আপন ঠিকানায় বিচ ভলিবল

রিও ২০১৬ অলিম্পিকের দিন–রাত

উৎপল শুভ্র

২০ জুলাই ২০২১

আপন ঠিকানায় বিচ ভলিবল

ছবি: গেটি ইমেজেস

যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম হলে কী হবে, কোপাকাবানা হলো বিচ ভলিবলের সবচেয়ে বিখ্যাত লালনভূমি। সৈকতে অসংখ্য খুঁটি বসানো আছে। একটা নেট টানিয়ে খেলা শুরু করে দিলেই হয়! রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে কোপাকাবানায় রীতিমতো বিচ ভলিবলের উৎসব শুরু হয়ে যায়। সেই কোপাকাবানাতেই বানানো অস্থায়ী স্টেডিয়ামেই বসেছিল রিও অলিম্পিকের বিচ ভলিবল।

প্রথম প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০১৬। প্রথম আলো

‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া...’ কথাটা বিচ ভলিবলের ক্ষেত্রে সত্যি হয়ে যাচ্ছিল। অলিম্পিকে এই ভেন্যু থেকে ওই ভেন্যুতে ছুটে বেড়াচ্ছি, আর বিচ ভলিবলেই কিনা যাওয়া হচ্ছে না!

‘ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া’ কথাটা এখানে আক্ষরিক অর্থেও নেওয়া যায়। ঠিক ‘দুই পা’ নয়, তবে কোপাকাবানার যে অ্যাপার্টমেন্টে আছি, সেটির জানালা দিয়েই বিচ ভলিবল অ্যারেনাটা দেখা যায়। হেঁটে যেতে মিনিট তিনেক লাগে। ‘চক্ষু মেলিয়া’ অবশ্য নিয়মিতই দেখা হয়। ওই বিচ ভলিবল অ্যারেনার সামনে থেকেই মেইন প্রেস সেন্টারে যাওয়ার বাস ছাড়ে। প্রতিদিনই তাই যাওয়া হয় সেখানে। ওই অ্যারেনাটা ঘিরে দর্শকের কোলাহল দেখি। দেখি সামনের টিকিট কাউন্টারে দীর্ঘ লাইন। 

২০০৪ এথেন্সের সময় খুব বলা হচ্ছিল কথাটা। অলিম্পিক তার নিজের দেশে ফিরল। অলিম্পিকের ধারণার জন্ম প্রাচীন গ্রিসে। ১৮৯৬ সালে আধুনিক অলিম্পিকের শুরুও। এই অলিম্পিক দিয়ে বিচ ভলিবলও তেমনি ‘নিজের বাড়িতে’ ফিরল। খেলাটির জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৯৬ আটলান্টা গেমসে অলিম্পিকে ঢোকা বিচ ভলিবলে সাফল্যের দিক থেকেও জন্মদাতারাই এগিয়ে। আগের পাঁচটি অলিম্পিকের সব কটিতেই পুরুষ বা মহিলা বিভাগে সোনা জিতেছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রাজিলের রেকর্ডও খারাপ নয়। ছেলেদের আগের পাঁচটি ফাইনালের চারটিরই ফাইনালে ছিল। যদিও জিতেছে মাত্র একবার। তিনটি ফাইনাল খেলে মেয়েরাও একবারই।

বিচ ভলিবলের ‘ঘরে ফেরা’র কথা হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম হলে কী হবে, কোপাকাবানা হলো বিচ ভলিবলের সবচেয়ে বিখ্যাত লালনভূমি। সৈকতে অসংখ্য খুঁটি বসানো আছে। একটা নেট টানিয়ে খেলা শুরু করে দিলেই হয়! রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে কোপাকাবানায় রীতিমতো বিচ ভলিবলের উৎসব শুরু হয়ে যায়। সেই কোপাকাবানাতেই বানানো অস্থায়ী স্টেডিয়ামে এবার অলিম্পিকের বিচ ভলিবল। সত্যিকার বিচে বিচ ভলিবল অলিম্পিকে এর আগে মাত্র একবারই হয়েছে। ২০০০ সালে সিডনি অলিম্পিকে বন্ডাই বিচে। অন্য সব বার বানাতে হয়েছে সেই বিচ। লন্ডনেই যেমন শহরের ঠিক মাঝখানে টনকে টন বালু ফেলে তৈরি করা হয়েছিল কৃত্রিম বিচ।

সত্যিকার সৈকতে বিচ ভলিবল খেলার মজাই আলাদা। তার ওপর সেটি কোপাকাবানায়। এবারের বিচ ভলিবল নিয়ে প্রতিযোগীদের মধ্যে তাই বাড়তি রোমাঞ্চ। দর্শকদের মধ্যেও। ১৮ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার গ্যালারি প্রায় প্রতিদিনই টইটম্বুর থাকছে। মাঝখানে অবশ্য বৃষ্টি একটু ঝামেলা করেছে। রিওর আবহাওয়ার মতিগতি তিন-চার দিন ধরে ভালো নয়। বুধবার প্রায় দিনভর বৃষ্টি ভালোই শীত নামিয়েছে। সঙ্গে কনকনে বাতাস এনে দিচ্ছে ইংলিশ আবহাওয়ার একটা আমেজও।

ছবি: গেটি ইমেজেস

গত পরশু বিকেলে যখন বিচ ভলিবল দেখতে গেলাম, তখন অবশ্য ঝকঝকে রোদ। গ্যালারিতে আক্ষরিক অর্থেই তিল ধারণের জায়গা নেই। ব্রাজিলের দুই মেয়ের যে ম্যাচ চলছে! প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে লারিসা ফ্রাঙ্কা ও তালিতা রোচার প্রতিপক্ষ জার্মানির কার্লা বোর্গার ও ব্রিটা বুথে। ভেতরে ঢুকেই চোখ জুড়িয়ে গেল। প্রেস ট্রিবিউন থেকে সাগর দেখা যাচ্ছে। তাতে ভেসে বেড়াচ্ছে একটা জাহাজ। দূরে একটা পাহাড়। অপূর্ব এক পটভূমি। অস্থায়ী স্টেডিয়ামটা সাগরের এমন কোল ঘেঁষে বসানো হয়েছে যে, ঢেউ এসে যেন আছড়ে পড়ছে গায়ে।

বিচ ভলিবল মানেই যেন এক আনন্দমেলা। দর্শকেরা তুমুল হইচই করছেন। না করে উপায়ও নেই। একটু চুপ থাকলেই তাঁদের আবার জাগিয়ে তুলছেন ডিজে। একটা পয়েন্ট হচ্ছে আর দ্রিম-দ্রিম মিউজিক বাজছে। ব্রাজিলের মেয়েরা পয়েন্ট পেলেই গগনবিদারী চিৎকার উঠছে। বিচ ভলিবলে তিন সেটের খেলা। প্রথম দুই সেট ২১ পয়েন্টের। তৃতীয়টা ১৫। লারিসা-তালিতা অবশ্য দুই সেটেই শেষ করে দিলেন ম্যাচ। দ্বিতীয় সেটে অবশ্য তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলো। একসময় পয়েন্ট হয়ে গেল ১৮-১৮। এমন লড়াই করে হারাটা অবশ্য একটুও সান্ত্বনা হতে পারল না জার্মান জুটির জন্য। ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে গিয়ে দেখি, জার্মান মেয়েদের চোখ ছলছল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তা আর শুধু ছলছল থাকল না, কথা বলতে বলতে তাঁরা কাঁদতে শুরু করলেন।

দর্শকের কাছে বিচ ভলিবল শুধুই বিনোদনের ব্যাপার হতে পারে, খেলোয়াড়দের কাছে তা নয়। পেশাদার খেলা, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ওয়ার্ল্ড লিগ হয়। টাকাপয়সাও ভালোই। বিচ ভলিবল খেলে সুপারস্টারও হওয়া যায়। যেটির সবচেয়ে বড় উদাহরণ কেরি ওয়ালশ। মার্কিনরা যাঁকে আদর করে ডাকে ‘সিক্স ফুট অব সানসাইন।’ গত তিনটি অলিম্পিকে সোনা জিতেছেন কেরি ওয়ালশ। সেই তিনবারের পার্টনার মিশি মে-ট্রেনর অবসর নিয়ে নেওয়ায় এবার খেলছেন এপ্রিল রসকে নিয়ে। টানা চতুর্থ সোনা জয়ের স্বপ্নে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জার ব্রাজিলের দুই জুটি।

কেরি ওয়ালশের বয়স ৩৮। এই অলিম্পিকের আগে বলেছেন, সন্তান জন্ম দিতে যেমন দীর্ঘ একটা সময় কষ্ট করতে হয়, অলিম্পিক সোনা জিততেও তেমনি। দুটির জন্যই অনেক কষ্ট করতে হয়, অনেক দিনের সাধনা। তবে পাওয়ার আনন্দ সব সার্থক করে তোলে। ওয়ালশ তিন সন্তানের মা। অলিম্পিকে সোনা জয়ের সঙ্গে সন্তান জন্ম দেওয়ার মিল খুঁজে পাওয়াটা তাঁর পক্ষেই সম্ভব।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×