টাউন হলের সামনের আন্ডারপাস থেকে একের পর এক ইঁদুরের ছাপ। অনুসরণ করে এগোলেই আপনি পৌঁছে যাবেন ছোট্ট নদীটার কাছে। ভিসার নদী। যে নদীতে একদিন এই শহরের সব ইঁদুর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। 

শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাঁ দিকে তাকালেই সেই পাহাড়, যে পাহাড়ের এক গুহায় গিয়ে ঢুকেছিল হ্যামিলনের সব শিশু। সব মিলিয়ে ১৩০ জন। তারা আর ফিরে আসেনি। 

এই গল্প আমরা ছোটবেলায় পড়েছি। বিশ্বের প্রায় সব শিশুই পড়েছে। হ্যানোভার থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের এই ছোট্ট শহরে এসে মনে হলো,‘দ্য পাইড পাইপার অব হ্যামিলন’  বোধহয় কোনো লোকগাথা নয়, সত্যি সত্যিই অমন হয়েছিল! 

প্লেগের ভয়ে আতঙ্কিত শহরের লোকজন বাঁশি হাতে রঙচঙে পোশাকের এক আগন্তুককে কথা দিয়েছিল, শহরের সব ইঁদুর শেষ করে দিতে পারলে তাকে স্বর্ণমুদ্রা দেওয়া হবে। বাঁশি বাজল, আর বাড়িঘর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করল ইঁদুরের মিছিল। বাঁশিওয়ালা বাঁশি বাজাতে বাজাতে নদীর দিকে হেঁটে গেল। তাঁকে অনুসরণ করে ইঁদুরগুলো সব ঝাঁপিয়ে পড়ল নদীতে। 

কাজ হয়ে গেছে দেখে স্বর্ণমুদ্রা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভুলে গেল হ্যামেলিনবাসী। বাঁশিওয়ালা চলে গেল। ফিরে এল কদিন পর। হ্যামিলনের বড়রা সবাই তখন গির্জায় প্রার্থনারত। বাঁশিওয়ালার পরনে সেদিন মলিন পোশাক। তাঁর বাঁশিতে অদ্ভুত একটা সুর উঠল, আর বাড়িঘর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করল শিশুরা। বাঁশিওয়ালার পেছনে পেছনে হাঁটতে হাঁটতে তারা ঢুকে গেল পাহাড়ের এক গুহায়। ফিরে এল মাত্র দুটি শিশু। একজন অন্ধ, পথ হারিয়ে ফেলেছিল। অন্যজন বোবা-কালা, শিশুগুলো কোথায় হারিয়ে গেল জানানোর ক্ষমতা নেই।  

হ্যামেলিন রেলওয়ে স্টেশনে নেমে যতই শহরের দিকে এগোবেন, মনে হবে শহরটা এখনো প্রায় আট শতাব্দী আগের সেই লোকগাথাতেই বিভোর হয়ে আছে। স্টেশন থেকে বেরোতেই ইঁদুরের মূর্তি। শহরের মাঝখানে ইঁদুরের মূর্তি। উঁচু একটা স্তম্ভে ওই বাঁশিওয়ালার ভাস্কর্য। গির্জার জানালায় তাঁর ছবি। প্রেস সেন্টারে স্বাগত জানাবে ইঁদুর। গেট থেকে ভেতরে আসতে আসতে দেখা হয়ে যাবে আরও তিনটি ইঁদুরের মূর্তির সঙ্গে। কোনোটি সাদা, কোনোটি লাল, কোনোটি ধূসর। 

সেই প্রেস সেন্টারের ওপরে ফরাসিতে লেখা এক ব্যানার: ‘বার্লিন! বার্লিন! আমরা যাব বার্লিন!’বিশ্বকাপের শুরু থেকেই লাগানো ছিল? ফ্রান্স তো বার্লিন যাচ্ছেই। লোকগাথার এই শহরেই ফরাসিদের বিশ্বকাপ ক্যাম্প এবং এখানে অনেক বিনিদ্র রাত কাটানোর পর রেমন্ড ডমেনেখ এখন হাসছেন। তাঁর কথাই যে সত্যি হয়েছে! যে কথা নিয়ে একসময় সবাই হাসাহাসি করেছে। 

নাইনথ অব জুলাই! নাইনথ অব জুলাই! নাইনথ অব জুলাই! শুনতে শুনতে সাংবাদিকদের মনে হচ্ছিল, নাম জিজ্ঞেস করলেও ডমেনেক নাইনথ অব জুলাই বলে ফেলেন কি না! ফ্রান্সের প্রথম রাউন্ড পেরোনো নিয়েই সংশয়। ডমেনেখ বলেছেন,‘আমরা শুধু নাইনথ অব জুলাই নিয়ে ভাবছি।’ দ্বিতীয় রাউন্ডে স্পেন, ডমেনেখ নাইনথ অব জুলাই নিয়ে ভাবছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল, ডমেনেখ নাইনথ অব জুলাই নিয়ে ভাবছিলেন। সেমিফাইনালে পর্তুগাল, ডমেনেখ তখনো নাইনথ অব জুলাই দেখতে পাচ্ছেন। এখন সত্যি সত্যিই সামনে নাইনথ অব জুলাই । ডমেনেখ এখন সঁজে লিজের সংবর্ধনা নিয়ে ভাবছেন।

দুপুর ২টায় ফ্রান্স দলের সংবাদ সম্মেলন। সাংবাদিকরা সবাই জিদান-অঁরিকে চান। নিদেনপক্ষে থুরাম-ত্রেজেগে-ভিয়েরা। অথচ এলেন গোভু আর স্যানিয়েল। বড় ম্যাচের আগে অঁরি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন না। জিদান তো পারলে কখনোই বলতেন না। লেকিপ পত্রিকার ফরাসি সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করছিলাম, ফ্রান্সে খেলাধুলার তারকাদের মধ্যে জনপ্রিয়তায় জিদান কয় নম্বরে? ওই সাংবাদিক হেসে বললেন,‘শুধু খেলাধুলা বলছ কেন, ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পর থেকে সব মিলিয়েই জিদান ফ্রান্সের জনপ্রিয়তম লোক। তবে এতে ও খুব বিব্রত।’নিজের খেলার মতোই মানুষ জিদানও নরম-লাজুক-অন্তর্মুখী। প্রচারের আলো তাঁর চোখে লাগে। 

হ্যামেলিন শহরের এখানে-ওখানে মাথায় টুপি আর রঙচঙে পোশাক পরে‘বাঁশিওয়ালা’রা ঘুরে বেড়ায়। প্রেস সেন্টারের সামনেও দেখা মিলল একজনের। কয়েক শতাব্দী আগের অমন অদ্ভুতুড়ে পোশাক, এদিকে কথা বলছেন মোবাইল ফোনে। দেখার মতো এক দৃশ্য। ফ্রান্সের এই দলে হ্যামেলিনের বাঁশিওয়ালা কে, সেটি সবারই জানা। সেটিই আবার বলে গেলেন গোভু, ‘জিজু ভালো খেলছে, এটাই আমাদের বড় শক্তি। আমরা আর কাউকে ভয় পাই না’

বিশ্বকাপের ছয় ম্যাচে একটাই গোল খেয়েছে ইতালি, সেটিও আবার আত্মঘাতী। সাইড ব্যাক স্যানিয়েলের মুখে তাই ইতালিয়ান ডিফেন্সের প্রশংসা। তবে এর পরই ক্রমশ উত্তুঙ্গে ওঠা ফরাসি আত্মবিশ্বাস।‘ইতালির ডিফেন্স ভালো। তবে আমাদের তা ভাঙার ক্ষমতা আছে। প্রতি ম্যাচেই আমরা উন্নতি করেছি। বিশ্বকাপ জিততে ঠিক সময়ে পিক-এ উঠতে হয়। আমরা তা-ই উঠেছি।’

এবার বাকি শুধু ফাইনাল। শেষবারের মতো বাঁশিতে সুর তুলবেন ‘মার্সেইয়ের বাঁশিওয়ালা’। ইঁদুর নয়, শিশু নয়। সুরে সুরে একটি জিনিসকেই ডাকবেন জিনেদিন জিদান। বিশ্বকাপ!