ওয়ার্ন শেষ?!

উৎপল শুভ্র

১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

ওয়ার্ন শেষ?!

শেষ ওয়ার্ন: ওই সময়ের সঙ্গে ছবিটা খুব যায়

টেস্ট দল থেকে শেন ওয়ার্ন বাদ যাবেন, এই অভাবনীয় ঘটনাটি ঘটে গেছে কদিন আগেই। তাঁর বদলে অস্ট্রেলিয়া দলে নিয়েছে স্টুযার্ট ম্যাকগিলকে। তখন অস্ট্রেলিয়া দলের সহ-অধিনায়ক শেন ওয়ার্নের তা ভালোভাবে নেওয়ার কোনোই কারণ নেই। `ক্যারিয়ার শেষ` বলে একটা রব উঠে গেছে, একটু মন খারাপ করেই লিখেছিলাম এই লেখাটা।

প্রথম প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ১৯৯৯। প্রথম আলো।

তখনো তাঁকে নিয়ে গ্রেটনেসের এমন আবহ তৈরি হয়নি। যদিও ওল্ড ট্রাফোর্ডে মাইক গ্যাটিংকে একই সঙ্গে বিস্ময় আর হতাশার সাগরে ডুবিয়ে দেওয়া 'বল অব দ্য সেঞ্চুরি' ততদিনে বছর দেড়েকের পুরোনো। ইংল্যান্ডে যে অ্যাশেজ সিরিজটি প্রথম পরিষ্কারভাবে নতুন এক সেনসেশনের আগমনবার্তা ঘোষণা করল, সেটিও তাই। তারপরও ১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে এ কথা বলায় ঝুঁকি ছিল। সে ঝুঁকি নিতে একটুও ভাবলেন না ববি সিম্পসন। অস্ট্রেলিয়া দলের ম্যানেজার কলম্বোর 'লঙ্কা ওবেরয়' হোটেলের লবিতে বসে ঘোষণা করলেন, 'সর্বকালের সেরা হয়ে ওঠার সব যোগ্যতাই আছে ওর।'

'ওর' মানে শেন ওয়ার্নের। ১৯৫২ সালে যাঁর ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে অভিষেক, ক্রিকেটের সঙ্গে যাঁর সম্পর্ক এরপর একদিনের জন্যও ছিন্ন হয়নি, সেই সিম্পসনের অহেতুক আবেগে ভেসে যাওয়ার দুর্নাম নেই। তাই তিনি যখন বলেন, 'প্রতিভার দিক থেকে এর সমকক্ষ কেউ কোনোদিন আসেনি বিশ্ব ক্রিকেটে'তখন যাঁর সম্পর্কে এ কথা বলা, তাঁর দিকে একটু অন্য দৃষ্টিতে তাকাতেই হয়।

তা হঠাৎ করে এসব পুরোনো কথা কেন? ওয়ার্নের প্রতিভা বা সর্বকালের সেরাদের মধ্যে তাঁর স্থান কোথায়... এসব প্রশ্নের তো মীমাংসা হয়ে গেছে বেশ আগেই। তবে সিম্পসন যখন এসব বলেছিলেন, সেই '৯৪ সালে ব্যাপারটি ওরকম নিঃসংশয় ছিল না। বরং মনে পড়ে, সে সময় ওয়ার্নকে নিয়ে একটি লেখায় এরকম কিছু স্বীকৃতি দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নাড়াচাড়া করাতেই রীতিমতো ক্ষুব্ধ হয়ে বাংলাদেশের এক শ্রদ্ধাভাজন সাংবাদিক বলেছিলেন, 'ওয়ার্নকে তো রীতিমতো ঈশ্বর বানিয়ে দিলে! অস্ট্রেলীয় মিডিয়া তোমারও মাথা খেয়েছে দেখছি।'

অনেককেই এটি বলতে শুনেছি, ওয়ার্ন অস্ট্রেলীয় মিডিয়ারই তৈরি করা 'হাইপ', আসলে মুশতাক আহমেদ ও অনিল কুম্বলে তার চেয়ে একটুও কম নন, শুধু ভারত ও পাকিস্তানের মিডিয়াই শুদেরকে সেভাবে তুলে ধরতে পারেনি...।রানাতুঙ্গা এমন হতাশাতেই ফেলেছিলেন ওয়ার্নকে। বোলার হিসেবে ওয়ার্নকে সেভাবে রেট-ও করেননি হয়তো এ কারণেই। ছবি: গেটি ইমেজেসবক্তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম অর্জুনা রানাতুঙ্গা। অস্ট্রেলীয়দের সঙ্গে গণ্ডগোলের পর থেকেই শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক ওয়ার্নকে খুবই সাধারণ বলে প্রমাণ করার একটা প্রাণান্তকর চেষ্টায় নেমেছিলেন। ১৯৯৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে লাহোরের রাতের শিশিরের বাড়াবাড়িতে ঠিকমতো বলই গ্রিপ করতে পারেননি ওয়ার্ন, সেই সুযোগে তাঁকে বেধড়ক পেটানোর পর রানাতুঙ্গা ঘোষণা করলেন, 'ওয়ার্ন আসলে খুবই ওভাররেটেড। এমন কিছু বোলার সে নয়।' বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের কথা, তাই সে সময় সবাই তা সহ্য করেছে। তবে কিছুদিন পর থেকে যা রীতিমতো হাস্যকর মনে হয়েছে, এই কথা নিয়ে আগামী দিনেও অনেক হাসাহাসি হবে।

ফ্র্যাঙ্ক ওরেল ট্রফির (১৯৯৮-৯৯) শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া যখন শেন ওয়ার্নকে বাদ দিয়ে খেলতে নামল, তখন রানাতুঙ্গার কথা খুব মনে পড়েছে। শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক কি খুব খুশি হয়েছিলেন তখন? হয়তো বা, তবে যদি আর একটি টেস্টও না খেলেন ওয়ার্ন, তাতেও কি রানাতুঙ্গার দাবিমতো 'ওভাররেটেড' বলা যায় ওয়ার্নকে? ৭১ ম্যাচে ২৫.৬৫ গড়ে ৩১৭ উইকেটই কি ওয়ার্নের গ্রেটনেসের যথেষ্ট প্রমাণ নয়? টেস্ট ইতিহাসে স্পিনারদের মধ্যে সর্বোচ্চ উইকেট, তারপরও যে রিচি বেনো ওয়ার্নের রেকর্ডে সন্তুষ্ট নন, তা বলতে পারি। তিন শ উইকেট পাওয়ার পর বেনো ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ওয়ার্ন টেস্টে ৬০০ উইকেট পাবে। রিচি বেনো কিন্তু বাড়িয়ে বলার লোক নন। শুধু দেশের মানুষ বলেই ওয়ার্নকে এত বড় কমপ্লিমেন্ট দিয়েছেন তিনি, এটা ভাবাও হবে অন্যায়। স্যাটেলাইট যুগের কমেন্টেটররা যখন মেলোড্রামাটিক হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় মত্ত, বেনো তাঁর সেই আদি ও অকৃত্রিম স্টাইল, যা বলা প্রয়োজন তার চেয়ে একটি শব্দও বেশি না বলার পরিমিতিবোধ দিয়েই রাজত্ব করে চলেছেন এই বয়সেও। তাছাড়া লেগ স্পিন বোলিংটাও তিনি মোটামুটি বোঝেন। সর্বকালের সেরা লেগিদের তালিকায় রিচি বেনো নামট বেশ উপরের দিকেই থাকে।স্টিভ ওয়াহর সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হওয়ার সেই শুরুতবে ওয়ার্ন আর টেস্ট খেলবেন না, সেই আশঙ্কাই বা আসছে কেন? ফিট, খেলতে চানতারপরও শেন ওয়ার্নকে ছাড়া একটি টেস্ট খেলে ফেলেছে অস্ট্রেলিয়া, কিছুদিন আগেও অবিশ্বাস্য এই ঘটনাটি ঘটেছে বলেই এই আশঙ্কা। আশঙ্কাই তো! শেন ওয়ার্নের মতো একজন বোলার, তাঁর মতো এক চরিত্র হারিয়ে গেলে তো ক্রিকেটেরই ক্ষতি। এই দশকের ক্রিকেট যতটা টেন্ডুলকার-লারার, সম্ভবত তার চেয়েও বেশি শেন ওয়ার্নের। প্রথম দুজনকে তো প্রায় হারিয়ে যাওয়া কোনো ঐতিহ্য পুনর্জীবিত করার কৃতিত্ব দেওয়ার কিছু নেই, কিন্তু শেন ওয়ার্ন পুনরুজ্জীবিত করেছেন প্রায় পুরাকীর্তিতে পরিণত হওয়া লেগ স্পিন বোলিংকে। ব্র্যাডম্যান সেই কবেই বলেছিলেন, 'একজন ভালো ব্যাটসম্যান আর একজন ভালো লেগ স্পিনারের লড়াইয়ের মতো চিত্তাকর্ষক কিছু নেই ক্রিকেটে'। এমন অনেক চিত্তাকর্ষক মুহূর্তই উপহার দিয়েছেন শেন ওয়ার্ন।

'দিয়েছেন' লেখাটা কি ঠিক হলো? 'দিচ্ছেন' লেখাই তো উচিত, শেন ওয়ার্ন তো এখনো খেলছেন। ওয়ানডে সিরিজে আবারও খুঁজে যাচ্ছে সেই পুরোনো ওয়ার্নকে। সবসময়ই তিনি বড় আসরের খেলোয়াড়...তাই কে জানে, বিশ্বকালই হয়তো হবে তাঁর পরিপূর্ণ মহিমায় প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ।

বছর চারেক আগে যখন বল করলেই উইকেট পান, এমন অবস্থাতেও এক সাক্ষাৎকারে ওয়ার্ন বলেছিলেন, 'উইকেট না পেলেও আমি তেমন মাথা ঘামাই না। ভালো বোলিং করছি কী-না, সেটিই আমার কাছে মূল বিবেচ্য।' শিল্পীরা হয়তো তা-ই, তবে সমস্যা হলো, তখন স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল ছিলেন না, এখন আছেন। এ কারণেই প্রথম তিন টেস্টে মাত্র ২ উইকেট পাওয়া শেন ওয়ার্ন যখন বলে যাচ্ছেন, 'আমার মনে হয় আমি ভালোই বোলিং করছি, শুধু উইকেট পাচ্ছি না, এই যা', তাতে কোনো লাভ হচ্ছে না। ম্যাকগিল না থাকলে এই ব্যাখ্যাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হতো অস্ট্রেলিয়াকে, কিন্তু এখন তো বিকল্প আছে।

তবে স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল কি সত্যি ওয়ার্নের বিকল্প হতে পারেন? উইকেট নেওয়ায় হয়তো সম্প্রতি তিনিই এগিয়ে। তবে ওয়ার্নের গ্রেটনেস কি শুধুই উইকেট নেওয়ায়? বোলারের গ্রেটনেসের জন্য উইকেট নে্ওয়াটা অবশাই প্রধান শর্ত। তবে সত্যিকারের বড় তারকা হয়ে ওঠার জন্য এর বাইরেও অনেক কিছু লাগে। এই দশকে কি কারও ওয়ার্নের চেয়ে বেশি ছিল সেসব? বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী: স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের কাছেই টেস্ট দলে জায়গা হারিয়েছিলেন শেন ওয়ার্ন। ছবি: গেটি ইমেজেস

টেস্ট দল থেকে বাদ পড়াটা বড় এক ধাক্কা হয়েই এসেছে ওয়ার্নের জন্য। আঘাতটা ভালোই লেগেছে তাঁর, সেটি গোপন করারও চেষ্টাও করেননি। তাঁর মতো একজন পারফরমারের আআত্মমর্যাদায় ঘা দিয়ে হয়তো প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানদের ক্ষতিই করা হলো? শেন ওয়ার্ন কি একটা শেষ কামড় দেবেন না?

দেবেন বলাটাই নিরাপদ। অস্ট্রেলিয়া দলের অধিনায়কত্ব অপেক্ষা করছে তাঁর জন্য, এত সহজে সরে যাবেন তিনি? সরে যাওয়ার প্রসঙ্গেই মনে পড়ছে বছর তিনেক আগের একটি ঘটনা। আঙুলে ইনজুরির কারণে ওয়ার্ন তখন খেলার বাইরে। চিকিৎসার জন্য গেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানকার এক বিখ্যাত সার্জন, সবই বোঝেন শুধু ক্রিকেটটা ছাড়া। তবে ক্রিকেটার, বল করেন...এসব বলা হয়েছিল তাঁকে। ওয়ার্নকে দেখে-টেখে গম্ভীর মুখে তিনি বললেন, তেমন সমস্যা নেই, শুধু আঙুলটা দিয়ে বল ঘোরানোর চেষ্টা না করলেই হবে, ওটাই ক্ষতির কারণ।

ক্রিকেটের সৌভাগ্য, ওয়ার্ন সেই পরামর্শ শোনেননি।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন