৯ টেস্ট ও ১৮ ওয়ানডের ছোট্ট ক্যারিয়ার, যার বেশির ভাগটাই কেটেছে ওপেনিংয়ে। শুভ্র.আলাপে অতিথি হয়ে এসে মেহরাব হোসেন অপিকে তাই বলতে হলো তাঁর ওপেনিং পার্টনারদের নিয়ে। উদ্বোধনী জুটিতে পাঁচজনের সঙ্গ পেলেও অনিয়মিত দুই ওপেনার খালেদ মাসুদ আর খালেদ মাহমুদ হিসেবের বাইরেই থাকলেন। ক্যারিয়ারের সর্বশেষ তিন ম্যাচে ইনিংস উদ্বোধনে তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন যিনি, সেই মোহাম্মদ আশরাফুলকে 'বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান'-এর স্বীকৃতি দিলেও ওপেনিং পার্টনার হিসেবে তাঁকে নিয়ে কথাই হলো না। একটা কারণ তো অবশ্যই উৎপল শুভ্র ওপেনিং প্রসঙ্গে তাঁর নামটা আনলেনই না।

শুভ্র যে প্রসঙ্গটা আলাপের কোনো এক পর্যায়ে তুলবেন বলে ঠিক করে রেখেছিলেন, এক দর্শক সেই প্রশ্নটা আগেই করে ফেললেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খুব বেশি দিন একসঙ্গে ওপেন করেছেন এমন নয়, তারপরও অপি-বিদ্যুৎ ওপেনিং জুটি বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের কাছে রোমান্টিক এক গল্প হয়ে আছে। অপির সঙ্গে শুভ্রর আলোচনাটা শুরু হয়েছিল বিদ্যুতের সঙ্গে তাঁর জুটি নিয়েই। পরে সেই প্রসঙ্গ ধরেই এলেন সেই সময়ের তৃতীয় ওপেনার জাভেদ ওমর। এলেন আল শাহরিয়ার রোকনও, ২০০১ সালের জিম্বাবুয়ে সফরে অপির বদলে যাঁকে মিডল অর্ডার থেকে ওপেনিংয়ে তুলে এনেছিলেন সে সময়ের কোচ ট্রেভর চ্যাপেল। এই তিনজন এবং তাঁদের সঙ্গে পার্টনারশিপ নিয়ে মেহরাব হোসেন অপি এমন দারুণ বললেন যে, দর্শক আক্রান্ত হলেন নস্টালজিয়ায়। সেটির লিখিত রূপও কিছুটা হলেও আপনাকে সেই অনুভূতিতে আচ্ছন্ন করবে।

শাহরিয়ার হোসেন

যে ১৬ বার অপি নেমেছিলেন ইনিংস উদ্বোধনে, এর সাতবারই পেয়েছিলেন বিদ্যুতের সাহচর্য। তাতে ৩৮ গড়ে ২৬৬ রান। ১৯৯৮ থেকে অপির ক্যারিয়ার শেষ হওয়া পর্যন্ত হিসেব করলে বাংলাদেশের হয়ে এর চেয়ে বেশি রান এসেছে মাত্র একটি জুটিতেই, আকরাম খান আর আমিনুল ইসলাম বুলবুল মিলে ১০ ইনিংসে করেছিলেন ২৭২।

অপি-বিদ্যুতের ব্যাটিং নিয়ে নিজের অভিমতও জানালেন শুভ্র। উইকেটে একটু ঝামেলা থাকলে টেকনিকের কারণে অপিকে হয়তো একটু বেশি স্বচ্চন্দ মতে হতো, কিন্তু ট্রু ব্যাটিং উইকেটে বিদ্যুৎ ছিলেন অসাধারণ। একটু ফ্ল্যাট উইকেটে বিদ্যুৎ দেখা দিতেন রুদ্রমূর্তিতে। অপিও সহমত পোষণ করে জানালেন, 'ব্যাটিং উইকেটে ও ছিল আনপ্যারালাল।'

মাঠে আর মাঠের বাইরে বিদ্যুৎ নাকি একেবারেই আলাদা চরিত্রের। ভুতের গল্প শুনলেও ভয় পান তিনি, অথচ মাঠে নামলে একদমই ভয়ডরহীন। অপি যেটির বর্ণনা দিতে গিয়ে বললেন, 'মাঠে বিদ্যুৎ কাউকে ভয় পেত না। কার বিরুদ্ধে খেলছে, কে বোলিং করছে, কোনো সময় এ জিনিসটা চিন্তা করত না!'

অবশ্য চিন্তা করবেনই বা কীভাবে! অবিশ্বাস্য এক তথ্যই জানালেন অপি। বিদ্যুৎ নাকি ব্রায়ান লারা-শচীন টেন্ডুলকার-ওয়াসিম আকরাম ছাড়া বাইরের কোনো ক্রিকেটারকেই চিনতেন না!  এখানটায় এসে উৎপল শুভ্র অপিকে স্মরণ করিয়ে দিলেন নর্দাম্পটনে পাকিস্তানের বিপক্ষে অপি-বিদ্যুতের সেই জুটির একটি মুহূর্তের কথা। সেদিন দুজনে মিলে গড়েছিলেন ৬৯ রানের জুটি, যার মধ্যে ওয়াকার ইউনিসকে এক ওভারেই বিদ্যুতের মারা তিনটি চারও ছিল। গল্প শোনা যায়, ওভার শেষে বিদ্যুৎ এসে অপিকে বলেছিলেন, 'এই মোয়া বোলারটা কেডা?'

সম্পর্কটা এখনো অটুট আছে। ছবি: সংগৃহীত

অপি হাসতে হাসতে নিশ্চিত করলেন ঘটনটা, 'তৃতীয় চার মারার পরে আমি যখন "সাবাস; সাবাস" বলতে বলতে ওর দিকে এগিয়ে গেলাম, বললাম, "দোস্ত, এইটা আরও সুন্দর হইছে", ও তখন আমাকে বলল, "ওই, এই মোয়া বোলারটা কেডা?" আমি খুবই আশ্চর্য হয়েছিলাম শুনে যে, ওয়াকার ইউনিসের মতো বোলারকে ও চেনে না!'

ম্যাচ আর প্র‍্যাকটিসের বাইরে বিদ্যুৎকে কখনো ক্রিকেট নিয়ে কথা বলতে শোনেননি বলে জানালেন অপি, 'পাঁচ মিনিটও ও কোথাও বসে টিভিতে খেলা দেখেছে কি না, সন্দেহ। খেলার কোনো খোঁজ-খবরই রাখত না। যতটুকু সময় সে প্র‍্যাকটিস করত, ম্যাচে যতটুকু খেলত, তার খেলোয়াড়ি জীবনটাই ছিল ততটুকুই।'

যে কারণে বিদ্যুৎ যে বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরিয়ান হতে হতে হতে পারেননি, পরের ম্যাচেই অপিকে ধরা দিয়েছে এই গৌরব, এ নিয়েও দুজনের কখনো কোনো কথা হয়নি।

মাঠে অপি-বিদ্যুতের দুর্দান্ত রসায়নটা অনূদিত হয়েছে মাঠের বাইরেও, যা জারি আছে এখনো। সেই অভিজ্ঞতাতেই অপি জানালেন, এখনো খেলা নিয়ে কথা বলতে আগ্রহ বোধ করেন না বিদ্যুৎ। আর খেলোয়াড়ি জীবনের আলাপ তো 'অনেক আগের কথা' বলে এড়িয়েই যান। এই 'মনের আনন্দে খেলা' ব্যাপারটিই তাঁকে খেলোয়াড় হিসেবে পরিপূর্ণ মাত্রায় বিকশিত হতে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে কি না, এ নিয়ে নিজের সংশয় প্রকাশ করলেন শুভ্র। একটু পরিশ্রম করে যে নিজের স্থানটাকে আরও ওপরে নিয়ে যাবেন, যা পেয়েছি তাতেই তৃপ্ত হলে কি আর সে সুযোগ থাকে?

কী করুণ সমাপ্তি ঘটেছিল বিদ্যুতের ক্যারিয়ারের, তা মনে পড়ায় একটু আক্ষেপও ঝরে পড়ল শুভ্রর কণ্ঠে। বেশ কিছুদিন দলের বাইরে থাকার পর ২০০৪ সালে জিম্বাবুয়ে ট্যুরে আবার প্রত্যাবর্তন ঘটেছিল বাংলাদেশ দলে। পাখির চোখ করেছিলেন ওয়ানডে সিরিজকে। কিন্তু টেস্ট সিরিজ চলাকালীনই ভেজা মাঠে ফিল্ডিংয়ের সময় হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে ছিটকে যান ওয়ানডে সিরিজ থেকে, ক্যারিয়ারও থেমে যায় ওখানেই।

অবশ্য এ সব আক্ষেপ বিদ্যুৎকে পোড়ায় বলে মনে হয় না। এগুলো তো 'অনেককাল আগের কথা।'

 

জাভেদ ওমর বেলিমকে নিয়ে অপি

বিদ্যুতের ক্যারিয়ার নিয়ে শুভ্রর আক্ষেপটা যেখানে, ঠিক সেই কঠোর পরিশ্রমটাকেই পুঁজি করে সমসাময়িক অন্য ওপেনারদের চেয়ে অনেক এগিয়ে গিয়েছিলেন জাভেদ ওমর বেলিম। বাকিদের মতো প্রতিভাবান না হলেও নিজের পরিশ্রমের কল্যাণেই ৪০টি টেস্ট খেলেছেন, এটা জাভেদও প্রায়ই মনে করিয়ে দেন। শুভ্রই জানাচ্ছেন, 'জাভেদ আমাকে প্রায়ই বলে, "আমার সময় কী সব ওপেনার ছিল, অপি-বিদ্যুৎ-রোকন...কী সব ফাটফাটি ট্যালেন্ট! এদের সঙ্গে ফাইট করে আমি ৪০টা টেস্ট খেলতে পেরেছি, এটাই তো অনেক কিছু।" পুরোটাই তো হার্ডওয়ার্কের জন্য।' এখানটায় একমত না হয়ে উপায় থাকল না অপিরও। স্বীকার করলেন, জাভেদ বিদ্যুৎ তো বটেই, তাঁর চেয়েও অনেক বেশি পরিশ্রমী ছিলেন।

জাভেদ ওমর বেলিমের সঙ্গে মেহরাব হোসেন অপি

দুই বন্ধু অপি-বিদ্যুতের উদ্বোধনী জুটির মাঝে যে বাগড়া দিতেন জাভেদ, এই ব্যাপারটিকে কীভাবে নিতেন অপি? জাভেদের সঙ্গে সম্পর্কটাই বা কেমন ছিল? জানতে চাইলেন শুভ্র। অপি বললেন, 'সম্পর্কটা সবসময়ই ভালো। যখন ব্যাটিং করতে নামতাম, সবাই কিন্তু নিজের পারফরম্যান্স নিয়েই চিন্তিত থাকত যে, কীভাবে ভালো খেলব।'

তবে জাভেদের ব্যাটিংয়ের শ্লথগতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে 'একটু সমস্যা হতো' বলেও স্বীকার করলেন অপি। তাঁর মতো বিদ্যুৎও মেরে খেলতে পছন্দ করতেন, যে কারণে নিজে কখনো একটু স্লো খেললেও রানরেট নিয়ে ভাবতে হতো না অপিকে। বিপরীতে জাভেদের ধীর-স্থির ব্যাটিংয়ের কথা কারও কাছেই অবিদিত নয়, 'আমরা সবাই জানি, জাভেদ একটু ধীরগতিসম্পন্ন খেলোয়াড়। তবে টেস্ট ক্রিকেটে খুব একটা সমস্যা হয়নি, আর জাভেদের সঙ্গে ওয়ানডেতেও খুব একটা খেলিনি আমি। সে হিসেবে খুব একটা সমস্যা হয়নি। আমরা একটু অ্যাগ্রেসিভ খেলতে পছন্দ করতাম, ও একটু ধীরে-সুস্থে, ডিফারেন্সটা এখানেই ছিল।'

অপির ব্যবহার করা 'ধীরগতিসম্পন্ন খেলোয়াড়' কথাটা শুনে খুব মজা পেলেন উৎপল শুভ্র। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেসও করলেন, পুরোনো ঢাকায় বড় হয়েও এমন সুন্দর বাংলা অপি কোত্থেকে শিখলেন। উত্তর কী পাওয়া গেল, জানেন? রেডিওতে খেলার কমেন্ট্রি শুনে। প্রসঙ্গটা ওঠায় সেই সময়ে বিখ্যাত কিছু ধারাভাষ্যকারদের নামও স্মরণ করলেন দুজনে।

আল শাহরিয়ার রোকনকে নিয়ে অপি

ট্রেভর চ্যাপেল বাংলাদেশের কোচ হয়ে এসেই যা করেছিলেন, অপিকে সরিয়ে রোকনকে তুলে দিয়েছিলেন ওপেনিংয়ে। বিদ্যুতের মতো রোকনের সঙ্গেও অপির সম্পর্কটা বেশ দারুণ ছিল। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেও রোকনের ওপর কোনো ক্ষোভ কাজ করেনি তাই। উৎপল শুভ্র জানাচ্ছেন, ২০০১ সালের যে জিম্বাবুয়ে সফরে এ কাণ্ড ঘটেছিল, একটা স্টোরি করতে দুজনের সঙ্গেই তিনি কথা বলেছিলেন। অপির মুখ থেকে কেবল প্রশংসাই শুনেছেন রোকনের ব্যাপারে, 'আমি তো ওর খুব ফ্যান। ওর স্ট্রোক প্লে দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি।' তবে ভেতরে ভেতরে একটা খেদ যে ছিলই, তা জানালেন গতকাল, 'দলের একটা এস্টাবলিশড ওপেনারকে সরিয়ে আপনি যখন কাউকে মেকশিফট ওপেনার বানাবেন, তখন (ওপেনিং ব্যাটসম্যানের) অভিজ্ঞতাটা কিন্তু সুখকর হয় না।'

ছবিটা ঝাপসা। কারণ তা পত্রিকা থেকে নেওয়া। ২০০১ সালের জিম্বাবুয়ে সফরের ছবি। যখন ওপেনিং থেকে অপিকে সরিয়ে মিডল অর্ডার থেকে তুলে রোকনকে খেলানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কোচ ট্রেভর চ্যাপেল

কিন্তু রোকনকে এভাবে মিডল অর্ডার থেকে ওপেনিংয়ে তুলে দেওয়াটা কি সমর্থন করেছিলেন তিনি? অপি বলছেন, করেননি। 'দলের হেড কোচ ট্রেভর চ্যাপেলই সব সিদ্ধান্ত নিতেন তখন। তিনি যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, মেনে নিতেই হবে। তবে রোকনকে আমি কখনো ওপেনার বলব না। আমার এখনো মনে হয়, হি ইজ ভেরি গুড অ্যাট নাম্বার থ্রি অর ফোর। তার ক্যারিয়ার যদি আপনি দেখেন, সে কিন্তু শুরুও করেছিল নাম্বার থ্রি-য়ে এবং টপ লেভেলেও সে যখন কট কমপিট  করতে শুরু করে, সে মিডল অর্ডারেই ছিল। পরে ট্র‍্যাক চেঞ্জ করে ওপেনিংয়ে তাকে তুলে আনা হলো। কিন্তু ওপেনার হিসেবে ও কতটুকু সাকসেসফুল ছিল?'

পরিসংখ্যান বলছে, ইনিংস উদ্বোধনের চেয়ে অন্য পজিশনেই বেশি সফল ছিলেন রোকন। টেস্টে ওপেনিংয়ে ২৪ ছাড়ানো গড়ের বিপরীতে তিন নম্বরে তাঁর গড় ২৮.৬৭। ওয়ানডেতে ওপেনিংয়ে গড় যেখানে ১১.২১, পাঁচ নম্বরে নামতেই তা হয়ে গিয়েছে ৪২। যদিও পাঁচ নম্বরে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র তিন ম্যাচই।

সব মিলিয়ে রোকনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানটা বড্ড সাদামাটা। যদিও তাঁকে বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যাটসম্যানদের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন অপি, 'বাংলাদেশের যত ট্যালেন্টেড ব্যাটসম্যান এসেছে, রোকন ইজ ওয়ান অব দেম। তার সামর্থ্য নিয়ে কখনো প্রশ্ন ছিল না।'

সেই প্রতিভাকে পারফরম্যান্সে রূপ দিতে না পারায় রোকনকে নিয়ে অপির আক্ষেপ আছে। যে আক্ষেপ আসলে অপিকে নিয়েও করেন সবাই।

আরও পড়ুন...
বাবাকে দেওয়া কথা রাখতে দেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান
রমন লাম্বাকে কীভাবে ভুলবেন অপি!