ফুটবলে নতুন ঝড়: দুই বছর পর পর বিশ্বকাপ?

ম্যাট স্ল্যাটার

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

ফুটবলে নতুন ঝড়: দুই বছর পর পর বিশ্বকাপ?

শুরু থেকেই চার বছরের চক্রে চলে আসছে বিশ্বকাপ ফুটবল। হঠাৎই আলোচনা শুরু হয়েছে প্রতি দুই বছর অন্তর বিশ্বকাপ আয়োজনের। শুরু হয়েছে এর পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কও। ফুটবল বিশ্ব দ্বিধাবিভক্তই বলতে পারেন এ নিয়ে। শেষ পর্যন্ত কে জিতবে? তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, দুই বছর পরপর বিশ্বকাপ হলে তা কি আবেদন হারাবে না? `দ্য অ্যাথলেটিক`-এর এই লেখায় উঠে এসেছে সবই।

আরও একবার লড়াইয়ের মঞ্চে হাজির ফুটবল। লড়াইয়ের শিরোনামটা তো জেনেই গেছেন এরই মধ্যে, 'ফুটবল বিশ্বকাপ কি দু'বছর পর পরই হচ্ছে?'

লড়াইয়ের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা, এর বৈশ্বিক উন্নয়নের প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গার, সৌদি আরব থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল ফেডারেশন, সঙ্গে ৮০টা শক্তিধর দেশের ফুটবল ম্যানেজার আর খেলোয়াড়। তাদের চাওয়া, বিশ্বকাপটা দু'বছর পর পরই হোক।

প্রথম পক্ষের কাছে যদি মাঠের বাইরের শক্তি থাকে তো অন্য পক্ষে দাঁড়িয়েছে উয়েফা আর এর অধিভুক্ত ক্লাবগুলো। প্রথম পক্ষে যদি ভোট থাকে তো তাদের আছে খেলোয়াড়, আছে অর্থ, আছে সর্বশেষ চার বিশ্বকাপজয়ী দলও। বিশ্বকাপের আসল রোমাঞ্চ তাদের পায়েই লুকিয়ে, এবং তারা বলছে, কোনোভাবেই দু'বছর পর পর বিশ্বকাপ হতে পারে না।

এমনিতে বিশ্ব ফুটবলের রাজনীতিতে নতুন কোনো পালাবদলের শুরুটা যেমনভাবেই হোক, শেষের অঙ্কটা একই থাকে বেশির ভাগ সময়। দুই পক্ষই কিছু কিছু ছাড় দিয়ে পৌঁছে যায় সমঝোতায়। কিন্তু এবারের 'কেন না' আর 'কোনোভাবেই না' দ্বন্দ্বের সন্ধি কিভাবে হবে, সেটাই বোঝা যাচ্ছে না এখনো। আসলেই কি আরও আন্তর্জাতিক ম্যাচের জায়গা আছে ফুটবলে, পাওয়া যায়নি এই প্রশ্নের উত্তরও।

দুই বছর পর পর বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে ফিফার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব আসেনি এখনো। তবে সেটা হলে কেমন হতে পারে, তার একটা ধারণা সম্প্রতি ফ্রেঞ্চ পত্রিকা লে'কিপকে দিয়েছেন আর্সেন ওয়েঙ্গার। নিজে ম্যানেজারি দায়িত্বে থাকাকালীন যা বলেছিলেন, তার সঙ্গে এখনকার বক্তব্যে সামান্য পার্থক্য থাকলেও, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পার্থক্যটা ঊনিশ-বিশের বেশি নয়। যেমন, আর্সেনালের দায়িত্বে থাকার সময়ও বারবার ফিফা প্রীতি ম্যাচের কারণে খেলোয়াড় হারানোটা পছন্দ ছিল না তাঁর। মৌসুমের মাঝপথে আফ্রিকান নেশনস কাপ এসে ক্লাবের বাঁধা সুরটা কেটে দিত বলে ওই টুর্নামেন্ট নিয়ে যারপরনাই বিরক্ত ছিলেন তিনি। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ফুটবলটা তাৎপর্যপূর্ণ থাকছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটার পক্ষেই মত ছিল তাঁর।ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোও (মাঝে) দুই বছর পরপর বিশ্বকাপ আয়োজনের পক্ষে। ছবি: গেটি ইমেজেস

