হতভম্ব ধোনির মুখে শুধুই মেন্ডিস

২০০৮ এশিয়া কাপ ফাইনাল

উৎপল শুভ্র

৬ জুলাই ২০২১

হতভম্ব ধোনির মুখে শুধুই মেন্ডিস

অজন্তা মেন্ডিস যেন এক ধাঁধার নাম। ছবি: এএফপি

ফাইনালে শ্রীলঙ্কার ২৭৪ রানের জবাব দিতে নেমে ভারত উড়ন্ত সূচনাই পেয়েছিল। ৭ ওভারেই তুলে ফেলেছিল ৫০, ৯ ওভারে ৭৬। কিন্তু এরপর অজন্তা মেন্ডিস আসতেই ওলট-পালট হয়ে গেল সব। তাঁর রহস্যময় বোলিংয়ে দিশা হারিয়ে ভারত হারল ১০০ রানে, মেন্ডিসের বোলিং ফিগার ৬-১৩। ফাইনাল শেষের সংবাদ সম্মেলনে ভারতীয় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনিকে দেখে মনে হলো, তখনো তিনি অজন্তা মেন্ডিস ধাঁধায় হতভম্ব।

• এমন হলো কেন?

ধোনি: আমরা মেন্ডিসের বল বুঝতেই পারিনি। আগে কোনো দিন ওকে খেলিনি। ওর বল বোঝা খুব কঠিন।

•ব্যাটসম্যানদের কারও কারও শট নির্বাচনে কি ভুল ছিল?

ধোনি: ওরা তো একটা ভেবে খেলেছে, বল হয়েছে অন্যটা। বাজে শট বলবেন কীভাবে? ওরা বুঝতেই পারেনি।

• ৯ ওভার পর্যন্ত তো ভারতের অবস্থা ভালো ছিল। এরপর কেন এমন হলো?

ধোনি: (হাসি) এরপর যে মেন্ডিস এল!

• শ্রীলঙ্কাকে ২৭৩ রানে আটকে দেওয়ার পর কী ভেবেছিলেন?

ধোনি: এই উইকেটে ২৭৩ অবশ্যই তাড়া করা সম্ভব। মেন্ডিস আসার পরই আমাদের সব এলোমেলো হয়ে গেল।

মেন্ডিস! মেন্ডিস! আর মেন্ডিস! সংবাদ সম্মেলনে মহেন্দ্র সিং ধোনির মুখে মেন্ডিস ছাড়া আর কোনো কথাই নেই। অন্য প্রসঙ্গ আছে, তবে যতবার ফাইনালের কথা উঠল, ততবারই ধোনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করলেন অজন্তা মেন্ডিসের সামনে নিজেদের অসহায়ত্ব।

কিন্তু ফাইনালের আগের দিন যে কোচ গ্যারি কারস্টেন বললেন, ভিডিও ফুটেজ দেখে অজন্তা মেন্ডিসের বোলিংয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ হয়েছে। ধোনি আবারও হাসলেন, 'ভিডিও দেখে কী আর বোলার বোঝা যায়? আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনি ১৫ বছর ধরে খেলছেন, এমন বোলাররাও তো উইকেট নেয়। আর ওকে তো আমরা আগে খেলিইনি।'

ভারতের বিপক্ষে সুপার ফোরের ম্যাচে অজন্তা মেন্ডিসকে বিশ্রাম দিয়ে শ্রীলঙ্কাই আসলে সেই সুযোগ দেয়নি। ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের কাছে এমনিতেই রহস্যময় অজন্তা মেন্ডিসের রহস্যটা এ কারণেই আরও বেড়েছে। ফাইনালের আগে ভারতীয় শিবিরে একটু বোধ হয় বেশিই চিন্তা হয়েছে তাঁকে নিয়ে। এমনিতে সাত ব্যাটসম্যান নিয়ে নামার কারণ হিসেবেও ধোনি বলে দিচ্ছেন, 'মেন্ডিসের কথা ভেবেই আমরা ব্যাটসম্যান একজন বাড়িয়েছি।' ধোনির কথা শোনার পর ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের মনের বাঘেই বেশি খেল কি না, এই প্রশ্নটা তাই মনে জাগছেই। বল কোন দিকে স্পিন করবে, এ নিয়ে ভাবতে ভাবতে বেশির ভাগই তো আউট হলেন সোজা বলে—টপ স্পিনারে।

অন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক গত ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। সেখানে তিন ম্যাচের পর এই এশিয়া কাপেই প্রথম খেললেন। অজন্তা মেন্ডিসের সেরা সাফল্যটা এল ফাইনালে, ম্যাচে ৬ উইকেট এই প্রথম। তাঁর কৃতিত্ব না ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা—কোনটা বেশি, এই প্রশ্নটাও উঠছে এ কারণেই।

ধোনি নিজেও হয়েছিলেন মেন্ডিসের শিকার। ছবি: এএফপি

মাহেলা জরাবর্ধনের কথা শুনলে অবশ্য সেটি একরকম মুছে যাচ্ছে। জয়াবর্ধনে জানাচ্ছেন, এই সফরে আসার আগে কুমার সাঙ্গাকারা প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে অজন্তার বোলিংয়ে প্র্যাকটিস করার পরও কিপিংয়ের সময় কোনটা কোন বল বুঝতে তাঁর সমস্যা হয়। অধিনায়ক হিসেবে এমন একজন স্পিনার দলে পাওয়াটাকে সৌভাগ্যই বলে ফেললেন তিনি, 'অন্য কোনো দলে এমন কোনো স্পিনার এলে আমাদেরও খুব সমস্যায় পড়তে হতো।'

মোরাতুয়ার একেবারে সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন, শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে বিরল উদাহরণ হয়ে ইংরেজিও বলতে পারেন না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের এই ঝলমলে আলোয় যাতে চোখ ঝলসে না যায়, সে জন্য অজন্তা মেন্ডিসকে আগলে রাখার বাড়তি দায়িত্বও পালন করছেন জয়াবর্ধনে। সংবাদ সম্মেলনে এলেন একাই৷ মেন্ডিসকে নিয়েই প্রথম প্রশ্ন হবে স্বাভাবিক। সেটির যে উত্তর দিলেন জয়াবর্ধনে, তা থেকে বোঝারই উপায় নেই, মেন্ডিস এই ফাইনালের কতটা আলোড়ন! 'ক্রিকেট ম্যাচ কেউ একা জেতাতে পারে না। এই দলের সবার কৃতিত্ব। যারা একটি রানও করেছে, একটি রানও বাঁচিয়েছে, তাদের সবারই অবদান আছে এই জয়ে' – শুধু অধিনায়কোচিত উত্তর ভাবলে ভুল করবেন, অজন্তা মেন্ডিসের যাতে মাথা ঘুরে না যায়, সেই চেষ্টাও আছে এতে।

শ্রীলঙ্কা মুরালিধরনের যোগ্য উত্তরসূরি পেয়ে গেল কি না, এই প্রশ্নেও জয়াবর্ধনে একই রকম নিরাবেগ, ‘ওর মাত্রই শুরু। ব্যাটসম্যানরা ওকে আস্তে আস্তে বুঝতে পারবে। ওকে তাই অনেক পরিশ্রম করতে হবে।' তাই বলে এমন একটা পারফরম্যান্সের পর অধিনায়ক তাঁর তরুণ বোলারের একটু প্রশংসাও করবেন না? করলেন, সেটিও তাঁর মতো করেই, 'ও কঠোর পরিশ্রমী। খুব আত্মবিশ্বাসীও। সব সময়ই আক্রমণ করতে চায়। আজই তো আমাকে আরও বেশি ক্লোজ ইন ফিল্ডার দেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করছিল।'

শ্রীলঙ্কার জয়টা মেন্ডিসময়, উদযাপনের মধ্যমণি হয়ে মেন্ডিসই তো থাকবেন। ছবি: এএফপি

এশিয়া কাপের রোল অব অনার এমনই ভারত আর শ্রীলঙ্কাময় যে, পাকিস্তান বলে প্রায় সমান শক্তির দলও যে এতে নিয়মিত খেলে তা বিশ্বাস করাই কঠিন হয়। ভারত চারবার জিতেছে এই ট্রফি, কাল শ্রীলঙ্কাও সমান হয়ে গেল তাঁদের। শ্রীলঙ্কার আগের তিনটি শিরোপার তুলনায় এটির বাড়তি তাৎপর্য—দেশের বাইরে এশিয়া কাপ জয় এই প্রথম। এর সঙ্গে গত বিশ্বকাপের পর থেকে বাজে সময় কাটিয়ে ওঠার আনন্দটাও বাড়তি পাওনা।

তার চেয়েও বড় পাওনা বোধ হয় অজন্তা মেন্ডিস।

আরও পড়ুন:
অজন্তা-রহস্যে এশিয়া কাপ শ্রীলঙ্কার

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন