ইউসেবিও স্বর্গ থেকে দেখছেন। মারিও কলুনাও। আর আপনি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, হাল ছেড়ে দিলেন?

কাজটা কঠিন, কিন্তু এই বিশ্বকাপে আসার পথটাও কি তা-ই ছিল না? সুইডেনের বিপক্ষে প্লে-অফে ৪ গোল করে আপনিই তো বিশ্বকাপে নিয়ে এলেন পর্তুগালকে। আর এখন শেষের আগেই হাত তুলে  আত্মসমর্পণ করে ফেলছেন! না, সিআর সেভেন, এটা আপনাকে মানায় না।

আপনাকে কি কথাগুলো বলছে কেউ? কেউ কি মনে করিয়ে দিচ্ছে, নতুন বছরের প্রথম দিনের সেই টুইট—‘আমি সাফল্যের জন্য আরও বেশি ক্ষুধার্ত। এ বছর আমি আরও বেশি ঢেলে দেব নিজেকে। গত বছরের ৬৯ গোলকে ছাড়িয়ে যাওয়া কঠিন, তবে বরাবরের মতোই আমি আমার সর্বস্ব উজাড় করে দেব। আমার বিশ্বকাপটা স্মরণীয় করে রাখবই।’

হায়, হায়, গোলহীন আপনার বিশ্বকাপ যে প্রথম রাউন্ডেই শেষ হতে চলল! তাতে কোনো ছাপ না রেখেই চলে যাবেন?

বছরের শুরুতে ব্যালন ডি’অর হাতে নিয়ে কেঁদেছেন। সেটি উৎসর্গ করেছেন এর কদিন আগেই প্রয়াত ইউসেবিওকে। আপনার এত সব অর্জনের পরও যাঁকে পর্তুগালের সর্বকালের সেরা মনে করেন, এমন লোকের অভাব নেই। এর মাস খানেক পর চলে গেলেন ১৯৬৬ বিশ্বকাপে পর্তুগালের অধিনায়ক কলুনাও। দুই পর্তুগিজ কিংবদন্তিকে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ হয়ে এসেছিল এই বিশ্বকাপ। আর সেটি থেকে মাথা নিচু করে বিদায় নেবেন আপনি, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়?

১৯৬৬ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে পর্তুগিজ নায়ক ইউসেবিও

কলুনা-ইউসেবিওদের কল্যাণেই পর্তুগালের প্রথম বিশ্বকাপে খেলা। আবির্ভাবেই হইচই ফেলে দেওয়ার মূলেও ইউসেবিও। উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ওই ম্যাচের গল্প শুনতে শুনতেই আপনি কি বড় হননি? ম্যাচের ২৫ মিনিটের মধ্যেই পর্তুগাল পিছিয়ে পড়ল ৩ গোলে। এর পর শুরু হলো ইউসেবিওর খেলা। টানা চারটি গোল করলেন। হ্যাঁ, এর দুটি ছিল পেনাল্টি থেকে। কিন্তু এর একটি তো আদায় করেছিলেন নিজেই। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে চমকপ্রদ প্রত্যাবর্তনের গল্পটা লিখে পর্তুগাল জিতে গেল ৫-৩ গোলে। 

সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হারের পর কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছেড়েছিলেন ইউসেবিও। পর্তুগিজ ফুটবলে যা অমর হয়ে আছে ‘জোগো দাস লাগরিমাস’ অর্থাৎ ‘কান্নার ম্যাচ’ নামে। সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারিয়ে তৃতীয়, এখনো যা বিশ্বকাপে পর্তুগালের সেরা ফল। একটা জায়গায় ইউসেবিও-ও সবাইকে ছাড়িয়ে। ৯ গোল করে গোল্ডেন বুট।

তৃতীয়র বদলে চতুর্থ হলেও বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খেলায় ইউসেবিওকে ছুঁয়েছেন। যদিও ২০০৬ বিশ্বকাপের পর্তুগাল এমন ‘রোনালদোর দল’ ছিল না। ফিগো-পলেতা-পস্টিগা-সিমাওদের সোনালি প্রজন্মের পাশে ২১ বছরের তরুণ আপনি খেললেন প্রথম বিশ্বকাপ।

শেষ বিশ্বকাপ কি এবারই? তাই যদি হয়, আজই হয়তো বিশ্বকাপে আপনার শেষ ম্যাচ। তাতে একবার ইউসেবিও হওয়ার চেষ্টা করবেন না? 

দুই যুগের দুই সেরা: ইউসেবিওর সঙ্গে রোনালদো

কাজটা খুবই কঠিন, হয়তো ইউসেবিওর চেয়েও। ইউসেবিওর নিজের ভাগ্য নিজের হাতে ছিল। আপনার তা নেই। ঘানাকে হারালেও তাকিয়ে থাকতে হবে ১২০০ মাইল দূরে জার্মানি-যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচের দিকে। সেই ম্যাচ ড্র হলে এই পর্তুগাল-ঘানার ফলাফলে কিচ্ছু আসে যায় না। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে যাবে জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্রই।

কিন্তু মহানাটকীয় এই বিশ্বকাপ নতুন কী নাটক লিখে রেখেছে, কে জানে! চার দলেরই তো সুযোগ আছে দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার। প্রথম ম্যাচে জার্মানি বিপক্ষে ৪ গোল খেয়ে বসায় আপনার পর্তুগালেরই হয়তো সবচেয়ে কম সম্ভাবনা। কিন্তু সমীকরণটা কঠিন হলেও অসম্ভব তো নয়। পর্তুগাল যদি ৩-০ গোলে ঘানাকে হারায়, আর যুক্তরাষ্ট্র ২-০ গোলে হারে, তা হলেই তো আপনাকে অন্তত আরও একটি ম্যাচ দেখতে পায় বিশ্বকাপ।

কিন্তু আপনি নিজেই তো দেখি হাল ছেড়ে দিয়েছেন। নইলে পর্তুগাল ‘অ্যাভারেজ টিম’, এই দল নিয়ে কখনোই বিশ্বকাপ জয়ের আশা করেননি এসব বলবেন কেন! এই সময়ে এসব কেউ বলে! ভেন্টিলেটারের সাহায্যে হলেও পর্তুগালের দমটা তো এখনো আছে।

ফিফা র‌্যাঙ্কিং যা-ই বলুক, পর্তুগাল হয়তো আসলেই ‘অ্যাভারেজ টিম’, কিন্তু এই বিশ্বকাপে আপনি নিজেও কি অ্যাভারেজ নন? চোটই হয়তো বড় কারণ, নইলে এই বিশ্বকাপের দুই ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে সমতাসূচক গোলটির উৎস ওই ক্রসটি ছাড়া আপনার কী অবদান? এই কি সেই রোনালদো, যাঁর সম্পর্কে ২০০৯ সালে ইউসেবিও বলেছিলেন, ‘আমি ওকে ব্যাখ্যা করতে পারি না। ও এখন অন্য এক বিশ্বের অধীশ্বর। এই মুহূর্তে ও-ই বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়।’

কাগজে-কলমে এখনো তো আপনিই বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়। এই বিশ্বকাপ শুরুর আগে তিনটি নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে, কিন্তু নেইমার-মেসির পাশে আপনি কোথায়? চ্যাম্পিয়নদের আত্মগর্ব থাকে। আপনার হয়তো তা একটু বেশিই আছে। স্প্যানিশ দৈনিক মার্কাকে বলা ওই কথাটা তো ইতিহাস হয়ে আছে। কেন আপনাকে অনেকে অপছন্দ করে, এর কারণটা ‘পরিষ্কার’ বলে দিয়েছিলেন, ‘কারণ আমি সুদর্শন, ধনী এবং গ্রেট এক খেলোয়াড়। এ কারণেই আমাকে ঈর্ষা। আমি তো আর কোনো কারণ খুঁজে পাই না।’ সেরা খেলোয়াড়দের আর কাকে কাকে দেখে মুগ্ধ হন প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন, ‘মাইসেলফ, ইন দ্য মিরর।’

আপনার সেই অহং কোথায় গেল, ক্রিস্টিয়ানো? আজ যে সেই অহংকে মাঠে নামিয়ে আনার দিন। বিশ্বকাপ যে আপনাকে এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে ফেলতে চায় না। আজ আপনার ইউসেবিও হয়ে ওঠার দিন। তাতেও যদি পর্তুগাল বিশ্বকাপে না থাকে, না থাকুক। আপনার চিহ্ন তো থাকবে!

আরও পড়ুন: ২০১৪ বিশ্বকাপ রোনালদোর পর্তুগালের বিদায়

                     ২০১২ ইউরো  হায়, রোনালদো!