উৎপল শুভ্র নির্বাচিত পাঠকের লেখা

কোহলি তো কোনো পরাজিত সৈনিক নন

ইফতেখার নিলয়

১২ অক্টোবর ২০২১

কোহলি তো কোনো পরাজিত সৈনিক নন

বিরাট কোহলি

ভারতের টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন আগেই। ছেড়ে দিয়েছেন আইপিএলে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর অধিনায়কত্বও। সেই অধ্যায়টা শেষ হয়েছে একটা আক্ষেপ নিয়েই। দারুণ দল নিয়েও কখনো শিরোপা জিততে পারেননি আইপিএলের। শূন্য হাতে বিদায়টা আরও বিস্বাদ করে তুলেছে সমর্থকদের সাইবার বুলিং। কোহলি এর জবাব নিশ্চয়ই তাঁর মতো করেই দেবেন। কারণ তিনি তো কোনো পরাজিত সৈনিক নন।

সময়টা ২০০৮। অধিনায়ক হিসেবে ভারতকে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জেতানোর পর ততদিনে তারকাখ্যাতি লেপ্টে গেছে তাঁর শরীরে। আইপিএলের যাত্রাও শুরু সে বছরই। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু দলে ভেড়াল তাঁকে, সম্পর্কের শুরুটা এভাবেই।

তখন তিনি ঊনিশ বছরের এক লিকলিকে তরুণ, যাঁর চোখে-মুখে আগ্রাসনের জোয়ার। মাঠে যাঁর নিবেদনের মাত্রা ছাড়িয়ে যায় শত সংখ্যার বাঁধটাকেও। গ্রাউন্ড ফিল্ডিংয়ে যাঁর ছুটে চলা চিতার চেয়েও দ্রুতগতিতে। তাঁর প্রাণপণ চেষ্টা নজরে আসে প্রতি বলেই। দলে তারকার ফুলঝুরির মাঝেও এই তরুণ ক্রিকেটার শরীরী ভাষা দিয়ে নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছিলেন। নামটা তো শিরোনামেই জেনে গেছেন, বিরাট কোহলি।

আরসিবি বোধ হয় খুব ভালোভাবেই টের পেয়েছিল তরুণ এই ক্রিকেটারের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আগুনটা। যে কারণে আরসিবির জার্সি ছাড়া কোহলিকে অন্য কোনো জার্সিতে এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি কোহলিকে। এবারের আসরেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। আগামী আসরেও থাকবেন এই দলটার সঙ্গেই, জানিয়েই দিয়েছেন। পার্থক্য বলতে, তিনি আর অধিনায়ক থাকবেন না।

কোহলির আরসিবির নেতৃত্ব ছাড়ার বিষয়টা অবশ্য অনুমেয়ই ছিল। যখন জানালেন, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরই ভারতের জাতীয় দলের নেতৃত্ব ছাড়বেন, তখনই গুঞ্জন রটতে শুরু করেছিল, আরসিবির দায়িত্বটাও বোধ হয় ছাড়বেন এই মৌসুম শেষেই। মূলত জাতীয় দল ও আইপিএলে নিজের শতভাগ পারফরম্যান্স নিশ্চিত করতেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে ভাবা হচ্ছিল। এমনিতেই, জাতীয় দলের জার্সিতে শতরানের দেখা নেই দুই বছর। এসব কিছুই হয়তো তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। শঙ্কায় ফেলেছিল আরও খারাপ সময়ের। কিন্তু, কোহলি তো হার মেনে নেওয়ার মতো কেউ নন। বরং, পরাজয়কে পরাজিত করে জয়ী যোদ্ধা রূপে আবির্ভূত হওয়ার উদাহরণ অনেকবারই গড়েছেন একজন কোহলি। জিততে হলে ত্যাগ করতে হয়, তা কোহলি বেশ ভালোই জানেন। এই কারণেই বোধ হয়, আরসিবির নেতৃত্বের আর্মব্যান্ডটাও আপাতত খুলে রাখলেন। কিছুটা হলেও এর ফলে যদি চাপ কমে আসে, আর কোহলি যদি কয়েকগুণ ভয়ঙ্কর কোহলি হয়ে ওঠেন। তখন তো এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ না জানিয়ে উপায় নেই। তবে, কোহলি তা হতে পারবেন কি না, সেই উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে আইপিএলের পরের আসর পর্যন্ত।

এখন বরং আইপিএলে কোহলির এতদিনকার যাত্রা নিয়ে আলোচনা করাই শ্রেয়। ১৩ বছরের আরসিবি ক্যারিয়ারে সর্বশেষ নয় আসরে (২০১৩-২০২১) নেতৃত্ব দিয়েছেন। এই সময়ে কোহলির অর্জন কী? প্রশ্নটা আপনি মুচকি হেসে উড়িয়ে দিতে পারেন এই ভেবে যে, নামের পাশে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকের অরেঞ্জ ক্যাপ থাকলেও শিরোপা তো নেই। ব্যাপারটা তুলনা হতে পারে মেসির সঙ্গেই, বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল থাকলেও যাঁর বিশ্বকাপ নেই। যদিও ক্রিকেটকে মাপা যায় না ফুটবলের রীতি-নীতিতে। ২০১৬ আইপিএল মৌসুমের কথা মনে করলে কোহলি বা আরসিবি সমর্থক না হলেও আপনি একটা বড় দীর্ঘশ্বাস নেবেন নিশ্চিত। ৪টি শতক আর ৭ অর্ধশতকে কোহলির নামের পাশে সেবার লেখা হয়েছিল ৯৭৩ রান। কিন্তু দলগত অর্জন? দীর্ঘশ্বাসের ফাইনাল শেষে রানার্সআপের ট্রফি।

দলে বাঘা বাঘা নাম থাকার পরেও কোহলি আরসিবিকে ট্রফি জেতাতে ব্যর্থ হয়েছেন। কোহলিসহ বাকি বড় নামধারীরা পারফর্ম করলেও দিন শেষে ট্রফি থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০১৬ আইপিএল ফাইনালে তাঁর ও গেইলের উড়ন্ত সূচনার পরেও এবি ডি ভিলিয়ার্স কিংবা শেন ওয়াটসনের মতো বড় ক্রিকেটারা ফাইনালের চাপ উতরে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে পারেনি। ম্যাচ শেষে কোহলির মলিন মুখ মনে থাকতেও পারে, না-ও পারে। তবে এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, কোহলি অবদান রাখেননি বলে জিততে পারেনি আরসিবি। বরং কোহলির সাজানো মঞ্চকে এবি ডি, ওয়াটসন ও লোকেশ রাহুলরা কাজে লাগাতে না পারায় শেষমেশ হারতে হয়েছিল আরসিবিকে।

তরুণ ক্রিকেটারদের সার্বক্ষণিক ছায়া হয়েই ফলাফল বের করে আনতেন কোহলি। প্রতিটি উইকেট পড়ার পর বোলারের চেয়েও কোহলির উল্লাস প্রমাণ করে, সতীর্থদের সাফল্য কতটুকু আনন্দ দিত তাঁকে। এমন অধিনায়ককে আপনি শুধুমাত্র ট্রফি জয় না করতে পারার জন্য 'পরাজিত নেতা' বলতে পারেন না। কোহলি একজন আপাদমস্তক নেতাই বটে। যাঁর শরীরের শিরায়-শিরায় নেতৃত্বের রক্ত প্রবাহিত। মাঝে মাঝে যা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে বলেই প্রতিপক্ষের প্রতি কোহলির ব্যাট ও মুখের বুলি চলে করাতের মতো।

গত নয় মৌসুমে কোহলির নেতৃত্বে আরসিবি ১৪০ ম্যাচের মধ্যে ৬২ ম্যাচ জিতলেও হেরেছে ৬৯ ম্যাচ। এর মধ্যে সুপার ওভারে দুটি জয় রয়েছে। গত মৌসুমে সুপার ওভারে তাঁর ব্যাটিং আইপিএল অনুসারীদের এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়ার কথা নয়। পরাজয়ের পাল্লাটা বেশি ভারি দেখে নিন্দুকরা নাক সিটকানোর সুযোগ পাবে ঠিকই, কিন্তু কোহলির নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন বোধ হয় কেউই তুলবে না।

ম্যাচ জয়ের হার ৪৮.১৬। এবার অধিনায়ক হিসেবে শেষ আসর হওয়ায় কোহলি নিজেই মুখিয়ে ছিলেন শিরোপা জিততে। মঙ্গলবার কেকেআরের কাছে হেরে আরেকবার ব্যর্থ হলেন। কোহলির মতো ক্রিকেটারদের বেদনাই আরও বেশি আগ্রাসী করে তোলে ভবিষ্যতের জন্য। তাই কোহলিকে কোনো পরাজিত সৈনিকের মানদণ্ডে ফেললে রাখলে, আপনি বিরাট ভুল করবেন।

বিদায়টা সবাই মধুর চায়। কোহলি নিজেও চেয়েছিলেন। আরসিবিকে শিরোপা জিতিয়েই অধিনায়কত্ব ছাড়তে চেয়েছিলেন। কেকেআরের কাছে পরাজয়ে তা আর হলো কই?

পরাজয় দিয়ে শেষ হওয়ার চেয়েও কোহলি সম্ভবত কষ্ট পেয়েছেন, ম্যাচ শেষে তাঁর ভিনদেশী সতীর্থ ক্রিকেটাররা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন বলে। ড্যান ক্রিস্টিয়ান বল হাতে খরুচে হওয়ায় আরসিবি সমর্থকরা ড্যান ক্রিস্টিয়ানের গর্ভবতী স্ত্রীর ইন্সটাগ্রাম অ্যাকাউন্টে আজেবাজে মন্তব্য করেছেন। ড্যান ক্রিস্টিয়ানের পাশাপাশি গ্লেন ম্যাক্সওয়েলও ধিক্কার জানিয়েছেন সমর্থকদের এমন কর্মকাণ্ডকে।ম্যাক্সওয়েল যা বলেছেন। ছবি: ইএসপিএন ক্রিকইনফো

এবারের মৌসুম অসাধারণ কেটেছে বলেও উল্লেখ করেন ম্যাক্সওয়েল তাঁর টুইটে। পাশাপাশি নিন্দা জানান সে সকল সমর্থকদের, যাঁরা অযথাই সাইবার বুলিং করেছে ড্যান ক্রিস্টিয়ানের স্ত্রীকে। তবে ভালোবাসা জানাতে ভুলে যাননি খাঁটি ভক্তদের। উপমহাদেশীয় সমর্থকদের এমন উগ্রতা অবশ্য নতুন কিছুই নয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সরগরম হয়ে যায় ড্যান ক্রিসটিয়ান আর ম্যাক্সওয়েলের এমন বার্তার পর। এতে করে সমর্থকদের জন্য সৌন্দর্যহানি ঘটেছে ক্রিকেটের। যেদিন সম্মান প্রদর্শন করার কথা ছিল নেতা কোহলিকে, সেদিন সমর্থকরা উল্টো খাটো করেছে পুরো দলকে। আরসিবির নামের সম্মানহানি ঘটা মানেই কোহলির সম্মানে আঘাত আসা। অধিনায়কত্বের বিদায়বেলায় ভিনদেশী সতীর্থদের এমন পরিস্থিতি দেখতে চাননি নিশ্চয়ই খোদ কোহলিও।

ড্যান ক্রিস্টিয়ান, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল মানসিকভাবে যতটুকু বিপর্যস্ত হয়েছেন সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে, তার সমপরিমাণ কষ্ট কোহলিও পেয়েছেন অধিনায়ক হিসেবে। ক্রিস্টিয়ান, ম্যাক্সওয়েল কিংবা কোহলি সবাই তো সমর্থকদের ভালোবাসেন। এমন আচরণ তাদের কারোই প্রাপ্য নয়। বিদায়ের দিনের সতীর্থদের এমন নাজেহাল হওয়া কোহলিকে আবেগতাড়িত করেছে নিশ্চিত। অথচ, কোহলির বিদায়ের দিনটা আরও বেশি সুন্দর হতে পারত। তবে, কোহলি তো পরাজয় মেনে নেওয়া কোনো সৈনিক নন। সতীর্থদের এই বিষাদকে শক্তিতে পরিণত করবেন হয়তো পরের মৌসুমেই ব্যাট হাতে।

আর আরব-আমিরাতে তো এখনও টি-টোয়েন্টির সবচেয়ে বড় মহারণ শুরু হওয়া বাকি। অপেক্ষায় থাকুন, সেখানে ভারতের অধিনায়ক হিসেবে শেষ অধ্যায়ে কোহলি হয়তো রচনা করতে পারেন নতুন এক রূপকথা।

কারণ কোহলি কোনো পরাজিত সৈনিক নন।

সম্পর্কিত বিষয়:

শেয়ার করুনঃ
আপনার মন্তব্য
আরও পড়ুন