রশিদ লতিফের ‘জেহাদ` শেষ হয়নি এখনো

উৎপল শুভ্র

১৪ অক্টোবর ২০২১

রশিদ লতিফের ‘জেহাদ` শেষ হয়নি এখনো

পাকিস্তান দলকে পাতানো খেলার মচ্ছবে মেতে উঠতে দেখে প্রতিবাদ হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেলেছিলেন। আবারও ফিরেছেন, পরে পাকিস্তান দলের অধিনায়কও হয়েছেন। ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে কলম্বোতে এই ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় অবশ্য রশিদ লতিফ জানিয়েছিলেন, ২০০৩ বিশ্বকাপই তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ। এই ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমেই প্রথম জেনেছিলাম, ক্রিকেটে ফিক্সিং এখন ম্যাচে জয়-পরাজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়েছে নানা রূপে। যেটিকে রশিদ লতিফ বলেছিলেন `ফ্যান্সি ফিক্সিং`। এখন যা স্পট ফিক্সিং নামে সবারই পরিচিত।

প্রথম প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ২০০২। প্রথম আলো।

ম্যাচ পাতানোর বিরুদ্ধে রশিদ লতিফের 'জেহাদ' এখনো শেষ হয়নি। ম্যচ পাতানোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে নিজের ক্যারিয়ারকেই প্রায় বিসর্জন দিয়ে ফেলেছিলেন। আবার যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে এসেছেন, তার নিজেরই কখনো কখনো তা বিশ্বাস হতে চায় না। আগামী বিশ্বকাপের পরই সেই ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন রশিদ লতিফ। তিন সন্তান ও স্ত্রীকে সময় দিতেই এই সিদ্ধান্ত, তবে অবসর নেওয়ার পর আরেকটি ক্ষেত্রেও তাঁর সময় দেওয়ার ইচ্ছে। পাতানো খেলা ঠেকাতে গঠিত আইসিসির অ্যান্টি করাপশন ইউনিট, এসিইউ-এ যোগ দিতে চান রশিদ লতিফ। কারণ তাঁর বিশ্বাস, তিনিই পারবেন ক্রিকেট থেকে পাতানো খেলাকে নিশ্চিহ্ন করতে।

এসিইউর প্রধান পল কনডনের দাবি, ক্রিকেট থেকে পাতানো খেলার বিষবৃক্ষ মোটামুটি উপড়ে ফেলা গেছে। আইসিসিও তার সঙ্গে একমত, তবে একমত নন রশিদ লতিফ। তাঁর দাবি, ক্রিকেটে বুকিদের দৌরাত্ম্য মোটেই শেষ হয়ে যায়নি। শুধু তাদের কার্যপদ্ধতি বদলেছে, বদলেছে ম্যাচকে প্রভাবিত করার ধরন। 'এসিইউর লোকেরা এখন ড্রেসিংরুমে থাকে, থাকছে, তারপরও ম্যাচ পাতানো পুরো বন্ধ হয়েছে বলে আমি মনে করি না। খেলোয়াড়রা চাইলে এখনো তা করতে পারে'...কলম্বোর গ্যালাদারি হোটেলে তাঁর রুমে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বললেন পাকিস্তানি উইকেটকিপার।

তবে রশিদ লতিফ এটা মানছেন যে, ১৯৯৪-৯৫-৯৬ সময়টা যেমন বুকমেকার এবং তাঁদের সঙ্গে হাত মেলানো খেলোয়াড়দের স্বর্ণযুগে পরিণত হয়েছিল, এখন অবস্থাটা তার চেয়ে অনেক ভালো। তবে তারপরও মাঠে অনেক কিছুই বুকিদের তৈরি করে দেওয়া পাণ্ডুলিপি অনুযায়ীই অভিনীত হচ্ছে বলে তাঁর দাবি, 'এখন বেটিংয়ের ধরন পাল্টে গেছে। ম্যাচের ফলাফলের ওপরই শুধু বাজি ধরা হচ্ছে না, যোগ হয়েছে আরও অনেক ছোটখাট বিষয়। যেমন, প্রথম ১৫ ওভারে কত রান হবে, শেষ ২০ ওভারে কত। ৫০-১০০ রান হবে কত ওভারের মধ্যে...এসব নিয়েও বেটিং হচ্ছে। এগুলোকে বলে ফ্যান্সি বেটিং। এগুলোর কারণে খেলোয়াড়েরা ম্যাচ জিতেও টাকা বানাতে পারে। এসব বন্ধ করা খুবই কঠিন।' 

খেলোয়াড়ি জীবনে...

তাহলে রশিদ লতিফ কীভাবে তা বন্ধ করবেন? মৃদু হেসে রশিদ লতিফের উত্তর, 'আমার মনে হয় আমি তা পারব।' ম্যাচ পাতানোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্যই ক্যারিয়ারের সেরা সময়টা হারাতে হয়েছে, এ নিয়ে কি কোনো আক্ষেপ নেই তাঁর মনে? কখনো কি মনে হয় না, কী দরকার ছিল, আমার মতো আমি খেলে গেলেই পারতাম!

না, রশিদ লতিফের তা মনে হয় না, 'আমি গর্বিত যে, আমার ক্যারিয়ার বাজি রেখে আমি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছি। এজন্য মানুষ আমাকে সম্মান করে। মানুষের দোয়াতেই আমি আবার পাকিস্তান দলে ফিরেছি, নইলে তিন বছর বাইরে থাকা আমি তো ফেরার আশা বাদই দিয়েছিলাম।' তবে ছোট্ট একটা আক্ষেপ আছে তাঁর মনে, 'টাকা-পয়সার কথা ভাবি না। কিন্তু একটা ব্যাপারেই শুধু আক্ষেপ হয়, যদি আমার ক্যারিয়ার প্রায় পাঁচ বছর নষ্ট হয়ে না যেত, তাহলে হয়তো বেশ কিছু রেকর্ড আমার হতে পারত। টেস্টে ৪৫০ ক্যাচের রেকর্ডটি তো আমি ভেঙেই ফেলতাম।'

দলে ফেরার পর কিছুদিন অস্বস্তিকর সময় কেটেছে তার। কাইয়ুম কমিশন রিপোর্টের ভিত্তিতে জরিমানা গোনা ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, সাঈদ আনোয়ার, ইনজামাম-উল-হকরা স্বাভাবিকভাবেই তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া রশিদ লতিফকে বরণ করে নেননি দলে। লতিফ জানাচ্ছেন, 'ইংল্যান্ড সফরে প্রথম কিছুদিন বেশ অস্বস্তিতেই কেটেছে। আমি শুধু নিজেকে বলেছি, আমি পাকিস্তানের পক্ষে খেলছি, ওদের কারও জন্য তো খেলছি না। অবশ্য আমি ভালো পারফর্ম করার পর ওরা এগিয়ে আসে। তবে আমি কখনোই ওদের বিপক্ষে ছিলাম না। ইনজি-মুশতাক-সাঈদ এদের সঙ্গে ছোটবেলা থেকেই আমি একসঙ্গে খেলে এসেছি। আমার প্রতিবাদ ছিল সেলিম মালিক এন্ড কোংয়ের বিরুদ্ধে। সেলিম মালিক এখন নিষিদ্ধ, তাই তার ব্যাপারে আর কিছু বলতে চাই না।' ২০০০ সালে কাইয়ুম, কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে খেলোয়াড়দের শাস্তি হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান দল এই ম্যাচ পাতানোর রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি পেয়েছে বলেই রশিদ লতিফের দাবি। পাকিস্তানের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সকেই তুলে ধরছেন এর প্রমাণ হিসেবে।

ওয়াসিম আকরাম ও সেলিম মালিকের সঙ্গে

ম্যাচ পাতানোর বিরুদ্ধে মুখ খুলে 'সৎ এবং সাহসী' একটা ভাবমূর্তি হয়েছে সত্যি, আবার পাকিস্তানের একটি অংশ, বিশেষ করে অভিযুক্ত খেলোয়াড়েরা পাকিস্তানের ভাবমূর্তি নষ্ট অভিযোগও এনেছেন তাঁর বিরুদ্ধে। রশিদ লতিফ অবশ্য তাঁর নিজের কাছে একেবারে পরিষ্কার, 'অনেকেই বলেছে, আমার মিডিয়ার কাছে এসব তুলে ধরা উচিত হয়নি। কিন্তু আমি নীরব থাকতে পারিনি। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ও আইসিসির হাতে আমি সব প্রমাণ তুলে দিয়েছি, নইলে ম্যাচ পাতানো ক্রিকেটকে ধ্বংস করে ফেলত।'

বিশ্বকাপের পর বিদায় নিলে আর মাত্র মাস পাঁচেক আছে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের। এই সময়টা যাতে নিষ্কলঙ্ক কাটে, সেটাই এখন রশিদ লতিফের একমাত্র চাওয়া, 'আমি চাই, লোকে আমাকে ভালো ক্রিকেটারের চেয়েও ভালো মানুষ হিসেবে বেশি মনে রাখুক।' 

পাতানো খেলার বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করে নিজের ক্যারিয়ারকে বাজি রেখেছেন। রশিদ লতিফের এই আশা পূরণ না হওয়ার তাই কোনো কারণ দেখছি না।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন