জিদানের মায়াবী ছোঁয়া, অঁরি-ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর স্প্রিন্টারের গতি, পায়ের ভিড়ের মধ্যে ডেকো-রিবেরির ড্রিবলিং—হাত দশেক দূর থেকে এসব দেখতে কেমন লাগে বলুন তো! টেলিভিশনে দেখার কথা বলছি না। এই বিশ্বকাপে এসে নতুন যেসব উপলব্ধি হলো, তার মধ্যে এক নম্বরে তো এই মাঠে আর টেলিভিশনে খেলা দেখার পার্থক্য। টেলিভিশনে ফুটবল দেখা আসলে একেবারেই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মাঠে বসে অনেক দেখেছি, ভবিষ্যতেও দেখব। ক্রিকেট মাঠের চেয়ে টেলিভিশনেই বেশি ভালো কি না, এ নিয়েও কথা হতে পারে। তবে ফুটবল আসলে মাঠে বসে দেখার জিনিস এবং এ-ও জানি যে, সেটি টেলিভিশনেই বেশি দেখতে হবে। তবে ওই ‘দুধ’ আর ‘ঘোল’-এর উপমাটা বোধ হয় বাকি জীবনের জন্য সঙ্গী হয়ে গেল। 

এত দিনে এই কথা কেন? বিশ্বকাপে এসে খেলা দেখতে শুরু করার পর থেকেই উপলব্ধিটা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি হলো গত পরশু ফ্রান্স-পর্তুগাল সেমিফাইনালে। সাংবাদিকদের খেলা দেখার জন্য মিউনিখের স্টেডিয়ামটা রীতিমতো স্বর্গ। অনেক স্টেডিয়ামেই প্রেসবক্স দোতলা-তিনতলা উচ্চতায়। ফ্রান্স-টোগো ম্যাচ তো দেখেছি প্রায় মহাকাশের কাছাকাছি বসে! মিউনিখে মাঠ যেখানে শেষ, প্রেসবক্স শুরু সেখান থেকেই। পরশুর সেমিফাইনালে সেটিরই দ্বিতীয় সারিতে আমার আসন। মাঠের এ পাশটাতে যখন খেলা হচ্ছে, জিদানের নাক থেকে ঘামের ফোঁটা পড়তে দেখছি। যেন শুনতে পাচ্ছি রোনালদো-অঁরির নিঃশ্বাসের শব্দ!

আচ্ছা, জিদানের বুটে কি আঠা-টাঠা কিছু লাগানো আছে! মাঝরাতে টেলিভিশনে রিয়াল মাদ্রিদের খেলা দেখে অনেকবারই এ ভেবে শোয়া থেকে ঝট করে উঠে বসেছি। আর গত পরশু চোখের সামনে জিদান ঘিরে ধরা তিন পর্তুগিজের মাঝখান থেকে যেভাবে বলটা বের করলেন, তা দেখে ‘নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছি না’ কথাটার সত্যিকার মানে খুঁজে পেলাম। বাঁ দিকে গেলেন, ডানে গেলেন, অত বড় শরীরটা নিয়ে ওটুকু জায়গার মধ্যে টার্ন করলেন, বল পায়েই আছে! রেফারি খেলা থামিয়ে আবার জিদানের বুট পরীক্ষা করতে চাইলে তাঁকে দোষ দেওয়া যেত না!

দেখতে দেখতে রীতিমতো মোহাচ্ছন্ন অবস্থা, তবে শুধু যে মাঠের ম্যাচ দেখলেই চলছিল না। ঠিক সামনেই সাইডলাইনের পাশে যে আরেকটি ম্যাচ হচ্ছে! লুই ফেলিপ স্কলারি বনাম রেমন্ড ডমেনেখ। তাতে অবশ্য মাঠের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। স্কলারিই গোল করে যাচ্ছেন!

এর আগে টেলিভিশনে তাঁর এই রূপ অনেকবারই দেখেছি। তবে ওই যে বললাম, টেলিভিশনে ফুটবল দেখা আর মাঠে বসে দেখায় আকাশ-পাতাল পার্থক্য। টেলিভিশন তো আর নিরবচ্ছিন্নভাবে একজনকে ক্যামেরায় ধরে রাখে না। মাঠে বসেও দেখেছি, তবে এত কাছ থেকে নয়। পরশু যেখানে বসেছি, ঠিক তার সামনেই বাঁ দিকে স্কলারি, ডানে ডমেনেখ। ডমেনেখ বেশির ভাগ সময় অদৃশ্যই থাকলেন, তাঁকে যে বেঞ্চেও বসতে হচ্ছিল। স্কলারির দাঁড়িয়ে থাকাতেই আনন্দ। সব মিলিয়ে পুরো ম্যাচে চার-পাঁচবার বসেছেন কি না সন্দেহ!

এথেন্স অলিম্পিকে আর্জেন্টাইন কোচ মার্সেলো বিয়েলসাকে ৯০ মিনিট দেখে এতই অবাক হয়েছিলাম যে, এ নিয়েই একটা লেখা লিখে ফেলেছিলাম। স্কলারিকে মনে হচ্ছে বিয়েলসার বাবা। সাইডলাইনের বিয়েলসাও যথেষ্টই বিনোদন, তবে তাঁর সিলেবাসে প্রতিপক্ষের বেঞ্চের দিকে কটাক্ষ আর টিটকিরি ছিল না।

বিয়েলসার মতো স্কলারিও সারাক্ষণই বিড়বিড় করে কী যেন বলেন! যখন বলেন না, তখন চিৎকার করেন। একটু পরপরই দু হাত বাড়িয়ে এমন একটা অসহায় ভঙ্গি করেন যে, তাঁকে তখন শিশুর মতো লাগে। পর্তুগিজ খেলোয়াড়রা কোনো ভুল করলে যে মুখভঙ্গিটা করেন, তাতে আরও বেশি। ডমেনেখকে টীকা-টিপ্পনি কাটাটাও তো শিশুতোষ ব্যাপারই।

একবার ঠিক সামনেই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর বিপক্ষে রেফারি ফাউল দেওয়ার পর ডমেনেখ দু হাত দিয়ে ডাইভ দেওয়ার ভঙ্গি দেখালেন। আর যায় কোথায়, স্কলারি তাঁর দিকে আঙুল তুলে সমানে কী যেন বলে যেতে লাগলেন। পারলে ডমেনেখকে মারেন আর কি! বেচারা ডমেনেখ তাড়াতাড়ি বেঞ্চে ফিরে গিয়ে বাঁচলেন!

স্কলারির সঙ্গী-সাথীরাও তাঁর সঙ্গে সঙ্গত করে যাচ্ছিলেন। পর্তুগালের দুটি ম্যাচ দেখে মনে হলো এদের ম্যাচে চতুর্থ রেফারির দায়িত্বটা বোধ হয় কোনো ‘শাস্তিমূলক ব্যবস্থা'। পর্তুগালের বিপক্ষে রেফারি যেকোনো সিদ্ধান্ত দিতেই একযোগে ছুটে বেরিয়ে আসছেন সবাই। মাঠের রেফারি সব সময় শ্রবণসীমার মধ্যে না থাকায় ঝড়টা যাচ্ছে পাশে বসা চতুর্থ রেফারির ওপর দিয়েই। একটু পরপরই তাঁকে উঠে গিয়ে বুঝিয়ে-শুনিয়ে বেঞ্চে ফেরত পাঠাতে হচ্ছে পর্তুগিজদের। ফ্রান্স পেনাল্টি পাওয়ার পর তো একজন মাঠে পানির বোতলও ছুড়লেন। আর স্কলারি তখন সমানে ডমেনেখকে কী যেন বলে যাচ্ছেন। তা যে গালাগালি, তা বুঝতে ভাষা কোনো বাধাই হতে পারছে না।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মার্কিং-টার্কিংয়ে খুব একটা উৎসাহ দেখতে না পেয়ে স্কলারি এমনভাবে বেঞ্চের দিকে এগোলেন যে, মনে হলো, এখনই বোধ হয় ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন।

জিদান গোল করলেন, ফ্রান্সের বেঞ্চে স্বাভাবিকভাবেই উল্লাস। স্কলারি তাদের সমানে হাত দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছেন অঁরি ডাইভ দিয়ে পেনাল্টি আদায় করেছেন! ‘খোঁচানো’ বলতে আমরা যা বুঝি, ঠিক তা-ই। অন্য সব কোচরা বদলি হিসেবে নামানোর জন্য ওয়ার্মআপরত খেলোয়াড়দের ডেকে আনতে সহকারীদের পাঠান। স্কলারির অত সময় নেই। ভাঙা গলায় চিৎকার করে নিজেই পালন করলেন সেই দায়িত্ব। খেলোয়াড়দের নির্দেশ দিতে মাঝে-মধ্যে ডমেনেখকেও চিৎকার করতে হচ্ছিল এবং প্রতিবারই স্কলারি তাঁর দিকে এমন রোষকষায়িত দৃষ্টিতে তাকালেন যে, তার অর্থ হতে পারে একটাই- ‘চিৎকার করলে আমি করব। হতচ্ছাড়া তোকে আবার এই অধিকার কে দিল?’

আর নিজের খেলোয়াড়দের নির্দেশ তো স্কলারি অনবরতই দিয়ে গেলেন। ফরাসি খেলোয়াড়দের পায়ে বল গেলেই ‘ক্রিস্টিয়ানো’‘ক্রিস্টিয়ানো’ বলে চিৎকার করে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে মার্কিং করতে বলছিলেন। শুনেও না শোনার ভান করা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মার্কিং-টার্কিংয়ে খুব একটা উৎসাহ দেখতে না পেয়ে একবার এমনভাবে বেঞ্চের দিকে এগোলেন যে, মনে হলো এখনই বোধ হয় ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে বাড়ি ফিরে যাবেন।

শেষ বাঁশি বাজার পর কী করেন, তা দেখার জন্য কৌতূহলভরে অপেক্ষা করছিলাম। শুরুটা প্রথাগতই ছিল। পর্তুগিজ খেলোয়াড়দের সান্ত্বনা-টান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। হঠাৎই ছিটকে পেছনে ঘুরলেন। রেফারিদের বেরিয়ে আসতে দেখেছেন যে! ফিফার দু-তিন কর্মকর্তা মিলে না আটকালে স্কলারির ভাবভঙ্গি সুবিধার ছিল না।

প্রচুর আনন্দ দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতাবোধ আছে, সঙ্গে একটু মায়াও লাগল। একটা ম্যাচের ধকল সামলাতে তো স্কলারির বেশ কয়েক দিন লেগে যাওয়ার কথা।