তেভেজ-স্যাভিওলা নন, মার্সেলো বিয়েলসা

২০০৪ অলিম্পিক

উৎপল শুভ্র

২১ জুলাই ২০২১

তেভেজ-স্যাভিওলা নন, মার্সেলো বিয়েলসা

বিয়েলসা ডাগআউটে থাকা মানে ধন্দে পড়ে যাওয়া। মাঠের খেলা দেখবেন নাকি বিয়েলসাকে! কখনো উবু হয়ে বসেন, বোতল থেকে জল খান, কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, থুতু ফেলেন আর ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে পায়চারি করতে থাকেন, দু-একবার সীমানার একটু বাইরেও চলে যান। সব সময়ই যে এই ক্রম অনুযায়ীই কাজগুলো করেন তা নয়। আরেকটা জিনিস বাদ পড়ে গেল, কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময়টায় খেলোয়াড়দের উদ্দেশে চিৎকার করেন। একবার আয়ালার মুখ দেখে মনে হলো, ট্যাকটিকস নিয়ে নির্দেশের পরিবর্তে গালাগালিই বোধ হয় বেশি হয়। 

প্রথম প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০০৪। প্রথম আলো

আর্জেন্টাইন ফুটবল দলে এখন সবচেয়ে বড় তারকা কে? কার্লোস তেভেজ, হাভিয়ের স্যাভিওলা, রবার্তো আয়ালা...এই নামগুলোই আসবে এবং তাদের কেউই নন। গত পরশু রাতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ফুটবল ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে (খেলাশেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় খেলোয়াড়রা যেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন) সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় জটলাটা যার জন্য দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করে রইল, তার নাম তেভেজ-স্যাভিওলা বা আয়ালা নয়, নাম গ্যাব্রিয়েল হাইঞ্জ!

আর্জেন্টিনার বাইরে কজনই বা তার নাম জানে, একটু আগে শেষ হওয়া ম্যাচেও চমকে দেওয়ার মতো কিছু করেননি, তারপরও তাকে নিয়ে এত আগ্রহ কেন? কারণ গ্যাব্রিয়েল হাইঞ্জ কদিন আগে প্যারিস সেন্ট জার্মেই থেকে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে সাইন করেছেন। এখনো ওল্ড ট্রাফোর্ডে যাননি, সাইন করেই চলে এসেছেন অলিম্পিকে খেলতে। আর্জেন্টিনার ম্যাচে ইংলিশ সাংবাদিকদের এমন ভিড়ও এ কারণেই। হাইঞ্জ ইংরেজি জানেন না বলে স্প্যানিশ জানা দোভাষী জোগাড় করার যে তৎপরতা, শেষ পর্যন্ত একজনকে পাওয়ার পর যে হাসি, তাতে মনে হলো হাইঞ্জের সঙ্গে কথা বলাটাই তাদের অনেকের অলিম্পিক কাভার করতে আসার উদ্দেশ্য! ফুটবল শুধু ইংল্যান্ডের এক নম্বর খেলাই নয়, আরও বেশি কিছু। 

১৮২১ সালে তুর্কিদের বিরুদ্ধে গ্রিকদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর কারাইস্কাকির নামে স্টেডিয়াম। এই কারাইস্কাকি স্টেডিয়াম এথেন্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম, অনেক পুরনোও। ১৮৯৬ সালে প্রথম অলিম্পিকে এটি ছিল সাইক্লিংয়ের ভেলোড্রাম। অলিমিঙ্ক শেষে তা হয়ে যাবে গ্রিক জাতীয় দলের ‘হোম’। অস্ট্রেলিয়ানদের অস্তিত্বের প্রমাণ হয়ে থাকা গ্যালারির ছোট্ট একটা হলুদ অংশ বাদ দিলে ২৬ হাজার ৩৬৮ জন দর্শকের বাকি সবাই যেন এসেছিলেন আর্জেন্টাইন-ম্যাজিক দেখতেই। কিন্তু তা দেখা গেল কই? 

শুরুতে স্পষ্টতই স্নায়ুর চাপে আক্রান্ত অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্সের কল্যাণে আলেসান্দ্রো ডি আলেসান্দ্রো গোল করে ফেললেন। ৯ মিনিটের সেই গোলই হয়ে থাকল ম্যাচের ভাগ্যনির্ধারক। বাকি সময়টায় আর্জেন্টিনার চেয়ে অস্ট্রেলিয়াই বেশি গোলের সুযোগ পেয়েছে, কিন্তু ভাগ্য তাদের পক্ষে ছিল না। বল পোস্টে লেগেছে, আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক দারুণ দুটি সেভ করেছেন। এক গোলে হেরেও কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা গেছে, ম্যাচশেষে এটা জানার পরই শুধু অস্ট্রেলিয়ার দুঃখটা একটু কমেছে। 

গোলের বাইরেও তো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার কাছে দর্শকদের অনেক কিছু প্রত্যাশা থাকে। সেটিই বা পূরণ হলো কই? কোপার পারফরম্যান্স দিয়ে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তম ফুটবলার হয়ে ওঠা কার্লোস তেভেজ তো প্রায় অদৃশ্যই হয়ে রইলেন। ৬৫ মিনিটে তাকে তুলেই নামানো হলো হাভিয়ের স্যাভিওলাকে। নেমেই দু-তিনজনকে কাটিয়ে একটা ঝলক দেখানোর পর স্যাভিওলারও একই দশা। শুধু মাউরো রোসালেসের পা-ই কয়েকবার যা একটু কারুকাজ দেখাল।

২৩ বছরের বেশি বয়সী খেলোয়াড় রাখা যায় মাত্র তিনজন। অলিম্পিক ফুটবল তাই কোনো দেশের ফুটবল-শক্তির সত্যিকার প্রতিফলন নয়। এটি ভবিষ্যতের তারকাদের চিনে নেওয়ার জায়গা। আর্জেন্টিনার বেলায় তো তা নয়। বলতে গেলে তাদের মূল জাতীয় দলই অনূর্ধ্ব-২৩, এথেন্সে তাই প্রায় জাতীয় দল নিয়েই এসেছে আর্জেন্টিনা। অন্তত একটি ক্ষেত্রে হলেও ব্রাজিলের চেয়ে এগিয়ে থাকার সুযোগও এই অলিম্পিক। এর আগে দুবার ফুটবলে রুপা পেয়েছে আর্জেন্টিনা, সোনা একবারও নয়। পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতে ফেলা ব্রাজিলও নয়। এথেন্সে তো ব্রাজিল কোয়ালিফাই-ই করতে পারেনি। আর্জেন্টাইন রেডিও সাংবাদিক মরিসিও লোতেরো হাসতে হাসতে বললেন, ‘প্যারাগুয়ে আমাদের বড় উপকার করেছে।’ কী উপকার? প্যারাগুয়ের কাছে হেরেই অলিম্পিক থেকে ছিটকে পড়েছে ব্রাজিল। 

২০০২ বিশ্বকাপে শোচনীয় ব্যর্থতার পরও মার্সেলো বিয়েলসা কীভাবে আর্জেন্টিনার কোচ থেকে গেলেন, তা ফুটবল বিশ্বেই একটা বিস্ময়। কোপাতেও জিততে পারেননি, এবার এই অলিম্পিক। গত পরশু মাঠে আর্জেন্টিনা যতই এলোমেলো হতে থাকল, ততই আরও বেশি চোখে পড়তে থাকলেন বিয়েলসা। এর আগে টিভিতে কিছুটা দেখেছি, কিন্তু টিভি তো আর সারাক্ষণ কোচকে দেখায় না। এখানে আর্জেন্টাইন দলের বেঞ্চ প্রেসবক্সের ঠিক নিচে। সেখান থেকে ৯০ মিনিট যা দেখলাম, তাতে মনে হলো দু দলের বেঞ্চের সামনে সাদা দাগ দিয়ে কোচের জন্য যে সীমানাটা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে, তা করা হয়েছে শুধু মার্সেলো বিয়েলসার জন্যই! অস্ট্রেলিয়ান বেঞ্চের সামনের জায়গাটা সারাক্ষণ শূন্যই থাকল, অস্ট্রেলিয়ান কোচ ফ্রাঙ্ক ফারিনাকে একবারও দেখা গেল না সেখানে। আর বিয়েলসা?

ছবি: গেটি ইমেজেস

ম্যাচের ৯০ মিনিট একই চিত্র। বিয়েলসা উবু হয়ে বসেন, বোতল থেকে জল খান, কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, থুতু ফেলেন আর ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে পায়চারি করতে থাকেন, দু-একবার সীমানার একটু বাইরেও চলে যান। সব সময়ই যে এই ক্রম অনুযায়ীই কাজগুলো করেন তা নয়। আরেকটা জিনিস বাদ পড়ে গেল, কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময়টায় খেলোয়াড়দের উদ্দেশে চিৎকার করেন। একবার আয়ালার মুখ দেখে মনে হলো, ট্যাকটিকস নিয়ে নির্দেশের পরিবর্তে গালাগালিই বোধ হয় বেশি হয়। 

খেলার মিনিট পনেরো যেতেই হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন, একটু পরই দেখা গেল সিজার দেলগাদোকে তুলে তাকে নামাবেন বলে প্রায় টেনে বের করে আনছেন নিকোলাস বুরদিসোকে। বদলটা করতে একটু দেরি হচ্ছিল বলে চতুর্থ রেফারির উদ্দেশে প্রায় তেড়ে যাচ্ছিলেন, সাদা দাগ দেখে শেষ মুহূর্তে নিজেকে সামলালেন। শেষ মুহূর্তে সামলানোর ঘটনা আরো আছে। নইলে তার ঠিক সামনেই আর্জেন্টিনা একটি ফ্রি কিক পাওয়ার পর যে ভঙিতে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলেন, মনে হয়েছিল ফ্রি কিকটা না তিনিই নিয়ে ফেলেন! 

রেফারির কাজেও সহায়তা করার চেষ্টা করেছেন কয়েকবার। যেমন দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্ডার নর্থ জেইড আলেসান্দ্রো ডি আলেসান্দ্রোকে ফাউল করতেই চিৎকার করে রেফারিকে কী যেন বলতে থাকলেন বিয়েলসা। গলারও তো একটা সহ্য সীমা আছে, সেটি ততক্ষণে বসে গেছে। খেলা আবার শুরু হয়ে যাওয়ার পরও মাথার ওপর হাত নাচাতে দেখে বোঝা গেল, কার্ড দেখাতে বলেছিলেন। এই ভঙিটা যে আগেই করা উচিত ছিল, বেশি উত্তেজনায় তা আর বিয়েলসার মনে ছিল না। মিসরীয় রেফারি কি আর স্প্যানিশ বোঝেন, বিয়েলসার নির্দেশ কীভাবে পালন করবেন তিনি?

মাউরো রোজালেসের দু-একটা ঝলক বাদ দিলে এই ম্যাচে আর্জেন্টাইন বিনোদন বলতে মার্সেলো বিয়েলসাই!

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×