অভিষেক টেস্টের পর নাঈমুর রহমান দুর্জয়

`নিজেকে একটু লাকিই মনে হয়`

উৎপল শুভ্র

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১

`নিজেকে একটু লাকিই মনে হয়`

বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের দুই অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয় ও সৌরভ গাঙ্গুলী। ছবি: শা. হ. টেংকু

খেলেছেন মাত্র ৮টি টেস্ট ও ২৯টি ওয়ানডে, কিন্তু নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের একটা কীর্তি অক্ষয় হয়ে থাকবে চিরদিন। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক তো আর কেউ হতে পারবেন না। ২০০০ সালের নভেম্বরে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টের পর নেওয়া হয়েছিল এই সাক্ষাৎকার। যাতে টেস্ট ক্রিকেটের অজানা-অচেনা ভুবনে পা রাখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে উঠে এসেছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের নানা দিক।

প্রথম প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০০০। প্রথম আলো।

উৎপল শুভ্র: এখন তো আপনি টেস্ট ক্রিকেটার। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়কও। অনুভূতিটা কেমন?

নাঈমুর রহমান দুর্জয়: আমি যখন খেলা শুরু করি, কখনোই ভাবিনি যে, টেস্ট খেলব। তখন ভাবতাম, বাংলাদেশ ন্যাশনাল টিমে খেলব। তখন দেখতাম, বাংলাদেশ ওয়ানডেই খেলে, এশিয়া কাপ-অস্ট্রেলেশিয়া কাপ এসব। তখন স্বপ্নটা ছিল যে, ন্যাশনাল টিমে খেলব, টেস্ট নিয়ে কখনো চিন্তাই করিনি। গত দুবছরে হয়তো কিছুটা মাথায় এসেছে, তবে এর আগে টেস্ট খেলার ব্যাপারটা একদমই চিন্তায় ছিল না।

শুভ্র: শেষ পর্যন্ত যখন সত্যি সত্যিই টেস্ট খেলতে নামলেন, ১০ নভেম্বর সকালে যখন টস করতে যাচ্ছেন, তখন কেমন লাগছিল আপনার?

দুর্জয়: ন্যাশনাল টিমের ক্যাপ্টেন হিসেবে টস আগেও করেছি, গত কেনিয়া সফরেই যেমন (২০০০ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে)। তবে এটার অনুভূতি একেবারেই আলাদা। কালার ড্রেসে টস করা আর এখানে ব্লেজার পরে টস করা...এখানেই বড় একটা পার্থক্য। ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বললে নিজেকে একটু লাকিই মনে হয়।

শুভ্র: বাংলাদেশের টেস্ট অভিষেকের ঠিক আগেই ক্যাপ্টেন হলেন, লাকি মনে হয় কি এ কারণে?

দুর্জয়: এ জন্যই বললাম, এটার অনুভূতিটা একদমই আলাদা। বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে আমি টস করলাম। মাঠে টনি গ্রেগও আমাকে এই প্রশ্নটাই করেছিলেন, ‘তোমার কী ফিলিংস?’ কিন্তু এটা তো বলে বোঝানোর নয়। ৪০-৫০ হাজার লোক গ্যালারিতে। সব কিছুই অন্যরকম লাগছিল। তবে এর মধ্যে একটু খারাপ লাগাও ছিল। যেকোনো ক্রিকেটিং সাফল্যের সময় আমি আমার বাবাকে খুব মিস করি। আমি ফুটবলার ছিলাম, ওনার জন্য আমার ক্রিকেটার হয়েছি। আইসিসি ট্রফির পর এশিয়া কাপ পর্যন্ত উনি দেখে গেছেন।

শুভ্র: সব মিলিয়ে অভিষেক টেস্টের অভিজ্ঞতাটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন আপনি?

দুর্জয়: পুরোটাই তো অভিজ্ঞতা। যেহেতু আমাদের এটি প্রথম টেস্ট, তাই প্রতিটি জিনিসই ছিল নতুন, প্রতিটি জিনিসই শেখার। যেমন আমাদের পক্ষে ব্যক্তিগত কিছু ভালো পারফরম্যান্স হয়েছে। ওভারঅল যদি ম্যাচটার দিকে তাকান, টেস্টটাও কিন্তু ভালো হয়েছে। সাধারণত কী হয়, যে টেস্ট ‘ডেড’ হয়ে যায়, প্রথম থেকেই ‘ডেড’ হয়ে যায় আর যেটিতে উত্তেজনা থাকে, প্রথম থেকেই থাকে। অথচ এই টেস্টটির প্রথম তিন দিন কিন্তু সমানে-সমান ছিল। দর্শকের জন্যও উপভোগ্য হয়েছে টেস্টটি। খুব কম টেস্টই তিন দিন এরকম অবস্থায় থাকে। আমাদের প্রথম টেস্ট হিসেবে এটিকে আমি মনে করি বড় অর্জন। আর শেখার কথা যদি বলেন, আমাদের তো সব কিছুই শিখতে হবে। প্লেয়াররা একেকটা টেস্ট ম্যাচ খেলবে, নানা রকম কন্ডিশনের সঙ্গে পরিচয় হবে আর শিখবে। এখান খেলা হয়েছে নিজেদের উইকেটে, যদিও এই উইকেট সম্পর্কে আমাদের নিজেদেরও কোনো ধারণা ছিল না। নিজেদের দেশে খেলা, তারপরও। গ্রাউন্ডসম্যানের সঙ্গে আলাপ করে যতটুকু জানা যায়, জেনেছি। আর একটা ব্যাপার, ওয়ানডে হ্যাবিট থেকে বেরোতে না পারার কারণেই দ্বিতীয় ইনিংসে আমাদের অমন হয়েছে (প্রথম ইনিংসে ৪০০ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ ৯১ রানে অলআউট হয়ে যায়)। দ্বিতীয় ইনিংসে ওরা যে অভিজ্ঞ, পরিণত একটা দল; এটা যেমন বোঝা গেছে, তেমনি আমরা যে অনভিজ্ঞ, সেটাও বোঝা গেছে। পার্থক্যটা এখানেই...এক্সপেরিয়েন্স, ম্যাচুরিটি এ সবে। আমাদের এত দিনের হ্যাবিট থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগবে।

অভিষেক টেস্ট শুরুর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে পরিচয়পর্ব। ছবি: শা. হ. টেংকু
শুভ্র: টেস্ট ক্রিকেটের সব কিছু আমাদের জন্য নতুন। তারপরও সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে কী?

দুর্জয়: যেটা বুঝেছি, এখানে লুজ কিছু করে পার পেয়ে যাওয়ার উপায় নেই। যেমন আপনি দেখবেন, ক্যাপ্টেন অনেক সময় জানে, সিলি পয়েন্ট বা ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ক্যাচ যাবে না, তারপরও সেখানে ফিল্ডার রাখে ব্যাটসম্যানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার জন্য। টেস্ট ক্রিকেট জিনিসটাই এমন চাপ, এখানে প্রতি মুহূর্তেই চাপে থাকতে হয়। যেমন ওয়ানডেতে একটা বা দুইটা ক্যাচ ড্রপ হয়ে গেলে তেমন গায়ে লাগে না, কারণ একজন ব্যাটসম্যান যা-ই করুন, ৫০ ওভারের বেশি ব্যাটিং করতে পারবে না। কিন্তু এখানে একটা চান্স মিস করলে অনেক বেশি মূল্য দিতে হতে পারে। তবে সবকিছু মিলিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে আমার কাছে সবচেয়ে যা কঠিন বলে মনে হয়েছে, তা হলো পুরো পাঁচ দিন মনসংযোগটা ধরে রাখা। ওয়ানডে এক দিনের খেলা, যা-ই হোক, এক দিনেই সব শেষ। কিন্তু টেস্টে একটা ম্যাচের জন্য পাঁচ দিন মনসংযোগ ধরে রাখাটা খুব কঠিন। যে যত মানসিকভাবে শক্ত হবে, টেস্ট ক্রিকেটে সে তত ভালো করবে। আবার এত সব চাপের মধ্যেও রিল্যাক্স থাকাটা শিখতে হবে।

শুভ্র: টেস্ট খেলতে নেমে বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা যেমন নিজেদের নতুন করে চিনেছে, তেমনি আপনিও বলতে গেলে নতুন করে চিনেছেন আপনার দলকে। বুলবুল যেমন ভাবতে পারেননি, টেস্টে নয় ঘণ্টা ব্যাটিং করবেন, আপনিও হয়তো ভাবেননি ভারতের মতো দলের বিপক্ষে ৬ উইকেট নেবেন। কার দ্বারা কী সম্ভব, এটা তো আপনিও সেভাবে জানতেন না। এখন টেস্ট শেষে এই টেস্ট থেকে সবচেয়ে পজিটিভ দিকগুলো কী মনে হয় আপনার?

দুর্জয়: পজিটিভ দিক তো আছেই। আপনি যেমন বললেন, বুলবুল ভাই হয়তো কোনোদিন চিন্তাও করেননি, টেস্টে নয় ঘণ্টা ব্যাটিং করবেন। হয়তো তাঁর স্বপ্ন ছিল এমন। কিন্তু প্রথম টেস্টেই তা করে ফেলবেন, এটা হয়তো ভাবেননি। তাঁর এই পারফরম্যান্স বাকি সবার জন্য বিরাট একটা প্রেরণা। এখন যে কেউ চিন্তা করবে, আমি যদি ভালো খেলি, তাহলে টেস্ট সেঞ্চুরি করতে পারব। আমি যেমন কোনোদিন ভাবিনি, ভারতের এই ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে ক্লোজ ইন ফিল্ডার নিয়ে বোলিং করার কথা। হাবিবুল বাশার টেস্ট ক্রিকেট হলেও এখানেও পজিটিভ অ্যাটাকিং ব্যাটিং করেছে। যদিও দুবারই ও যখন আউট হয়েছে, তখন তা দলের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে, কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখলে ওর পুরো অ্যাপ্রোচটার মধ্যে একটা সাহসী ব্যাপার আছে। আমি যদি চাই, তাহলে এই লেভেলে এরকম বোলারদের বিপক্ষেও স্ট্রোক খেলতে পারি। স্ট্রোক খেলাটা এজন্যই জরুরি যে, হাইয়েস্ট লেভেলে আপনি যদি একটা জায়গায় আটকে যান, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ হলো স্ট্রোক খেলা।  যে কারণে দেখবেন, একজন ভালো স্ট্রোকমেকার সব পর্যায়েই ক্রিকেটেই রান করে। এই ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সগুলো পরবর্তী প্রজন্মকে অনেক উৎসাহিত করবে। আমি মনে করি, পরের প্রজন্ম আরও ভালো ফ্যাসিলিটিজ পাবে, অন্তত পাওয়া উচিত। তাই ওরা আরও ভালো করবে। বর্তমান দলেরও অনেক খেলোয়াড় অনুপ্রাণিত হবে এই পারফরম্যান্সগুলো দেখে।

অভিষেক টেস্টেই সেঞ্চুরি করে ফেলার পর বুলবুল। ছবি: শা. হ. টেংকু
শুভ্র: বাংলাদেশ দলে সবচেয়ে বড় কী সমস্যা চোখে পড়েছে, যেটি খুব তাড়াতাড়ি কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

দুর্জয়: খুব তাড়াতাড়ি ইমপ্রুভ করার উপায় নাই। আসলে আমাদের কিছু ন্যাচারাল ট্যালেন্ট পাওয়া খুব জরুরি। যেমন ধরুন পেস বোলার। ফাস্ট বোলার তৈরি করা যায় না, ওরা জন্মায়। আমাদের তাই ট্যালেন্ট হান্টিং প্রোগ্রাম দরকার। ট্যালেন্ট পাওয়ার পর তার সঠিক নার্সিংটা করাটাও খুব জরুরি। এটা যদি আমরা ঠিকভাবে না করতে পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আসবে কোত্থেকে? আমরা যদি দুই ইঞ্চি এগোই, অন্য দেশগুলো ছয় ইঞ্চি এগোবে আর এমনিতেই তো ওরা আমাদের চেয়ে এক শ বছর এগিয়ে আছে।

শুভ্র: তাহলে পেস বোলারের অভাবই বেশি অনুভব করছেন আপনি?

দুর্জয়: ওভারঅল বোলিংই দুশ্চিন্তা, বিশেষ করে পেস বোলিং। এই লেভেলে নতুন বলে ব্যাটসম্যানদের জন্য থ্রেট হতে পারে, এমন পেস বোলার আমাদের নেই। ভালো ওপেনিং স্পেল টেস্টে যেমন, তেমনি ওয়ানডেতেও আমাদের দরকার হবে। নতুন বলটা আমরা ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারছি না।

শুভ্র: কিন্তু এই টেস্টে যেমন উইকেট ছিল, তাতে আমাদের পেস বোলাররা কি খুব খারাপ করেছে?

দুর্জয়: তা হয়তো করেনি। এই উইকেটে ওরা ভালো বোলিংই করেছে। বিকাশ তো এই মরা উইকেটেও খুব ভালো বোলিং করেছে, কিন্তু তা ছিল মূলত লাইন-লেংথ ঠিক রেখে বোলিং। ব্যাটসম্যানদের খুব সমস্যায় ফেলার মতো কিছু নয়। অনেক সময় মনে হয়েছে, ব্যাটসম্যানরা খুব ইজি খেলছে। আমাদের এমন বোলার দরকার, যে ব্যাটসম্যানদের লাইফ ডিফিকাল্ট করে তুলবে। যদিও আমাদের এমন উইকেট পেস বোলারদের এনকারেজও করে না।

শুভ্র: আপনি কি আমাদের পেস বোলারদের বলে গতির অভাবটাই বেশি বোধ করছেন? এমন কাউকে চাচ্ছেন, যে বলের গতিতে ব্যাটসম্যানকে ব্যাকফুটে যেতে বাধ্য করবে?

দুর্জয়: না, না, শুধু গতি নয়। শুধু গতি থাকল আর লাইন-লেংথ ঠিক থাকল না, তাহলে আর লাভ কী? ব্যাটসম্যানদের জন্য থ্রেট কোনটা? গতি আছে, মুভমেন্ট আছে, এর সঙ্গে লাইন-লেংথও ঠিক আছে, এটাই তো? এরই অভাব আমাদের। আমি বিভিন্ন পেসে বল করতে পারি, কিন্তু বিভিন্ন পেসে বল করলেও বলের ওপর আমার কন্ট্রোলটা থাকতে হবে। অনেক সময় মন হয়, আমাদের পেস বোলারদের বলের ওপর কন্ট্রোলটা কম। তাছাড়া আমাদের পেস বোলাররা ব্যাটসম্যানদের রিড করতেও অনেক সময় নেয়। এদেশে পেস বোলারদের উৎসাহিত করার মতো উইকেট নেই, ঠিক আছে; কিন্তু পেসারদের নিজেদের বাড়তি পরিশ্রম, বাড়তি কষ্ট করার ইচ্ছাটাও কম। এ ব্যাপারে স্পেশালাইজড ট্রেনিং প্রয়োজন।


শুভ্র: বাংলাদেশের পেস বোলাররা তো সেভাবে ভালো কোচ বা ট্রেনিং ক্যাম্পের সহায়তাও পাননি…

দুর্জয়: হ্যাঁ, তা ঠিক। ওরা নিজেরা যতটুকু পেরেছে, করেছে। তবে পেস বোলিং নিয়ে আমার মূল দুশ্চিন্তা হলো অন্য। ঠিক আছে, বিকাশ আগের চেয়ে কিছুটা উন্নতি করেছে, কিন্তু শান্ত দলের সিনিয়র পেস বোলার, অথচ গত তিন/চার বছর ওর সেরকম কোনো ইমপ্রুভমেন্ট আমরা দেখিনি। অথচ চামিন্ডা ভাসের দিকে তাকান, হিথ স্ট্রিকের দিকে তাকান, খেলতে খেলতে ওদের যে ইমপ্রুভমেন্ট, ম্যাচুরিটি হয়েছে, আমাদের পেস বোলারদের মধ্যে কিন্তু তা দেখিনি। ব্যক্তিগত চেষ্টার অভাব আছে ওদের মধ্যে। ফ্যাসিলিটিজও কম আমাদের। পেস বোলারদের জন্য একটা জিম দরকার, সেটা কই? ইনজুরি বেশি হয় বলে পেস বোলারদের জন্য হয়তো জিমটা বেশি জরুরি, কিন্তু এখন ক্রিকেট যেখানে গেছে, তাতে পাওয়ারটাই মূল কথা, সব ক্রিকেটারকেই তাই সেভাবেই প্রস্তুত হতে হয়। অথচ সেই সুযোগ কোথায়? জিম নেই, মাঠ নেই...সব মিলিয়েই আমাদের ফ্যাসিলিটিজ খুব খারাপ।

শুভ্র: এখন আপনারা টেস্ট ক্রিকেটার। অথচ আজ বিকেলে যদি আপনি-বুলবুল-আকরাম-শান্ত ভালোমতো নেট প্র্যাকটিস করতে চান, ঢাকা শহরে তো তার কোনো সুযোগ নেই। 

দুর্জয়: নেই তো! কোথায় যাব আমরা? আমাদের ন্যাশনাল টিমের প্র্যাকটিস করার জায়গা নেই ঢাকা শহরে। ক্রিকেটারদের সব সময় বিকেএসপিতে গিয়ে থাকতে হয়। বিকেএসপি খুব ভালো, কিন্তু ক্রিকেটারদেরও তো সামাজিক জীবন আছে, পারিবারিক জীবন আছে। এক মাসের ট্যুর হলে বিকেএসপিতে গিয়ে থাকতে হয় দুই মাস, সব মিলিয়ে তিন মাস। এতে সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা হয়, ক্রিকেটাররা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আর মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়লে কারও পক্ষে সেরা খেলাটা সম্ভব নয়। অথচ ঢাকায় যদি একটা নির্দিষ্ট মাঠ থাকত, ইনডোর থাকত, তাহলে এখানেই আমরা প্র্যাকটিস করতে পারতাম। মাঠই তো নেই, একটাই মাঠ, সেটা নিয়েই টানাটানি। এবার যে ১৫ দিনের মধ্যে একটা টেস্ট ম্যাচের জন্য মাঠ-উইকেট রেডি করা গেছে, এটাই তো দারুণ ব্যাপার। সব মিলিয়ে আমাদের প্র্যাকটিস ফ্যাসিলিটিজ খুব খারাপ। আপনি কেনিয়ায় তো দেখেছেন। সেখানে অন্তত অনেক মাঠ আছে, মাঠে দুটি ভালো উইকেট আছে, চাইলে কেউ সেখানে প্র্যাকটিস করতে পারে। আমাদের তো সেই সুযোগও নেই।

শুভ্র: অভিষেক টেস্টে আপনার সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতি কোনটা? 

দুর্জয়: যখন টস করতে যাই।

প্রথম তিনটি দিন কেটেছিল স্বপ্নের মতো। ছবি: শা. হ. টেংকু
শুভ্র: আর ম্যাচ শুরু হওয়ার পর কীভাবে বদলাল আপনার অনুভূতি?

দুর্জয়: আমি আসলে সব সময়ই কনফিডেন্ট ছিলাম যে, ঢাকায় আমরা ভালো করব টেস্টে। এক্স্ট্র অর্ডিনারি কিছু হয়তো করব না, তবে ভালো যে করব, প্লেয়ারদের ওপর এই আস্থাটা ছিল। সেটি করেছিও। পারফরম্যান্সে আমি মোটামুটি সন্তুষ্ট। কেউ কেউ হয়তো সেভাবে পারফর্ম করতে পারেনি, এটা হয়ই, এক ম্যাচে সবাই পারফর্ম করতে পারে না। যেমন রফিক ভালো বোলিং করার পরও সেরকম উইকেট পায়নি। তবে ও সত্যি ভালো বোলিং করেছে। বিকাশও ভালো বল করেছে।

শুভ্র: দিন ভাগ করে যদি বলতে বলি...প্রথম দিনের ড্রেসিংরুম কেমন ছিল?

দুর্জয়: প্রথম দিন স্বাভাবিকভাবেই সবাই খুব এক্সাইটেড ছিল। সকালে উইকেট দেখে টস জিতলে ব্যাটিং করতে চেয়েছিলাম, টস জেতায় তাই করতে পেরেছি। শুরুটা ভালো না হলেও পরে তো ভালোই হলো। আমার সবচেয়ে যা ভালো লেগেছে, হাবিবুল বাশার যখন প্রথম ফিফটি করেছে, বুলবুল ভাই ফিফটি আর সেঞ্চুরি করেছে, পুরো দল কিন্তু ড্রেসিংরুম থেকে বাইরে চলে এসেছে। ব্যক্তিগত সাফল্য হলেও এটা আমাদের দলেরও অ্যাচিভমেন্ট এবং এর মধ্য দিয়ে টিম স্পিরিটটা বোঝা গেছে। অনেক দিন তো বাংলাদেশে ড্রেসিংরুমে ছিলাম, এই টেস্টের সময় বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমটা অন্যরকম লেগেছে, যেমন লেগেছিল আইসিসি ট্রফি আর বিশ্বকাপের সময়। সবার মধ্যেই একটা আলাদা ব্যাপার কাজ করেছে যে, আমরা টেস্ট খেলছি। প্লেয়ারদের চালচলন, অ্যাপ্রোচ সব কিছুতেই ফুটে বেরিয়েছে ‘আমরা টেস্ট খেলছি’ এই উপলব্ধিটা। এটা এত তাড়াতাড়ি আসবে, এটা আমি ভাবিনি।

প্রথম তিনটা দিন তো স্বপ্নের মতো কেটে গেছে। সব কিছুই হয়েছে আমাদের প্ল্যানমতো। প্রথম দিন ব্যাটিং করার পর আমাদের প্ল্যান ছিল, পরদিন লাঞ্চ পর্যন্ত ব্যাটিং করব। আমরা তাতে সফল হওয়ার পর প্রায় পৌনে দুই দিন যখন ব্যাটিং করলাম, প্লেয়াররা সবাই খুব ইনস্পায়ার্ড হয়েছিল। স্টার্ট হিসেবে আমি বলব, আমরা দারুণ করেছি। বোলিংয়ের সময় যেটা সব সময় আমার মনের মধ্যে ছিল যে, এটা ব্যাটিং উইকেট বলে আমরা একজন এক্সস্ট্রা ব্যাটসম্যান নিয়েছি। তাই আমার দায়িত্বটা বেশি।
অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসেই ৬ উইকেট নিয়েছিলেন দুর্জয়। ছবি: শা. হ. টেংকুশুভ্র: তাছাড়া আপনি নিজেকে স্পেশালিস্ট অফ স্পিনার বলে যে দাবি করেছিলেন, তা প্রমাণের দায় তো ছিল আপনার…

দুর্জয়: আমার প্রমাণ করার আরও অনেক কিছুই ছিল। ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিং...আমার পারফরম্যান্স, ক্যাপ্টেনসি সব কিছুই প্রমাণ করার ছিল। কারণ আমি যখন ক্যাপ্টেনসি পাই, তখন বলা হয়েছে যেহেতু এক্স ক্যাপ্টেন ফর্মে নাই, এ কারণে আমি ক্যাপ্টেন। ক্যাপ্টেনসি পেয়ে ভালো লেগেছে, তবে কারণটা আমার ভালো লাগেনি। ক্লাব ক্রিকেটে এজন্যই আমি ক্যাপ্টেনসি করতে রাজি হইনি, একজন করবে না তাই আমি করব, এটা আমার ভালো লাগেনি। আমাকে এমনভাবে ক্যাপ্টেন করা হয়েছে যেন ‘তুমি যথেষ্ট ভালো নও, একজন রান পাচ্ছে না বলেই তোমাকে ক্যাপ্টেন করা হলো।’ আমার মনে হয়, জিনিসটা স্ট্রেটকাট হওয়া উচিত। এভাবেই যে, ‘বুলবুল, হচ্ছে না। এষন নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া সময়’। কিন্তু আমার জিনিসটা এভাবে হয়নি। এ কারণেই আমি কেনিয়াতেও বলেছি, ক্যাপ্টেন হিসেবে আমার অনেক কিছু প্রমাণ করার আছে।

শুভ্র: প্রথম তিন দিন স্বপ্নের মতো কেটেছে বললেন, কিন্তু দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা যখন একের পর এক আউট হয়ে ফিরছেন, তখন তো আপনার আকাশ থেকে মাটিতে পড়ার মতো অবস্থা, তাই না?

দুর্জয়: অনেকটা সে রকমই। ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় সমস্যা ছিল, এখানে সেট হওয়াটা খুব কঠিন। আশেপাশে এত ফিল্ডার থাকে যে, উইকেটে সেট হওয়া সহজ নয়। কিন্তু একবার সেট হয়ে গেলে টেস্টে ব্যাটিং করা কিন্তু ওয়ানডের চাইতেও সহজ। মাঠে অনেক গ্যাপ, রানরেটেরও কোনো চাপ থাকে না। কিন্তু আমাদের সেরা ব্যাটসম্যানরা, যেমন ধরুন সুমন, ও সেট হয়ে গিয়েছিল, ওর দায়িত্ব ছিল ইনিংসটা ক্যারি করা। প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও একই ভুল করার পর ব্যাটসম্যানদের ওপর বেশি চাপ চলে আসে। যে একবার সেট হবে, তার দায়িত্ব হচ্ছে চালিয়ে যাওয়া, এটা প্রফেশনালিজমের মধ্যেই পড়ে। এক্ষেত্রে সুমন আরেকটু কেয়ারফুল হতে পারত। যেমন আমি চাইনি, আমার মূল দুই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান বুলবুল ভাই ও আকরাম ভাই নতুন বলের সামনে পড়ুক, এ জন্যই রোকনকে আগে পাঠালাম। আমার আঙুলে ইনজুরি ছিল, এ কারণে আমি চতুর্থ দিনে ব্যাট করতে নামতে চাইনি। কিন্তু আকরাম ভাই আউট হওয়ার পর আমাকে নামতেই হলো।

শুভ্র: সব মিলিয়ে ড্রেসিরুমের মুডটা তো তখন পুরো অন্যরকম হয়ে গেল…

দুর্জয়: তা তো হলোই। আগের সাড়ে তিন দিনের মুডটা বদলে গেল পুরোপুরি। তবে সেটি সে সময়ের পারফরম্যান্সের কারণে, পুরো ম্যাচ নিয়ে উপলব্ধিটা বদলে যায়নি।

শুভ্র: ম্যাচ শেষে প্লেয়ারদের কী বলেছেন?

দুর্জয়: আমি বলেছি, আমরা খারাপ খেলিনি। আমরা শুধু একটা ইনিংস খারাপ খেলেছি, ম্যাচটা খারাপ খেলিনি। আমার আরেকটা অনুরোধ ছিল, আমাদের টিম স্পিরিটটা যেমন ছিল, আবার যখন আমরা খেলব, তখনো যেন তা এমনই থাকে।

শুভ্র: টিম স্পিরিট ব্যাপারটা তো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তা এই টিম স্পিরিট ধরে রাখার জন্য আপনার কোনো পরামর্শ?

দুর্জয়: এ ক্ষেত্রে আমি বলব, ম্যানেজমেন্টেরও অনেক ভূমিকা আছে। প্লেয়াররা কিভাবে রিল্যাক্সড থাকে, কীভাবে এনজয় করে...এই জিনিসগুলো ম্যানেজমেন্টকে বুঝতে হবে। এ জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ম্যানেজার হলে ভালো হয়। প্লেয়াররা যেমন একে অন্যকে চেনে; তেমনি ম্যানেজারকেও প্লেয়ারদের চিনতে হবে, বুঝতে হবে।

শুভ্র: বাংলাদেশের মানুষ তো এখন ক্রিকেট পাগল। তাদের উদ্দেশে কিছু বলার আছে আপনার?

দুর্জয়: দর্শকদের আমি শুধু একটা কথাই বলব, আমরা বড় বেশি ইমোশনাল, কিন্তু ক্রিকেট খেলা দেখতে হলে ক্রিকেট খেলাটা বুঝতে হবে। খারাপ খেললে দর্শকদের যেমন খারাপ লাগে, তেমনি আমাদেরও খারাপ লাগে। আমরা মাত্র টেস্ট ক্রিকেট শুরু করেছি। তাই সামনে অনেক খারাপ সময় আসবে। সেই সময়গুলোতেই বরং আমাদের বেশি সাপোর্ট দরকার। ভালো সময় সাপোর্ট না পেলেও চলে, কিন্তু খারাপ সময়ে যারা পাশে থাকে, তারাই প্রকৃত সমর্থক।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন