০০ ছুঁয়েছে মাত্র একটিই। হায়দার আলীর ৩৮ বলে ৪৫ রান এই ব্যারিয়ার পেরিয়েছে শেষ দিকে শহীদুলের এক ওভারে দুই ছক্কায়।

ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্র শহীদ আফ্রিদি যে টুইটটা করেছেন, তা দেখে তাই একটুও আশ্চর্য হইনি। তা কী বলেছেন আফ্রিদি? সবার জানা কথাটাই, ‘বাংলাদেশের ভালোভাবে ভেবে দেখা উচিত,তারা কি এ ধরনের পিচে জিতে দেশের বাইরে ও বিশ্বকাপে সাদামাটা পারফরম্যান্স করতে চায়? তাদের প্রতিভা ও খেলাটার প্রতি প্যাশনের অভাব নেই। তবে উন্নতি করতে হলে ভালো পিচ খুব জরুরি।’

লো স্কোরিং থ্রিলারেরও একটা মজা আছে। অস্ট্রেলিয়া সিরিজে যা দেখে ‘ক্রিকেট, লাভলি ক্রিকেট’ শিরোনামে একটা লেখাও লিখে ফেলেছিলাম। কিন্তু বাড়াবাড়ি কোনো কিছুই ভালো নয়। যে কারণে নিউজিল্যান্ড সিরিজের সময়ই আবার লিখতে হয়েছিল, ‘লাভলি থেকে অসহ্য ক্রিকেট!’ ওই দুই সিরিজের দশ ম্যাচের সাতটিই জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার তিন ম্যাচের একটাই পারল না, তার কারণ তো অনুমেয়ই। পাকিস্তান অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড নয়। এ ধরনের উইকেটের সঙ্গে তাদের ভালোই পরিচয় আছে।

 শহীদুলের আনন্দটা একটু বেশিই হওয়ার কথা। প্রথম আন্তর্জাতিক উইকেট বলে কথা! ছবি: এএফপি

আরেকটা কারণ তো অবশ্যই এটা যে, পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে যে দলটা খেলেছে, তা কোনোমতেই বাংলাদেশের সেরা টি-টোয়েন্টি দল নয়। 'সেরা দল'-ও ভালো করেনি বলে শুধুই পরিবর্তনের জন্যই অনেক পরিবর্তন দলে। তা করে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ টি-টোয়েন্টি দলের কোনো রূপরেখা পাওয়া গেল না কেন, এই প্রশ্নের জবাব কী হবে? কেনই পরিবর্তন, কী ভেবে পরিবর্তন, এই দলটা দীর্ঘমেয়াদী কোনো পরিকল্পনার অংশ কি না, একটা প্রশ্নেরও তো পরিষ্কার উত্তর আমরা পাইনি। উল্টো দেখেছি বিভ্রান্তিময় সব সিলেকশন, যা ভুল প্রমাণিত হওয়ার পর আরেকটি ভুল দিয়ে তা ঢাকতে চাওয়ার অপপ্রয়াস। বাংলাদেশের ক্রিকেটের মোটামুটি খোঁজখবর রাখেন, এমন কাউকে টি-টোয়েন্টি দলের জন্য ২০/২৫ জন খেলোয়াড়ের একটা পুল করতে বললে কেউ কি সাইফ হাসানকে রাখতেন? সেই সাইফকেই দলে নিয়ে এই তরুণের প্রতি একটা অন্যায় করা হলো। অনুমিতভাবেই দুই ম্যাচে ব্যর্থ হওয়ার পর যা করা হলো, তা আরও বড় অন্যায়। দুটি ব্যর্থতার পর বাদ পড়তেই পারেন, কিন্তু বাইরে থেকে আরেকজনকে দলে ঢুকিয়ে সাইফকে স্কোয়াড থেকেই বের করে দেওয়া নবীন এই খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাসে কেমন একটা ঝাঁকুনি...তা কি নির্বাচকেরা একবারও ভেবে দেখেছেন?

তার চেয়েও অবাক ব্যাপার হলো, তৃতীয় ম্যাচের জন্য পারভেজ হোসেন ইমনকে দলে ডেকেও তাঁকে না খেলানো। তাহলে কেন তাঁকে হুট করে দলে ডাকা? সাইফকে নিয়ে প্রশ্ন করায় মাহমুদউল্লাহ এই সিরিজে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উক্তিটাই আবার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বলেছেন টিম ম্যানেজমেন্টই এটা ভালো বলতে পারবে। এই টিম ম্যানেজমেন্ট বস্তুটাই এখন বিষম এক ধাঁধার নাম। টিম ম্যানেজমেন্ট মানে কে বা কারা? জানতে খুব কৌতূহল হয়। কারণ অধিনায়ককে ছাড়া টিম ম্যানেজমেন্ট তো ক্রিকেট ইতিহাসে অভূতপূর্ব এক আবিষ্কার।  

মাহমুদউল্লাহর প্রসঙ্গ আসায় ভালোই হলো। তাঁকে দিয়েই লেখাটা শেষ করি। ক্রিকেটে অদ্ভুত একটা রীতি এখন প্রায় স্থায়ী হয়ে যেতে বসেছে। একাধিক স্পনসরের নাম উচ্চারণ করার সুবিধার্থে ম্যাচশেষে ব্যক্তিগত কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে দুটি পুরস্কার দেওয়া হয়। একজন ম্যাচের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড়, আরেকজন ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়। সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড়ের তো অবধারিতভাবেই ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার কথা...এই প্রশ্ন তুলে লাভ নেই। বাণিজ্যিকীকরণের এই দুনিয়ায় সবই নিপাতনে সিদ্ধ। তারপরও প্রসঙ্গটা তুললাম, ওই একটা ওভারের জন্যই মাহমুদউল্লাহ ‘মোস্ট ভ্যালুয়েলবল প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’-এর স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে। 

তাসকিন চতুর্থ ওভারের প্রথম বলে চোট পাওয়ায় ওভারটা শেষ করতে পারেননি। বাকি পাঁচটা বল করেছেন এই ম্যাচেই অভিষিক্ত শহীদুল। অর্থাৎ দলের মূল দুই পেসারের বোলিং ৭ ওভারেই শেষ। মাহমুদউল্লাহর হাতে শেষ ওভারের জন্য কোনো অপশনই ছিল না। হয় আফিফকে দিতে হবে, নয়তো করতে হবে নিজেকেই। এই সিরিজের শুরু থেকেই যেমন নামকাওয়াস্তে অধিনায়ক বলে মনে হচ্ছে তাঁকে, তাতে আফিফের হাতে বল তুলে দিয়ে ঝুঁকিমুক্ত পথে হাঁটতেই পারতেন তিনি। তা না করায় মাহমুদউল্লাহকে ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছা করছে। ম্যাচের সবচেয়ে স্মরণীয় অংশটুকু যে তাঁর ওই এক ওভারেরই উপহার!

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×