উৎপল শুভ্র: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হওয়ার সবচেয়ে ভালো দিক কী? খারাপ দিক থাকলেও শুনি।

মাহেলা জয়াবর্ধনে: ভালো দিকের তো অভাব নেই। সবই ভালো। খারাপ দিক একটাই—সময়ের টানাটানি। ক্রিকেট এত সময় নিয়ে নেয় যে, পরিবারের সঙ্গে কাটানোর মতো সময় বের করাই কঠিন। শুধু তো ম্যাচ আর দলের সঙ্গে প্র্যাকটিস নয়, নিজের খেলা নিয়ে আলাদা কাজ করতে হয়। অধিনায়ক হওয়ার পর আজ স্পনসরদের এই অনুষ্ঠান, কাল বোর্ডের ওই অনুষ্ঠান—এসবে ব্যস্ততাও অনেক বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য আর খুব বেশি সময় থাকে না।

শুভ্র: ভালো দিকগুলোর মধ্যে কোনটিকে এগিয়ে রাখবেন? টাকা, খ্যাতি...প্রাপ্তি তো অনেক।

জয়াবর্ধনে: ক্রিকেট আমাদের জীবিকা, টাকাটাও খারাপ পাই না। খ্যাতিও আছে, যেখানেই যাই লোকে চেনে, প্রশংসা করে। এসব তো ভালো লাগেই। এর বাইরেও একটা কারণে নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে করি, এশিয়ান দেশ হয়েও ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের মতো আমাদের খ্যাতির বিড়ম্বনা পোহাতে হয় না। আমরা আর দশজন মানুষের মতোই সাধারণ জীবন যাপন করতে পারি। আমি যেমন খেলা না থাকলে প্রায় প্রতিদিন সকালে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে নিজেই মুদির দোকানে গিয়ে কেনাকাটা করি। এখানে মানুষ আমাদের ভালোবাসে ঠিকই, তবে আমাদেরও যে ব্যক্তিগত একটা জীবন আছে, সেটা বোঝে। আমাদের প্রাইভেসিকে সম্মান করে। আমরা যখন যা ইচ্ছে, তা-ই করতে পারি।

শুভ্র: শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে পালাবদলের নায়ক মনে করা হয় আপনাকে। গত বছর আইসিসি বর্ষসেরা অধিনায়কের স্বীকৃতি, আইসিসি ক্রিকেট কমিটিতে খেলোয়াড়দের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনয়ন পাওয়া...খেলা শুরু করার সময় কি এত কিছু ভাবতে পেরেছিলেন?

জয়াবর্ধনে: এসব কিছুই ভাবিনি, আমি শুধু ক্রিকেটটাই খেলতে চেয়েছি। আইসিসি ক্রিকেট কমিটিতেও আসলে আমার যাওয়ার কথা ছিল না। খেলোয়াড়েরা সাঙ্গাকে (কুমার সাঙ্গাকারা) মনোনীত করেছিল। ও কাউন্টি ক্রিকেটে ব্যস্ততার কারণে যেতে পারেনি বলে ওর হয়ে আমি ক্রিকেটারদের প্রতিনিধিত্ব করেছি। গিয়ে ভালোই হয়েছে, অনেক কিছু শিখেছি। আমার একটাই স্বপ্ন ছিল—শ্রীলঙ্কার হয়ে ক্রিকেট খেলা, ভালো খেলা। এখনো তা-ই। এর বাইরে যা পেয়েছি, তা বোনাস।

শুভ্র: যত দিন সম্ভব খেলা বা ভালো খেলা—এসব কি নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য দিয়ে বোঝানোর মতো?

জয়াবর্ধনে: নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। এখনো আমি খেলাটা উপভোগ করছি। এখনো আমার মধ্যে ভালো করার ক্ষুধা আছে, ম্যাচ জেতানোর তাড়না আছে। যেদিন এসব আর থাকবে না, সেদিনই বিদায় নিয়ে নেব। আমি দলের সাফল্যে অবদান রাখতে চাই, এক দিনের জন্যও বোঝা হতে চাই না। বয়স তো মাত্রই ত্রিশ হলো। কাজেই এখনই বলা কঠিন, কতটুকু কী করতে পারব।

শুভ্র: এই সিরিজেই অরবিন্দ ডি সিলভার টেস্ট রান ছাড়িয়ে গেলেন। এটা আলাদা একটা অনুভূতি হতে বাধ্য। অনেকেই তো অরবিন্দকে শ্রীলঙ্কার সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান মনে করেন।

জয়াবর্ধনে: আমার চোখে তিনি এখনো শ্রীলঙ্কার সেরা ব্যাটসম্যান। সে সময়ের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে ডি সিলভা যা করেছেন, সেটা চমকে দেওয়ার মতো। তাঁকে বিচার করার সময় আপনার মনে রাখতে হবে, ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত যখন তাঁর সেরা সময়, তখন আমরা সেভাবে টেস্ট ক্রিকেট খেলারই সুযোগ পেতাম না। শ্রীলঙ্কা বছরে দু-তিনটি করে টেস্ট খেলত। তিনি যদি এখনকার মতো বছরে ১০-১২টি করে টেস্ট খেলার সুযোগ পেতেন, তা হলে তাঁকে পেরিয়ে যাওয়াটা এত সহজ হতো না। আমি ডি সিলভার বড় ভক্ত ছিলাম, এখনো তা-ই। আমার চোখে এখনো অরবিন্দ ডি সিলভাই শ্রীলঙ্কার সেরা ব্যাটসম্যান।

উত্তরসূরিদের সাহায্য করতে যথা সম্ভব চেষ্টা করেন অরবিন্দ ডি সিলভা, এটাই নাকি শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের রীতি

শুভ্র: কিন্তু অরবিন্দ ডি সিলভা নিজেই নাকি মুকুটটা আপনার মাথায় তুলে দিয়েছেন। ঘোষণা করেছেন—তিনি নন, আপনিই শ্রীলঙ্কার সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান!

জয়াবর্ধনে: হ্যাঁ, সম্ভবত গত বছর শ্রীলঙ্কার পত্রিকায় কলামে তিনি এমন লিখেছিলেন। তাঁর কাছ থেকে এই স্বীকৃতি পাওয়াটা অন্য রকম। কারণ তাঁর কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। এখনো তো তাঁকে এটা-ওটা জিজ্ঞেস করি, কারণ খেলাটা তিনি খুব ভালো বোঝেন। গত বছর আমাদের ইংল্যান্ড সফরের সময় অরবিন্দ ও অর্জুনা (রানাতুঙ্গা)—দুজনই আমাদের সঙ্গে দেখা করে দারুণ কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। আমি মনে করি, ইংল্যান্ডে আমাদের এমন ভালো করার পেছনে তাঁদেরও অবদান ছিল। তাঁরা এখনো আমাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। অর্জুনা-অরবিন্দ—দুজনই খেলাটা এত ভালো বোঝেন যে, তাঁদের উপদেশ পাওয়াটা দারুণ ব্যাপার।

শুভ্র: ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে এখানে শ্রীলঙ্কার বড় পার্থক্য দেখছি। ওসব দেশে তো সাবেক খেলোয়াড়েরা সুযোগ পেলেই বর্তমান খেলোয়াড়দের আক্রমণ করে বসে। শ্রীলঙ্কায় সাবেক-বর্তমান সব ক্রিকেটার যেন এক পরিবারের সদস্য।

জয়াবর্ধনে: শ্রীলঙ্কার বড় সুবিধা হলো, এখানে সবাই বোঝে যে, শেষ পর্যন্ত এটি শুধুই একটি খেলা। আরেক ধাপ এগিয়ে বাণিজ্যিকীকরণের স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়াটা খুব সহজ। কিন্তু আমরা তা দিইনি। এটা এমন একটা খেলা যে, খেলোয়াড়েরা ভুল করবেই। সাবেক খেলোয়াড় হিসেবে আপনি যদি কাউকে আরও ভালো ক্রিকেটার হওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন, কেন তা করবেন না। আমাদের শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের সংস্কৃতিটাই এ রকম। সাবেক খেলোয়াড়েরা বর্তমান খেলোয়াড়দের সাহায্য করে। একদিন আমি যখন সাবেক হয়ে যাব, পরের প্রজন্মকে সাহায্য করতে চেষ্টা করব। আমরা এই সংস্কৃতির মধ্যেই বড় হয়েছি। আশা করি, চিরদিন এটা এমনই থাকবে।

শুভ্র: ক্যান্সারে আপনার ছোট ভাই ধিশালের মৃত্যুর পর তো আপনি খেলা ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে শুনেছি। প্রসঙ্গটা আপনার জন্য কষ্টকর জানি, তারপরও জানতে চাই, এত বছরেও কি যন্ত্রণাটা একটুও কমেছে?

জয়াবর্ধনে: ওর মৃত্যুটা এখনো আমার হৃদয়ে প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরায়। আমরা ছিলাম পিঠাপিঠি, মাত্র দেড় বছরের ছোট-বড়। দুজন একই স্কুলে খেলেছি, একই বয়সভিত্তিক দলে। বড় ভাই-ছোট ভাইয়ের সম্পর্ক ছাড়িয়ে আমরা ছিলাম বন্ধু। ও খুব ভালো ক্রিকেটার ছিল। ওর অসুখটা যখন ধরা পড়ল, আমাদের পরিবারের জন্য তা ছিল ভয়াবহ এক সময়। যখন ও চলেই গেল...সেটিও তো ১১-১২ বছর হয়ে গেল, ওকে হারানোটা আমি মেনেই নিতে পারছিলাম না। আমি তখন স্কুলের পক্ষে খেলি, প্রায় ছয় মাস ক্রিকেট মাঠে যাইনি। আমার কোচ, শিক্ষকেরা, মা-বাবা—সবাই বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আমাকে ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনেন। ওর কথা ভেবেও ফিরেছি। মনে হচ্ছিল, ও নিজে যেহেতু ক্রিকেটার ছিল, আমাকে তো ও মাঠেই দেখতে চাইবে। ওর একটা ছবি সব সময় আমার সঙ্গে থাকে। আমার তো মনে হয়, ধিশাল এখনো আমার সঙ্গেই আছে।

ওকে হারানোর ওই ঘটনা কম বয়সেই জীবনটাকে অন্যভাবে দেখতে শিখিয়েছে আমাকে। শিখিয়েছে, এই যে আমরা অর্থ-বিত্ত-খ্যাতির পেছনে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াতে থাকি, সব আসলে অর্থহীন। এই পৃথিবীতে অনেক মানুষ খুব কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে। আমরা ভালো আছি, ঝলমলে জীবন কাটাচ্ছি...এর পেছনেও অনেক পরিশ্রম আছে, আমরা কষ্ট করেই তা অর্জন করেছি। তারপরও আমরা যদি মুহূর্তের জন্য থেমে ভাগ্যবঞ্চিতদের কথা একটু ভাবি, আশপাশের এক-দুজন মানুষের জীবনকেও একটু উন্নত করতে সাহায্য করি, তা হলে পৃথিবীটা অনেক সুন্দর হবে। এটি ভেবেই আমি হোপ ক্যান্সার হাসপাতাল প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। ক্রিকেটারদের অনেকেও এতে জড়িত হয়েছে। এটা অনেক বড় প্রকল্প, অনেক টাকা প্রয়োজন। শ্রীলঙ্কার মতো ছোট দেশে কাজটা সহজ নয়। তারপরও আশা করি, একদিন এটি শেষ করতে পারব, শ্রীলঙ্কানরা দারুণ কিছু পাবে।

ক্যান্সার হাসপাতাল গড়ে তুলতে স্ত্রীকে সঙ্গে করে এভাবেই হেঁটে বেরিয়েছেন মাহেলা

শুভ্র: এই হাসপাতালটা কোথায় হচ্ছে?

জয়াবর্ধনে: কলম্বোর একটু বাইরে, এটির নাম মহারামাগামা ক্যান্সার হাসপাতাল। আসলে এটি একটি সরকারি হাসপাতাল। আমরা যা করছি, সরকারের সঙ্গে মিলে সেটিকেই বড় করছি। কারণ এখন যা আছে, তা রোগীদের চাহিদা মেটাতে পারছে না। এ কারণে আগেরটির পাশে ৭৫০ শয্যার নতুন একটা হাসপাতাল হচ্ছে, যাতে আধুনিক সব চিকিৎসাব্যবস্থা থাকবে। এ জন্য কারও কাছ থেকে এক পয়সাও নেওয়া হবে না। পুরোটাই চ্যারিটি। 

শুভ্র: এ ব্যাপারে ইমরান খানের সঙ্গে কথা বলেছেন? তিনি তো এ বিষয়ে পথিকৃৎ!

জয়াবর্ধনে: ইমরানের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি। তবে তিনি কিভাবে এটি করেছেন, আমি তার খোঁজ-খবর নিয়েছি। এখানে সমস্যা হলো, আমাদের দেশটা খুব ছোট। আমি তাই দেশের বাইরে থেকে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছি। সেটি ভালোই এগোচ্ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে সুনামি আঘাত হানায় যারা আমাদের টাকা দিতে চেয়েছিল, তারা সুনামি তহবিলে টাকা দিয়েছে। তবে ধীরগতিতে হলেও আমাদের কাজ এগোচ্ছে।

শুভ্র: ক্রিকেটাররা এতে কিভাবে অবদান রাখছেন? ম্যাচ ফির একটা অংশ দিচ্ছেন তহবিলে, এমন কিছু?

জয়াবর্ধনে: শুরুতে ক্রিকেটাররাও টাকা দিয়েছে। তবে আমাদের ক্রিকেটাররা সবাই এর বাইরেও দুস্থ শিশু, এতিমখানা—এ জাতীয় বিভিন্ন চ্যারিটির সঙ্গে জড়িত। আমি আমার স্পনসরশিপ খাতে পাওয়া টাকার একটা অংশ এ তহবিলে দিই। তহবিল সংগ্রহের জন্য একটা অফিসমতো আছে, সেটির কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও আমিই দিই।

আমার মা-বাবা ওর কবর দেখতে যায়, আমি দশ বছর যাইনি। আমার যে মনে হয়, ও আমার সঙ্গেই আছে।

শুভ্র: শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটার সবারই নিজস্ব চ্যারিটি আছে বলছেন?

জয়াবর্ধনে: প্রায় সবারই। মুরালি যেমন সুনামিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কাজ করে আসছে, সিনিগামা নামের একটি গ্রামের পুরো দায়িত্বই নিয়েছে ও। আমি আর আমার স্ত্রী এরও আগে থেকে ওই গ্রামের পিতৃহারা দুটি মেয়ের পড়াশোনার খরচ দিয়ে আসছি। আমাদের দলের বেশির ভাগ ক্রিকেটারই এমন দু-তিনজন শিশুর পড়াশোনার খরচ চালায়। সম্প্রতি আমরা আরেকটি প্রকল্প শুরু করেছি—যুদ্ধে মারা যাওয়া সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সন্তানদের পড়াশোনা করার খরচ দিচ্ছি। প্রত্যেকে দু-তিনজন করে শিশুসন্তানের দায়িত্ব নিচ্ছি। হয়তো পুরো দেশটাকে বদলে দিতে পারব না, কিন্তু দু-তিনটি জীবন বদলে দিতে পারলেও তো ষাট বছর বয়সে পেছনে তাকিয়ে আমরা বলতে পারব—শুধু ভালো ক্রিকেটার নয়, সমাজের জন্যও আমরা কিছু করেছি।

শুভ্র: বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরি, গত বছর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৩৭৪—এমন সব পারফরম্যান্সের পরই কি আপনি ধিশালকে স্মরণ করেন?

জয়াবর্ধনে: শুধু পারফরম্যান্সের পর কেন, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তেই আমি ওকে মনে করি। সকালে ওর একটা ছবি সামনে নিয়ে প্রার্থনা করেই দিন শুরু হয় আমার। ও নেই, এটাই তো আমার বিশ্বাস হতে চায় না। আমার মা-বাবা ওর কবর দেখতে যায়, আমি দশ বছর যাইনি। আমার যে মনে হয়, ও আমার সঙ্গেই আছে।