ববি রবসনের দোভাষী হয়ে যাঁর শুরু

টম ওরভিল্লি

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১

ববি রবসনের দোভাষী হয়ে যাঁর শুরু

শুরুটা হয়েছিল ২০০০ সালে। ২০২১ সালে এসে ম্যানেজার হিসেবে এক হাজারতম ম্যাচে ডাগ আউটে দাঁড়িয়েছেন জোসে মরিনহো। তাঁর আগে যা করতে পেরেছেন মাত্র তিনজন। উত্থান-পতনে ভরা মরিনহোর এই হাজার ম্যাচের পেছনের গল্পটা দারুণভাবে তুলে এনেছে `দ্য অ্যাথলেটিক`। উৎপলশুভ্রডটকম-এর পাঠকদের জন্য সেটির অনূদিত রূপ।

সোমবার (১৩ সেপ্টেম্বর) স্তাদিও অলিম্পিকোতে টান টান উত্তেজনার এক ম্যাচে স্তেফান এল শারাউয়ির শেষ মুহূর্তের গোলে সাসসুয়েলোর বিপক্ষে ২-১ গোলে জয় পায় রোমা।। দলটির কোচ জোসে মরিনহো, এমনিই মাঠে অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গি আর আলটপকা মন্তব্যের জন্য প্রায় সময় আলোচনায় থাকেন। সেদিনও ব্যতিক্রম হলো না, বাচ্চা ছেলের মতো দৌড়ালেন মাঠময়।

দৌড়াবেন না-ই বা কেন! এ ম্যাচ যে তাঁর জন্য বিশেষ এক উপলক্ষই ছিল। অ্যালেক্স ফার্গুসন, আর্সেন ওয়েঙ্গার, সাবেক গুরু ববি রবসন এবং স্বদেশি ফার্নান্দো সান্তোসের পর ম্যানেজার হিসেবে ১০০০ ম্যাচের মাইলফলক ছুঁয়েছেন মরিনহো। আর এই ম্যানেজারদের মধ্যে তাঁর জয়ের হারই সবচেয়ে বেশি...৬৩.৮ শতাংশ।হাজারতম ম্যাচের দিন

অথচ ১০০০তম ম্যাচের আগে মরিনহোর ভাবখানা এমন ছিল যেন এই ম্যাচ অন্য যেকোনো একটা ম্যাচের মতোই। কিন্তু ম্যাচ শেষে আর নিজের সেই ভাবখানা ধরে রাখতে পারেননি তিনি।

ড্যাজনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের মনের কোনে লুকিয়ে রাখা সেই কথাটা বলেছেন মরিনহো, ‘পুরো সপ্তাহ আমি মিথ্যা বলেছি। আমি বলেছিলাম, এটা কোনো বিশেষ ম্যাচ নয়। আসলে এটা আমার জন্য বিশেষ একটি ম্যাচ ছিল। হাজারতম ম্যাচে মনে রাখার মতো কিছু চেয়েছিলাম আমি।’

'ম্যাচটি হারা নিয়ে আমার অনেক ভয় ছিল। সৌভাগ্যবশত আমরা জিতেছি। আমি এমনভাবে দৌড়াচ্ছিলাম, যেন আমার বয়স ৫৮ নয়, ১০-১১ বছর। যখন আপনি ফুটবল শুরু করেন, তখন আপনি হয়তো এমন একটা দৌড় দেওয়ারই স্বপ্ন দেখেন।

'এমন এক বিশেষ দিনে জয় না পেলে উৎসবটাই মাটি হয়ে যেত। আর আমার মনে হয়, দল এই বিশেষ দিনে জয় পাওয়ার জন্য আরও বেশি উদ্দীপ্ত ছিল। ফুটবল ঈশ্বরও নাকি চেয়েছিলেন, মরিনহো তাঁর ১০০০তম ম্যাচে জয়ের হাসি হাসুক, এমনটাই বলেছেন আমাদের ক্রীড়া পরিচালক থিয়াগো।'বার্সেলোনায় অনুবাদক ছিলেন মরিনহো, পাশে গার্দিওলা

মরিনহো তাঁর ক্যারিয়ারে বেনফিকা, উনিয়াও দে লেইরার, পোর্তো, চেলসি (দুই মেয়াদে), ইন্টার মিলান, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, টটেনহাম ও রোমার ম্যানেজার ছিলেন। পুরো ক্যারিয়ার-জুড়েই সঙ্গী ছিল উত্থান-পতন ও অসংখ্য বিতর্ক। তবে পরিসংখ্যানের বিচারে ক্যারিয়ারে তাঁর সাফল্যের পাল্লাটাই ভারি। ৬৩৮ ম্যাচে জয়ের বিপরীতে ১৫৭ ম্যাচে হেরেছেন। ২০৫ ম্যাচ করেছেন ড্র।

পেশাদার ক্লাবের সাথে মরিনহোর পথ চলা শুরু ১৯৯২ সালে। পর্তুগিজ ক্লাব স্পোর্টিং লিসবনের দায়িত্ব নেন বিখ্যাত ইংলিশ কোচ ববি রবসন। একজন ইংরেজের পক্ষে পর্তুগিজ ভাষা শেখা কিছুটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, তাই রবসনকে সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শী জোসে মরিনহোকে তাঁর দোভাষী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অবশ্য শুধু ভাষায় পারদর্শিতার কারণেই মরিনহোকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল, এমনটা বললে ভুল হবে। বেশ কিছু ক্লাবে স্কাউটের দায়িত্ব পালন করা মরিনহোর ফুটবলজ্ঞানও এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

রবসনের অধীনে লিগে বেশ ভালোই খেলছিল স্পোর্টিং লিসবন। কিন্তু ১৯৯৩ সালের উয়েফা কাপে ক্যাসিনো সালস্বুর্গের কাছে হারার কারণে তাঁকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এরপর আরেক পর্তুগিজ ক্লাব পোর্তোর দায়িত্ব নেন রবসন, এবার অবশ্য অনুবাদকের বদলে মরিনহোকে সহকারী কোচ হিসেবে যুক্ত করেন তিনি। মূলত মরিনহোর স্কাউটিং দক্ষতায় মুগ্ধ হয়েই রবসনের এই সিদ্ধান্ত। রবসন-মরিনহো জুটি জমে উঠেছিল বেশ। রবসনের আক্রমণভাগের ট্যাকটিকস দুর্দান্ত হলেও রক্ষণভাগ সামলানোর ট্যাকটিকস অতটা ভালো ছিল না, এই দিকটা সামলানোর দায়িত্ব ছিল মরিনহোর ওপরই।

১৯৯৬ সালে বার্সেলোনার কোচ হিসেবে যাত্রা শুরু করেন রবসন। বার্সেলোনা অবশ্য রবসনের সাথে মরিনহোকে ক্লাবে আনার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। তবে চার বছরের সঙ্গী মরিনহোকে ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারে রবসন রাজি ছিলেন না, তাই মরিনহোকে কোচিং স্টাফের একজন হিসেবেই দলের সাথে রেখে দেন তিনি।

বার্সাকে অনেক কিছুই জিতিয়েছিলেন রবসন। কিন্তু তারপরও সন্তুষ্ট ছিল না বোর্ড। যে কারণে সরে যেতে হয় রবসনকে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন লুই ফন গাল। রবসন চলে গেলেও থেকে যান মরিনহো। রবসনেরই পরামর্শে ফন গালও তাঁকেই সহকারী হিসেবে রেখে দেন।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, পেপ গার্দিওলা তখন বার্সার খেলোয়াড় এবং তাঁর সাথে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতেন মরিনহো। শুধু পেপই নন; লরা ব্লাঁ, লুইস এনরিকে, রিভালদো, রোনালদো... সবার সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল স্পেশাল ওয়ানের। লুই ভন গাল-মরিনহো কম্বিনেশনে বার্সা টানা দুই মৌসুমে লা লিগায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে।যেখান থেকে তিনি `স্পেশাল ওয়ান`

অনেক জল্পনা-কল্পনার পর ২০০০ সালে বার্সা ছেড়ে পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকার প্রধান কোচ হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেন মরিনহো। বেনফিকায় মরিনহোর শুরুটা ভালো হয়নি। শুরুতেই ক্লাব কর্তৃপক্ষের রোষানলে পড়তে হয় সহকারী কোচ বাছাই নিয়ে। এর মধ্যে কিছুদিন পর আবার বদল হয় ক্লাব প্রেসিডেন্টের। তবে দলের পারফরম্যান্স বেশ ভালোই হচ্ছিল। তাই মরিনহো ভেবেছিলেন, নতুন প্রেসিডেন্টও তাঁর ওপর খুশি থাকবেন। কিন্তু না! নতুন প্রেসিডেন্টের সুনজরে পড়তে ব্যর্থ হন মরিনহো। ফলাফল, বেনফিকা থেকে বিদায়।

এরপর মরিনহো দায়িত্ব নেন পর্তুগালের এক অখ্যাত দল উনিয়াও দে লেইরার। সে দলকে শিরোপা জেতাতে না পারলেও জায়ান্ট বেনফিকা-পোর্তোকে হটিয়ে উনিয়াও উঠে যায় টেবিলের তিনে, যেটি তাদের ইতিহাস-সেরা সাফল্য।

মরিনহো যখন পোর্তোর হাল ধরেন, তখন পোর্তোর একদম করুণ দশা। লিগে অবস্থান ছিল পাঁচ নম্বরে। সেই পোর্তোকে মরিনহো শুধু লিগই নয়; সেই সাথে উয়েফা কাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগসহ তিন মৌসুমে ৬টি শিরোপা জেতান । তার আমলে চেলসি ও ইন্টার মিলানও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।

তবে জয়ের হার বিবেচনায় নিলে মরিনহোর সেরা সময় ছিল রিয়াল মাদ্রিদে, যেখানে তিনি ১৭৮টি ম্যাচের ১২৮টিতেই জয় পেয়েছিলেন। তবে শিরোপার হিসেবে হয়তো খুশি করতে পারেনি রিয়াল সমর্থক ও বোর্ডকে। তিন মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদে তাঁর অর্জন কেবল একটি লিগ, একটি কোপা দেল রে এবং একটি সুপার কাপ। যদিও মরিনহো যখন রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব নেন, তখন মাদ্রিদ অনেকটাই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। দলে তারকা খেলোয়াড় অনেকেই থাকলেও তাদেরকে নিয়ে একটা দলে পরিণত করার জন্য হয়তো আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন ছিল তাঁর।

চলবে...

*'দ্য অ্যাথলেটিক' থেকে অনুবাদ: শাওন শেখ শুভ

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন