`লারা-টেন্ডুলকার লাকি, এখন সেরকম ভালো বোলার কোথায়?`

উৎপল শুভ্র

২৭ এপ্রিল ২০২১

`লারা-টেন্ডুলকার লাকি, এখন সেরকম ভালো বোলার কোথায়?`

জাভেদ মিয়াঁদাদ। ছবি: পিএ ফটোস

মহা আলোড়ন তুলে ১৯৯৬ বিশ্বকাপের দলে ঢুকেছেন। জনগণের দাবি, দেশের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ—১৯৯২ সালে জেতা বিশ্বকাপটা দেশের মাটিতে অবশ্যই ধরে রাখতে হবে। জাভেদ মিয়াঁদাদ তাই খেলছেন টানা ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। করাচি ন্যাশনাল স্টেডিয়ামে পাকিস্তান দলের প্র্যাকটিসে ইন্টারভিউয়ের অনুরোধ করতেই রাজি। প্র্যাকটিস শেষে ডেকে নিয়ে গেলেন ড্রেসিংরুমে। সেখানে বসেই দীর্ঘ ইন্টারভিউ। আরও অনেক ইন্টারভিউ প্রার্থীকে উপেক্ষা করে আমাকে এত যত্নআত্তি করার কারণটা বুঝলাম ইন্টারভিউ শেষে। বাংলাদেশে তাঁর বিশাল ভক্তকুলকে শুভেচ্ছা জানানোর সুযোগটা ছাড়তে চাননি!

প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬। ভোরের কাগজ।

উৎপল শুভ্র : টানা ছয়টি বিশ্বকাপ! এ তো অবিশ্বাস্য! আপনার এই রেকর্ড তো মনে হয় না ভাঙবে কোনোদিন!

জাভেদ মিয়াঁদাদ: না না, এই রেকর্ড নিয়ে আমার বাড়তি কোনো উচ্ছ্বাস নেই। শুধু যে একটা কারণেই এই বিশ্বকাপটা (১৯৯৬) অন্য রকম লাগছে, তার কারণ আমি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার চিন্তাটাই দূর করে দিয়েছিলাম মাথা থেকে। হাঁটুর ইনজুরি এমনই ভুগিয়েছে যে, গত এক-দেড় বছর আমি একদমই খেলিনি। এমনকি '৯৩ সালে তো অবসরের ঘোষণাই দিয়ে দিয়েছিলাম।

শুভ্র: শেষ পর্যন্ত ফিরে এলেন, তার পেছনে তো দেশের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীরও ভূমিকা আছে বলে শুনেছি। আসলে ঘটনা কী?

মিয়াঁদাদ: হ্যাঁ, প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো অনুরোধ করেছেন। প্রেসিডেন্টও বলেছেন, নিজেদের দেশে হচ্ছে বিশ্বকাপ, এটা খেলো। এর সঙ্গে দল ভালো করছিল না বলে ফিরে আসার জন্য পাকিস্তানি জনগণের দাবি তো ছিলই। সবাই এমন বলার পর আমি তাদের বলেছি, ঠিক আছে, বিশ্বকাপের জন্য ফিট হয়ে উঠতে আমি আমার সাধ্যমতো চেষ্টা করব। গত এক বছর অমানুষিক পরিশ্রম করে নিজেকে ফিট করে তুলেছি। এখন আমার একটাই স্বপ্ন, বিশ্বকাপ জিতে বিদায় নেওয়া। জীবনে এমন মনে-প্রাণে আর কিছু চাইনি।

শুভ্র: বিশ্বকাপ আর জাভেদ মিয়াঁদাদ তো মনে হচ্ছে একে অন্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরের বিশ্বকাপেও তো এমন জনদাবি উঠতে পারে, হয়তো এটাই আপনার শেষ বিশ্বকাপ নয়!

মিয়াঁদাদ: (হাসি) আরে না, কী বলেন! আর না! এবারই তো খেলতাম না। একটা কথা ভেবেই খেলছি। নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ হচ্ছে। পাকিস্তানের মানুষ ১৯৮৭ বিশ্বকাপের হতাশাটা ভুলে যেতে চায়। আমার ফেরার এই একটাই কারণ। নইলে মাঝখানে দুবার ফিরে এসে দলের অধিনায়কত্ব নেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল আমাকে, আমি তা ফিরিয়ে দিয়েছি। আমাকে যত দিন ইচ্ছে খেলে যাওয়ার স্বাধীনতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু আমি তো না ফেরার ব্যাপারে অনড়ই ছিলাম।

শুভ্র: ১৯৭৫ সালে প্রথম বিশ্বকাপ আপনারও প্রথম। ২১ বছর আগের ওই বিশ্বকাপের দিকে ফিরে তাকিয়ে তখনকার ১৫ বছর বয়সী জাভেদ মিয়াঁদাদের কথা কী মনে পড়ে?

মিয়াঁদাদ: সেটি ছিল পাকিস্তান দলে আমার প্রথম খেলা। আর দশজন তরুণ খেলোয়াড়ের মতোই ছিলাম আমি, আমার ওপর কোনো চাপ ছিল না। আসলে ওই বিশ্বকাপে সেভাবে কারও ওপরই চাপ ছিল না। পুরো ক্রিকেট বিশ্বই তো ওয়ানডে ক্রিকেট মাত্র দেখতে শুরু করেছে। ১৪০-১৫০ রানকেই তখন বড় স্কোর বলে মনে করা হতো। এখন তো পুরো ব্যাপারটাই পাল্টে গেছে। সবাই জানে, কীভাবে ওয়ানডে খেলতে হয়। খেলাও হচ্ছে প্রচুর, যেকোনো ট্যুরেই এখন টেস্টের চেয়েও ওয়ানডে বেশি। এটা ওয়ানডের দারুণ জনপ্রিয়তারই প্রমাণ। তবে আমি টেস্ট-ওয়ানডে দুটি খেলতেই সমান এনজয় করি।

জীবনের শেষ বিশ্বকাপে। প্রথম ছয়টি বিশ্বকাপেই খেলার অনন্য কীর্তি জাভেদ মিয়াঁদাদের।

শুভ্র: ইদানীং তো টেস্ট-ওয়ানডে স্পেশালিস্ট ভাগ হতে শুরু করেছে।

মিয়াঁদাদ: আমি সব সময়ই বিশ্বাস করে এসেছি, যে ভালো ক্রিকেটার সে টেস্ট-ওয়ানডে দুটিতেই ভালো। এটা শুধু নিজেকে একটু ' টিউন' করে নেওয়ার ব্যাপার। বেসিক তো একই, খেলাটাও তো ক্রিকেটই, না কি? একমাত্র পার্থক্য হলো, ওয়ানডে পিছু ফিরে তাকানোর সুযোগ দেয় না। একবার যা গেল তা গেল। টেস্টে সব সময়ই ফিরে আসার সুযোগ থাকে। প্রথম ইনিংসে খারাপ করলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে তা পুষিয়ে দিতে পারবেন। কিন্তু ওয়ানডেতে একবার কোনো ভুল করলে সেখানেই সব শেষ। ফিরে আসার কোনো সুযোগ থাকে না, কারণ প্রতিপক্ষ সুযোগটা নিয়ে ফেলে।

শুভ্র: ইন্টারভিউ করার সুযোগ হলেই আপনাকে একটা প্রশ্ন করব বলেই ঠিক করে রেখেছি। ক্রিকেট মাঠে আপনি যেমন লড়াকু, সেটিতে অনেকেই করাচির অবদান দেখে। এই শহরের ধরনই নাকি আপনাকে অমন যুদ্ধংদেহী বানিয়েছে। আপনি নিজে কী মনে করেন?

মিয়াঁদাদ: আমি জানি না, যারা এসব বলে তারা করাচি সম্পর্কে কতটা জানে, করাচি সম্পর্কে কী শুনেছে! আমার যুদ্ধংদেহী মেজাজের কথা বলছেন, অনেকেই আমার ফাইটিং কোয়ালিটির কথা বলে, তা তো আরও অনেক ক্রিকেটারের মধ্যেই ছিল বা আছে। ভিভ রিচার্ডসের কথাই ধরুন না। ওর মাঠে নামা, ব্যাটিং করার ধরন সব কিছুই পরিষ্কার বুঝিয়ে দিত যে, খেলাটা ওর কাছে যুদ্ধ এবং ও যুদ্ধ করতেই নেমেছে। ও ছিল আদ্যন্ত এক ফাইটার। ওদের পুরো দলটাই ছিল ওরকম। হয়তো আমার দলে আমি একাই ওরকম বলে সেটি মানুষের বেশি নজরে পড়েছে। এত বেশি আলোচনাও হয়েছে। তবে আমি একটা কথা স্বীকার করি, ব্যাটিং করার সময় আমি সব ভুলে যাই। যতবার ব্যাট করতে পারি, ততবারই মনে করি, এটাই আমার জীবনের শেষ ইনিংস, হেরে গেলেই সব শেষ। এ কারণেই আমি শুধু হান্ড্রেড পার্সেন্ট নয়, তার চেয়েও বেশি উজাড় করে দিই। এটাকেই হয়তো মানুষ অন্যভাবে দেখে।

শুভ্র: এসব তো ভালো গুণ। তবে আপনি তো মাঠে অনেক উল্টোপাল্টা কাজও করেছেন। ডেনিস লিলিকে ব্যাট দিয়ে মারতে গিয়েছিলেন, বিশ্বকাপের ম্যাচে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন কিরণ মোরেকে। এসবের ব্যাখ্যাও কি যেকোনো মূল্যে জিততে চাওয়া?

মিয়াঁদাদ: এর কিছুই আমি পরিকল্পিতভাবে করিনি। ম্যাচের ঘটনাপ্রবাহে হয়ে গেছে। আর লিলির ঘটনায় আমার ব্যাট দিয়ে মারতে যাওয়াটাই দেখলেন, ও যে আমি রান নিতে যাওয়ার সময় বাধা দেওয়ার পর আমাকে আগে লাথি মেরেছিল, সেটি ভুলে গেলেন? বলতে পারেন, লিলি আর আমার ঘটনাটা ঘটার আরেকটা কারণ আছে। তখন ক্রিকেটটা অনেক বেশি আক্রমণাত্মকভাবে খেলা হতো। ক্রিকেট অনেক বদলে গেছে, তবে সব বদলই ভালো হয়েছে তা নয়। আমি তো বলব, পাঁচ-দশ বছর আগের সঙ্গে তুলনা করলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এখন খুব বাজে অবস্থা।

ডেনিস লিলিকে ব্যাট তুলে মারতে গিয়েছিলেন জাভেদ মিয়াঁদাদ। পার্থ, ১৯৮১

শুভ্র: এটাকে কি 'আমার সময়ই ভালো ছিল' চিরন্তন সেই...

মিয়াঁদাদ: মোটেই তা নয়। দেখুন না, এখন সবাই শুধু দুজন ব্যাটসম্যানকে নিয়েই মাতামাতি করছে। লারা আর টেন্ডুলকার ছাড়া আর কেউ চোখেই পড়ছে না কারও। অথচ আমার সময়ে কী ছিল বলুন! কজনের কথা বলব, অসংখ্য ভালো ব্যাটসম্যান ছিল। এভাবে দুজনে নেমে আসা একদমই সম্ভব ছিল না। বোলারদের ক্ষেত্রেও একই কথা। এখন বড়জোর দু-তিনজন বোলার আছে, যারা সত্যিই ভালো বোলার। পাঁচ-দশ বছর আগে ব্যাপারটা এমন ছিল না। পাকিস্তান দলের কথাই ধরুন না! আমি যখন পাকিস্তান দলে খেলা শুরু করি, দলের ১১ জনই ছিল সুপারস্টার। আমরা খেলোয়াড়রাই স্টেডিয়াম ভরিয়ে ফেলতাম। একজনের দশ হাজার ফ্যান আসত, আরেকজনের দশ হাজার, কারও হয়তো পনেরো হাজার। অথচ এখনকার দলের বড়জোর দু-তিনজন খেলোয়াড়ের এমন অনুরাগী আছে।

শুভ্র: ক্রিকেট দিন দিন আরও জনপ্রিয় হচ্ছে, খেলোয়াড়রা আরও বেশি টাকা পয়সা পাচ্ছে। আপনার কথামতো ক্রিকেটের মানের যদি অধোগতিই হয়ে থাকে, এর কারণ কী?

মিয়াঁদাদ: এ প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি, বর্তমান বিশ্ব ক্রিকেটে একটাই দল আছে, যারা বাকি সব দলের জন্য উদাহরণ হতে পারে। প্রতিদিনই নতুন নতুন খেলোয়াড় আসছে ওদের দলে, যাদের প্রত্যেকেই ম্যাচিউরড এবং একই রকম ভালো। দলটির নাম নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন! অস্ট্রেলিয়া। ওদের ভালো খেলার কারণ, ওরা খেলাটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করে, অনেক খাটে । অথচ আমাদের দলের কথা ধরুন। একই দল দিনের পর দিন খারাপ খেলছে, হারছে, অথচ নতুন কেউ এসে খেলোয়াড়দের জায়গা নিতে পারছে না। অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আমি দক্ষিণ আফ্রিকার কথাও বলব। এত বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেই ওরা দারুণ পারফরম্যান্স দেখিয়েছিল। মাঝখানে আরও উন্নতি করেছে এবং করেই চলেছে।

আমাদের সময়ে প্রায় সব দলেই দারুণ সব বোলার ছিল। তার পরও যদি একজনকে বেছে নিতে হয়, আমি বলব ডেনিস লিলির কথা। ও ছিল কমপ্লিট এক ফাস্ট বোলার।

শুভ্র: লারা-টেন্ডুলকারের কথা আপনিই বললেন। আপনার সময়ের সেরা ব্যাটসম্যান গাভাস্কার-রিচার্ডস-গ্রেগ চ্যাপেলদের তুলনায় ওরা কোথায় থাকবে?

মিয়াঁদাদ: ওরা ভালো। তবে আমি বলব একই সঙ্গে ভাগ্যবানও। এখন ভালো বোলার কোথায়? হাতে গোনা দু-একজন। অথচ আমাদের রান করতে হয়েছে (আঙুলের কর গুনে) লিলি-টমসন-হোল্ডিং-গার্নার-মার্শাল-রবার্টস হ্যাডলি-স্নোদের বিপক্ষে। ভারতের ওই বিখ্যাত স্পিনারদের বিপক্ষে। ওই বোলারদের বিপক্ষে রান করাটা মোটেই সহজ কাজ ছিল না। তবে সে সময় ওরকম ভালো ব্যাটসম্যানও ছিল। অথচ এই বিশ্বকাপে ১২টি দেশের কত খেলোয়াড় খেলছে, সব আলোচনা লারা ও টেন্ডুলকারকে নিয়েই। ওরা অবশ্যই ভালো ব্যাটসম্যান, এই মুহূর্তে ওরাই বিশ্বসেরা। তবে সত্যিকার ভালো বোলিংয়ের বিপক্ষে খেলতে দেখলে বুঝতে পারতাম ওরা অন্য সেরাদের সঙ্গে তুলনীয় কি না। এখন খুব বেশি ভালো বোলার নেই, এটা তো আর ওদের দোষ নয়। আমি বরং বলব, ওরা খুব লাকি।

শুভ্র: আপনার সময়ের এত বড় বড় বোলারের নাম বললেন, তাদের মধ্য থেকে যদি কাউকে সেরা হিসেবে বেছে নিতে বলি।

মিয়াঁদাদ: খুব কঠিন। আপনাকে তো বললামই, আমাদের সময়ে প্রায় সব দলেই দারুণ সব বোলার ছিল। তার পরও যদি একজনকে বেছে নিতে হয়, আমি বলব ডেনিস লিলির কথা। ও ছিল কমপ্লিট এক ফাস্ট বোলার।

শুভ্র: আপনার সেরা ইনিংস?

মিয়াঁদাদ: সেরা না বলে আমি বলি সবচেয়ে স্মরণীয়। অবশ্যই এটি শারজায় ভারতের বিপক্ষে শেষ বলে ছক্কা মেরে জেতানো ওই ইনিংসটি (১৯৮৬ সালে। অস্ট্রেলেশিয়া কাপে)। সে ম্যাচে পরিস্থিতিটা ছিল খুব কঠিন। শেষ পর্যন্ত যেভাবে সবকিছু হলো, তাতে এই ইনিংসটি নিয়ে আমি গর্বিত।

শারজায় ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল জেতানো ম্যাচের শেষ বলে সেই ছক্কা। জাভেদ মিয়াঁদাদের সবচেয়ে স্মরণীয় ইনিংস। ছবি: ইউটিউব

শুভ্র: সমাপ্তির কারণে হয়তো ওই ইনিংসটি বেশি স্মরণীয়। কিন্তু ব্যাটসম্যানশিপের দৃষ্টিকোণ থেকে সেরা ইনিংস বলবেন কোনটিকে?

মিয়াঁদাদ: বলা কঠিন। আমি অনেক ভালো ইনিংস খেলেছি। টেস্টে ৭টি ডাবল সেঞ্চুরি করেছি, সেঞ্চুরি করেছি ২৩টি, ৫০টির মতো হাফ সেঞ্চুরি। সব তো আর মনে রাখা সম্ভব নয়, শেষ পর্যন্ত সব ছাপিয়ে ক্যারিয়ারের একটি-দুটি ইনিংসই আলাদাভাবে মনে থাকে। সবচেয়ে স্মরণীয় শারজার ওই ইনিংসটিই।

শুভ্র: ৭টি ডাবল সেঞ্চুরির মধ্যে সবচেয়ে যেটি বড়, সেটি তো অপরাজিত ২৮০। ইমরান ডিক্লেয়ার করে না দিলে তো ট্রিপল সেঞ্চুরিই পেয়ে যেতেন। এ নিয়ে কি কোনো আক্ষেপ আছে?

মিয়াঁদাদ: নতুন আর কী বলব! অনেক কথা হয়েছে এ নিয়ে। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিও হয়েছে অনেক। সেদিন আমার খুবই খারাপ লেগেছিল। আমি একটা জিনিস বিশ্বাস করি, দলের সব খেলোয়াড় যেহেতু অধিনায়কের কথামতো খেলে, অধিনায়কেরও উচিত খেলোয়াড়দের কথা ভাবা। ব্যাটসম্যানের ব্যক্তিগত মাইলফলকের কথাও চিন্তা করা। আমি তো সেদিন সোবার্সের ৩৬৫ রানের বিশ্ব রেকর্ডের কথা ভাবতে শুরু করেছিলাম।

শুভ্র: ইমরান ডিক্লেয়ার করে দেওয়ার পর ড্রেসিংরুমে ফিরে তাঁকে কিছু বলেননি?

মিয়াঁদাদ: না, কিছুই বলিনি। তবে একদিক থেকে ঘটনাটা আমার উপকারই করেছে। ওই ঘটনায় আমার এমনই রাগ হয়েছিল যে, এর পর থেকে একটা জেদই চেপে গিয়েছিল। এরপর যতবার ব্যাট করতে নেমেছি, এটি মনে পড়েছে। যখনই এক শ করেছি, আমার মন চলে গেছে ৩৬৫ রানের দিকে। ৩৬৫ করতে পারিনি, তবে এতগুলো ডাবল সেঞ্চুরি করতে পেরেছি হয়তো এ কারণেই।

পাকিস্তান ক্রিকেটের দুই মহানায়ক। দুজনের সম্পর্কে টানাপড়েন থাকাটা ছিল তাই খুবই স্বাভাবিক। ছবি: গেটি ইমেজেস

শুভ্র: সোবার্সের রেকর্ড ভাঙতে না পারার মতো আরেকটি ব্যাপার নিয়েও আপনার আক্ষেপ আছে বলে অনুমান করি। আপনার ক্রিকেট মস্তিষ্কের এত সুনাম, অথচ দীর্ঘমেয়াদে তো অধিনায়কত্বই করতে পারেননি।

মিয়াঁদাদ: না, এ নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ অধিনায়কত্বটা আমি আসলে সেভাবে এনজয় করিনি। বাড়তি কোনো দায়িত্ব ছাড়াই খেলতে পছন্দ করি আমি। হ্যাঁ, মাঠে থাকলে আমি অনেক কিছুই বুঝতে পারতাম। সেই বাড়তি সেন্সটা যে আমার আছে, সেটি আমি জানতাম। তবে আমি অধিনায়কত্ব চাইনি। আমি শুধু দলের প্রয়োজনে স্টপ-গ্যাপ দায়িত্ব পালন করেছি। অধিনায়কত্বকে আমার কাছে থ্যাংকলেস জব মনে হয়। ভালো করলে যতটা নাম হয়, খারাপ করলে যন্ত্রণা তার চেয়ে অনেক বেশি।

বাংলাদেশের মানুষকে আমার শুভেচ্ছা জানাবেন। ১৯৮৮ সালে এশিয়া কাপ খেলতে গিয়েই বুঝেছি, বাংলাদেশে আমার অনেক ভক্ত। আমি তাদের সবাইকে সালাম জানিয়েছি, এটা লিখতে ভুলবেন না যেন।

শুভ্র: আপনার অধিনায়কত্ব ক্যারিয়ারের সঙ্গে তো ইমরান খানও জড়িয়ে। প্রথমবার আপনাকে সরিয়ে তাঁকে অধিনায়ক করা হলো। এর পরও ইমরানের অনুপস্থিতিতেই শুধু দায়িত্ব পেয়েছেন। কিন্তু ইদানীং তো মিডিয়ায় আপনাদের মধ্যে বেশ কথা চালাচালি হচ্ছে। ইমরানের সঙ্গে আপনার সমস্যাটা কী?

মিয়াঁদাদ: আমার দিক থেকে কোনো সমস্যা ছিল না, এখনো নেই। ও-ই (ইমরান) তো পত্রপত্রিকায় উল্টোপাল্টা কথা বলতে শুরু করল। কিছু মানুষ ভুলে যায় যে, আমি তাদের আগে পাকিস্তানের অধিনায়ক হয়েছি, তারা আমার অধিনায়কত্বে খেলেছে। আমার সামর্থ্য সম্পর্কে, কোয়ালিটি সম্পর্কেও ভালোই জানে তারা। কিন্তু পত্রপত্রিকায় তাদের কথাবার্তা পড়লে মনে হয়, এটা তাদের মনেই থাকে না। তারা অন্য খেলোয়াড়দের কথা বলে, অথচ সেই দলে আমিও ছিলাম। এটাকে আমি কীভাবে নেব? নিশ্চয়ই এটা প্রফেশনাল জেলাসি। কেউ তাকে টপকে যেতে পারে, মানুষ তখন তার কথা ভুলে যেতে পারে—এই ভয় ছাড়া তো আমি এ ধরনের আচরণের কোনো কারণ দেখি না। তবে এতে কি আর কাজ হয়? যারা জানার তারা ঠিকই জানে, আসল কাজগুলো কে করত, সাফল্যে কার কতটা অবদান ।

শুভ্র: আমার প্রশ্ন শেষ। আপনি নিজে থেকে কিছু বললে তা সাগ্রহে শুনব।

মিয়াঁদাদ: বাংলাদেশের মানুষকে আমার শুভেচ্ছা জানাবেন। ১৯৮৮ সালে এশিয়া কাপ খেলতে গিয়েই বুঝেছি, বাংলাদেশে আমার অনেক ভক্ত। তারা আমাকে খুব ভালোবাসে। আমি তাদের সবাইকে সালাম জানিয়েছি, এটা লিখতে ভুলবেন না যেন।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন