সিডনির দুঃস্বপ্নকে এথেন্সে কবর দিলেন ডলি

২০০৪ অলিম্পিক

উৎপল শুভ্র

২১ জুলাই ২০২১

সিডনির দুঃস্বপ্নকে এথেন্সে কবর দিলেন ডলি

ডলি আক্তার। ছবিটা যদিও এথেন্স অলিম্পিকের নয়, তবে নির্বিঘ্নে সাঁতার শেষ করে এমনই হাস্যোজ্জ্বল দেখাচ্ছিল তাঁকে। ছবি: প্রথম আলো

সিডনি অলিম্পিকে ডিসকোয়ালিফাইড হয়ে গিয়েছিলেন পুলে নামতে না নামতেই। পরবর্তী চার বছর তাই বাঁচতে হয়েছে সেই দুঃসহ জ্বালাকে সঙ্গী করেই। এথেন্স অলিম্পিকটা তাই ডলির জন্য কেবলই আরেকটা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মঞ্চ ছিল না, ছিল দুঃস্বপ্নকে কবর দেওয়ার মঞ্চও।

প্রথম প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০০৪। প্রথম আলো

স্টার্টিং ব্লকে যখন দাঁড়ালেন, সিডনি অলিম্পিকের কথা মনে পড়েছিল?

ডলি আক্তারের উত্তর, ‘মনে পড়েছিল। তবে আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, ওই ভুল আর হবে না।’

বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের জন্য অলিম্পিকের একটাই অর্থ। অংশ নেওয়ার জন্যই অংশ নেওয়া। তবে ডলি আক্তারের জন্য এই অলিম্পিকটা ছিল অন্য রকম। চার বছর ধরে তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল যে দুঃস্বপ্ন, এথেন্স অলিম্পিক ছিল সেই দুঃস্বপ্নটাকে কবর দেওয়ার সুযোগ। 

চার বছর আগে সিডনিতে সাঁতার শুরুর আগেই জলে পড়ে গিয়ে ডিসকোয়ালিফায়েড হয়ে গিয়েছিলেন। এই অলিম্পিকেরই অস্ট্রেলিয়ান ট্রায়ালে প্রিয় ইভেন্ট ৪০০ মিটার ফ্রি স্টাইলে একইভাবে ডিসকোয়ালিফায়েড হয়েছিলেন ইয়ান থর্প। কিন্তু তিনি তো ইয়ান থর্প আর ইনি ডলি আক্তার। থর্পের জন্য যেখানে অস্ট্রেলিয়ায় সমবেদনার ঢেউ, বাংলাদেশে ঝড় সমালোচনার। ডলির ভুলটাকে কেউ ‘ভুল’ ভাবল না, সেটি হয়ে গেল ‘অপরাধ’। এর আগে-পরের বাকি সবকিছু মিথ্যে হয়ে গিয়ে শুধু এই কলঙ্কটাই হয়ে গেল ডলির পরিচয়। এথেন্স আসার আগেও যাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, তিনিই লবণ ছিটিয়েছেন চার বছর পরও ‘কাঁচা’ হয়েই থাকা সেই ঘায়ে, ‘এবারও ডিসকোয়ালিফায়েড হয়ে এসো না।’

হাতে পতাকা, পরনে শাড়ি। বিশ্বমঞ্চে ডলি। ছবি: সংগৃহীত

চার বছর ধরে বুকের ওপর চেপে থাকা সেই পাথরটাকে কাল সকালে এথেন্সের সুইমিংপুলে ডুবিয়ে দিয়ে হাসিমুখে উঠে এলেন ডলি আক্তার। দিনের প্রথম হিটে তাঁর সঙ্গে আর মাত্র দুজন প্রতিযোগী। ‘হিটে ডলির তৃতীয় না হয়ে উপায় নেই’— শোনা যাচ্ছিল এমন রসিকতা। ডলির কানেও তা গিয়েছিল কি না কে জানে, জীবনের সেরা সাঁতারটি সাঁতরালেন তিনি। কঙ্গো আর লিবিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকে শুরুতেই পেছনে ফেলে দিয়ে ১.২৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে তাঁর হিটে প্রথম। প্রতিটি হিট শেষেই বিজয়ীকে ক্লোজআপে ধরে টেলিভিশন। অলিম্পিক ইতিহাসে এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো ক্রীড়াবিদের ক্লোজআপও দেখা গেল ডলির সৌজন্যেই। 

তাঁর হিটে প্রথম হতে পারেন, তবে ৭৩ জন প্রতিযোগীর মধ্যে ৬১তম। সেটি নিয়ে ডলির মাথাব্যথা নেই। ৩০.৭২ সেকেন্ডে সাঁতার শেষ করেছেন, ৩১ সেকেন্ডের নিচে ৫০ মিটার সাঁতরালেন এই প্রথম। এই ইভেন্টে আগের জাতীয় রেকর্ডটা তাঁরই ছিল বলে জানালেন। তা-ই যদি হয়, নিজের গড়া জাতীয় রেকর্ডই ভাঙলেন কাল।

আগের দিন ৫০ মিটার ফ্রি স্টাইল সাঁতরে জুয়েল আহমেদ বলেছিলেন, তাঁর আসল ইভেন্ট বাটারফ্লাই। কাল ডলি জানালেন, ফ্রি স্টাইল তাঁরও সেরা ইভেন্ট নয়, সেটি আসলে ব্রেস্ট স্ট্রোক। অলিম্পিকে কোয়ালিফাইংয়ের নিয়মকানুনের জালে পড়ে ফ্রি স্টাইলই সাঁতরাতে হলো তাঁকে। 

এ নিয়ে কোনো অনুযোগ নেই ডলির। সিডনির দুঃস্বপ্নটাকে কবর দিতে একটা কিছু সাঁতার হলেই তাঁর হতো। ‘সিডনি অলিম্পিকের পর কী যে সব দিন গেছে! আমি শুধু আরেকটি সুযোগ চেয়েছিলাম। আজ আমার সেরা টাইমিং করেছি, আমার আর কোনো দুঃখ নেই।’ কথাগুলো বলার সময় ডলির মুখে হাসি, কিন্তু চোখ দুটো কি একটু চিকচিক করতে দেখলাম? 

হয়তো দেখার ভুল, হয়তো বা এথেন্সের তীব্র রোদের কারণেই মনে হলো অমন অথবা কে জানে, হয়তো বা...

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন