টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ছক্কা ও একজন জো ডার্লিং

উৎপল শুভ্র

১৪ জানুয়ারি ২০২২

টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ছক্কা ও একজন জো ডার্লিং

জো ডার্লিং: টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ছক্কা

প্রথম ছক্কা দেখতে টেস্ট ক্রিকেটকে ৫৫তম টেস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে, এর কারণ ছক্কা মারতে তখন বল মাঠের বাইরে পাঠাতে হতো। অস্ট্রেলিয়ায় তো ব্যাটসম্যান চার-ছয়ের মতো `পাঁচ`-ও মারতে পারতেন! সেটি আবার কিভাবে?

টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম বলটি খেলেছেন যে ব্যাটসম্যান, প্রথম 'পাঁচ'টিও মেরেছেন সেই চার্লস ব্যানারম্যানই।

আর প্রথম ছক্কা? ৫৫তম টেস্টে এসে মেরেছেন তা অস্ট্রেলিয়ারই জো ডার্লিং। প্রথম চারটি কে মেরেছিলেন, সুনির্দিষ্টভাবে তা জানা না গেলেও সেটি ব্যানারম্যানই হবেন বলে অনুমান করা যায়। তা ক্রিকেট আইন চার পাঁচ-ছয় থেকে শুধু চার-ছয়ে আসার গল্পটা কী? তা বলার আগে আপনার মনে যে প্রশ্নটা জেগে উঠেছে, সেটির উত্তর দিয়ে নেওয়া ভালো। ক্রিকেটে চার-ছয় মারা যায়, এটা তো সবারই জানা। 'পাঁচ' মারে কিভাবে?

একসময় মারা যেত। বল মাটি না ছুঁয়ে বাউন্ডারি সীমানার ওপারে পড়লেই ছয়...বর্তমান এই আইন তো সর্বজনগ্রাহ্য স্বীকৃতি পেয়েছে ১৯১০ সালে, টেস্ট ক্রিকেট শুরু হওয়ার ৩৩ বছর পর! টেস্ট ক্রিকেটের শুরুতে চার-পাঁচ-ছয় সবই মারতে পারতেন কোনো ব্যাটসম্যান। যদিও 'পাঁচ' মারার ব্যাপারটা ছিল শুধু অস্ট্রেলিয়াতেই সীমাবদ্ধ।

অস্ট্রেলিয়ায় বল শুধু সীমানার ওপারে গেলে ব্যাটসম্যান পেতেন ‘পাঁচ’, মাঠের বাইরে গেলে ছয়। ইংল্যান্ডে ছিল অন্য নিয়ম। সেখানে এক শটে 'পাঁচ' রান নেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। বল মাঠের বাইরে না গেলে চার রানের বেশি পেতেন না ব্যাটসম্যান, পাঁচ রানের সান্ত্বনাও নয়। ১৮৯৯ সালে সফরকারী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে এমসিসির অ্যালবার্ট ট্রটের যে বিগ হিটটি লর্ডস মাঠে সবচেয়ে ‘বড়’ বলে স্বীকৃত, তাতে বল প্যাভিলিয়নের ছাদে ড্রপ খেয়ে মাঠের পাশের টেনিস কোর্টে পড়ার পরও ট্রট চার রানই পেয়েছিলেন। বল যে সরাসরি মাঠের বাইরে গিয়ে পড়েনি।

বল উড়ে গিয়ে বাউন্ডারি সীমানার বাইরে পড়লেই ছয়...অস্ট্রেলিয়ায় অবশ্য ১৯০৪-০৫ মৌসুমেই চালু হয়ে যায় এই নিয়ম। পাঁচ রান হলে ব্যাটসম্যান আর স্ট্রাইকিং প্রান্তে থাকতে পারেন না, কারণ ছিল এটাই। ১৯০৫ সালের ইংল্যান্ড সফরে অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক জো ডার্লিং (যাঁর ব্যাট থেকে টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ছক্কা) টেস্ট সিরিজের বাইরে অন্য ম্যাচগুলোতে এই নিয়ম অনুসরণ করার জন্য ইংলিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অনেক দেনদরবার করেও সফল হতে পারেননি। ১৯১০ সালে কাউন্টি ক্রিকেটের উপদেষ্টা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে ছক্কা মারতে বল মাঠের বাইরেই পাঠাতে হতো।

জো ডার্লিং: টেস্টে প্রথম ছক্কাতেই শুধু প্রথম ননটেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ছক্কা মারার কারণেই শুধু নয়, অন্য কারণেও ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন জো ডার্লিং। টেস্টে সেঞ্চুরি করা প্রথম বাঁহাতি ব্যাটসম্যান তিনি। এক সিরিজে ৩টি সেঞ্চুরি করার প্রথম কীর্তিও এই অস্ট্রেলিয়ানের, প্রথম ৫০০ রান করারও (দুটিই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১৮৯৭-৯৮ সিরিজে)। সেই সিরিজেই অ্যাডিলেডে টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম ছক্কাটি মারেন ডার্লিং। অর্থাৎ বল পাঠিয়ে দেন মাঠের বাইরে।

৩৪ টেস্টে ২৮.৫৬ গড়ে ১৬৫৭ রান...এই পরিসংখ্যান ডার্লিংয়ের ব্যাটিং সামর্থ্যের পুরো প্রতিফলক নয়। তবে অধিনায়কত্বের রেকর্ডে ঠিকই মূর্ত নেতৃত্বগুণ। ২১টি টেস্টে নেতৃত্ব দিয়ে হেরেছেন মাত্র ৪টিতে। তিনটি অ্যাশেজ জয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে হেরে গেছেন ১৯০৫ সালে ক্যারিয়ারের শেষ সিরিজটিতে।

১৯০৫ অ্যাশেজের সিরিজের দুই অধিনায়ক: অস্ট্রেলিয়ার জো ডার্লিং ও ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি জ্যাকসনযেটিতে ডার্লিংকে নিয়ে মজার একটা ঘটনা আছে। সেই সিরিজে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক স্ট্যানলি জ্যাকসন, পরে যিনি ব্রিটিশ শাসিত বাংলার গভর্নর হয়েছিলেন। তো কাকতালীয়ভাবে দুই অধিনায়ক ডার্লিং-জ্যাকসন দুজনেরই জন্ম হয়েছিল একই দিনে। মজার ঘটনা এটা নয়। সেই সিরিজের পাঁচটি টেস্টেই টসে হারার পর সফরের শেষে স্কারবরোতে একটি প্রদর্শনী ম্যাচের আগে ডার্লিং কোমরে তোয়ালে জড়িয়ে জ্যাকসনকে গিয়ে বলেন, 'আর টস করতে রাজি নই। টসের বদলে কুস্তি হবে।'

জ্যাকসন পাশে দাঁড়ানো অলরাউন্ডার জিওফ হার্স্টকে দেখিয়ে বলেন, এই ম্যাচে তো ও আমাদের অধিনায়ক!' ইয়া লম্বা-চওড়া জিওফ হার্স্টের দিকে একবার তাকিয়ে ডার্লিং বলেন, 'ক্রিকেট খেলায় কুস্তি-টুস্তির কী দরকার! প্রথাগত টসই হোক।' তা-ই হয় এবং টসে আবার হারেন ডার্লিং!

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×