মেসিকে পেয়ে পিএসজির অন্য লাভ-৩

অ্যাডাম ক্রাফটন

৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

মেসিকে পেয়ে পিএসজির অন্য লাভ-৩

লিওনেল মেসিকে পেয়ে শুধু পিএসজিই বা লিগ ওয়ানেরই নয়, বড় লাভ হতে পারে শহর প্যারিসেরও। সেটি কীভাবে? `দ্য অ্যাথলেটিক` বার্সেলোনা থেকে মেসিকে পাওয়ার পর পিএসজির আর্থিক লাভের হিসাবের সঙ্গে দেখার চেষ্টা করেছে প্যারিসের লাভও। উৎপলশুভ্রডটকম-এর পাঠকদের জন্য এরই অনূদিত রূপের তৃতীয় ও শেষ পর্ব এখানে।

মেসির আগমনে কি তাহলে পার্ক দে প্রিন্সেস হয়ে উঠবে সোনার ডিম পাড়া হাঁস? করোনার কারণে দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে খেলার দিন তো শেষ হয়ে আসছে। সমস্যা হলো, পিএসজির হোম গ্রাউন্ড পার্ক দে প্রিন্সেসের আসন সংখ্যা মাত্র ৫০ হাজার। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সাল থেকে পিএসজির প্রতিটি হোম ম্যাচের টিকেটই 'সোল্ড আউট' ছিল। স্কোয়াডে মেসি যুক্ত হওয়ায় পিএসজি তাদের টিকেটের দাম বাড়াতে পারে, ঘোষণা করতে পারে নতুন হসপিটালিটি প্যাকেজও। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ম্যাচ ডের টিকেট বিক্রি ক্লাবের সার্বিক আয়ের খুব একটা উল্লেখযোগ্য অংশ নয়। 

প্যারিস শহরের পর্যটন আকর্ষণকেও পিএসজি কাজে লাগাতে পারে নিজেদের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে। প্যারিস ও বার্সেলোনা দুটি শহরই ভ্রমণ পিপাসুদের পছন্দের তালিকায় ওপরের দিকেই থাকে। এক জরিপে দেখা যায়, বার্সেলোনা শহরে যত পর্যটক আসতেন, তাদের ১০ শতাংশ আসতেন মূলত ফুটবল ও মেসির টানে। নেইমার প্যারিসে যাওয়ার পর থেকে প্যারিসও একই সুবিধা পাচ্ছে। তাছাড়া ২০২৪ গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক প্যারিসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, ভ্রমণপিপাসু মানুষদের এবং ক্রীড়া পর্যটনের জন্য যেটা আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। এ কারণেই মেসিকে সই করানোর বিষয়ে যখনই ফ্রান্স সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল, সেটা সাথে সাথে চলে এসেছে। আর সেটা হবে না-ই বা কেন? পিএসজি ফরাসি সরকারকে গত এক দশকে বিভিন্ন কর বাবদ প্রায় ১.৯ বিলিয়ন ইউরো দিয়েছে। মেসির তারকাদ্যুতি আর প্যারিসের পর্যটন আকর্ষণের সাথে আরেকটা জিনিসের সংযোগ ঘটিয়ে দিতে পারে পিএসজি, সেটা হলো 'মাইকেল জর্ডান'। পিএসজির সাথে আগে থেকেই চুক্তিবদ্ধ এই কিংবদন্তি। চুক্তি হয়ে যাওয়ার পর সপরিবারে মেসি যেদিন প্যারিসে পা রাখলেন, তখন মেসির গায়ে চাপানো সাদা টি-শার্টে কী লেখা ছিল মনে আছে? লেখা ছিল 'Ici, c’est Paris', যার মানে দাঁড়ায়, এটাই তো প্যারিস।

প্যারিসে মেসির প্রথম ছবি। ছবি: গেটি ইমেজেসফোর্বস ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বছরের শুরুতে পিএসজির ব্র্যান্ড ভ্যালু ছিল প্রায় আড়াই বিলিয়ন ইউরো। যেটি মেসির আগমনের সাথে সাথে নিশ্চিত উর্ধ্বমুখী হয়েছে। আর ইউরোপের ক্লাবগুলোর কাছে নতুন ফ্যান-বেজ তৈরির আদর্শ টার্গেট হলো এশিয়ার ফুটবলভক্তরা। এই মুহূর্তে যেখানে একচ্ছত্র আধিপত্য ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনাইটেডের এই উর্বর ময়দানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হতে যাচ্ছে প্যারিস সেন্ট-জার্মেই। এফসি বার্সেলোনার সাবেক বিপণন কর্মকর্তা হুলি ফিয়েরে নাদাল জানাচ্ছেন একটা অন্যরকম তথ্য, 'ইউরোপ আর গ্লোবাল ফ্যান-বেজের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। ইউরোপের ফ্যানরা ক্লাবের প্রতি বেশি অনুগত। কিন্তু ইউরোপের বাইরে, বিশেষ করে এশিয়ায় বা আমেরিকায়, নির্দিষ্ট ক্লাবের চেয়ে তারকা খেলোয়াড়দের অনুসারী বেশি। ওখানে কেউ যদি মেসির ভক্ত হন, তাহলে তিনি মেসিকেই অনুসরণ করবেন। মেসি কোন ক্লাবে খেলছে, সেটা তার কাছে গৌণ বিষয়। পিএসজির ক্ষেত্রে বলতে পারেন, নেইমারের দলবদলের সময় তারা যতটা আলোড়ন তৈরি করতে পেরেছিল, মেসির দলবদলের মাধ্যমে সেটা আরও বেশি সাড়া ফেলে দিয়েছে।'

'বার্সেলোনায় আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, মেসির বাণিজ্যিক আকর্ষণ ছিল চুম্বকের মতো। আমাদের একটা অনুষ্ঠানে মেসি, নেইমার, সুয়ারেজ তিন জনই ছিল, কিন্তু সবাই পাগল হয়ে গিয়েছিল মেসির সাথে একটা ছবি তোলার জন্য। সবাই মানে কিন্তু আমি সাধারণ ফুটবল-ভক্তদের কথা বলছি না, তারা ছিলেন বড় বড় সব সিইও বা এক্সিকিউটিভ। মেসির সাথে একটা ছবি তুলতে তাদের প্রাণান্তকর চেষ্টা আসলেই দেখার মতো ছিল। নেইমারও স্পন্সরদের কাছে পরম প্রার্থিত একজন তারকা, নেইমার নিজেই দুর্দান্ত একটা ব্র্যান্ড। কিন্তু মেসির হিসাবটা আলাদা। এটার সাথে কিছুর তুলনা করতে পারবেন না। মেসি যদি দুই বছর পিএসজিতে থাকে, তাহলে ওদের হাতে সময় আছে দুটো শীতকালীন, আর একটি গ্রীষ্মকালীন বিরতি। গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নস কাপে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণে পিএসজি এখন যেকোনো মূল্য হাঁকাতে পারে। ওরা বলবে, আমাদের 'মেসি-নেইমার-এমবাপ্পে' আছে। ফেল কড়ি, মাখো তেল।'

ছবি: রয়টার্সতাহলে সব মিলিয়ে মেসির পেছনে ব্যয় করা অর্থের ঠিক কতটা পিএসজি তুলে আনতে পারবে? হুলি ফিয়েরে নাদালের মতে এটা বেশ কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করছে, 'মেসি যদি কাতার বিশ্বকাপ জিতে ফেলেন, তাহলে এক হিসাব। তখন সেটা ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে। আবার পিএসজি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলে অন্য হিসাব। মেসি বা পিএসজির বড় কোনো শিরোপা জয় ক্লাবের ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়িয়ে দেবে নিশ্চিত। মোট কথা, আপনাকে বিনিয়োগ করে সাফল্য পেতে হবে। মেসির পেছনে কত টাকা বিনিয়োগ করে পিএসজি কত টাকা লাভ করল, সেটা সরাসরি বলা অসম্ভব। কিন্তু এটা নিশ্চিত করা বলা যায়, এই বিনিয়োগের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা অফুরন্ত।'

সমাপ্ত

*'দ্য অ্যাথলেটিক' থেকে ভাষান্তর: আজহারুল ইসলাম

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×