স্টেডিয়ামের এক কোণে হাজার তিন-চার বার্সেলোনা সমর্থকের দিকে তাকিয়ে একটু পর পর কী বলে চিৎকার করছিল মাদ্রিদিস্তারা?

না, সেটি আর জানাই গেল না। আশপাশে যাকেই জিজ্ঞেস করি, একটু বিব্রত হাসিতে একই উত্তর পাই, ‘নো ইংলিশো, স্প্যানিশো।’ অর্থাত্ ইংরেজি বলতে পারেন না, স্প্যানিশ পারেন। দ্বিতীয়টা না বললেও চলত। স্প্যানিশ যে বলতে পারেন, সেটি তো এস্তাদিও সান্টিয়াগো বার্নাব্যু স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ঢোকার পর থেকেই টের পাচ্ছিলাম।

আগে থেকেই চেয়ারে রেখে দেওয়া রিয়াল মাদ্রিদের সাদা পতাকা দুলিয়ে একটু পরপরই ‘হালা মাদ্রিদ’ বলে চিৎকারে কান ফেটে যাওয়ার জোগাড়। খেলা শুরু হওয়ার পর সেই চিৎকার ভাষা বদলাল অনেকবার। ভাষা তো বুঝি না, তবে বেশির ভাগ কোরাসই যে রিয়ালকে উদ্দীপিত করতে, তা অনুমান করতে সমস্যা হলো না। 

নিয়মিত বিরতি দিয়ে বার্সা সমর্থকদের জন্যও বরাদ্দ থাকল সামান্য সময়। সেটি বুঝলাম দুইভাবে। রাগ-রাগ ভাবাপন্ন লম্বা বাক্যটাতে ‘বার্সা’ শব্দটা ছিল। আর তা বলা হচ্ছিল গ্যালারির ওই ক্ষুদ্র অংশটার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। প্রীতি সম্ভাষণ যে নয়, সেটি বুঝতে স্প্যানিশ জানার প্রয়োজন পড়ে না। যেমন আরেকটি কোরাসে ‘মেসি’ শব্দটা শুনেই বুঝে ফেললাম, বার্সার আর্জেন্টাইনকে নিয়ে রচিত ব্যঙ্গাত্মক কিছুই হবে।

ক্লিয়ার শ্যাম্পু কিনে বাংলাদেশ থেকে এল ক্লাসিকো দেখতে এসেছে যে দলটা, তাদের সবাই বার্সেলোনা গ্যালারিতে। টিকিটের নিচের দিকে ছোট করে ‘বার্সেলোনা’ লেখা, যার মানে সেগুলো বার্সা সমর্থকদের জন্যই বরাদ্দ ছিল, যা হাতে পেয়ে বেশির ভাগই উচ্ছ্বসিত। এই দলে বার্সা সমর্থকই যে বেশি। 

দুটি টিকিটে শুধু বার্সেলোনা লেখা নেই। প্রবেশপথও ভিন্ন। এই সফরের সমন্বয়কারী তাজুল হোসেন প্রস্তাব করলেন, ‘সবার যখন একসঙ্গে বসা হচ্ছে না, চলেন, আমরা দুজনই আলাদা বসি।’

জীবনে প্রথম এল ক্লাসিকো দর্শন। চেহারায় যতই ভ্রমণক্লান্তি থাকুক না কেন, ছবি না তুললে কি হয়!

সেই বসার জন্য সিঁড়ি বেয়ে উঠছি তো উঠছিই। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত আসনের দেখা মিলল প্রায় মহাশূন্যে! এক দিকের গোলপোস্টের ঠিক পেছনে। এত খাড়া যে নিচের গোলপোস্টের সামনে বল এলে দেখার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে হয়। দূরের গোলপোস্টের সামনে কী হচ্ছে, স্পষ্ট দেখতে দূরবীন লাগে। লোভাতুর দৃষ্টিতে তাই কয়েকবার প্রেসবক্সের দিকে তাকালাম। সেটি অবশ্যই মাঠের মাঝখানে এবং মাঠের সমতল থেকেই গা এলিয়ে ওপরে উঠে যাওয়া। কোনো কিছু পেতে পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে সেটি যে অনেকটাই মূল্য হারায়—এই পুরোনো সত্যটাও উপলব্ধি করলাম নতুন করে। সাংবাদিক-জীবন মাঠের সেরা আসনে বসে খেলা দেখার যে সুযোগ দিয়েছে, এমন কোনো পরিস্থিতিতে না পড়লে সেটিকেই যেমন এখন আর কোনো প্রাপ্তি বলে মনে হয় না।

এল ক্লাসিকোতে সান্টিয়াগো বার্নাব্যুর প্রেসবক্সে থাকার চেয়ে দর্শক গ্যালারিতে থাকাটাই অবশ্য ভালো হয়েছে। আবেগের এত সব রূপের সঙ্গে যে নইলে পরিচয় হয় না। ম্যাচটাও তো হলো সে রকম! দেশ থেকে আসার আগে ঠিক যেমন চাওয়া ছিল। 

হ্যাটট্রিক তো করেছিলেনই, ভেঙে দিয়েছিলেন এল ক্লাসিকোতে ডি স্টেফানোর সবচেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ডও। নামটা বলার প্রয়োজন দেখছি না

না, রেজাল্টের কথা বলছি না। বার্সা জিতেছে বা রিয়াল হেরেছে—এতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। জানি, এমন কোনো দাবি বাংলাদেশে কাউকে বিশ্বাস করানো ক্রমশ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। একটা সময় আবাহনী-মোহামেডান নিয়ে যা হতো, এখন যে সেটির জায়গা নিয়েছে রিয়াল-বার্সা! কোনো এক দলের সমর্থক যেন হতেই হবে। এল ক্লাসিকো দেখতে আসছি জেনে অনেকেই যেমন প্রশ্ন করেছেন, কোন দলকে সাপোর্ট করবেন? ‘কোনো দলকেই না’ শোনার পর প্রতিক্রিয়াতেই বুঝেছি, বিশ্বাস করেননি। না করলে কী আর করা! আমি তো জানি, সাংবাদিকতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই কীভাবে কীভাবে যেন পেশাদার সত্তার কাছে সমর্থক সত্তা বিলীন হয়ে গেছে।

বার্নাব্যুতে ঢোকার সময় আমার তাই প্রত্যাশা ছিল শুধু একটাই। জীবনে প্রথম এল ক্লাসিকো দেখতে যাচ্ছি। আবার কবে দেখার সুযোগ আসবে, আদৌ আসবে কি না, কে জানে! ম্যাচটা যেন স্মরণীয় কিছু হয়। এমন একটা ম্যাচ, অনেক দিন পরও যেটির স্মৃতিচারণা হবে।

সেই চাওয়া তো পূরণ হলোই। ৪-৩ গোলে এল ক্লাসিকোর নিষ্পত্তি—ক্লাসিক প্রমাণ করতে আর কিছু না বললেও চলে। যেভাবে ঘন ঘন ম্যাচের রং বদলাল, তাতে ‘থ্রিলার’ কথাটাও এর সঙ্গে খুব যায়। তার পরও একটু আফসোস কিন্তু থেকেই গেল। দারুণ ম্যাচ হয়েছে, কিন্তু সেটি তো আরও দারুণ হতে পারত! শেষ ২৫ মিনিট রিয়াল ১০ জনের দল হয়ে যাওয়াতেই তো নষ্ট হয়ে গেল মজাটা! নইলে এই ম্যাচের সম্ভাবনা ছিল চিরকালীন এক ক্লাসিক হয়ে থাকার।

এ নিয়ে আফসোস করে আর কী হবে! যা পেয়েছি, তাতেই বরং খুশি থাকি। কোনো ম্যাচ মনে রাখতে খেলা ছাড়াও বাড়তি একটা মাইলফলক-টলক থাকলে সুবিধা হয়। সেটিও তো থাকল। অনেক দিন পরও গল্প করা যাবে, মেসি যে ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে এল ক্লাসিকোতে ডি স্টেফানোর গোলের রেকর্ড ভেঙেছিলেন, সেই ম্যাচেই আমার এল ক্লাসিকো অভিষেক!

আরও পড়ুন: এল ক্লাসিকো দর্শন-১: গুয়ের্নিকা ও অশান্তির মাদ্রিদে