বারবাডোজে ক্যারিবীয় লেজেন্ডদের সান্নিধ্যে

উৎপল শুভ্র

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

বারবাডোজে ক্যারিবীয় লেজেন্ডদের সান্নিধ্যে

এভার্টন উইকস, গ্যারি সোবার্স, গর্ডন গ্রিনিজ, ওয়েস হল, চার্লি গ্রিফিথ, সিমুর নার্স...কী সব নাম! সাবেক ক্রিকেটার তো বটেই, এঁদের সবার আরেকটা মিল, সবাই `বারবাডোজ লেজেন্ডস্`। কিংবদন্তিরা সব আসছেন-যাচ্ছেন, আড্ডা মারছেন গোল হয়ে বসে। সবারই দেখা মিলবে বারবাডোজের লেজেন্ডস্ ক্লাবে। আমার যেমন তাঁদের সঙ্গে দারুণ সময় কেটেছিল ২০১০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময়।

না, বিগ বার্ড নামটা ঠিক হয়নি। ‘বিগ’ ঠিক আছে, তাই বলে বার্ড...পাখি? জোয়েল গার্নারের পাশে প্রথম দাঁড়ানোর দিন গালিভার আর লিলিপুটের গল্পটা মনে পড়েছিল। এ দিন আবারও পড়ল। তার চেয়ে বেশি মনে হলো, আর যা-ই হোক, ভদ্রলোকের বিপুলায়তন বোঝানোর জন্য উপমা হিসেবে পাখি-টাখি একেবারেই চলে না।

৬ ফুট ৮ ইঞ্চির গার্নারের সঙ্গে দেখা বারবাডোজ লেজেন্ডস্ ক্লাবে। বারবাডোজের টেস্ট ক্রিকেটাররা মিলে বছর কয়েক আগে গড়েছেন এই সংগঠন। অফিসিয়াল নাম 'ক্রিকেট লেজেন্ডস্ অব বারবাডোজ'। কেনসিংটন ওভালের পাশেই দোতলা ভবন। অবসর নেওয়ার পর বারবাডোজের টেস্ট ক্রিকেটাররা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এর সদস্য হয়ে যান। ৪২ জনকে নিয়ে শুরু হয়েছিল। ২০১০ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় সর্বশেষ যখন গিয়েছিলাম, তখনো সংখ্যাটা তা-ই ছিল। সদস্য তালিকায় একটা পরিবর্তন অবশ্য হয়েছিল। ক্লাইড ওয়ালকট মারা গেছেন। নতুন ঢুকেছেন ইয়ান ব্র্যাডশ।

`বিগ বার্ড` জোয়েল গার্নারের পাশে দাঁড়ালে নিজেকে বামন লাগেব্র্যাডশকেও তাহলে লেজেন্ড বলতে হবে! সোবার্সও লেজেন্ড, ব্র্যাডশও লেজেন্ড! হ্যাঁ, লেজেন্ড সবাই। তবে ঘি-তেল সবকিছুর যাতে এক দাম হয়ে না যায়, সে জন্য সাতজনকে দেওয়া হয়েছে আইকনের মর্যাদা—সোবার্স, উইকস্, হল, গার্নার, মার্শাল, গ্রিফিথ ও নার্স।

২০০৭ বিশ্বকাপের সময় বেশ কবারই ঘুরে এসেছি। সেবারের সঙ্গে খুব বেশি পার্থক্য চোখে পড়ল না। যদিও ‘জাদুঘর’টা নতুন সংযোজন বলে জানালেন লেজেন্ডস ক্লাবের বিপণন ব্যবস্থাপক অ্যামান্ডা রেইফার। ‘রেইফার’ শুনেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল—ফ্লয়েড রেইফার। মনে আছে তো নামটা? ওই যে ২০০৯ সালে বাংলাদেশের সফরে গেইলদের ধর্মঘটে হঠাৎ ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক হয়ে গিয়েছিলেন। হাসিখুশি ওই তরুণী হাসিটা আরও বড় করে বললেন, ‘ও আমার স্বামী।’

জাদুঘর বলতে যেমন বোঝায়, তেমন কিছু অবশ্য নয়। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান গ্রেটদের কিছু ছবি আছে, বড় বড় ব্যানারে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের দিকপালদের সম্পর্কে কিছু তথ্য...এর বাইরে অন্য দশটা মার্চেন্ডাইজ শপের মতো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের কিছু জার্সি, মগ-টগ এই তো! এত সব বিখ্যাত ক্রিকেটার জন্ম দিয়েছে বারবাডোজ, তাঁদের কিছু স্মৃতিচিহ্ন থাকলে না হতো! সোবার্স-উইকসের ব্যাট-ট্যাট, গার্নারের জার্সি-বুট...অন্য সব ক্রিকেট জাদুঘরে যেমন থাকে আরকি!

ব্যাট আছে, তবে মাত্র দুটি। দুটিই গর্ডন গ্রিনিজের। এর একটি দিয়ে ৪০ বছর বয়সে গ্রিনিজের চার ডাবল সেঞ্চুরির শেষটি—১৯৯১ সালে কেনসিংটন ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২২৬। অন্য ব্যাটটিই বেশি টানল আমাকে। এটি দিয়েই ১৯৮৪ সালের লর্ডস টেস্টে গ্রিনিজের ওই বিধ্বংসী অপরাজিত ২১৪। ইংল্যান্ড টার্গেট দিয়েছিল ৩৪২। ব্যাট করতে নামার আগে বারবাডোজ থেকে মেয়ের অসুস্থতার খবর পাওয়ায় গ্রিনিজের মনমেজাজ ভালো ছিল না। সেটির ঝাল ঝাড়েন ইংলিশ বোলারদের ওপর। মাত্র ২৪২ বলে অপরাজিত ২১৪ করে মাত্র ৯ উইকেটেই জিতিয়ে দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। ৬৬.১ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩৪৪—এই টি-টোয়েন্টির যুগেও খুব বেশি দেখা যায় না।

লেজেন্ডস ক্লাব সারা বছরই টুকটাক এটা-ওটা করে। স্কুলে স্কুলে গিয়ে কোচিং করানো, মাস্টার্স টুর্নামেন্ট আয়োজন ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে জমজমাট থাকে কেনসিংটন ওভালে ক্রিকেট থাকলে। খেলার পর লিজেন্ডরা আসেন, পেছনে বারের পাশে খোলা জায়গাটায় দর্শকদের সঙ্গে কথা বলেন, ছবি তোলেন। নিজেরাও বসে আড্ডা দেন। ২০০৭ বিশ্বকাপের সময় যেমন ছবি তোলা বা অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য টাকা দিতে হতো, দূর থেকে ছবি তুলতে গেলেও সোবার্স মুখ ঢেকে ফেলতেন—সেটি আর এবার নেই। সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার একেবারেই সহজ ভঙ্গিতে বসে আছেন একটা ঘরে।

মনুমেন্ট দেখার মতো ঘাড় উঁচিয়ে গার্নারের সঙ্গে কথা বলছি। টি-টোয়েন্টি যে শুধুই এন্টারটেইনমেন্ট, দর্শকদের জন্যই খেলা, কিশোরদের মোটেই খেলা উচিত নয়—এটা বোঝাচ্ছেন তিনি; তখনই একসঙ্গে ঢুকলেন ওয়েস হল, সিমুর নার্স আর ক্যামি স্মিথ। স্মিথ এসেই বেরিয়ে গেলেন। গর্ডন গ্রিনিজেরও কী যেন কাজ আছে বলে বিদায় নিলেন সবার কাছ থেকে। বাকিরা আরও কয়েকজন আর বিয়ারের বোতল নিয়ে গোল হয়ে বসলেন একটা টেবিলে। একটা চেয়ার টেনে আমিও অংশ হয়ে গেলাম সেই আড্ডার।

ওয়েস হল: কথাবার্তায় ফাস্ট বোলার সুলভ ঔদ্ধত্যহলের স্বাস্থ্যটা একটু ভেঙে গেছে, কিন্তু কথাবার্তায় একই রকম প্রাণবন্ত। ফাস্ট বোলার-সুলভ অহংকারও। ৪৮ টেস্টে ১৯২ উইকেট নিয়ে তাঁর সময়ের সেরা ফাস্ট বোলারদের একজন। তাঁর দেখা সেরা ফাস্ট বোলার হিসেবে নাম করলেন ট্রুম্যান, লিলি ও হোল্ডিংয়ের। পাশ থেকে একজন ব্রায়ান স্ট্যাথামের কথা বলতেই তাচ্ছিল্যভরে বললেন, ‘আমি শুধু ফাস্ট বোলিং নিয়ে বলছি। স্ট্যাথাম তো ঘণ্টায় ৮৪ মাইলের বেশি করতে পারত না।’

১৯৬০-৬১ সিরিজে ইতিহাসের প্রথম টাই টেস্টের শেষ ওভারটি করেছিলেন হল। অস্ট্রেলিয়ার জিততে লাগত ৬ রান, হাতে ছিল ৩ উইকেট। তখন আট বলের ওভার, এক বল বাকি থাকতে দুই দলের সমান স্কোরে অস্ট্রেলিয়া অলআউট। কত সহস্রবার যে সেই ওভারের স্মৃতিচারণা করতে হয়েছে হলকে! আমার অনুরোধে আবার করতে হলো, ‘ওরেল (উইন্ডিজ অধিনায়ক) আমাকে বলেছিল, আর যা-ই করো, নো বল করো না, তাহলে আর বারবাডোজে ফিরতে পারবে না। আমি তাই দুই ফুট দূর থেকে বোলিং করেছি। ২২ গজের জায়গায় ২৩ গজ দূর থেকে...এ কারণেই ওরা ব্যাটে বল লাগাতে পেরেছে।’ বলে হো হো হাসি। 

হলের উল্টো দিকেই বসে চার্লি গ্রিফিথ। হল-গ্রিফিথ নাম দুটি এক সঙ্গেই উচ্চারিত হয়। আরও বেশি হতো, যদি না অ্যাকশন নিয়ে সমস্যার কারণে অকালেই গ্রিফিথ হারিয়ে না যেতেন। টেস্ট খেলেছেন মাত্র ২৮টি। বলা ভালো, ২৮টির বেশি খেলতে পেরেছেন। তাতে ৯৪ উইকেট। বারবাডোজের অনেকের মুখেই অবশ্য শুনেছি, গ্রিফিথকে খেলতে না পারায় এটা ছিল সাদা দেশগুলোর ষড়যন্ত্র। সেই সময়ের ক্রিকেটে আরও অনেক 'চাকার' ছিলেন, কিন্তু গ্রিফিথকেই টার্গেট করা হয়েছিল কেন? উত্তরটা বাজানদের (বারবাডোজের মানুষকে এই নামেই ডাকা হয়) ঠোঁটের ডগাতেই থাকে, 'চার্লিই যে ছিল সে সময়ের সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলার। ব্যাটসম্যানরা ওকে ভয় পেত।'

অতীতের তিক্ততা আর নেই চার্লি গ্রিফিথের

গ্রিফিথ নিজে কী বলেন? সময় সব তিক্ততার ওপরই প্রলেপ বুলিয়ে দেয় বলেই হয়তো গ্রিফিথ হাসি মুখে বলতে পারলেন, 'পাস্ট ইজ পাস্ট। ওসব আর মনে রাখিনি।' গ্রিফিথের পাশেই বসে সিমুর নার্সও কি তা-ই? গ্রিফিথের চেয়ে একটি টেস্ট বেশি খেলেছেন। সেই ২৯ টেস্টে ৬ সেঞ্চুরি, ৪৭.০৬ গড়ে ২৫২৩ রান। জীবনের শেষ সিরিজে সেরা গড়ের রেকর্ড এখনো তাঁর। ৩ টেস্টে ১টি সেঞ্চুরি, ১টি ডাবল সেঞ্চুরি ও ১টি ৯০-এ ৫৫৮ রান—তারপরও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৯৬৮-৬৯ সিরিজের পরই অবসর নিয়ে নিলেন কেন?

নার্সকে দেখে প্রায় ৭৬ ছুুঁইছুঁই বয়স বোঝারই কোনো উপায় নেই। এই প্রসঙ্গটা তুলতে তা একটু বোঝা গেল। নার্সও যেন চার্লি গ্রিফিথের মতোই 'জীবনানন্দ দাশ', ‘কে হায়, হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!’—‘বাদ দাও, এই আনন্দের সন্ধ্যায় ও সব কথা থাক!’

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন