বৃষ্টির কল্যাণেই তো ক্রিকেটের অন্য রোমাঞ্চ

ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল

উৎপল শুভ্র

২৩ জুন ২০২১

বৃষ্টির কল্যাণেই তো ক্রিকেটের অন্য রোমাঞ্চ

লড়াইটা শুধু গদাসদৃশ এই ট্রফির জন্য নয়, প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা প্রাইজমানিরও। ছবি: আইসিসি

বৃষ্টির কারণে রিজার্ভ ডে পরিণত হয়েছে টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণী রঙ্গমঞ্চে। এই বৃষ্টির কারণেই বলের ওপর ব্যাটের একাধিপত্যের বদলে ক্রিকেটের অন্য একটা দিক দেখার সুযোগ। বৃষ্টিকে শাপশাপান্ত করার বদলে তাই ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছা করছে। মনে রাখার মতো অনেক কিছুই দিয়েছে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ফাইনাল। মন বলছে, আজ শেষ দিনে আরও কিছু দেবে।

যে দিনটা প্রয়োজনে ব্যবহার করার কথা ছিল, সেই দিনটাতেই এখন কেন্দ্রীভূত সব উত্তেজনা। সেটিই এখন টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণের রঙ্গমঞ্চ।

এক সময় টেস্ট ম্যাচের সময়কালের কোনো ঠিক ঠিকানা ছিল না। তিন দিন-চার দিন-পাঁচ দিন-ছয় দিন...কখনো বা সময়কে একেবারেই তুচ্ছ বানিয়ে 'রেজাল্ট হতে যত দিন লাগে' প্রতিজ্ঞার টাইমলেস টেস্টও দেখেছে ক্রিকেট। সাম্প্রতিক অতীতে কয়েকটা চার দিনের টেস্ট হলেও অনেক বছর ধরে পাঁচ দিনেই আয়ু নির্ধারিত প্রথাগত টেস্ট ম্যাচের। ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ফাইনাল যেন অমীমাংসায় শেষ না হয়, সেই চাওয়া থেকেই এই প্রথম টেস্ট ম্যাচে রিজার্ভ ডে। 

রিজার্ভ ডে'র অর্থ তো একটাই--যদি লাগে...। শুধু লাগছেই না, সেই রিজার্ভ ডে-ই এখন দেখছে গদাসদৃশ রাজকীয় এক ট্রফি আর প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা পাওয়ার লড়াই। হ্যাঁ, ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম চ্যাম্পিয়নরা প্রাইজমানি পাবে সাড়ে ১৩ কোটির টাকার মতোই। রানার্স আপ এর অর্ধেক। ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনাল পরবর্তী কনফিউশনের কথা মনে রেখেই হয়তো ম্যাচ ড্র হলে যে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন, আইসিসি তা জানিয়ে দিয়েছে আগেই। যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন হলে প্রাইজমানিও সমান ভাগ হওয়া উচিত। তাতে দুই দলেরই ১০ কোটিরও কিছু বেশি পাওয়ার কথা। কিন্তু ওই যে গদাসদৃশ ট্রফির কথা বলা হলো, সেটির কী হবে?

কী আর হবে? সিরিজ ড্র হলে ট্রফি নিয়ে 'এটা আমারও' ভঙ্গিতে দুই অধিনায়ককেই পোজ দিতে তো আমরা অনেকই দেখেছি। বিরাট কোহলি ও কেন উইলিয়ামসনও তেমন একটা ছবি তুলবেন। রেপ্লিকা হয়তো দুটি বানিয়েই রেখেছে আইসিসি। দুই দলকেই একটি করে তা দিয়ে দেওয়া হবে।

ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে লেখায় খেলা বাদ দিয়ে ট্রফি আর টাকাপয়সা নিয়ে এত কথা বলার কারণ একটাই, ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মূল্য বোঝানো। অনেক বছর ধরে এই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের কথা শুনতে শুনতে এই বস্তু জীবনেও আর দেখা হবে কি না, মাঝখানে এই প্রশ্নও জেগেছিল মনে। শেষ পর্যন্ত যে তা সত্যি সত্যিই বাস্তবে রূপ নিয়েছে, তা উদযাপন করার মতোই একটা উপলক্ষ। যদিও যে অযৌক্তিক পদ্ধতিতে এটির আয়োজন, তা নিয়ে অনেক যৌক্তিক প্রশ্ন তোলাই যায়। এ কেমন টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ, যেটির ফাইনালিস্ট নির্ধারণী পর্বে এক দল (পড়ুন ইংল্যান্ড) ২১টি টেস্ট খেলে ফেলে, আরেক দল (পড়ুন বাংলাদেশ) খেলে মাত্র ৭টি টেস্ট! বাংলাদেশ ২১টি টেস্ট খেলার সুযোগ পেলে ফাইনাল খেলে ফেলত, কেউ এমন ভাবলে তাঁর মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে অবশ্যই নতুন আরেকটা প্রশ্ন জন্ম নেবে। ভুল বললাম, কোনো প্রশ্নই জাগবে না, কোনো ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়ে গেলে কি আর কোনো প্রশ্ন ওঠার অবকাশ থাকে!

কিন্তু অন্য একটা প্রশ্ন তো উঠবেই। সব দল সমান টেস্ট না খেললে যে পয়েন্টের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হয়েছে দুই ফাইনালিস্ট, সেই পয়েন্ট নিয়েই প্রশ্ন ওঠাটা কি খুব স্বাভাবিক না? নিউজিল্যান্ড যেমন মাত্র ১১ টেস্ট খেলেই ফাইনালে উঠে গেছে। ইংল্যান্ড ২১ টেস্ট খেলেও পারেনি। আবার অস্ট্রেলিয়া ১৪ টেস্ট খেলেও মাত্রই দশমিক শূন্য আট পয়েন্টের জন্য ফাইনালের দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে এসেছে। এই ধাঁধার উত্তর লুকিয়ে সিরিজ-সংখ্যায়। নিউজিল্যান্ডের ১১ টেস্ট পাঁচ সিরিজে, ইংল্যান্ড যেখানে ছয়টি সিরিজেই খেলে ফেলেছে ২১ টেস্ট। অস্ট্রেলিয়ার ১৪ টেস্ট আবার চারটি সিরিজে। ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পরের চক্রে হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে। হয়তো কেন, সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে অবশ্যই তা খোঁজা উচিত।

মনে রাখার মতো ক্যাচিংও ফাইনালের আরেক উপহার। এই ছবিটা শুবমান গিল দারুণ এক ক্যাচে রস টেলরকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর। ছবি: আইসিসি

এই উচিত-অনুচিত নিয়ে কথাবার্তা ভবিষ্যতে বলা যাবে। আপাতত যা হচ্ছে, তা নিয়েই না হয় থাকি। ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল নিয়ে অনেক দিন ধরেই 'দ্য আলটিমেট টেস্ট' বলে আওয়াজ তুলছে আইসিসি। অবশ্যই মার্কেটিং স্লোগান। তবে তা যথেষ্টই কাজে এসেছে বলতে হবে। এই টেস্ট নিয়ে যে 'হাইপ'টা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তা পুরোপুরিই সফল। কিন্তু বৃষ্টি-দেবতা যে অন্যরকম ফন্দি এঁটে বসে ছিলেন, তা কে জানত!

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ফাইনালটা ক্রিকেটের তীর্থস্থান লর্ডসে হলেই তা বেশি মানাত। সেটিই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখান থেকে এই ফাইনালের ঐতিহ্য আর মর্যাদায় লর্ডসের তুলনায় নেহাতই হরিজন সাউদাম্পটনে চলে আসা করোনার চোখ রাঙানিতে। যেখানে টিম হোটেল মাঠেরই অংশ। দুই দলের খেলৌয়াড়, ম্যাচ অফিসিয়াল, কমেন্টটররা হোটেল থেকে সরাসরি মাঠে নেমে যেতে পারেন। তখন তো কেউ জানত না, ফাইনাল আসতে আসতে করোনা ভাইরাসকে কিছুটা হলেও বাগে আনতে পারবে ইংল্যান্ড। এতটাই যে, মাঠেও কিছু দর্শকের প্রবেশাধিকার থাকবে।

গত কয়েক দিন লন্ডনে বৃষ্টি হয়েছে কি না, জানি না। ইন্টারনেট দেখলেই জানা যায়, কিন্তু এখন আর তা ঘাঁটতে ইচ্ছা করছে না। লন্ডনে যদি বৃষ্টি না-ও হয়ে থাকে, এখন আর তা জেনে লাভ কি! তাতে আফসোসটা বরং আরেকটু বাড়বে। পুরো সময় খেলা হলে টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম ফাইনালটা কী দারুণই না হতো! হয়তো ফাইনালটা হতো ফাইনালের মতোই, যেমন হয়েছিল দুই বছর আগে লর্ডসে ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে। এটা লিখতে লিখতেই মনে হলো, নাটকীয় আর অভাবনীয় সব কাণ্ডের জন্য যে টেস্ট ম্যাচের এমন সুনাম, তা আরেকটু মহিমান্বিত করতেই বৃষ্টির এমন তৎপরতা নয় তো! দুদিন একটা বলও পড়তে পারেনি পিচে, তাতে কি, হিসাব মতো তো পাঁচ দিন চলে গেছে টেস্টের। পুরো খেলা হলে ৪৫০ ওভার হতো, হয়েছে এর অর্ধেকেরও কম। তারপরও অবিশ্বাস্যভাবে আজ শেষ দিনটা শুরু হচ্ছে সম্ভাব্য তিনটি রেজাল্ট সামনে নিয়েই।

সুইং আর সিম বোলিংয়ের  এক প্রদর্শনী মেলে ধরেছে ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ফাইনাল। ছবি: আইসিসি

দ্বিতীয় ইনিংস খেলতে নামা ভারত হাতে ৮ উইকেট নিয়ে ৩২ রানে এগিয়ে। ভারতের জয়ের সম্ভাবনাটা তাই হিসাব থেকে বাদ দিয়ে দেওয়ার একটা প্ররোচনা থাকছেই। নিউজিল্যান্ড করতে পারবে না, এমন একটা লিড যদি তারা নিয়েও ফেলে, তখন আবার নিউজিল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসের ১০ উইকেট তুলে নেওয়ার মতো সময় হাতে থাকার কথা নয়। অনুমিত ড্রকে প্রাধান্য দিয়েও নিউজিল্যান্ডের জয়ের সম্ভাবনা তাই ভারতের তুলনায় একটু হলেও বেশি। আজ প্রথম সেশনেই যদি টপাটপ বেশ কয়েকটি উইকেট তুলে নিতে পারেন বোল্ট-সাউদি-ওয়াগনাররা (এই দেখো কাণ্ড, জেমিসনের কথা বাদই দিয়ে দিলাম, প্রথম ইনিংসে মূল হন্তারক না ৬ ফুট ৮ ইঞ্চির এই পেসারই), তাহলে কিন্তু হয়েও যেতে পারে।

'হয়েও যেতে পারে' বলার একটাই অর্থ, না-ও হতে পারে। তবে বৃষ্টি প্রথম পাঁচ দিনের অর্ধেকেরও বেশি খেয়ে ফেলার পরও রিজার্ভ ডেতে এসে যে এই কথাটা বলা যাবে, এটাই বা কে ভেবেছিল!

বৃষ্টিকে শাপশাপান্ত করার বদলে ধন্যবাদই দিতে ইচ্ছা করছে! ছবি: আইসিসি

শেষ পর্যন্ত রেজাল্ট না হলে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ফাইনালটা ঘিরে একটা অতৃপ্তি থেকে যাবে, বৃষ্টিকে হয়তো শাপশাপান্তও করবেন অনেকে। অতৃপ্তির জায়গাটাতে একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে থেকেও আমি কিন্তু বৃষ্টিকে উল্টো একটা ধন্যবাদই দেব। সেটি কেন? কারণ বৃষ্টির কল্যাণেই না ব্যাট-বলের এমন রোমাঞ্চকর একটা লড়াই দেখতে পেলাম! সেই লড়াইয়ে বলের বড় বেশি আধিপত্য, এটাই বলবেন তো? কথাটা খুবই সত্যি। সত্যি বলেই এই টেস্ট ম্যাচে যতটুকু খেলা হয়েছে, তা এমন প্রাণভরে উপভোগ করেছি। নিষ্প্রাণ উইকেট আর ভারি ব্যাটের যুগলবন্দির সঙ্গে টি-টোয়েন্টি প্রভাবিত ব্যাটিং মিলে দিনের পর দিন ব্যাটসম্যানদের একাধিপত্য দেখতে দেখতে ক্লান্ত দুই চোখ যেন দু দণ্ড শান্তি পেয়েছে এই ফাইনালে। সুইং আর সিম বোলিংয়ের অনুপম এক প্রদর্শনী মেলে ধরেছে এই ফাইনাল। সঙ্গে দুই দলের দারুণ ফিল্ডিং, মনে রাখার মতো সব ক্যাচ।

হ্যাঁ, এখন পর্যন্ত একটাও সেঞ্চুরি নেই, হাফ সেঞ্চুরিই তো মাত্র একটা, তাতে কি! সেঞ্চুরি তো আর জীবনে কম দেখিনি, কিন্তু বিরুদ্ধ পরিবেশে দারুণ দক্ষতামণ্ডিত সুইং আর সিম বোলিংয়ের বিপক্ষে ব্যাটসম্যানশিপের চূড়ান্ত পরীক্ষার দর্শক হওয়ার যে মজা, তা তো আর প্রতিদিন পাওয়ার নয়।

মারার মতো বল পেলে উইলিয়ামসনও মেরেছেন, তবে তাঁর বল ছাড়ার দৃশ্যগুলোই মনে বেশি গেঁথে আছে। ছবি: আইসিসি

কেন উইলিয়ামসনের ৪৯ রানের ইনিংসটার কথাই ধরুন না। টেস্টে তাঁর ২৪টি সেঞ্চুরি, এর বেশির ভাগই টেলিভিশনে লাইভ দেখা, দুই/তিনটা মাঠে বসেও। টি-টোয়েন্টির টানে ক্রিকেটের নব্য দর্শক শুনে অবাক হতে পারেন, ১৭৭ বলে এই ৪৯-কে ওগুলোর চেয়ে কম উপভোগ করিনি। স্ট্রোক প্লের রোমাঞ্চ এতে অনুপস্থিত, কিন্তু টেকনিকের সর্বোচ্চ পরীক্ষা নেওয়া বলের পর বল ওভাবে ধ্যানস্থ হয়ে খেলে যেতে দেখাটাও কি কম আনন্দের! এর সঙ্গে যোগ করুন অপূর্ব ওই বল ছাড়া। আহা! 

অন্য কোন একটা লেখায় যেন লিখেছিলাম, ক্রিকেটই সম্ভবত একমাত্র খেলা, না-খেলাটাও যেটিতে প্রশংসার দাবিদার। উইলিয়ামসনের ইনিংসটা দেখতে দেখতে কথাটা বারবার মনে পড়ছিল।

মন বলছে, আজ শেষ দিনে মনে রাখার মতো আরও অনেক কিছুই হয়তো ঘটার অপেক্ষায়।  

আরও পড়ুন:   উইলিয়ামসনের দুঃখমোচন, তবে আসল জয়ী তো টেস্ট ক্রিকেট!

                      কোহলি-উইলিয়ামসন: লক্ষ্য দুজন, পথ ভিন্ন

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন