২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ

বোলার আশরাফুলকে বড় ভয় সিডন্সের

উৎপল শুভ্র

২৪ অক্টোবর ২০২১

বোলার আশরাফুলকে বড় ভয় সিডন্সের

কোচ ও অধিনায়ক

কোচ চান না অধিনায়ক বোলিং করুন। কিন্তু অধিনায়কের এক কথা, পরিস্থিতি দাবি করলে তিনি বোলিং করবেনই। ২০০৯ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে এ নিয়ে বাংলাদেশ দলে মহা টেনশন। এমনই যে, বিশ্বকাপ শুরুর দিন এ নিয়ে না লিখে পারিনি। কারণ কোচ জেমি সিডন্সের কথা শুনে যে মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভালো করা না-করা অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুলের বোলিং করা না-করার ওপর নির্ভরশীল!

প্রথম প্রকাশ: ৫ জুন ২০০৯। প্রথম আলো।

ধুমধাড়াক্কা ক্রিকেটের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ কী বিস্ময় সাজিয়ে বসে আছে, এখনই তা বলা কঠিন। তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন, এই বিশ্বকাপে মোহাম্মদ আশরাফুল বোলিং করতে এলে জেমি সিডন্সের মুখটা দেখার মতো হবে!

প্রেক্ষাপটটা এমনই নাটকীয় যে, টেলিভিশন প্রযোজকের তা জানা থাকলে নিশ্চিত আশরাফুল বল হাতে নেওয়া মাত্র সিডন্সকে ক্লোজ-আপে ধরার নির্দেশ দেওয়া থাকত ক্যামেরাম্যানদের। সেই মুখে কী ফুটে উঠবে, সেটা এখনই বলে দেওয়া যাচ্ছে। বিরক্তি, অপমানবোধ এবং সবকিছু ছাপিয়েঅসহায়ত্ব।

বিরক্তি, কারণ আশরাফুলকে তিনি কোনো বোলারই মনে করেন না।

অপমানবোধ, কারণ আশরাফুলকে একাধিকবার বোলিং না-করতে বলেছেন।

অসহায়ত্ব, কারণ আশরাফুল তাঁর মতকে অগ্রাহ্য করে বোলিং করেই যাচ্ছেন।

গত পরশু বাংলাদেশের কয়েকজন সাংবাদিকের কাছে জেমি সিডন্স মনের কথা খুলে বলার পর থেকে বাংলাদেশ দলে এ নিয়ে একটু গুমোট ভাব। আগের দিন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে আশরাফুলের বোলিং করায় অখুশি বলে জানিয়েছেন সিডন্স, সঙ্গে শেষ ওভারে ফিল্ড সাজানো নিয়ে অসন্তোষও। যা শুনে আশরাফুলের এমনই তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে যে, কেমব্রিজে এক বন্ধুর বাড়িতে পূর্বনির্ধারিত যাত্রা বাতিল করে তিনি গুম হয়ে রুমে বসে থাকলেন। এ পর্যন্ত পড়ে এ অধ্যায়টিকে আপনি অনায়াসে গ্রেগ চ্যাপেল-সৌরভ গাঙ্গুলী ধরনের কোচ বনাম অধিনায়ক জাতীয় একটা মুখরোচক শিরোনাম দিয়ে দিতে পারেন।

তবে কাল সকালে কোচ-অধিনায়কের কথা শুনে মনে হলো, ব্যাপারটা এমন গুরুতর কিছু নয়। নটিংহামের পার্ক প্লাজা হোটেলের প্রাতরাশ টেবিলে এ নিয়ে এত কথা হচ্ছে জেনে সিডন্স বরং মহা বিস্ময় প্রকাশ করলেন। ম্যানেজার শফিকুল হক হীরা এই প্রতিবেদকের কাছে ঘটনা শুনে যখন ও কীভাবে এই কথা বলে আমি ওকে শোকজ করব জাতীয় হম্বিতম্বি করছেন, তখনই পাশের টেবিলে জেমি সিডন্সের আগমন। ম্যানেজার ঠারেঠোরে একটা ব্যাখ্যামতো চাইলেন। সিডন্স যারপরনাই বিরক্ত হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, প্রেস নিয়ে এত ভাবার কী আছে?

প্রশ্নটা যৌক্তিক কি না, এ নিয়ে কথা হতে পারে। তবে বাহুল্য যে, তা বলাই বাহুল্য। ডেভ হোয়াটমোরের সঙ্গে সিডন্সের অনেক পার্থক্যের মধ্যে এটা অনেক আগেই পরিষ্কার যে, হোয়াটমোর যেখানে সংবাদমাধ্যম নিয়ে অসম্ভব স্পর্শকাতর ছিলেন, সিডন্স কে কী লিখল’-কে খুব একটা পাত্তাই দেন না। কিন্তু এখানে তো সংবাদমাধ্যমের কোনো দায় নেই। এত বড় একটা টুর্নামেন্টে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামার দুদিন আগে অধিনায়কের প্রকাশ্য সমালোচনা করে সিডন্সই তো তাদের বিতর্ক তৈরির রসদ সরবরাহ করেছেন।

এ কথাতেও সিডন্স আশ্চর্য, আমি এমন কী বলেছি? আমি বলেছি, আশরাফুলের বোলিং করা উচিত নয়। দলে ওর চেয়ে ভালো বোলার আছে। আর বলেছি, ফিল্ড প্লেসিং নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে। এতে সমস্যা কোথায়? আশরাফুলের অধিনায়কত্ব ভালো হয়নিএ জাতীয় কিছুই তো আমি বলিনি।

কোচ জেমি সিডন্সের সঙ্গে অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল

কিন্তু এটা প্রকাশ্যে না বলে আশরাফুলকে বললেই কি ভালো হতো না? সিডন্সের দাবি, সেটিও তিনি বলেছেন। আশরাফুল সম্পর্কে সিডন্সের সর্বশেষ মন্তব্যটা বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠছে গত বছর অস্ট্রেলিয়া সফরের ওই ঘটনার কারণে। যখন আশরাফুলের অধিনায়কত্ব নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা করে বোর্ড থেকে কারণ দর্শাও নোটিশ পেতে হয়েছিল সিডন্সকে। সেখানেও ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল বলে সিডন্সের দাবি, আমি কখনোই বলিনি, আশরাফুলের অধিনায়কত্ব ভালো নয়। আমি বলেছিলাম, ও খুব চাপে আছে। ওকে তাই অধিনায়কত্ব থেকে কিছুদিন বিশ্রাম দেওয়া যেতে পারে। এটাকেই আপনারা সবাই অন্য রং চড়িয়ে দিয়েছেন।

অধিনায়ক আশরাফুলের ব্যাপারে সিডন্স বরং সহমর্মীই, আমি তো সব সময়ই বলি, ক্রিকেট বিশ্বে সবচেয়ে কঠিন কাজটা ওর। ওর হাতে যে খেলোয়াড় আছে, তা নিয়েই তো যা করার করতে হয়। মার্ক টেলর বা স্টিভ ওয়াহ এই দলের দায়িত্ব নিলেও খুব একটা হেরফের হতো না বলে বিশ্বাস এই অস্ট্রেলিয়ানের। আশরাফুলের ব্যাপারে তাঁর মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক যা হয়েছে, সেটির একমাত্র কারণ মনে করেন, তাঁর মনের কথা খুলে বলার সততাকে।

এ দাবির ব্যাপারে আশরাফুলও একমত। তাঁর মন্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা হয়েছে দাবি করে সাতসকালেই সিডন্স ব্যক্তিগতভাবে দুঃখ প্রকাশ করায় অধিনায়কের ক্ষোভ ততক্ষণে অনেকটাই প্রশমিত। সিডন্সের মতো তিনিও মনে করেন, আধুনিক ক্রিকেট অধিনায়ক ও কোচের যুগলবন্দী। সিডন্সের সঙ্গে তাঁর সেই যুগলবন্দী একদমই বেসুরো নয় বলেও আশরাফুলের দাবি, তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই ভালো। সে লোকও ভালো। সমস্যাটা হলো, সে অস্ট্রেলিয়ান আর বাংলাদেশি মানসিকতার পার্থক্যটা বোঝে না। আমাদের দেশে এমন সরাসরি কথা বললে সে জন্য যে অন্য রকম অর্থ হতে পারে, এটা ওকে অনেক বলেও কাজ হয়নি। হোয়াটমোর উপমহাদেশে অনেক দিন কাজ করেছে বলে এটা খুব ভালো বুঝত।

ফিল্ড সাজানো নিয়ে কোচের পর্যবেক্ষণকে খেলোয়াড়িসুলভ মনোভাবেই নিচ্ছেন। তবে বোলিং না করার নির্দেশটাকে নয়। পরিস্থিতি দাবি করলে অবশ্যই বোলিং করবেন বলে জানিয়ে দিলেন। দলে তাঁর চেয়ে ভালো বোলার আছেসিডন্সের এই মন্তব্যের জবাবে হেসে বললেন, আমিও ভালো বোলার। বোলিং ভালো করলে আমার ব্যাটিংও ভালো হয়। কিন্তু ভালো না করলে? নিজে নিরাপদ না থেকে এই ঝুঁকি তিনি কেন নিতে চাইছেন? কারণ আমি সব সময় ম্যাচে ইনভলব থাকতে চাই।

 ৫ জুন ২০০৯। প্রথম আলোতে প্রকাশিত এই লেখা

সিডন্স এ কথা শুনলে নিশ্চিত আরও চিন্তিত হয়ে পড়বেন। তাঁর কথাবার্তা শুনে মনে হওয়া স্বাভাবিক, এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভালো করার বেশ কিছু পূর্বশর্তের মধ্যে আশরাফুলের বোলিং না-করাটা জরুরি-শ্রেণীভুক্ত। রেকর্ডও তাঁকে সমর্থনই করে। গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম দুই ওভারে ১১ রান দেওয়ার পর শেষ দুই ওভারে আশরাফুল দিয়েছিলেন ২০ ও ২৪। পরে মাত্র ২০ বলে হাফ সেঞ্চুরি করে ম্যাচ জেতানোয় সেটি ঢাকা পড়ে যায়। ৯ ম্যাচে ১৬ ওভার বোলিং করে ৫ উইকেট। তবে টি-টোয়েন্টিতে কমপক্ষে ৫ উইকেট নিয়েছেন, এমন ৮২ জন বোলারের মধ্যে একমাত্র আশরাফুলেরই ওভার প্রতি রান খরচ দুই অঙ্কের (ঠিক ১০)।

আশরাফুল তারপরও ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। এটিকে সাহস বলবেন, নাকি দুঃসাহস? সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার আপনার ওপরই থাকল!

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন