পাঁচদিনেই পতন পিএসজি-মেসির!

কাশীনাথ ভট্টাচার্য

৩ অক্টোবর ২০২১

পাঁচদিনেই পতন পিএসজি-মেসির!

পাঁচ দিন আগেই ম্যানচেস্টার সিটিকে দু`গোলে হারিয়ে আকাশে উড়ছিল যারা, রেনেঁর বিপক্ষে ম্যাচে সেই দুই গোলে হেরেই মাটিতে নেমে এলো পিএসজি। মাঠে নেইমার-এমবাপ্পে-মেসি ত্রয়ীকে নামিয়েও মরিসিও পচেত্তিনো বুঝলেন, তাঁর সার্জিও রামোসকেই লাগবে।

উত্থানের পর পতন আসে, জগতের নিয়ম। ফুটবলে বোধ হয় বড্ড তাড়াতাড়ি!

এই তো গত মঙ্গলবার রাতেই ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে বিরাট জয়। রবিবার বিকেলেই বদলে গেল সব। পাঁচ দিনেই পতন পিএসজির, লিওনেল মেসিরও! লিগ ওয়ানে রেনেঁর বিরুদ্ধে ০-২ হারলেন মেসিরা। তিন গোলও হতে পারত। একটি পেনাল্টি রেনেঁর পক্ষে দিয়েও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির সিদ্ধান্তে নাকচ। যেমন, কিলিয়ান এমবাপ্পের একটি গোলও অফসাইডের কারণে বাতিল করল সেই ‘ভার’। লিগে আটটি ম্যাচ টানা জয়ের পর হার, নতুন ক্লাবে এসে ৯০ মিনিট মাঠে থেকেও যা আটকাতে পারলেন না মেসি।

আর্জেন্টিনার অধিনায়কের আরও একটি ফ্রি কিক এবার ধাক্কা খেল বারে। এই নিয়ে দুবার। পছন্দসই জায়গায় দ্বিতীয়ার্ধে আরও একবার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু তিন কাঠিতে রাখতে পারেননি। পরে খেলার শেষ দিকে বাঁ পায়ের শটও বাইরে।

‘সময় দিতে হবে মেসি-নেইমার-এমবাপ্পে ত্রয়ীকে, যত দিন যাবে, বোঝাপড়া বাড়বে, খেলা খুলবে’, বলেছিলেন কোচ মরিসিও পচেত্তিনো। রেনেঁর বিরুদ্ধে ম্যাচে সেরা চারজনকে নামিয়েছিলেন ওপরে। আনহেল ডি মারিয়া, চ্যাম্পিয়নস লিগে যিনি আপাতত নির্বাসিত হয়ে আছেন, এই ম্যাচে শুরু থেকেই মাঠে। ধরা হয়েছিল, আগের আট ম্যাচের মতোই পিএসজির বিজয়রথ থামবে না। রেনেঁ দেখিয়ে দিল আবারও, খেলাটা মাঠেই হয়, মাঠের বাইরে নয়!নেইমারকে তো খুঁজেই পাওয়া গেল না

পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে্‌ও সমস্যায়ই ছিল পিএসজি। প্রেসিং, অর্থাৎ তাড়া করলে পিএসজি ডিফেন্ডাররা এখনও অসহায়। বারবার যা দেখা গিয়েছিল সিটির বিপক্ষে, সেটিরই পুনরাবৃত্তি রবিবার ফ্রান্সে দুপুরের ম্যাচে। তুলনায় অখ্যাত ফুটবলাররা যতবারই দৌড়ালেন, পিএসজি রক্ষণে হাহাকার।

কামালদীন সুলেমানা, নামটা মনে রাখুন। ঘানার ফুটবলার, বয়স ১৯। পিএসজির রক্ষণের ডানদিকে খেলেন মরক্কোর আশরাফ হাকিমি। জীবনপঞ্জী ঈর্ষণীয়। রিয়াল মাদ্রিদে নিজেকে গড়ে তোলার পর বরুসিয়া ডর্টমুন্ড এবং ইন্টার মিলানে দুর্দান্ত খেলে বাইশের হাকিমি এবার এসেছেন প্যারিস শহরে। উনিশের সুলেমানা ছেলেখেলা করলেন প্রায় তাঁকে নিয়ে। সুলেমানার দুরন্ত সেন্টারে ঠিক সময়ে পা ছুঁইয়ে প্রথম গোল গায়েতান লাবোর্দের। পরে ডান পায়ের আউটস্টেপ দিয়ে বার দুই বল রেখেছিলেন জিয়ানলুইগি দোনারুমা এবং পিএসজি ডিফেন্ডারদের মাঝখানে, বক্সের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক জায়গায়। তাঁর দুর্ভাগ্য, রেনেঁ স্ট্রাইকাররা কেউই সেই সময় জায়গায় থাকতে পারেননি। বল নিয়ন্ত্রণ, শরীরের দোলা এবং গতি–মাঠের বাঁ দিক থেকে তিনি যখনই আক্রমণে এসেছেন, ত্রাহি ত্রাহি রব উঠেছে মারকুইনোস-কিম্পেম্বেদের।

সুলেমানার কম বয়সের অকুতোভয় মানসিকতা দেখা গেল, মেসি যখন ফ্রি-কিক নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বলের ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন, রেফারি বারবার বলা সত্ত্বেও। নিজের গোলের দিকে মুখ করে, যখন গোলরক্ষক দেখেশুনে নিলেন সব, সরেছিলেন তারপরই। কিন্তু, নেইমার আর মেসি ফ্রি কিক নেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছেন, সামনে দাঁড়িয়ে  পড়লেন কোমরে হাত! খুব ভালো করেই জানেন, ওখান থেকে মেসির ফ্রি কিক মানে জল বইছে বিপদসীমার ওপরে। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রমাণ করল, সহজে হাল ছাড়েন না তিনি।

পিএসজির খেলা যে দানা বাঁধেনি এখনও, মূল কারণ, সিটি ম্যাচের মতোই দায়সারা পাসিং। হ্যাঁ, ৬১ শতাংশ সময় বলের দখল নিজেদের পায়ে থাকার পরও। বিশেষ করে নেইমার-এমবাপ্পে-ডি মারিয়া, তিনজনেরই প্রবণতা রয়েছে হঠাৎ একটা ‘কেমন দিলাম’ গোছের মানসিকতা নিয়ে পাস দেওয়ার। বিপক্ষের ডিফেন্সিভ থার্ড, যেখানে পাসিং নিখুঁত এবং জায়গায় হওয়া বাঞ্ছনীয়, দেখনদারির এই প্রবণতার কারণে ভুল পাসে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে এমন আক্রমণগুলো পরিণতি পায় না। আর, মাঝমাঠ বা রক্ষণ থেকে ভুল পাসে বিপক্ষ পেয়ে যায় অযাচিত আত্মবিশ্বাস।

এই সবই অবশ্য বাজে কাগজের ঝুড়িতে চলে যেত, প্রথমার্ধের ২১ থেকে ৪৫ মিনিট খেলাটা যদি ধরে রাখতে পারত পিএসজি। রেনেঁ যদি শুরুর মিনিট কুড়ি দৌড়ে হাঁফ ধরিয়ে দিয়ে থাকে, প্রথমার্ধের বাকি সময়টুকুতে প্রথমবার পিএসজির হাল ধরতে দেখা গিয়েছিল মেসিকে। মাঝমাঠ বা ডান প্রান্ত থেকে খেলা ধরছেন, তৈরি করছেন, ছোট ছোট পাসে একেবেঁকে ভেতরে ঢুকে আসার পরিচিত দৃশ্য, কখনও এমবাপ্পে, কখনও নেইমারের সঙ্গে ওয়ান-টুগুলোয় তখন বার্সেলোনা-ঝলক। গোল হয়তো হয়নি, কিন্তু ত্রয়ী কী কী করে ফেলতে পারে, আভাস ছিল। ওই পর্বেই ফ্রি কিক, ওই পর্বেই অন্তত গোটা দুই নিশ্চিত গোলের সুযোগ হারানো।মেসি-ঝলক ছিল, গোল ছিল না।

খেলার ধরন যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, ফুটবল-রান্নায় লবণ পড়ে গোল হলে। প্রথমার্ধের সংযুক্তি সময়ে এগিয়ে যাওয়া, আবার দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দ্বিতীয় গোল পেয়ে রেনেঁ যেন লাগাম পরিয়ে দিল পিএসজির সেই ঘোড়ার গায়ে। সেই লাবোর্দের ক্রস, যাঁকে ডানদিক থেকে ঢুকে আসতে দেওয়ার ফাঁকা জমি দেওয়া হলো, সময়ও, যাতে দেখে নিতে পারেন বক্সে আগুয়ান ফ্লাবিয়ান তেকে। মেপে বল পাঠালেন, ফ্লাবিয়ানও জোরালো শটে পরাস্ত করলেন দোনারুমাকে, আন্তর্জাতিক দুই ডিপ ডিফেন্ডার মারকুইনোস-কিম্পেম্বে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলেন, কারণ মাঝমাঠ থেকে কেউই নেমে আসেননি ফ্লাবিয়ানকে রুখতে। আর হ্যাঁ, সেই মাঝমাঠে ভেরাত্তিও ছিলেন, গার্দিওলা এই সে দিনও যাঁর খেলার ভক্ত হওয়ার কথা জানাতে ছিলেন সোচ্চার!

সাধারণত, ফুটবলের প্রচলিত নিয়ম, দুই অর্ধের শুরু এবং শেষের পাঁচ মিনিট দুটি দলই ভঙ্গুর থাকে। রেনেঁর দুটি গোলের সময় ৪৫ ও ৪৬ মিনিট! ঘড়ি ধরে মিলিয়ে নেওয়া যাবে ফুটবল মাঠের প্রাচীন প্রবাদ। প্রথম গোল খেয়েই বিরতি। ফিরে আসার যাবতীয় সম্ভাবনা শেষ দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই। পিএসজি ভাবতেই পারেনি দু-গোলে পিছিয়ে পড়বে কখনও, মনে হচ্ছিল সবার খেলা দেখেই। তাই, প্রথমার্ধের মিনিট পঁচিশেক যে তাগিদ দেখা গিয়েছিল, সেটি উধাও। সবচেয়ে বড় কথা, ১৩ বার রেনেঁর গোল লক্ষ্য করে শট নিয়েছিলেন এমবাপ্পেরা, একবারও তেকাঠিতে রাখতে পারেননি। এমবাপ্পে সবচেয়ে বেশি দোষী হলে, নেইমারও কম নন। এমবাপ্পে অন্তত খেলায় ছিলেন। নেইমার ছিলেনই না। বাঁদিকের সাইডলাইনের ধারে চূড়ান্ত নিষ্প্রভ দেখাল ব্রাজিলীয় তারকাকে।

হয়তো যত গড়াবে মৌসুম, তীক্ষ্ণ হবে ত্রিফলা। পিএসজির এই মৌসুমের সব খেলা দেখার পর নিশ্চিন্তেই বলা যায় তবু, মাঝমাঠ এবং রক্ষণভাগ বিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেওয়ার প্রাথমিক কাজ সামলাতে এভাবেই দায়সারা খেললে বড় সাফল্যের কাছাকাছি যাওয়া সমস্যা।

হ্যাঁ, আওয়াজটা জোরালো হয়ে উঠল এবার, ‘আপনি কোথায়, সার্জিও রামোস’!

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন