উৎপল শুভ্র নির্বাচিত পাঠকের লেখা

মেসি কেন খেলে না, কিছু ভালো লাগে না...

রিজওয়ান রেহমান সাদিদ

২১ আগস্ট ২০২১

মেসি কেন খেলে না, কিছু ভালো লাগে না...

বার্সেলোনা ছেড়ে লিওনেল মেসি পাড়ি জমিয়েছেন প্যারিস সেন্ট-জার্মেই। কিন্তু ফ্রেঞ্চ লিগের তিন ম্যাচ পেরিয়ে গেলেও মাঠে দেখা যায়নি তাঁকে। মেসি-জাদু দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া এক পাঠক লিখে পাঠালেন তার এই নতুন অভিজ্ঞতার কথা। মৌসুমের প্রথম তিন ম্যাচে মেসি কতটা ভয়ঙ্কর, জানা গেল সেটাও।

এমন অভিজ্ঞতা আমার হয়নি কখনোই। সেই ২০১০-১১ মৌসুম থেকে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল দেখার অভিজ্ঞতায় জানি, পুরোনো মৌসুমের শেষ আর নতুন মৌসুম শুরুর লম্বা খরাটা কাটবে মেসি-ম্যাজিকে; কোনোদিন হয়তো বা গোল পাবেন, কোনোদিন পাবেন না; কিন্তু পায়ের কারুকাজে কিংবা ভুবনমোহিনী ড্রিবলিংয়ে মাঝে পড়া বিরতির যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেবেন এক লহমায়। ফুটবল খেলেন অনেকেই, তবে মেসির পায়ে বলটা দেখার আগ পর্যন্ত যেন ঠিক তৃপ্তি হয় না, আশ মেটে না। পরিচিত ভাই-বন্ধুদের কেউ কেউ তো এমনও বলেন, 'ফুটবলে তুই মেসি ছাড়া কিচ্ছু দেখিস না...'

প্রতিবাদ যে করব, তার উপায়ও তো নেই। ওদিকে ম্যানচেস্টার সিটি-টটেনহ্যাম দেখেছি, বার্সেলোনার খেলা দেখব কী ঘুমাব দ্বিধায় ভুগে দেখার সিদ্ধান্তও নিয়েছি, কিন্তু আমার ফুটবল-মৌসুমটা ঠিক যেন শুরুই হচ্ছে না। প্রাক-মৌসুমের ম্যাচগুলো বাদই দিলাম, ইউরোপের প্রায় সব লিগের ম্যাচই শুরু হয়ে গেছে, তাঁর নতুন দল প্যারিস সেন্ট-জার্মেইও খেলে ফেলেছে তিনটা ম্যাচ, কিন্তু কোথাও মিলছে না ওই সাড়ে পাঁচ ফুটের জাদুকরের দেখা। শুধু আমার কথাই বলছি কেন, সদ্য সদ্য ফুটবল অনুসরণ করতে শুরু করা চোখগুলোর কাছেও তো অভিজ্ঞতাটা নতুনই। মেসি নিজেও এই অভিজ্ঞতা খুব একটা পেয়েছেন নাকি!

প্রস্তুতি করছেন পুরোদমে। ছবি: পিএসজি

তাঁকে মৌসুমের প্রথম তিন ম্যাচের কোনোটতেই পাওয়া যায়নি, এমন ঘটনা এর আগে সর্বশেষ ঘটেছিল ২০১৯-২০ মৌসুমে। পায়ের চোটে পড়ে ছিটকে গিয়েছিলেন প্রথম চার ম্যাচ থেকে। বার্সেলোনাও মেসির অভাবটা বোধ করেছিল ভালোই, রিয়াল বেতিস ও ভ্যালেন্সিয়ার বিপক্ষে ৫-২ গোলের বিশাল জয় পেলেও মৌসুমের প্রথম ম্যাচেই হেরে গিয়েছিল অ্যাথলেটিকো বিলবাওয়ের বিপক্ষে। তৃতীয় ম্যাচে গিয়ে ২-২ গোলে ড্র করেছিল ওসাসুনার সঙ্গে। ওই মৌসুমে লা লিগার বাকি ৩৪ ম্যাচে মেসি খেলতে পারেননি আর একটিতেই, তাই ৩৩ ম্যাচ খেলে গোল পেয়েছিলেন ২৫টি, সঙ্গে ২১ অ্যাসিস্ট। শুরুর ওই ধাক্কা অবশ্য সামলাতে পারেনি বার্সেলোনা, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের কাছে খুইয়েছিল শিরোপা।

এর আগে উরুর চোটে পড়ে ২০১৩-১৪ মৌসুমে মালাগার বিপক্ষে ম্যাচটা মিস করেছিলেন তিনি। মৌসুমের উদ্বোধন করেছিলেন লেভান্তের বিপক্ষে দুই গোল দিয়ে, চোটে পড়ে মেসির তাই বিরক্তই হওয়ার কথা! মেসির ক্ষোভটা ছয় দিন বাদে টের পেয়েছিল ভ্যালেন্সিয়া, ফিরেছিলেন হ্যাটট্রিক দিয়ে!

যে নতুন অভিজ্ঞতার কথা বলছি, সেখানে অবশ্য চোটের কোনো বালাই নেই। চোট-সমস্যা নেই, তবুও প্রথম তিন ম্যাচের কোনো একটায় মেসিকে পাওয়া যায়নি, এমন উদাহরণ খুঁজে পেতে ফিরে যেতে হচ্ছে প্রায় এক যুগ আগে, আর তখনো ক্লাব ফুটবলের মহোৎসবে অবগাহন করা হয়নি আমার। লা লিগায় মেসির অভিষেক ২০০৪-০৫ মৌসুমের সপ্তম ম্যাচে, প্রথম তিন ম্যাচে খেলার সুযোগ তাই ছিল না। প্রথম পাঁচ ম্যাচে মেসিকে স্কোয়াডে রাখা হয়নি পরের মৌসুমেও। তবে এরপর থেকেই হয়ে গিয়েছিলেন বার্সেলোনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। চোট ছাড়া মৌসুমের প্রথম তিন ম্যাচের যেকোনো একটা মিস করার অভিজ্ঞতাই তাই হয়েছিল আর মাত্র দু'বার!

বার্সেলোনা সমর্থকেরা এই ছবিটাতেই অভ্যস্ত ছিলেন

'প্রভাত দেখেই দিন বোঝা যায়' প্রবাদটাকে সত্য প্রমাণের দায়িত্বও যেন নিজের হাতে (পড়ুন পায়ে) তুলে নিয়েছিলেন মেসি। পনেরো মৌসুমে তাঁকে একাদশে নিয়ে প্রথম তিন ম্যাচে বার্সেলোনাকে হারের অভিজ্ঞতা পেতে হয়েছে মাত্র তিনবার, ড্র-ও করেছে মাত্র চার ম্যাচে। মেসির ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানও তো আক্ষেপই বাড়াবে তাঁর সমর্থকদের। এখন পর্যন্ত মৌসুমের প্রথম তিন ম্যাচে মেসি জালের দেখা পেয়েছেন ৩৯ বার, সঙ্গে গোলে সহায়তা করেছেন ১৫ টি, আছে ৩ হ্যাটট্রিকও।

মেসিকে নিয়ে 'ও কেবল খেলতে চায়, বিশ্রাম নিতে চায় না' -জাতীয় উদ্ধৃতি বারেবারেই সরবরাহ করেছেন তাঁর কোচ-সতীর্থরা। মাস দেড়েক আগের ওই দৃশ্যটাও নিশ্চয়ই মনে আছে আপনার। কোপা আমেরিকার সেমিফাইনালে কলম্বিয়ার কোন এক খেলোয়াড়ের ট্যাকলে চোট পেয়ে মেসি বসে ছিলেন মাঠে, গোড়ালি থেকে রক্ত ঝরেছে এর আগেই। দলের ফিজিও চাইছিলেন তাঁকে বাইরে নিয়ে শুশ্রূষা করতে। কিন্তু ওই অনুরোধেই ফুঁসে উঠেছিলেন মেসি, হাতের ভাবভঙ্গিতে তাঁর বিরক্তি প্রকাশ পেয়েছিল স্পষ্ট।

এবার কোনো চোট নেই, দলবদলের ঝুট-ঝামেলাও শেষ, তবুও মাঠে নামতে পারছেন না বলে মেসিরও নিশ্চয়ই অস্থির-অস্থির লাগছে। একটু রাগ হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। যতটুকু খবর শোনা যাচ্ছে, তাতে মেসি পিএসজির জার্সিতে প্রথমবার মাঠে নামতে পারেন ৩০ আগস্ট (বাংলাদেশ সময় রাত ১২:৪৫), রিমসের বিপক্ষে। রিমসের কোচের কপালে যে চিন্তার বলিরেখা বেড়ে গিয়েছে বেশ কিছু, তা দেখতে পাচ্ছি দিব্যচোখেই।

রাগী মেসির 'কোপা আমেরিকা'-অভিযান তিনি দেখেছেন নিশ্চয়ই।

 

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×