ডনকে নিয়ে ডন

উৎপলশুভ্রডটকম

২৭ আগস্ট ২০২১

ডনকে নিয়ে ডন

খেলা ছাড়ার দুই বছর পরই আত্মজীবনী লিখেছেন। আড়ালে চলে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের ইন্টারভিউ-টিউও দিয়েছেন। নিজের সম্পর্কে অনেক কিছুই বলতে হয়েছে সেখানে। নানা বিষয়ে স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের মত জানার সুযোগও মিলেছে এতে। সেসব থেকেই নির্বাচিত কিছু বিষয়ে ডনের মত।

জয়ের লক্ষ্য নিয়ে
জয়ের লক্ষ্য ছাড়া কোনোদিন মাঠে নেমেছি বলে তো মনে পড়ছে না।

ক্রিকেট নিয়ে
আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, এই খেলাটা একজন মানুষের ভেতরের সত্যিকারের সত্তাটা বের করে আনতে পারে। আমি নিশ্চিত, অন্য কোনো খেলা একজন খেলোয়াড়ের মনস্তত্ত্বকে এতটা সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করতে পারে না। মানুষের প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশের এই ব্যাপারটা শুধু খেলা নয়, জীবনের সব ক্ষেত্রেই জরুরি। ব্যক্তি জীবনে যেমন, তেমনি জাতীয় জীবনেও।

ভক্তদের নিয়ে
ভক্তদের চিঠি কিংবা টেলিগ্রামের স্তুপের দিকে যখন তাকাই, তখন আঁতকে উঠি। এই ভেবে যে, এগুলো পড়ার সময় বের করাই তো মুশকিল। আমার সকল শুভানুধ্যায়ীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। তবে তারালগা থেকে আসা টেলিগ্রামটার কথা মনে হয় একটু বলা যায়। যেখানে লেখা ছিল, 'এমন দুর্দান্ত পারফরমেন্সের জন্য তারালগার প্রমীলা ভক্তদের পক্ষ থেকে ডনকে এক উষ্ণ আলিঙ্গন।'

ডন ব্র্র্যাডম্যান। ছবি: গেটি ইমেজেস

নিভৃতচারিতা নিয়ে
অনেকেই বলত, আমি নাকি মিশুক নই। যদিও আমি এটার সাথে একমত নই। অকারণ প্রচারণা বা কৃত্রিম যেকোনো কিছুর ব্যাপারে আমি উৎসাহ বোধ করতাম না। যখন খেলতাম, তখন কেউ কেউ বলত, আমি বন্ধুবৎসল নই। কারণ দিনের খেলা শেষে তাদের মতো বারে গিয়ে পান করতে করতে আড্ডাবাজি করাটা আমার পছন্দ ছিল না।

রাজনীতি নিয়ে
এই জিনিসটার প্রতি কখনো আগ্রহ জন্মায়নি। কোনদিন এই পথে যাবার ইচ্ছাও নেই। লেবার পার্টি, লিবারেল পার্টি-- দুই পক্ষই আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু আমি সাড়া দিইনি। রাজনীতিটা আমার জন্য নয়।

গ্রেটনেস নিয়ে
যেকোনো অসাধারণ পারফরম্যান্সের পেছনে কিন্তু যথেষ্ট শারীরিক এবং মানসিক ধকল থাকে। নিজেকে চাঙা করার জন্য কোনো উদ্দীপক নেয়, আবার কেউ উদ্দীপ্ত হবার জন্য ভিন্ন কোনো চ্যালেঞ্জ খুঁজে নেয়। আমার কাছে চুপচাপ বিশ্রাম নেওয়াটাই ছিল সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

গান শোনা নিয়ে
অস্থির বা বিষন্ন মন ভালো করে দিতে গান-বাজনার বিকল্প নেই। মন খারাপ হলে আমি গান শুনি।

সাংবাদিকদের নিয়ে
বিপরীত কোনো ধারণা না পাওয়া পর্যন্ত আমি সব সাংবাদিককেই বিশ্বাসযোগ্য মনে করি। তবে বিশ্বাস ভঙ্গ করলে আমি খুব কমই তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দিই। তাছাড়া, অনাবশ্যক শোরগোল তুলতে চান, এমন সাংবাদিকদের আমি এড়িয়ে চলি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা অর্ধ-সত্য প্রতিবেদনকেও ঘৃণা করি।

দিনের পর দিন এমন প্রচারের আলোয় থাকা কঠিন মনে হতো ব্র‍্যাডম্যানের। ছবি: গেটি ইমেজেস

সেই ‘শূন্য’ নিয়ে
সেই শূন্যটা বেদনাদায়ক। সেদিন ওই চারটা রান নিয়ে গড়টা ১০০ করে শেষ করতে পারলে খুশি হতাম। জানতাম, জীবনের শেষ টেস্ট খেলতে নামছি এবং এই ইনিংসটাই জীবনের শেষ টেস্ট ইনিংস হয়ে যেতে পারে।

নিঃসন্দেহে যথেষ্ট আবেগাক্রান্ত ছিলাম আমি। জীবনের শেষ টেস্ট খেলতে নেমে কার না এমনটা লাগে! তবে কেউ কেউ দাবি করেন, চোখের কোণে কান্নার জল জমে থাকায় নাকি আমি বলটা দেখতে পাইনি। এটা একদম ফালতু কথা। মানসিকভাবে আমি এত দুর্বল কখনো ছিলাম না। আমি ভাবছিলাম, (১০০ গড়) হলে ভালোই হবে। এর বেশি কিছু আমার চিন্তায় ছিল না।

প্রচার-প্রচারণা নিয়ে
সাধারণ মানুষ আসলে ভাবতেও পারবে না, সব সময় মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কতটা বিড়ম্বনার। মেলবোর্নের ট্রেন, দ্য স্ট্র্যান্ডের বাস কিংবা পোর্ট সাঈদ...যেখানেই যান আপনার ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বলে কিছু থাকবে না। আপনার হাসিমুখ দেখে হয়তো লোকে বলবে, 'আহা, কি বিনয়ী!' হয়তো তাই। কিন্তু টানা ৫০ বছর এমনটা করে যাওয়াটাও এক ধরনের মানসিক অত্যাচার।

১৯৪৮ সালের অপরাজেয় দল নিয়ে
মনে আছে, সেই সফরে আমার ৪০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছিল। ছেলেরা আমাকে নিয়ে খুব হইচই করছিল। যেন আমি ওদের বুড়ো দাদু। আগের সফরেও হয়তো দলে নতুন আসা ছেলেটাকে ‘এটা করবি, ওটা করবি না' বলে বকে-টকে দিয়েছিলাম। কিন্তু ১৯৪৮-এর সেই সফরে আমি ছিলাম নিভৃত এক দলনেতা।

ভাষান্তর: আজহারুল ইসলাম

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন