কেন সরে দাঁড়ালেন তামিম ইকবাল?

উৎপল শুভ্র

১ সেপ্টেম্বর ২০২১

কেন সরে দাঁড়ালেন তামিম ইকবাল?

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সিরিজকে ছাপিয়ে আলোচনায় উঠে এসেছেন তামিম ইকবাল। হঠাৎ করে কেন এই সিদ্ধান্ত? তামিম যা বলেছেন, তার বাইরেও কি কিছু আছে?

নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে তামিম ইকবালের পোস্ট করা ভিডিওটা দেখতে দেখতে কেন যেন ২০১৭ সালের ৬ এপ্রিলের কথা খুব মনে পড়ছিল। সেদিন কলম্বোর প্রেসাদাসা স্টেডিয়ামে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টস করতে নেমে টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে সবাইকে হতবাক করে দিয়েছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা।

তামিম ইকবালের ভিডিও দেখতে দেখতে কেন মাশরাফির ওই ঘটনা মনে পড়ল, কারণটা ব্যাখ্যা করা দরকার। তামিম তো আর মাশরাফির মতো টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেননি। বরং পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি রিটায়ার করছেন না। শুধুই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। বোর্ড সভাপতি ও প্রধান নির্বাচককে তা জানিয়ে দেওয়ার পরই সবাইকে তা জানাচ্ছেন। তারপরও তামিম প্রসঙ্গে মাশরাফির কথা মনে পড়ার কারণ হয়তো একটাই। মাশরাফির ওই আকস্মিক সিদ্ধান্তের ছায়ায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটা। তামিমের হঠাৎ এই সিদ্ধান্তও একই রকম ছায়া ফেলেছে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে। এর আগে যে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১০টি টি-টোয়েন্টি খেলে ১০টিতেই হেরেছে বাংলাদেশ, এবার তাদের বিপক্ষে প্রথম জয়ের হাতছানি দেওয়া সিরিজকে ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তামিমের এই সিদ্ধান্ত।

তামিম নিজে এই সিদ্ধান্তের পেছনে যে কারণগুলোর কথা বলেছেন, তা আপনারা এরই মধ্যে জেনে গেছেন বলে অনুমান করি। তারপরও সারাংশটা একটু মনে করিয়ে দিই। অনেক দিন তিনি খেলার বাইরে। প্রস্তুতির দিক থেকে বাকিরা অনেক ভালো অবস্থায় আছে। এই অবস্থায় তাঁর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে ফেরা দলের তরুণদের প্রতি অবিচার হবে।গত বিশ্বকাপেই সেঞ্চুরি করেছিলেন ওমানের বিপক্ষে। ছবি: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

যা শুনে আপনার মনে যে প্রশ্নটা প্রথমেই জেগে ওঠার কথা, তা হলো তামিম কি আদৌ নির্বাচকদের জমা দেওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দলে ছিলেন? এমন কি হতে পারে, দলে নেই জেনেই সসম্মানে নিজেই সরে দাঁড়িয়েছেন?

তামিম ভিডিওতে তাঁর প্রাইভেসিকে সম্মান করে মিডিয়াকে কোনো কল করতে বা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ না পাঠাতে অনুরোধ করেছেন। সেই অনুরোধ রাখতে তাঁকে তাই এই প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। নির্বাচকেরাও অফিসিয়ালি এ নিয়ে কিছু বলবেন বলে মনে হয় না। তবে একাধিক সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েই বলছি, বোর্ডের কাছে জমা দেওয়া নির্বাচকদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে তামিম ইকবাল ছিলেন। তামিম ইকবালকে রেখেই আগামী পরশু সেই দল ঘোষণা করাও এক রকম চূড়ান্তই হয়ে গিয়েছিল।

বিশ্বকাপের দল থেকে তামিমের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত তাই মোটেই কোনো ‘কৌশল’ নয়। তামিমের সত্যি সত্যি মনে হয়েছে, এত দিন খেলার বাইরে থাকার পর তাঁর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যাওয়াটা ঠিক হবে না।

কিন্তু তারপরও আরেকটা প্রশ্ন তো জাগেই। হাঁটুর চোটের কারণে টি-টোয়েন্টি সিরিজের আগেই জিম্বাবুয়ে থেকে ফিরে আসার সময়ই তো তামিম জানতেন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে তাঁর খেলা হবে না। আবার মাঠে ফেরার জন্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকেই তিনি পাখির চোখ করেছিলেন বলেই জানি। নির্বাচকেরা দল চূড়ান্ত করে ফেলার পর হঠাৎ তাঁর কেন মনে হলো, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যাওয়াটা ‘তরুণদের প্রতি অবিচার’ হবে? তামিমের কাছ থেকে এই প্রশ্নের উত্তর জানার সুযোগ নেই বলে অনুমাননির্ভর কিছু জল্পনা করা ছাড়া আর উপায় কি!

ছবি: আইসিসি

বেশ আগেই শুনেছিলাম, তামিম যেকোনো একটা ফরম্যাট থেকে অবসর নেওয়ার কথা ভাবছেন। ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে ২০২৩ বিশ্বকাপ নিয়ে অনেক পরিকল্পনার কথা শুনেছি তাঁর মুখেই। তার মানে ওই ‘একটা ফরম্যাট’ ওয়ানডে নয়, সাম্প্রতিক সাফল্য টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি তাঁর আগ্রহটা আরও বাড়িয়েছে বলেও জানি। বাকি থাকে এক টি-টোয়েন্টি, যাতে তামিমের স্ট্রাইক রেট বাংলাদেশের ক্রিকেট জনতার আলোচনার বড় খোরাক হয়ে আছে অনেক দিনই। সেই সমালোচনায় বিরক্ত হয়েই হোক বা তিন ধরনের ক্রিকেটের চাপ নিতে না চাওয়ার কারণেই হোক, টি-টোয়েন্টি ছেড়ে দেওয়ার একটা ইঙ্গিত নাকি নির্বাচকদেরও দিয়েছিলেন। কিন্তু আমজনতা যা-ই মনে করুক না কেন, নির্বাচকেরা বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে তামিমের অভিজ্ঞতাকে মিস করতে চাননি। তামিমকেও সেটি বলা হয়েছিল বলেই জানি। দলে তাঁর গুরুত্ব নিয়ে যদি তামিমের মনে কোনো সংশয় জেগে থাকে, সেটি দূর করার কাজও নাকি করা হয়েছিল। তাহলে?

দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ইনজুরির কারণে অনেক দিন বাইরে থাকলেও বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে যেকোনো দলই তাঁকে পেতে চাইবে। ওপেনিং পজিশনে তামিমের তিন প্রতিদ্বন্দ্বী লিটন কুমার দাস, সৌম্য সরকার ও নাঈম শেখের হঠাৎ ঝলকে সাধারণ ক্রিকেট দর্শক যতই বিমোহিত হয়ে পড়ুন না কেন, তামিমে যে নির্ভরতাটা খুঁজে পায় দল, নির্বাচকদের তা না বোঝার কোনো কারণ নেই। টি-টোয়েন্টিতে স্ট্রাইক রেট অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, হয়তো সবচেয়ে বেশিই, তবে ওপেনিংয়ে কারও লম্বা ইনিংস খেলার গুরুত্বও খুব কম নয়। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ইনিংসের তালিকাটার দিকে তাকালে আপনি দেখতে পাবেন, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সর্বোচ্চ চারটি ইনিংসের তিনটিই তামিম ইকবালের। ঘটনাচক্রে এর দুটিই পাঁচ বছর আগে সর্বশেষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। হল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ৮৩ রানের পর ওমানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের একমাত্র সেঞ্চুরিটিও ধর্মশালায় সেই বিশ্বকাপের প্রাথমিক পর্বে।

ছবি: আইসিসি

টেস্ট-ওয়ানডের মতো টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি রানও কদিন আগেও তামিম ইকবালেরই ছিল। তামিমের অনুপস্থিতির সুযোগে সাকিব তাঁকে ছাড়িয়ে গেছেন ঠিকই, তবে তামিমের চেয়ে ১৭ রান বেশি করতে তাঁকে ৯ ইনিংস বেশি খেলতে হয়েছে। এই হিসাবটা অবশ্যই নিউজিল্যান্ড সিরিজের আগ পর্যন্ত।

স্ট্রাইক রেটের হিসাবে যদি আসেন, অন্য দুই ওপেনার লিটন ও সৌম্য তামিমের চেয়ে এগিয়ে (তামিমের স্ট্রাইক রেট ১১৬.৯৬, লিটনের ১৩৪.০২, সৌম্যর ১২৩.৬০), নাঈম শেখ পিছিয়ে (১১১.২৪)। ক্যারিয়ার স্ট্রাইক রেটের এই তুলনার সময় এটাও বোধ হয় মনে রাখা দরকার, বাকি তিনজনের আবির্ভাব বদলে যাওয়া টি-টোয়েন্টির যুগে। তামিমের শুরুর সময় যে চাহিদা এমন আকাশচুম্বী ছিল না। যে কারণে প্রথম ২০ ম্যাচে তামিমের স্ট্রাইক রেট ছিল ১০০-এর নিচে। ২০১৮ থেকে হিসাব করলে এই সময়ে তামিম টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন মাত্র ১৯টি। এই ১৯ ম্যাচে তামিমের স্ট্রাইক রেট ১২১.৬০। ১৬০-এর বেশি স্ট্রাইক রেট আছে ৩টি ইনিংসে। ওই তিনটি ম্যাচেই বাংলাদেশ জয়কেও মিলিয়ে নিতে পারেন এর সঙ্গে।

তামিম ইকবালকে বিশ্বকাপে তাই নিশ্চিতভাবেই মিস করবে বাংলাদেশ। কী কারণে তামিম বিশ্বকাপের মতো বড় আসর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন, এই নিয়ে আলোচনাও আরও অনেক দিনই চলবে। যা বলেছেন, সেটাই একমাত্র কারণ, নাকি এর পেছনে আরও কিছু আছে, একদিন হয়তো সেটিও বলবেন তামিম।

ততদিন না হয় অপেক্ষাতেই থাকি।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন