উৎপল শুভ্র নির্বাচিত পাঠকের লেখা

নীরাজের স্বর্ণজয়ের পেছনের গল্পটা কি জানেন?

পিনাক রায়

২৪ আগস্ট ২০২১

নীরাজের স্বর্ণজয়ের পেছনের গল্পটা কি জানেন?

অলিম্পিকে সাফল্য পেতে চাইলে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি আর কঠোর অনুশীলন তো লাগেই, সঙ্গে সঙ্গে অলিম্পিকে পদক জয়ের মনও লাগে। নীরাজ চোপড়ারা যে কারণে কোনো পরীক্ষায় না বসেই সেনাবাহিনীতে ঢুকে যেতে পারেন, কারণ, `মিশন অলিম্পিক উইং` নামে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে আলাদা একটা শাখাই আছে।

'ও (নীরাজ চোপড়া) একজন সৈনিক, কিন্তু রণাঙ্গনে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত, এমন সৈনিক নয়। ও অন্য একটি লড়াইয়ের জন্য লড়ছে।'

ভারতের একজন একজন সেনা কর্মকর্তা এরকমই বলেছেন এবারের টোকিও অলিম্পিকে জ্যাভলিন থ্রোয়ের মাধ্যমে ভারতকে প্রথম স্বর্ণপদক এনে দেওয়া নীরাজ চোপড়াকে নিয়ে। যে স্বর্ণজয়ের গল্প লেখার পেছনে নীরাজ চোপড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই সেনা কর্মকর্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে।

নীরাজের মধ্যে সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন সুবেদার কাশীনাথ। ছবি: ইন্ডিয়া টুডে

শুরুতে নীরাজ চোপড়া ছিলেন হরিয়ানার পানিপথের একজন সম্ভাবনাময় জ্যাভলিন থ্রোয়ার। তাঁকে আবিষ্কার করেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সুবেদার কাশীনাথ, যিনি নিজেও ২০১০ সালের কমনওয়েলথ গেমসে জ্যাভলিন থ্রোয়ে জিতেছিলেন ব্রোঞ্জ পদক। নীরাজের প্রতিভা দেখে তিনি ঠিক করেন, যেভাবেই হোক নীরাজকে যুক্ত করবেন ভারতীয় আর্মি স্পোর্টস ইনিস্টিটিউটের (এএসআই) সবচেয়ে যুগান্তকারী প্রকল্প ‘মিশন অলিম্পিক উইং’-এ। 

কাশীনাথের এই স্কাউটিংয়ের কারণেই ভারতীয় সেনাবাহিনীর সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী রেজিমেন্ট রাজপুতানা রাইফেলসের একটি দল নীরাজের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে চলে আসে। ২০১৫ সালে হরিয়ানা রাজ্যের পঞ্চকুলার তাবু দেবী লাল স্পোর্টস কমপ্লেক্সে, মাত্র ১৭ বছর বয়সী নীরাজ চোপড়ার ৭০ মিটারের বেশি জ্যাভলিন থ্রো দেখে রেজিমেন্টের অ্যাথলেটিকস কোচ ও স্পোর্টস অফিসারদের মনে বিশ্বাস জন্মে যে, তারা অলিম্পিকে পদক জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে এমন এক অ্যাথলেটকে খুঁজে পেয়েছেন। এই বিশ্বাস আরও মজবুত হয়, যখন এর এক বছরের মাথায় ২০১৬ সালে নীরাজ পোল্যান্ডে আয়োজিত আইএএএফ অনুর্ধ-২০ আসরে রেকর্ড ৮৬.৪৮ মিটার দূরত্বে জ্যাভলিন ছুড়ে রেকর্ড গড়ে স্বর্ণপদক জয় করেন। রাজপুতানা রেজিমেন্টের কেন্দ্রীয় কমান্ড্যান্ট অফিসার দ্রুত একদিনে সফরে পানিপথের খান্দ্রাগ্রামে নীরাজের বাড়ি গিয়ে তাঁর পরিবারের সাথে সেনাবাহিনীতে নীরাজের চাকরির নিশ্চয়তা এবং খেলাধুলার সম্পূর্ণ দায়ভার নিয়ে আলোচনায় বসেন। ঠিক যেমনটা আমরা ইউরোপিয়ান ফুটবল ক্লাবগুলোতে দেখতে পাই, সঠিক স্কাউটিং আর প্রতিভা অন্বেষণের মাধ্যমে পরিবারের সম্মতি নিয়ে একটি ক্লাব এক যুব প্রতিভাকে গড়ে তোলার দায়িত্ব নেয়। পরবর্তী সময়ে এই রাজপুতানা রাইফেলসের নায়েক-সুবেদার পদে থেকেই নীরাজের প্রশিক্ষণের হাতেখড়ি হয় সেনাবাহিনীর স্পোর্টস ইন্সটিটিউটের মিশন অলিম্পিক উইংয়ে।

অন্যান্য দেশ, বিশেষত দক্ষিণ-এশিয়ার দেশগুলোর মতো ভারতেও বেশির ভাগ অ্যাথলেটের পৃষ্ঠপোষকতা সেনাবাহিনীই করে থাকে। তবে অন্য দেশের সঙ্গে পার্থক্য হচ্ছে, সেনাবাহিনীতে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের চাকরি দিয়েই তারা থেমে থাকে না। বরং, তৃণমূল পর্যায় থেকে বিভিন্ন  ডিসিপ্লিনের সম্ভাবনাময় ছেলে-মেয়েদের খুঁজে বের করে দক্ষ খেলোয়াড় হিসেবে তৈরি করার দায়িত্ব নেয় ভারতের আর্মি স্পোর্টস ইনিস্টিটিউট। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠান থেকে বাছাই করা খেলোয়াড়দের নিয়ে সেনাবাহিনী পরিচালনা করে ‘মিশন অলিম্পিক উইং’-এর কার্যক্রম।

মিশন অলিম্পিক উইংকে ভারতের ক্রীড়াঙ্গনে সেনাবাহিনীর এক নীরব বিপ্লব বলা যেতে পারে। এবারের অলিম্পিকে নীরাজ চোপড়ার সাফল্যের পর অনুসন্ধানে উঠে আসে স্বর্ণ জয়ের পেছনে ভারতের সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নিভৃতে চলা এই প্রকল্পের আদ্যোপান্ত। পুনেতে অবস্থিত আর্মি স্পোর্টস ইন্সটিটিউট ২০০১ সালের এক জুলাই ‘মিশন অলিম্পিক’ নামে চালু করে এই প্রকল্প। প্রথমে সেনাবাহিনীতে কর্মরত সাতটি ডিসিপ্লিনের (অ্যাথলেটিকস, আর্চারি,  বক্সিং, ডাইভিং, ফেন্সিং, ভারোত্তলন এবং কুস্তি) খেলোয়াড়দের নিয়ে এই মিশনের কাজ শুরু হয়। মূলত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ভারতকে সাফল্য এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে কাজ করতে থাকে এই উইং। যদিও শুরুর দিন থেকে আজ পর্যন্ত এই প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সকলের লক্ষ্য একটাই, অলিম্পিকে এই সব ডিসিপ্লিনে পদক জয় করা। পরবর্তীতে এএসআইয়ের বিভিন্ন স্কাউটের সহযোগিতায় দেশের নানা প্রান্তের বিভিন্ন খেলায় পারদর্শী কয়েকজন যুব খেলোয়াড়দের দারুণ প্রতিভার কথা জানতে পারে 'মিশন অলিম্পিক'। কিন্তু তাঁরা সেনাবাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত নন জেনেও শুধুমাত্র ভারতের হয়ে পদক জিততে পারেন ভেবে ওই খেলোয়াড়দের ভেতর থেকে বাছাই করে কয়েকজনকে এএসআই তথা মিশন অলিম্পিক উইংয়ে যুক্ত করেন প্রকল্পের সেনা কর্মকর্তারা। পানিপথের নীরাজ চোপড়াও সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন এভাবেই।

নিভৃতে হলেও খেলোয়াড়দের পরিচর্যা আর  প্রকল্পের প্রশিক্ষণ অত্যন্ত কার্যকরী ও উচ্চমানের। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থেকেই এই খেলোয়াড়েরা পেয়ে থাকেন জাতীয় পর্যায়ের কোচ, বিদেশি টেকনিক্যাল টিমের সহযোগিতা। একজন খেলোয়াড়ের শারীরিক অবস্থা ও খাদ্যাভাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণের সময়। এ বিষয়টিকে শুরু থেকে বিবেচনায় নিয়ে এই উইংয়ে  রয়েছেন দক্ষ ফিজিও, ক্রীড়া স্বাস্থ্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মনোবিদ, পুষ্টিবিদ এমনকি বায়োমেকানিক্সও। খেলোয়াড়দের ক্যাম্প চলাকালীন এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সময় ডিসিপ্লিন অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়ে ডেটা ও ভিডিও অ্যানালিস্ট। এএসআইয়ের তত্ত্বাবধানে ‘সেন্টার অব গ্রাভিটি’ এবং ‘টিম এএসআই’ উইংয়ের খেলোয়াড়দের মানবদেহ সম্পর্কিত নিয়মানুবর্তিতা, অনুশীলনের প্রতি ঝোঁক করা, লক্ষ্যে অবিচল রাখা আর আনুগত্যের নৈতিক আলোচনা করে থাকে। আর এভাবে শারীরিকভাবেই শুধু নয়, মানসিকভাবেও একজন খেলোয়াড়কে গড়ে তোলে প্রতিষ্ঠানটি। ঠিক যেমনটা সারাবছর যেকোনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে থাকে একজন সৈনিক।

পুনের আর্মি স্পোর্টস ইন্সটিটিউট। ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

মিশন অলিম্পিক উইংয়ের এই কার্যক্রমের সুফল ভারত পেয়ে আসছে গত কয়েক বছর ধরেই। সাফল্য ধরা দিচ্ছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আসরগুলোতে। ভারতের প্রতিনিধিত্ব করা এই উইংয়ের খেলোয়াড়দের হাত ধরে এখন পর্যন্ত এসেছে ১৯টি এশিয়ান গেমস পদক, ১৮টি কমনওয়েলথ গেমস পদক। তাছাড়া শেষ তিন বছরে এএসআইয়ে প্রশিক্ষিত খেলোয়াড়েরা এই সাতটি ডিসিপ্লিনে মোট ৪৫০টি আন্তর্জাতিক পদক এবং সর্বভারতীয় বিভিন্ন আসরে রেকর্ড ১১১৮টি পদক অর্জনের নজির সৃষ্টি করেছে। মিশন অলিম্পিক উইংয়ের ১৬ জন সদস্য এবারের টোকিও অলিম্পিকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। এটা বিশেষ গুরুত্ববহ, কেননা আর কোনো ভারতীয় সংগঠন একসঙ্গে এত বেশি সদস্য অলিম্পিকে  কখনো পাঠায়নি। শুধু সংখ্যাতেই নয়, মানের দিক দিয়ে মিশন অলিম্পিকের সদস্যদের উৎকর্ষতার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে তাদের পারফরম্যান্সেও। ভারতের আর্চার তরুণদীপ রাই, প্রবীণ যাদব, কুস্তিগির দীপক পুনিয়া, অ্যাথলেট সন্দীপ কুমার, গুরপ্রীত সিং, শিবল অবিনাশ কিংবা স্বর্ণজয়ী নীরাজ চোপড়া-- সকলেই নিজেদের প্রতিভা আর পরিশ্রমের স্বাক্ষর রেখেছেন এবারের আসরে। আর শেষ দিনে অ্যাথলেটিক্সে স্বর্ণ জিতে আক্ষেপে পুড়তে থাকা ভারতবাসীকে আনন্দের উপলক্ষ এনে দিলেন সেই নীরাজ চোপড়া, যাকে সাধারণ একজন থেকে অসাধারণ এক অ্যাথলেটে পরিণত করেছে মিশন অলিম্পিক উইং।

দীর্ঘ বিশ বছর ধরে নিয়মতান্ত্রিক পরিকল্পনা, সঠিক নির্বাচন পদ্ধতি, উচ্চতর প্রস্তুতি আর লক্ষ্যে অবিচল থেকে ভারতের মিশন অলিম্পিক উইংয়ের সেনা কর্মকর্তা, প্রশিক্ষক আর খেলোয়াড়দের আজকের এই সাফল্য অনুকরণীয় হতে পারে যেকোনো দেশের সংগঠন ও খেলোয়াড়দের কাছে। অলিম্পিকে সবচেয়ে জনবহুল অথচ পদকবঞ্চিত রাষ্ট্র হিসেবে এখনো যে দুর্নাম বাংলাদেশের ফেডারেশন আর খেলোয়াড়ের বয়ে বেড়াচ্ছেন, তা ঘোচানোর জন্য তাদের পাশের দেশে তাকালেই চলছে।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×