বাংলাদেশ নয়, লর্ডস টেস্টের প্রিভিউ জুড়ে থাকলেন শুধুই গ্রাহাম থর্প। আগামী শীতে ইংল্যান্ড যখন পাকিস্তান ও ভারত সফরে যাবে, থর্প থাকবেন অস্ট্রেলিয়ায়। নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলবেন থর্প—খবরটা বেরিয়েছে গত পরশু, লর্ডস টেস্ট শুরুর ঠিক আগের দিন। অস্ট্রেলিয়ানরা হরহামেশাই ইংল্যান্ডে কাউন্টি ক্রিকেট খেলছেন, তবে ইংলিশদের অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে যাওয়া সত্যিই একটা ঘটনা। ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে সর্বশেষ কোনো ইংলিশ টেস্ট ক্রিকেটার খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে। তারপরও থর্পের ইয়ান বোথামের উত্তরসূরি হওয়াটা এত বড় খবর হতো না, যদি তা গ্রাহাম থর্পের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘোষণা না করত।

গত এক দশকে ইংল্যান্ডের সেরা ব্যাটসম্যানের অনানুষ্ঠানিক এই অবসর ঘোষণা যদি জলকল্লোলের আওয়াজ তুলে থাকে, তার পাশে লর্ডসে বাংলাদেশের অভিষেকের খবরটা শুধু একটু বুদবুদ তুলেই মিলিয়ে গেছে। টেস্টের প্রিভিউর নামে ইংল্যান্ডের পত্রপত্রিকায় যা ছাপা হয়েছে, সব কটির শিরোনামেই গ্রাহাম থর্প। থর্পের আসন্ন বিদায় নিয়ে কাব্য রচনার পর লেখার শেষ দিকে গিয়ে একটু মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, লর্ডসে আজ বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে ‘ইংলিশ সামার’।

সামনেই অ্যাশেজ সিরিজ। অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারতে হারতে ক্লান্ত-হতাশাগ্রস্ত ইংরেজরা গত ১৬ বছর ধরে পেয়ে আসা লজ্জা এবার ঘোচাতে পারবে বলে আশায় বুক বেঁধেছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজটা তাদের জন্য তাই রবিশঙ্করের সেতার শোনার অপেক্ষায় থেকে শিক্ষানবিশদের টুং-টাং শুনতে হওয়ার মতোই বিরক্তিকর ব্যাপার। সেই ‘শিক্ষানবিশ’দের মধ্যে এক মুশফিকুর রহিমকে নিয়েই যা একটু আগ্রহ দেখা গেল ইংলিশ সাংবাদিকদের। উইজডেনের সাবেক সম্পাদক ও বিখ্যাত ক্রিকেট ইতিহাসবিদ ডেভিড ফ্রিথ পর্যন্ত বাংলাদেশের ৪ উইকেট পড়ে যেতেই ‘এবার ওই ১৬ বছরের ছেলেটা আসবে’ বলে আড্ডার মাঝখান থেকে উঠে গেলেন।

ট্যুর ম্যাচ থেকেই ইংলিশ সাংবাদিকদের মুখে-মুখে ফিরছিল '১৬ বছর বয়সী' মুশফিকুরের নাম। ছবি: পোপারফটো

তারুণ্যের একটা আলাদা আকর্ষণী-ক্ষমতা আছে। কৈশোরের সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা খুদে এক ব্যাটসম্যান ব্যাট হাতে লড়াইয়ে নামছেন লম্বায় ছয় ফুট ছাড়ানো চার ইংলিশ ফাস্ট বোলারের সঙ্গে... মুশফিকুর রহিমের গল্প তো ক্রিকেট রোমান্টিকের মন রাঙাবেই। ইংলিশদের মন আরও বেশি রাঙাচ্ছে, এখানে যে ২০ বছর বয়সে কেউ ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলতে শুরু করলেই তারুণ্যের বন্দনা শুরু হয়ে যায়!

মুশফিকুরের বয়স আসলেই ১৬ কি না, সে গবেষণাও হচ্ছে। উপমহাদেশের ঐতিহ্য মনে রেখে নিজে থেকেই এক-দু বছর যোগও করে নিয়েছেন কেউ কেউ। তাতে মুশফিকুর রহিমের ইতিহাসে ঢুকে যাওয়া আটকাচ্ছে না। ১৬ বছর ২৫৭ দিন বয়সে টেস্ট খেলতে নেমেছেন, টেস্ট ইতিহাসই তার চেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় দেখেছে মাত্র আটজন। লর্ডস মাঠ দেখেইনি। ১৯৫৪ সালে ১৮ বছর ৪৪ দিন বয়সে লর্ডসে টেস্ট অভিষেক হয়েছিল পাকিস্তানি ব্যাটসম্যান খালিদ ওয়াজিরের। সেই রেকর্ড ভেঙে মুশফিকুর রহিমই এখন লর্ডসে সবচেয়ে কম বয়সী ডেব্যুট্যান্ট।

এমন নান্দনিক কাভার ড্রাইভও খেলেছিলেন প্রথম ইনিংসে। ছবি: গেটি ইমেজেস

এই রেকর্ডের কথা মুশফিকুর রহিম জানেন না। জানলে মনেপ্রাণে চাইবেন, মিলটা যেন এখানেই শেষ হয়ে যায়। খালিদ ওয়াজিরের যে বলার মতো আর কিছুই নেই। লর্ডসে একমাত্র ইনিংসে ৩ রান করে ব্রায়ান স্ট্যাথামের বলে বোল্ড হয়ে গিয়েছিলেন। সেই সিরিজেই ওল্ড ট্রাফোর্ডে তাঁর দ্বিতীয় টেস্টের দুই ইনিংসে ২ ও অপরাজিত ৯ রান করার পর শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যায় তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ার। খালিদ ওয়াজিরের তা নিয়ে খুব আক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না। মাঠের স্মৃতিটা বিস্মরণযোগ্য হলেও মাঠের বাইরের একটি ঘটনা যে পাল্টে দিয়েছে তাঁর পরবর্তী জীবনের গতিপথ। সেই সফরেই এক ইংরেজ তরুণীর সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁকে এতটাই মনে ধরে যায় যে, খালিদ ওয়াজির আর পাকিস্তানেই ফেরেননি, তাঁকেই বিয়ে করে থেকে যান ইংল্যান্ডে।

অভিষেক ইনিংসে ৮৫ মিনিট উইকেটে থেকে ১৯ করেছিলেন মুশফিক, একবার বল হেলমেটেও লেগেছিল। ছবি: গেটি ইমেজেস

আপাতত শুধু কম বয়সের বিবেচনায় নয়, রানের বিচারেও খালিদ ওয়াজিরের চেয়ে অনেক এগিয়ে মুশফিকুর রহিম। ১৯ রান এমন কিছু নয়, কিন্তু দলের স্কোর ১০৮ হলে সেটির মূল্যও অনেক বেড়ে যায়। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের স্থায়িত্ব মাত্র ১৭৯ মিনিট, এটা মনে রাখলে যেমন অনেক গুণ বেড়ে যায় তাঁর ৮৫ মিনিট উইকেটে থাকার তাৎপর্য। প্রথম টেস্ট ম্যাচটি তাঁর মাত্র ষষ্ঠ ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ, সেই ম্যাচে বাংলাদেশের ইনিংসের প্রায় অর্ধেকটা সময়ই তো ব্যাট করলেন মুশফিকুর রহিম। অভিষেকটাকে স্মরণীয় না বলুন, খারাপই বা বলবেন কীভাবে?

লর্ডস টেস্ট শুরুর আগে ইংলিশ প্রেসের কাছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের বিজ্ঞাপন হয়ে ছিলেন মুশফিকুর রহিম। প্রথম দিন শেষেও তা-ই। মুশফিকুরের জন্য ব্যাপারটি আনন্দের, কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য তা নয়। তাচনর আগে যে পাঁচজন ব্যাটসম্যান নেমেছেন, শুধু অভিজ্ঞতা নয়, সামর্থ্যের বিচারেও তো তাঁরা সবাই মুশফিকুরের চেয়ে এগিয়ে। ইংলিশ সাংবাদিকরা মুশফিকুর রহিমে এমনই মজে আছেন যে, প্রথম মানদণ্ডটা মেনে নিলেও কারও কারও কথা শুনে মনে হলো, দ্বিতীয়টা নিয়ে আপত্তি আছে তাঁদের!

আরও পড়ুন...
ভুল মুশফিক, ঠিক মুশফিক!
দুই তরুণের 'স্বপ্নের অভিষেক'

বগুড়ার টেস্ট অভিষেকে তো থাকাই উচিত মুশফিকুরের

এবার মুশফিকের আসল টেস্ট অভিষেক

প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি: ইতিহাসের মুশফিক ইতিহাসে

ডাবল সেঞ্চুরির চেয়েও মুশফিক বেশি তৃপ্তি পেয়েছিলেন যাতে