আর এখনকার ওয়েঙ্গার বলছেন, বছরে আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য যে ছয়টা বিরতি দেওয়া হয়, পঞ্জিকা থেকে পুরোপুরিভাবে তুলে দেওয়া হোক সেসব। নেশনস লিগ আর প্রীতি ম্যাচের মতো অর্থহীন আয়োজন করে লাভ কী! তার বদলে অক্টোবরে আয়োজিত হোক বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব এবং জুন-জুলাইতে বসুক মূল পর্ব। দুই বছরের চক্রে এক বছর বিশ্বকাপ হলে পরবর্তী বছর বসবে ইউরো-কোপার মতো আসর। খেলোয়াড়দের ওপরও বারেবারে ভ্রমণক্লান্তি, অতিরিক্ত ম্যাচের চাপ আসবে না। একই সঙ্গে ওয়েঙ্গারের প্রস্তাব, গ্রীষ্মকালে বাধ্যতামূলকভাবে ২৫ দিনের ছুটি দিতে হবে খেলোয়াড়দের। নতুন সূচিতে ক্লাব ফুটবল আর আন্তর্জাতিক ফুটবলটা চলবে ৮০:২০ অনুপাতে।

ওয়েঙ্গারের আইডিয়াটা মনে ধরেছে ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোরও। সেটা ধরাই অবশ্য স্বাভাবিক। দুই বিশ্বকাপের মাঝের দূরত্ব দুই বছর কমে আসা মানে আয় দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়া। এখন প্রতি চার বছরের চক্রে ফিফার আয় চার বিলিয়ন, যার প্রায় পুরোটাই আসে বিশ্বকাপের বছরে। মাঝের তিন বছরে লাভের মুখ তো দেখেই না, উল্টো লোকসানই গুনতে হয়।

আর দুই বছর বাদে বিশ্বকাপ মানে দুই বছর পর পরই রাজনৈতিক আনুকূল্য পাওয়া, দুই বছর পর পরই বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দহরম-মহরমের সুযোগ, নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তির দৌড়ে এগিয়ে যাওয়া। ফিফা সভাপতি নিজের আর সংগঠনের লাভের জন্য বিশ্বকাপ ফি বছর চাইলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

তবে দুই বছরান্তে বিশ্বকাপের প্রস্তাব কিন্তু ফিফা কর্তাদের মস্তিষ্কপ্রসূত নয়, বরং গত মে'র কংগ্রেসে প্রস্তাবটা উত্থাপন করেছিল সৌদি আরব। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, লাভটা কেবল ফিফা আর এর সভাপতিরই নয়।

এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা পেয়েছে ৭৯টি দেশ। জনসংখ্যায় পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ভারত খেলতে পারেনি একবারও। এমনকি ২১টি দেশ সুযোগ পেয়েছে মাত্র একবার, যার মধ্যে চীন-কানাডা-ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও আছে। আর ৩৮টা দেশ অংশ নিতে পেরেছে তিনের কম আসরে; মিশর, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, সেনেগালের মতো ফুটবল-পাগল জাতিগুলোও যে দলে পড়ছে৷

বিপরীতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, যে ১৪টা দেশ বিশ্বকাপের অর্ধেকের বেশি আসরে খেলেছে, তার দশটিই ইউরোপের। বাকি চারটি নাম আপনি অনুমান করেই নিয়েছেন বোধ হয়: ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে এবং মেক্সিকো। বিশ্বকাপের ২১ আসরের ১২ বারই শিরোপা গেছে উয়েফা অধিভুক্ত দেশগুলোতে। ইউরোপের দলগুলো ছাড়া ফাইনালই হয়েছে তো মাত্র দু'বার, এবং ১৯৫০ সালের পর একবারও না।ছবি: টুইটার

ফিফার র‍্যাঙ্কিংয়েও ইউরোপেরই জয়জয়কার। সর্বশেষ প্রকাশিত র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ দশ দলের ছয়টিই ইউরোপের, আর শীর্ষ ২০-এ আছে ১৩টি দেশ। আফ্রিকার সেরা দল সেনেগাল আছে ২১ নম্বরে, যেখানে এশিয়ার সেরা জাপানের অবস্থান ২৪ নম্বরে।

ক্লাব বিশ্বকাপেও ইউরোপেরই জয়গান। ১৭ আসরের ১৩ বারই শিরোপা উৎসব করেছে ইউরোপের কোনো না কোনো ক্লাব। আর ওই টুর্নামেন্ট আয়োজনই সার, লাভ-টাভ হয়েছে বলে শোনা যায়নি তেমন।

ইউরোপের এই একাধিপত্যের টুর্নামেন্টে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোকেও এগিয়ে আনতে ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮, ক্লাব বিশ্বকাপও এরপর থেকে ২৪ দলের টুর্নামেন্ট হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফিফা, যদিও ওই টুর্নামেন্টের চেয়ে বিশ্বকাপ অনেক বেশি লাভজনক বলে মাঠে নামানোর আগেই ফিফা মন ঘুরিয়ে ফেলেছে।

ফিফা যে 'দুই বছর পর পর বিশ্বকাপ চাই' দাবির স্বপক্ষে বিরাট একটা অংশের সমর্থনও পাচ্ছে, তা বোঝা গেছে সৌদি আরব দাবিটা উত্থাপনের পরই। ১৬৬ দেশই ভোট দিয়েছিল প্রস্তাবের পক্ষে। আফ্রিকার ফুটবল কনফেডারেশনও (যে সংস্থা এখন বিশেষ ব্যবস্থায় ফিফার অধীনে চলছে) জানিয়েছে, আর ভোটাভুটির দরকার নেই, তাদের ৫৪টা দেশও রাজি আছে।

তবে ফিফা যে ওই দেশগুলোকে পাশে পাবে, সেটা তো আগে থেকেই জানা। একই রকম জানা, আপত্তিটা আসবে উয়েফার তরফ থেকে। এবং সেটা ইতোমধ্যেই এসে গেছে।

গত সপ্তাহেই ইসিএর কর্তারা বৈঠকে বসেছিলেন জেনেভায়। সেখানেই আরও নানা আলোচনার পর উঠেছিল দুই বছর পর পর বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রসঙ্গ। ম্যানচেস্টার সিটির প্রধান নির্বাহীর উত্তরটা সোজাসাপটা 'কোনো সুযোগই নেই। খেলোয়াড়েরা আর নিতে পারবে না।'

বায়ার্ন মিউনিখের আইনি দিকগুলো দেখভাল করেন যিনি, সেই মাইকেল গারলিঞ্জার কিছুটা নরম গলায় বললেও সুর মিলিয়েছিলেন সোরিয়ানোর সঙ্গেই, 'পরবর্তী বছর পর্যন্ত ফিফা ক্যালেন্ডারে আমরা সবাই ঐকমত্যে পৌঁছেছি। সেখানে এমন কিছুর উল্লেখ নেই। আর ফিফাও নতুন সূচি বানিয়ে কোনো প্রস্তাবনা আমাদের পাঠায়নি। তাই আমরা ধরেই নিচ্ছি, কোনো জায়গা নেই। দুই বছরান্তে বিশ্বকাপ আয়োজন অসম্ভব।'

লিডস ইউনাইটেডের চেয়ারম্যান আন্দ্রেয়া রাদ্রিজ্জানি অবশ্য চাইছিলেন সমঝোতায় যেতে। 'আমারও না, তোমারও না' মন্তব্য করে তিন বছর পর পর বিশ্বকাপ আয়োজনের চিন্তা-ভাবনা ছিল তাঁর। তবে ফিফা যেহেতু এটা নিয়ে কোনো আলোচনাই করেনি, তাঁর বাকি সহকর্মীরা তাঁকে দমিয়ে দিয়েছিলেন সঙ্গে সঙ্গেই।ইসিএর মিটিংয়ে খেলাইফি। ছবি: ইসিএ ইউরোপ

প্যারিস সেন্ট জার্মেই সভাপতি নাসের আল-খেলাইফি অবশ্য নিজের কূটনৈতিক-সত্বাকে হাজির করেছিলেন আবার, 'একপাক্ষিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত তো নেওয়া যাবে না। আমরা ফুটবলের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নির্ধারণে বাকি অংশীদারদের সঙ্গে কথা বলে দেখি, তারা কী ভাবছে…'

অংশীদারিত্বের কথা যদি বলাই হয়, তো দর্শকও বিবেচনায় আসা উচিত। কিন্তু এই লাভ-ক্ষতির হিসাবে তাদের কথা ধর্তব্যে নেওয়া হচ্ছে বলে মনে হয় না। ফিফা যদিও বলছে, আন্তর্জাতিক ফুটবলের আবেদন যে কমে যায়নি মোটেই, গত ইউরো আর কোপাই তার প্রমাণ। কিন্তু যে টুর্নামেন্টের আকাশচুম্বী আকর্ষণের পেছনে প্রতীক্ষারও বিরাট ভূমিকা, দুই বছর পর পর আয়োজন করলে রোমাঞ্চটা কি একই রকম থাকবে?

ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের কোনো কোনো কর্তা আবার ভাবছেন, আদতে দুই বছর অন্তর অন্তর বিশ্বকাপ হবেই না। বরং এই চাপ দিয়ে ইসিএ আর উয়েফার কাছ থেকে ক্লাব বিশ্বকাপের কলেবর বাড়ানোর সম্মতিটাই আদায় করতে চাইছেন ইনফান্তিনো। একজন তো মিটিং চলাকালেই বলেছিলেন, 'ইনফান্তিনোর মাথায় কী চলছে, এটা বোঝার সাধ্য কার!'

ওই ফুটবল-কূটনীতি গুলে খাওয়া মানুষগুলোই যখন ধরতে পারছেন না চাল, আমাদের আপাতত ধৈর্য ধরা ছাড়া গতি কী!

*'দ্য অ্যাথলেটিক' থেকে ভাষান্তর: রিজওয়ান রেহমান সাদিদ

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন