ঢাকায় লারার ৪৫ বলে সেঞ্চুরির সেই শিল্পিত তাণ্ডব

উৎপল শুভ্র

৯ অক্টোবর ২০২১

ঢাকায় লারার ৪৫ বলে সেঞ্চুরির সেই শিল্পিত তাণ্ডব

৪৫ বলে সেঞ্চুরির পথে ব্রায়ান লারা

ব্রায়ান লারার স্মরণীয় ওয়ানডে ইনিংসগুলোর তালিকায় এটিও অবশ্যই থাকবে। ঘটনাচক্রে যেটির সঙ্গে জড়িয়ে বাংলাদেশ ও সে সময়কার ঢাকা স্টেডিয়ামের নাম। ৬২ বলে ১১৭ রান করেছিলেন, ৪৫ বলে সেঞ্চুরি ছিল তখন ওয়ানডেতে দ্বিতীয় দ্রুততম। লারার শিল্পিত সেই তাণ্ডব যেভাবে থেমেছিল, সেটিও বাড়তি মাত্রা যোগ করেছিল এই ইনিংসে। লারাকে আউট করেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর একমাত্র উইকেটটি পেয়েছিলেন হাবিবুল বাশার।

প্রথম প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ১৯৯৯। প্রথম আলো।

শেষ পর্যন্ত যখন ব্রায়ান লারার শিল্পিত তাণ্ডব থামল, বোলার হাবিবুল বাশার সুমনের চেয়েও বেশি খুশি হলেন আল শাহরিয়ার রোকন। অফ স্পিনার হিসেবে একেবারেই অনিয়মিত সুমন, তাঁর হাতে বল দেয়াটা অধিনায়কের যতটা না ট্যাকটিকাল সিদ্ধান্ত, তার চেয়ে বেশি নিরুপায় মরিয়া একটা চেষ্টা। নিয়মিত বোলারদের সবাই তখন পারলে মাঠ ছেড়ে দেন। ১৯ ওভারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর ২ উইকেটে ১৮২, ব্রায়ান লারার সেঞ্চুরিও তখন পাঁচ ওভার আগের ঘটনা। সুমনের ওভারের চতুর্থ বলটি পড়ল অফ স্টাম্পের একটু বাইরে, কাট করতে গিয়ে সেটিকে স্টাম্পে টেনে আনলেন লারা। দীর্ঘ পাঁচ বছরে খেলা মাত্র নয় ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে সুমনের প্রথম উইকেট। 

এর চেয়ে মহামূল্য প্রথম উইকেট পেয়েছেন খুব কম বোলারই। সুমন তো উচ্ছ্বাসে ভেসে যাবেনই। সেই উচ্ছ্বাসে তাঁর সঙ্গী হয়েছেন বাংলাদেশের সব খেলোয়াড়ই। কিন্তু তার মধ্যেও রোকনের আনন্দটা ছিল অন্য রকম। আনন্দ না বলে বলা ভালো 'স্বস্তি', বুক থেকে যেন পাষাণভার নেমে গেল তাঁর। সেই পাষাণভার তাঁর বুকে চেপে বসেছিল ম্যাচের দ্বিতীয় ওভার থেকেই। সফিউদ্দিন বাবুর প্রথম বলটি লাগার ব্যাট ছুঁয়ে যখন প্রথম স্লিপে এলো, ক্যারিবীয় অধিনায়কের নামের পাশে তখন মাত্র ৫ রান। স্লিপে ফিল্ডিং করার অভ্যাস কারই বা তেমন আছে বাংলাদেশে! রোকন তাই নিচু হওয়ার বদলে কিছুটা সোজা হয়ে গেলেন প্রথমে, সর্বনাশটা হয়ে গেল সেখানেই।

প্রমত্ত ব্রায়ান লারা

এরপর একেকটি বল গেছে, একেকটি ওভার, আর রোকনের অস্বস্তি বাড়তে বাড়তে রূপ নিয়েছে যন্ত্রণায়। ক্যাচ ফেলে দেয়ার পর সেই ব্যাটসম্যানকে সেঞ্চুরি করতে দেখা...ক্রিকেট মাঠে এর চেয়ে যন্ত্রণার ব্যাপার আর কিছু নেই। আর সেই সেঞ্চুরি যদি এমন হয়, তাহলে তো আর কথাই নেই।

কেমন সে সেঞ্চুরি? পরিসংখ্যানই তা বলে দিচ্ছে। ২৬ বলে হাফ সেঞ্চুরি করা লারা দ্বিতীয় ফিফটি করেছেন মাত্র ১৯ বলে। ৪৫ বলে সেঞ্চুরি, ১৮টি চার, ৩টি ছয়...২৮ বছর বয়সী ওয়ানডে ক্রিকেটে এর চেয়ে বিধ্বংসী সেঞ্চুরি আছে আর একটিই। ১৯৯৬ সালে নাইরোবিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পাকিস্তানি শহীদ আফ্রিদির ৩৭ বলে সেঞ্চুরির রেকর্ড ভাঙতে পারেননি। তবে আফ্রিদি যাঁর রেকর্ড ভেঙেছিলেন, সেই সনাৎ জয়াসুরিয়ার সিঙ্গাপুরে করা ৪৮ বলে সেঞ্চুরিকে 'দ্বিতীয়’ থেকে তৃতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরিতে নামিয়ে এনেছেন লারা।

লারা যখন এমন মেজাজে থাকেন, তখন কেমন বল-কোন বোলার এসব কোনো ব্যাপারই নয়। বাংলাদেশের বোলিং অ্যাটাক তো তাঁর জন্য একেবারেই ডালভাত। এ কারণেই এর আগে বাংলাদেশের বিপক্ষে দুই ইনিংসে তাঁকে দুবার আউট করা মঞ্জুর প্রথম স্পেলের চেহারা হলো ৩-০-৩০-০। স্লিপে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেছিলেন, নতুন বলে মঞ্জুর সঙ্গী বাবুর এই গর্ব আড়াল হয়ে গেল ৩ ওভারে ৩২ রানের গ্লানিতে। মঞ্জুর সঙ্গে লোকজন গ্লেন ম্যাকগ্রার তুলনা করছে, এই খবর হয়তো লারার কানে গিয়ে থাকবে। মঞ্জুর তৃতীয় ওভারটিতে তাই তাঁর প্রতি একটু বেশি মনোযোগ দিলেন লারা। চারটি বাউন্ডারি এলো সেই ওভারে, এর মধ্যে তিনটি পরপর তিন বলে। বাবুর পরের ওভারে দেখা গেল এক পা তুলে লাবার সেই বিখ্যাত পুল। কী দেখা যায়নি, সেই প্রশ্নই আসলে তোলা যায়। কাট, ড্রাইভ, পুল, সুইপ...ক্রিকেট বইয়ের প্রচলিত সব স্ট্রোকের বাইরেও ছিল তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতার স্বাক্ষর। ঢাকা স্টেডিয়াম অনেক ভালো ইনিংসেরই সাক্ষী। তবে লারার কালকের ইনিংসটি বাকি সব কিছু ছাড়িয়ে জ্বলজ্বল করবে এখন থেকে। ব্যাটিং সৌন্দর্যে বিন্দুমাত্র আপস না করেও কতটা আক্রমণাত্মক হওয়া যায়, লারার ব্যাটিং সব সময়ই তার আদর্শ উদাহরণ। সেটিই কাল পরিপূর্ণ মহিমায় প্রকাশিত হতে দেখলেন ঢাকার দর্শকরা।

এই ছবিটা ২০০৭ বিশ্বকাপের। একই ফ্রেমে ব্রায়ান লারা ও হাবিবুল বাশারকে পাওয়ায় মনে হলো, লেখাটার সঙ্গে এটা ভালোই যায়৬২ বলে খেলা ১১৭ রানের ইনিংসে ৯৪ রান এসেছে মাত্র ২২ বল থেকে। ১৯টি চার ও ৩টি ছয়, ওই ৯৪ সীমানা পেরুনো ২২টি স্কোরিং শটের ফসল। দৌড়ে নিয়েছেন যে বাকি ২৩ রান, সে জন্য খেলতে হয়েছে তাঁকে ৪০ বল। মঞ্জু-বাবুর চেয়েও লারার তোপ বেশি গেছে সুজনের ওপর দিয়ে। দ্বাদশ ওভারে আক্রমণে আসেন বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের নায়ক। মিডিয়াম পেস বোলিংয়ের খুনি হিসেবে পরিচিত লারা যাতে বড়ই আনন্দ পেলেন। তাঁকে সামনে পেয়ে প্রথম ওভারেই ২টি চার ও ১টি ছয়... ওই ওভারে এলো ১৬ রান। পরের ওভারে লারা আরও উন্মত্ত। প্রথম বলটি 'ডট', সে কারণে রাগ হলো বোধ হয়। পরের বলটি উড়ে গেল মিড উইকেটের ওপর দিয়ে, শেষ চারটি বলেই চার, ওভারে মোট ২২ রান। তৃতীয় বাউন্ডারিটি মেরেই এক হাতে হেলমেট আর হাতে ব্যাট নিয়ে মাথার ওপর তুলে ধরলেন ব্রায়ান লারা। ওয়ানডেতে তাঁর ত্রয়োদশ সেঞ্চুরি। দ্বাদশ সেঞ্চুরিটি এসেছিল অনেক দিন আগে। লারার মতো ব্যাটসম্যানের জন্য বিস্ময় রকম দীর্ঘ এই খরার সময়টা।

গত পরশু প্রথম ম্যাচে অনেক দিন পর তাঁকে ওপেন করতে নামতে দেখেই বোঝা গিয়েছিল, শুধু সেঞ্চুরির খরা কাটানো নয়, ওয়ানডের সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডটিকেও একটা চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইছেন লারা। সেই মতোই এগোচ্ছিলেন, যেভাবে এগোচ্ছিলেন, তাতে পুরো ৫০ ওভার খেলতে পারলে তো শুধু ডাবল নয়, ট্রিপল সেঞ্চুরিরও সম্ভাবনা জাগত। যা হয়নি, তা নিয়ে আর কথা বলে লাভ নেই। তবে যা হয়েছে, সেটিকেও লারা কথা বলার মতো কোনো উপলক্ষ মনে করছেন না। ওয়ানডেতে তাঁর ছয় হাজার রান পূর্ণ হয়েছে। আউট হয়ে ড্রেসিংরুমে ফেরার পর তাঁকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে একজন উত্তর পেয়েছেন, 'ছয় হাজার রান, তাতে কী? এ তো অনেকেই করেছে।'

ওই শেষ লাইনটিতেই পরিস্ফুট ক্রিকেটার লারার দর্শনটা। অনেকেই যা করেছে, তা করায় তাঁর তৃপ্তি নেই। তিনি এমন কিছু করতে চান, যা আগে কেউ করেনি। টেস্টে ৩৭৫, প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ৫০১...।

শেষে কী ওয়ানডেতে প্রথম 'ডাবল সেঞ্চুরি' লেখা হবে একদিন?

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন