রাগ-জেদ থেকেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ এমন ভয়ংকর!

২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনাল

উৎপল শুভ্র

৩ এপ্রিল ২০২১

রাগ-জেদ থেকেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ এমন ভয়ংকর!

এমন হাসি-হাসি মুখ দেখে ভুল বুঝবেন না। ড্যারেন স্যামি রাগতেও জানেন! ছবি: গেটি ইমেজেস

পরপর চার ছক্কায় ফাইনাল শেষ হওয়াতেই শুধু নয়, ফাইনাল পরবর্তী ঘটনার কারণেও ২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাকি সব বিশ্বকাপ থেকে আলাদা হয়ে থাকবে। পাঁচ বছর আগের এই দিনে ইডেন গার্ডেনের ফাইনাল-পরবর্তী সেই সময়টায় ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন উৎপল শুভ্র  

ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই দলের সঙ্গেই আছেন কার্টলি অ্যামব্রোস। খেলোয়াড়ি জীবনে যাঁর প্রিয় একটা কথা ছিল, ‘সাবধান, আমাকে রাগিও না। রেগে যাওয়া কার্টলি অ্যামব্রোস খুব ভয়ংকর।’
বলতেনও খুব মজা করে, ‘অ্যাংরি কার্টলি অ্যামব্রোস ইজ আ ডেঞ্জেরাস ঠিং।‘ 

এখন তো দেখা যাচ্ছে, শুধু কার্টলি অ্যামব্রোসই নন, রেগে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান মাত্রই ভয়ংকর। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজের টি-টোয়েন্টি দল! সবাইকে দেখিয়ে দেওয়ার রাগ-জেদ ড্যারেন স্যামির এই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলকে এমনই অদম্য বানিয়ে দিয়েছে যে, শেষ ওভারে ১৯ রান দরকার থাকলে মাত্র অষ্টম টি-টোয়েন্টিতে পঞ্চম ইনিংস খেলতে নামা অনভিজ্ঞ এক তরুণ পরপর চার বলে ছক্কা মেরে দেন! 

ম্যাচসেরার ট্রফি নিতে গিয়ে মারলন স্যামুয়েলস সোজা বলে দিলেন, ‘এই ট্রফিটা শেন ওয়ার্নের জন্য। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই দেখছিলাম, লোকটা বকবক করেই যাচ্ছে।‘

অধিনায়ক ড্যারেন স্যামি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেই আবার তোপ দাগলেন মার্ক নিকোলাসের দিকে। ফাইনালের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনেও এ-সংক্রান্ত প্রশ্নেই সবচেয়ে বড় উত্তর দিয়েছেন। তবে নামটা উল্লেখ করেননি। এ দিন আর রাখঢাক নেই। 

নিকোলাস-কাণ্ড কিন্তু অনেক পুরোনো। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ফাইনালে উঠে যাওয়ার পরই যা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, এই যা। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর আগে ক্রিকইনফোতে লেখা তাঁর কলামে মার্ক নিকোলাস ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটারদের মাথায় মস্তিষ্ক নামক বস্তুটির অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। সেমিফাইনালে জেতার পরই টুইটারে যেটির জবাব দিয়েছেন কোচ ফিল সিমন্স—‘মস্তিষ্কহীন কিছু মানুষের কী দুর্দান্ত প্রদর্শন—মস্তিষ্ক থাকলে না জানি কী হতো!’

ফাইনাল-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনেও প্রসঙ্গটা আবার উঠেছিল। একটা নতুন জিনিসও জানা গিয়েছিল তাতে। সদা হাস্যময়, আমুদে ড্যারেন স্যামি রাগতেও জানেন! ‘কীভাবে কেউ কারও সম্পর্কে বলে যে, তাঁর মস্তিষ্ক নেই। আরে, জন্তুদেরও তো মস্তিষ্ক আছে। আমরা তো জড়বস্তু নই। ওই কথাটাই আমাদের সবাইকে তাতিয়ে দিয়েছে’—বলার পরই অবশ্য স্যামির রাগত মুখে আবার হাসি ফিরেছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরা খুব রংচং মাখিয়ে কথা বলেন। স্যামিও যেমন বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর কুৎসিত কিছু পছন্দ করেন না। আমাদেরও খুব সুন্দর করে বানানো হয়েছে। এ কারণেই আমরা এমন রোমাঞ্চকর ক্রিকেট খেলি।’

এর আগেও বলেছেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের জন্য এই বিশ্বকাপ ‘আমরা বনাম বাকি সবাই’। ফাইনালের আগে আবারও সেই বাকি বিশ্বের বিপক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা। আর ফাইনালের পর পুরস্কার বিতরণীতে জানিয়ে দিলেন, ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের মাথায় মস্তিষ্কের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিকোলাসের ওই মন্তব্যই এই দলকে একতাবদ্ধ করায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। সঙ্গে আরও কিছু বিষয় তো ছিলই।

ফাইনালের আগেই ড্যারেন স্যামি বলেছিলেন, আমাদের মতো সেলিব্রেশন করতে আর কেউ পারে না, পারবেও না। তার প্রমাণও দিয়েছিলেন ভালোমতোই। ছবি: গেটি ইমেজেস

এই টুর্নামেন্ট খেলতে আসার আগে স্যামির ভাষায় ‘তথাকথিত’ বিশেষজ্ঞ, সাংবাদিক, এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডও তাঁর দলের প্রতি যে তাচ্ছিল্য দেখিয়েছে, সেটিই নাকি তাতিয়ে দিয়েছিল সবাইকে। জেতার পর প্রধানমন্ত্রীর ফোন পেয়েছেন, কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড থেকে কোনো ফোন না পাওয়ার কথাও জানিয়ে দিলেন প্রকাশ্যে। পরে সংবাদ সম্মেলনেও যেভাবে বোর্ডের সমালোচনা করলেন, তাতে মনে প্রশ্নটা না জেগে উপায় থাকল না। ড্যারেন স্যামি ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে শেষ ম্যাচ খেলে ফেললেন না তো! 

স্যামির মনেও এই সম্ভাবনা বা আশঙ্কা নিশ্চয়ই আছে। নইলে কেন দুঃখ করে বলবেন, দলের বাকি খেলোয়াড়দের আবার কবে এক ড্রেসিংরুমে পাবেন, তা তিনি জানেন না। এ বছর সামনে কোনো টি-টোয়েন্টি নেই, ভবিষ্যতে এই ‘পনেরো ম্যাচ উইনার’ আবার কবে একসঙ্গে মাঠে নামবেন, আদৌ নামবেন কি না, কে জানে! 

প্রথম অধিনায়ক হিসেবে দুটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ তাঁর। এবারের টুর্নামেন্ট-পূর্ব পরিস্থিতির কারণে অনায়াসে পেছনে পড়ে যাচ্ছে ২০১২। ছেলেদের আগে ফাইনাল জিতেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের মেয়েরা। ‘ডাবল’ তো সবার চোখের সামনেই ঘটল। স্যামি এর সঙ্গে বাংলাদেশে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপকেও যোগ করে ‘ট্রেবল’ বানিয়ে দিলেন। পনেরো ম্যাচ উইনারের ব্যাখ্যায় বললেন, ‘সবাই তো বলছিল, আমরা নাকি একজনের দল। তা প্রথম ম্যাচে সেঞ্চুরির পর ক্রিস (গেইল) তো আর কিছু করতে পারেনি। তারপরও আমরা ঠিকই এগিয়ে গেলাম। কারণ, আমাদের মধ্যে বিশ্বাস ছিল।’ 

সেই বিশ্বাস এমনই যে, ম্যাচ যখন শেষ ওভারের অনিশ্চয়তায় এসে দাঁড়াল, তখনো নাকি স্যামির মনে হয়নি ওয়েস্ট ইন্ডিজ হারতে পারে! বোর্ডের সঙ্গে বিরোধ, এতজনের এত কথা—এসব অনুপ্রেরণার জ্বালানি হয়েছে। আরেকটা জ্বালা মেটানোরও ছিল। দুদিন পরপর টাকাপয়সা নিয়ে বোর্ডের বিরোধের কারণে একটা ধারণা ছড়িয়ে পড়েছিল বা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল-ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান খেলোয়াড়েরা শুধুই টাকার কথা ভাবেন, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের মানুষের ভালোবাসার প্রতি তাঁদের কোনো দায় নেই। 

স্যামির আগে স্যামুয়েলসও বলে গেছেন, শিরোপা জিতেই এসব কথাবার্তার জবাব দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা। যা বলেছেন, যেভাবে বলেছেন, তার চেয়েও বেশি জানানো প্রয়োজন, বলার সময় স্যামুয়েলসের দেহভঙ্গি। দেহভঙ্গি বলতে এখানে বডি ল্যাংগুয়েজ বা শরীরী ভাষার কথা বলা হচ্ছে না, শব্দটা আক্ষরিক অর্থেই নিন। দুই পায়ের প্যাড জোড়া তখনো খোলেননি। প্রেস কনফারেন্সে এসে চেয়ারে বসার পরই সেই প্যাড পরা দুই পা সামনের টেবিলে তুলে দিয়েছেন। প্রেস কনফারেন্সের পুরোটা সময় তা আর নামাননি।

 ঔদ্ধত্য বলবেন, না অসভ্যতা? বলুন, স্যামুয়েলসের কিচ্ছু যায়-আসে না। প্রেস কনফারেন্সে এই কাণ্ড করেছিলেন অনেককে বার্তা পাঠাতে। ছবি: ইউটিউব

শেষ ওভারে পরপর চার ছক্কায় ম্যাচ শেষ করা যদি প্রথম হয়, প্রেস কনফারেন্সে কারও এমন ঔদ্ধত্যের প্রকাশও এটাই প্রথম। অন্য কোনো সময় হলে সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ না কেউ অবশ্যই আপত্তি তুলতেন। এখানে তুললেন না, কারণ সবাই বুঝে গেছেন, এই ‘অসভ্যতা’র লক্ষ্যবস্তু আসলে সামনে বসে থাকা সাংবাদিকেরা নন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ড, সমালোচক, সমালোচকদের মধ্যে আরও নির্দিষ্ট করে বললে মার্ক নিকোলাস ও শেন ওয়ার্ন।

স্যামি আর স্যামুয়েলস দুজনের কাছেই এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য, এটি ক্যারিবীয়দের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। ক্রিকেট খেলে এর চেয়ে বড় কিছু পাওয়ার নেই তাঁদের। 

এমন আবেগ, এমন ঢেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এই টুর্নামেন্টটা খেলল যে, কথাটা বিশ্বাস করতেই হচ্ছে।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন