বারবাডোজে করোনা টেস্ট, উদ্বেগে বাংলাদেশ!

উৎপল শুভ্র

২৩ জুলাই ২০২১

বারবাডোজে করোনা টেস্ট, উদ্বেগে বাংলাদেশ!

দ্বিতীয় ওয়ানডে স্থগিত হয়ে যাওয়ার পর মাঠ থেকে হোটেলে ফিরে যাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটাররা। ছবি: এএফপি

বারবাডোজে করোনা পরীক্ষার রেজাল্ট যে শুধু স্থগিত হয়ে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের বাকি দুই ম্যাচই নয়, আরও দুটি আন্তর্জাতিক সিরিজ হবে কি হবে না, তার নির্ধারক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে একটি সিরিজ বাংলাদেশের। যে কারণে বাংলাদেশও এখন উদ্বেগভরে অপেক্ষায় আছে বারবাডোজ থেকে ভেসে আসা খবরের জন্য।

কোনো এক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান করোনা পজিটিভ হয়েছেন, আর তা নিয়ে মহা উদ্বেগে চারটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দল! বাংলাদেশও আছে যার মধ্যে।

করোনাকাল কত রকম বিস্ময়ের সঙ্গেই না আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। এটাকে বলতে পারেন তাতে সর্বশেষ সংযোজন। সর্বশেষ, তবে শেষ তো অবশ্যই নয়। কে জানে, সামনে আরও কত নাটকীয় ঘটনার সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেবে এই সর্বনাশা ভাইরাস!

আপাতত যা হয়েছে, সেটাতেই না হয় থাকি। টস হয়ে যাওয়া মানে অনানুষ্ঠানিকভাবে ম্যাচ শুরু হয়ে যাওয়া। গতকাল বারবাডোজে সেই টস হয়ে যাওয়ার পরও স্থগিত হয়ে গেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ওয়ানডে। ‘কোনো এক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান’ বলেছিলাম, তা হলে আসলে সমস্যা হতো না। ওই ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

সুনির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও সাপোর্ট স্টাফদের কেউই হবেন বলে অনুমান। এর পরের ঘটনাপ্রবাহ আপনার জানা বলেই অনুমান করছি। দল সংশ্লিষ্ট একজনের করোনা পজিটিভ হওয়ার খবর মাঠে পৌঁছানো মাত্র দুই দল হোটেলে ফিরে গেছে। হোটেলে ফিরেই যে যার রুমে। খেলোয়াড়-কোচ-দলের বাকি সব সদস্য সবাইকে থাকতে হচ্ছে আইসোলেশনে। করোনা টেস্টের রেজাল্ট না আসা পর্যন্ত তা-ই থাকতে হবে। আর সেই টেস্টে দুই দলের কোনো একজনও পজিটিভ হলে সবার জন্যই ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারান্টাইন।

সেই ভয় তো আছেই। বারবাডোজে অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ভিন্ন ফ্লোরে থাকলেও সেন্ট লুসিয়া থেকে একই বিমানে এসেছে বারবাডোজে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের কারও পজিটিভ হওয়ার মানে তো তিনি কাউকে সংক্রমিত করে থাকতেই পারেন। তা যদি হয়, তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

খেলা কোনো জীবন-মরণ ব্যাপার নয়। তারপরও ‘সর্বনাশ’ শব্দটা ব্যবহার করার একটাই কারণ। বারবাডোজে করোনা পরীক্ষার রেজাল্ট যে শুধু স্থগিত হয়ে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের বাকি দুই ম্যাচই নয়, আরও দুটি আন্তর্জাতিক সিরিজ হবে কি হবে না, তার নির্ধারক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে একটি সিরিজ বাংলাদেশের। যে কারণে বাংলাদেশও এখন উদ্বেগভরে অপেক্ষায় আছে বারবাডোজ থেকে ভেসে আসা খবরের জন্য।

রবিবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডের পর সেখান থেকেই সরাসরি বাংলাদেশে আসার কথা অস্ট্রেলিয়ার। ৩ আগস্ট থেকে টি-টোয়েন্টি সিরিজ, পাঁচ ম্যাচের সূচিও ঘোষণা করা হয়ে গেছে। এখন কারও করোনা পজিটিভ হওয়া মানে অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশ সফর বাতিল।

`কী হবে` উৎকণ্ঠা নিয়ে মাঠ থেকে গন্তব্য হোটেল। ছবি: এএফপি

একই রকম অনিশ্চয়তায় ঢাকা পাকিস্তানের ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরও। ৫টি টি-টোয়েন্টি আর দুই টেস্টের মোটামুটি লম্বা এক সিরিজ, যা শুরু হওয়ার কথা ২৭ জুলাই। ওয়েস্ট ইন্ডিজ-পাকিস্তান সিরিজ নিয়ে দুশ্চিন্তা ওই দুই দল করুক, বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা নিজেদের নিয়েই। ভারতের সফর অর্থকরী দিক থেকে এক নম্বরে থাকতে পারে; থাকেও, কিন্তু মর্যাদার দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ডকে পাওয়া মনে হয় আরও উপরে। এই দুই দেশে বাংলাদেশ ট্যুর করার সুযোগ সেভাবে পায়ই না, এই দুই দলকে নিজেদের দেশে পাওয়ার সুযোগও সহজে মেলে না। গত বছর জুনেই তো বাংলাদেশে দুই টেস্টের ট্যুর বাতিল করেছে অস্ট্রেলিয়া।

আপনার মনে যে প্রশ্নটা জাগার কথা, তা অনুমান করে উত্তরটাও বলে দিচ্ছি। গত বছর জুনে তো বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি এখনকার তুলনায় কম খারাপ ছিল। তাহলে তখন যে অস্ট্রেলিয়া আসতে রাজি হলো না, তারাই এখন আসছে কেন?

এই একটা প্রশ্নের উত্তর হবে দুটি। প্রথমটা হলো, গত বছর জুনে করোনার ধাক্কায় টালমাটাল বিশ্ব এই আপদ থেকে নিজেদের নিরাপদ রেখে কীভাবে খেলা যায়, সেই উপায় পুরোপুরি আবিষ্কার করে সারতে পারেনি। বাংলাদেশ তো আরও না। বাংলাদেশে সব ক্রিকেট তখন বন্ধ। পরে বাংলাদেশে যে আন্তর্জাতিক সিরিজগুলো হয়েছে, সেগুলোকে অভয়বাণী শুনিয়েছে বিসিবি আয়োজিত ঘরোয়া দুটি টুর্নামেন্ট। এরপরই না আসতে রাজি হয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কা। 

দ্বিতীয় যে কারণ, সেটাই এখন অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশে আসতে চাওয়ার আসল কারণ। গত বছর জুনের টেস্ট সিরিজটা বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার জন্য তা ছিল নিছকই কর্তব্যপালন। বলতে পারেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষা। না খেললে তাদের কিছু আসে যায় না। কিন্তু এবারের পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজটা অস্ট্রেলিয়ার নিজেদের প্রয়োজনেই। বিশ্ব ক্রিকেটের বড় শক্তি হিসেবে বাংলাদেশের প্রতি কর্তব্য পালনের কোনো ব্যাপার এখানে নেই। সামনেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। যা ভারত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে সরে গেলেও কন্ডিশন তো সেই উপমহাদেশীয়ই থাকছে। সেই বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্যই বাংলাদেশের এই ট্যুরটা যেকোনো মূল্যে করতে চাইছে অস্ট্রেলিয়া। আগে থেকেই তাদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৪-১ ম্যাচে টি-টোয়েন্টি সিরিজ হারার পর যে গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

এ কারণেই বাংলাদেশে যখন করোনা সংক্রমণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, কদিন পরপর শিথিল-কঠোর নানা রকম লকডাউনে চলে যাচ্ছে দেশ, তখনও ট্যুরটা করার ঝুঁকি নিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া। সেই ঝুঁকিটা নিচ্ছে 'কোনোরকম ঝুঁকি নেই' তা নিশ্চিত করতে সব ব্যবস্থা নেওয়ার পরই। বায়ো বাবলের পরীক্ষা দিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কা সিরিজ দুটি সফলভাবে আয়োজন করেছে বিসিবি। সেই ভরসাতেই নিশ্চিন্ত হয়ে থাকেনি অস্ট্রেলিয়া। বায়ো বাবলকে শতভাগ নিচ্ছিদ্র করতে কঠিন কিছু শর্তও জুড়ে দিয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সিরিজ শুরুর দশ দিন আগে বায়ো বাবলে ঢুকে যাওয়াটা যার মধ্যে একটি।

দেরি হয়ে গেছে মুশফিক!

এসব নিয়ম অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। অন্যদেরও মানতে বাধ্য করে। এ কারণেই মুশফিকুর রহিম অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজে খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করতে একদিন দেরি করে ফেলায় তাঁর যেমন খেলা হচ্ছে না। বাংলাদেশে আমরা নিয়ম-আইন ব্যক্তিভেদে আলাদা হয়ে যায়, কিন্তু অস্ট্রেলিয়ানরা তো এই সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত নয়। দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও দেশের বাইরে থেকে ফেরার পর বাধ্যতামূলক হোটেল কোয়ারান্টাইনে থাকতে হয়। তিনি তা থাকেনও এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা সবাইকে জানিয়েও দেন। বাংলাদেশে যা কল্পনাও করা যায় না। বিসিবিই তো বিদেশি কোচিং স্টাফদের জন্য কতবার নিয়ম শিথিল করিয়েছে। সাকিব আল হাসান বিদেশ থেকে ফিরে পরদিনই সুপার শপ উদ্বোধন করতে জনারণ্যে চলে গেছেন। মুশফিকুর রহিমকে এক দিনের ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট বোর্ড যে পত্রপাঠ নাকচ করে দিয়েছে, তাতে তাই একটুও অবাক হইনি।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই ঘটনার পর অস্ট্রেলিয়া তো আরও সাবধান হয়ে যাবে। সেখানে যাওয়ার আগেও নিশ্চয়ই বায়ো বাবলকে নিচ্ছিদ্র করতে সব ব্যবস্থাই নিশ্চিত করা হয়েছিল, তারপরও তো লখিন্দরের বাসরঘরের মতো কোনো এক ছিদ্র দিয়ে ঠিকই ঢুকে গেছে করোনা ভাইরাস। যা এখন বাংলাদেশের বহু কাঙ্ক্ষিত সিরিজটাতেও ফেলেছে অনিশ্চয়তার ছায়া।

কী খবর আসছে বারবাডোজ থেকে?  

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন
×